প্রতিরোধের নয়া অঙ্কুরোদ্গমকে স্বাগত

সুদীপ্ত বসু

১ জানুয়ারী, ২০১৭

বালি মাফিয়াদের মৃগয়াক্ষেত্র। মুখ্যমন্ত্রীর কথায় ‘মাথায় অক্সিজেন কম যাওয়া’ অনুব্রত মণ্ডলের দাপটের এলাকা, মাথা তুলেছে দুষ্কৃতীরাজ। বিস্তৃত হয়েছে ভয়ের সাম্রাজ্য। আর সেই ভয়ের রঙ? কালো, ঘন আঁধারের ক্যানভাস।

সেই আঁধারেই এক চিলতে রোদ্দুর হাফিজা খাতুন।

চলে যাওয়া বছর, স্মৃতির খাতায় জমে থাকা ঘটনার ভিড়ে হাফিজা খাতুন আমাদের চেতনাতেও নিঃসন্দেহে রঙ মশাল জ্বেলেছে।

হাফিজা খাতুন কোন সংবাদপত্রের পাতায় জায়গায় পায়নি।

হাজিফা খাতুন কয়েক শো কিলোমিটার দূরে ভিনরাজ্যের বাসিন্দা, নিজের একমাত্র কন্যা সন্তানের নিথর দেহ নিয়ে কলকাতার রাস্তাকে চোখের জলে ভেজানো এক অসহায় বাবা’র হদয়ে জায়গা পেয়েছে। সন্তান হারানো এক মা’র দীর্ঘশ্বাসের দাম চুকিয়েছে। প্রবল জেদে, দুর্দান্ত এক প্রত্যাঘ্যাতের সোনালি স্পর্শে!

*****************************

হাফিজা খাতুন সেই বালি মাফিয়াদের সাম্রাজ্যের বাসিন্দা। বীরভূমের ইলামবাজারের একটি গ্রামে তাঁর বাড়ি। হাফিজা সাহাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী। হাফিজা মমতা ব্যানার্জির সাধের ‘সবুজ সাথী’ প্রকল্পে সাইকেল পেয়েছিল। সাইকেলে চেপে ইস্কুলে যাওয়ার কথা ছিল।

মমতা ব্যানার্জির একচ্ছত্র দখলদারির রাজত্বই তাঁর সাইকেলে চেপে ইস্কুলের যাওয়ার এক এবং একমাত্র বাধা হয়ে দাঁড়ালো শেষমেষ।

তখন মে মাস, প্রবল দাবদাহ। দ্বিতীয়বারের জন্য সরকারের মমতা ব্যানার্জি। সেই সরকার আনার জন্য কিংবা তৃণমূলের ভোট বাড়া/ কমা কোন কিছুতেই ভূমিকা ছিল না হাফিজার, কেননা ভোটার লিস্টেই তো নাম ওঠেনি তাঁর। তবুও ভোট শেষের পরে দশম শ্রেণির ছাত্রীকে শুনতে হয়েছে, ‘ইজ্জত নেওয়ার’ হুমকি। তাঁর বাড়িতেই চড়াও হয়েছিল শাসক দলের বাহিনী, লন্ডভন্ড করেছে ঘরের সব আসবাব, তাঁর বই পত্র, আঁকার খাতাও। শেষমেষ গায়েও হাত পড়েছে, শিউরে উঠেছে হাফিজা। শুনতে হয়েছে ‘বাড়াবাড়ি করলে ইজ্জত নিয়ে নেবো, দেখবি কেমন লাগে’। কিন্তু কী তাঁর অপরাধ? শাসকের চোখ রাঙানী, ‘ভোট দিসনি আমাদের, তারপরে আবার আমাদের সাইকেল চড়বি, রেপ করলে বুঝবি ঠেলা’।

শুধু হাফিজা নয়, তাঁর আরও কয়েকজন সহপাঠির পরিণতিও তাই। তবুও হাফিজা মাথা নত করেনি, প্রবল জেদেই মাথা তুলছে। লাগবে না সাইকেল, ইজ্জত যাওয়ার হুমকি দেওয়া সাইকেল চড়বো না।

এই শহর, শহর লাগোয়া আধুনিক নগরায়নের ছোঁয়া মেশানো তল্লাট হয়তো সম্পূর্ণভাবে অনুবাদ করতে পারবে না, ইলামবাজারের মত জায়গায় দাড়িয়ে ১৬বছরের এক কিশোরীর এই প্রত্যাঘাতের কাহিনী।

নারী নির্যাতন-ধর্ষণ- শ্লীলতাহানি- এসব শব্দ কিংবা এসব শব্দের বিরুদ্ধে কোথাও মোমবাতি কোথাও গানের সুরে প্রতিবাদের ভাষা সব কিছুই অর্থহীন হয়ে যায় আসলে এই মনোভাবের সামনে। একটা সরকার, একটা শাসক দল যে কোন অছিলায় এক স্কুলছাত্রীকেও বেমালুম রেপের ভয় দেখাতে পারে, প্রশাসনও যখন সেই ভয়ে ভয় পাওয়া পরামর্শ দেয়, বুঝতে হবে আসলে প্রতিরোধের লড়াইটা কতটা জোরালো হওয়া প্রয়োজন।

ক্যালেন্ডারের পাতায় ধূসর হয়ে যাওয়া সদ্য প্রাক্তন ২০১৬ পার্ক স্ট্রিটের পুনরাবৃত্তি দেখিয়েছে বিধাননগরে (পার্কস্ট্রিটের মতই সারা রাত চলন্ত গাড়িতে এক তরুণীকে ধর্ষণ), গেঁদে, গাইঘাটার পুনরাবৃত্তিও দেখিয়েছে কখনও বাগদা কখনও বর্ধমান। একই সঙ্গে হাফিজা খাতুনকেও দেখিয়েছে।

কোন উদাহরণ আমরা সামনে আনবো? কোন রঙে আগামীর দিনগুলিকে রাঙাবো?

*****************************

৩১শে ডিসেম্বর। বছর শেষের সকাল। নববর্ষের উন্মাদনায় আগাম মেতে ওঠা শহর। সেই সকালেই ফোন মেলে সেই ভিনরাজ্যের অসহায় এক বাবার কাছ থেকে।

গত দু’ বছরের মত এবারও ৩১শে ডিসেম্বের তাঁর কাজ থেকে ছুটি চেয়ে বিহারের সমস্তিপুরের পুলিশ সুপারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন রামশঙ্কর ঝাঁ। সেই আবেদন মঞ্জুরও হয়েছে। ৩১শে ডিসেম্বর ঘরের ভিতর তাঁর একমাত্র মেয়ের ছবির সামনে বসেই কাটাবেন এক অসহায় দম্পতি।

৩১শে ডিসেম্বর, ২০১৩। এই রাজ্য, এই শহর সাক্ষী ছিল এক অসহণীয় বর্বরতার যা কলকাতাকেও বাধ্য করেছিল মুখ লুকোতে। দু’ বছর আগে সেই বর্ষশেষের রাত একই সঙ্গে দেখিয়েছিল এই শহর কলকাতা এখনও কাঁদতে জানতে। নববর্ষের উৎসবকেকে পিছনে ফেলে ভিনরাজ্যের এক শ্রমজীবী পরিবারের কিশোরীর জন্য মিছিলে সামিল হতে পারে।

মধ্যমগ্রামের কিশোরী-নামেই এই শহর রাজ্যের মানুষের পরিচিত হয়ে উঠেছিল রামশঙ্কর ঝাঁ-অনিতা ঝাঁর একমাত্র কন্যা সন্তান।

বিশ্বাস করতেন কলকাতা গরিব মানুষের নিরাপদ আশ্রয়। সেই বিশ্বাসে ভর করেই একমাত্র মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন কলকাতা। দু-বার ধর্ষণের শিকার হয়ে অবশেষে আগুনে পুড়ে মৃত্যু হয়েছিল তাঁর ১৫বছরের একমাত্র মেয়ের। তারপরেও রাজ্য সরকারের সঙ্গে কার্যত ‘যুদ্ধ’ করতে হয়েছে ন্যায় বিচারের জন্য, এমনকি নিজের মেয়ের মৃতদেহের অধিকার পাওয়ার জন্য।

রামশঙ্কর ঝাঁ’র ফোন এসেছিল সকালে। প্রশ্ন ছুঁড়েছিলাম কেমন আছেন, রিসিভারের ওপার থেকে উত্তর এসেছিল অঝোর কান্না হয়ে। তাঁকে শুনিয়েছিলাম হাফিজা খাতুনের কথা, হালিশহরের সেই দেবশ্রী ঘোষের কথা, রাজ্যের বিস্তীর্ণ প্রান্তে কোথাও নির্যাতনের শিকার হওয়া, কোথাও বা ঘরছাড়া হয়েও রুখে দাড়ানো আরও একাধিক মহিয়সীর গল্প। শুনেছিলেন নির্বাক হয়েছে। শেষে বললেন, ‘আমার মেয়ের লড়াই ওঁদের মধ্যেই বেঁচে থাকুন। আর হ্যাঁ আমিও লড়বো, এখনও একটি মামলার বিচার বাকি আছে’।

*****************************

নতুন ক্যালেন্ডারে নতুন বছরে প্রথম দিনে পা রাখতে তখনও ৭২ঘন্টা বাকি।

পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনায় টাউনের জয়ন্তীপুর, সবে সন্ধ্যা নেমেছে। দুই বোনের সঙ্গে বাড়ি ফিরছিলেন আরও দুই নাবালিকা। ঘৃণ্য চোখ তাঁদের শরীরকেও ছাড় দিলো না। এখানেও সেই শাসক দলের বাহিনী, বোনের সামনেই এক নাবালিকাকে তুলে নিয়ে শাসক দলের দুষ্কৃতীরা, একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে চলে শারীরিক নির্যাতন। হাসপাতালে শুয়েই নতুন বছরের পদার্পন ‘উপভোগ’ করবে চন্দ্রকোনার নাবালিকা। তবুও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে গড়িমসি, আক্রান্ত পরিবারকেই মামলা তুলে নেওয়ার চাপ।

-এটাই আজকের বাংলা। পশ্চিমবঙ্গে এখন এটাই দস্তুর। ‘অর্ধেক আকাশ বিপন্ন’- বিপদ শুধু এটাই নয়। বরং আরও ভয়ানক প্রবনতা হলো আক্রান্তদের বিরুদ্ধেই দাড়াচ্ছে প্রশাসন। যার সহজ অর্থ- অপরাধীদের মনোবল বাড়বে, এমন ভূমিকাই পালন করছে মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সিংহভাগ অপরাধের ঘটনার শিকাহ হচ্ছে গরিব, নিম্নবিত্ত পরিবারের মহিলারা। একই সঙ্গে সিংহভাগ ঘটনাতেও অভিযুক্ত শাসক দল। ফলে শাসক দলের অনুগত ‘বুদ্ধিজীবি’ বাহিনীও মুখে লিউকোপ্লাস্ট লাগিয়ে রেখেছে নির্দ্বিধায়।

সরকারে আসার মাত্র দুবছরের মাথাতেই জাতীয় মহিলা কমিশনের মহার্ঘ পর্যবেক্ষণ কুড়িয়েছে রাজ্যের মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর সরকার- ‘পশ্চিমবঙ্গে দিনের কোন সময়তেই নিরাপদ নয় সাত থেকে বাহাত্তর, কোন বয়সের মহিলারাই’। এই লজ্জা, গ্লানিকে সঙ্গে নিয়েই আরও একটি নতুন বছরে পা রাখলো আমার রাজ্য!

ধর্ষণের রঙ হয়, ধর্ষণের ঘটনারও রাজনৈতিক পরিচয় আছে- এই নিদারুন চিত্র সত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে এরাজ্যের মাটিতে। বর্ধমানের কেতুগ্রামে তা আরও ভয়াবহ। ধর্ষণের করার পরে হুমকির মুখে অপমানে গায়ে আগুন দিয়ে আত্মঘাতী হয়েছেন একেবারে দরিদ্র পরিবারে ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী। কিন্তু তারপরেও কিশোরীর বাবা দায়ের এফ আই আর ধর্ষণ শব্দটুকু লেখার ‘সাহস’ পায়নি। অপরাধীদের দাপট এতটাই তীব্র। শাসক দল ও পুলিসের চাপেই সন্তান হারানো পিতা এফ আই আরে ধর্ষণ কথাটি উল্লেখ করতে পারেননি। নিছক খারাপ ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেই দায়ের করতে হয়েছিল এফ আই আর!

*****************************

সম্প্রতি এন সি আর বি’র ২০১৫ সালের রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। সেই রিপোর্টেও নারী নির্যাতনে ফের প্রথম সারিতেই পশ্চিমবঙ্গ। এক বছরে পশ্চিমবঙ্গে ৩৩হাজারের বেশি মহিলা আক্রান্ত হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ দ্বিতীয় স্থানে, সামনে শুধু উত্তর প্রদেশ। কেন্দ্রের এই রিপোর্ট বলছে, ২০১৫ সালে রাজ্যে মহিলাদের ওপর আক্রমণের মোট ঘটনা ঘটেছে, ৩৩হাজার ২১৮টি।একই সঙ্গে এই রিপোর্টেই দেখা গেছে ঐ বছরে দেশে মোট ২০১৬টি দলবদ্ধ ধর্ষনের ঘটনা ঘটেছে। দেশের মধ্যে মাত্র যে সাতটি রাজ্যে দলবদ্ধ ধর্ষনেই একশোর গণ্ডী পেরিয়েছে তার মধ্যেও রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ! তবে ধর্ষনের চেষ্টা হয়েছে এমন ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গই দেশের শীর্ষস্থান অর্জন করেছে। এরকম ঘটনার সংখ্যা হাজারের বেশি!

শুধু তাই নয় এন সি আর বি’র ঐ রিপোর্ট-ই বলছে ২০১৪ সালের তুলনায় সারা দেশে মানব পাচারের (বিশেষত মহিলা) সংখ্যা ২০১৫ সালে প্রায় ২৫শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৪ সালে যা ছিল ৫৪৬৬, ২০১৫’তে তা দাড়ায় ৬৮৭৭। এর মধ্যে ৮৫ শতাংশই শিশু পাচারের ঘটনা, যার বেশিরভাগই কন্যাশিশু। আর গোটা দেশের এক তৃতীয়াংশ শিশু পাচারের ঘটনা ঘটেছে এরাজ্য থেকেই। শুধুমাত্র ২০১৫সালেই পশ্চিমবঙ্গ থেকে ১১৯৮টি শিশু পাচারের ঘটনা ঘটেছে যার ৮০ শতাংশ কন্যাশিশু। এরাজ্যের দুই চব্বিশ পরগনা, সুন্দরবন, মুর্শিদাবাদ, হুগলী থেকেও অসংখ্য নারী পাচারের ঘটনা সামনে এসেছে।

*****************************

এ’কোন সকালের দিকে আমরা এগোচ্ছি, যা নিকষ অমাবস্যার রাতের চেয়েও অন্ধকার! কোন প্রজন্ম, কোন চেতনা এবাংলার মাটিতে শ্বাস প্রশ্বাস নিচ্ছে, জল-বাতাস-সার পেয়ে মাথা তুলে দাড়াচ্ছে?

একরাশ প্রশ্ন, অসহায়তা, এক মেয়ের আব্রু রক্ষার জানকবুল লড়াই- শেষ হয়ে যাবে এত তাড়াতাড়ি, তা মনে করাটা চিন্তার দৈন্যতা। সমাজের বিকাশ, চলার গতির সঙ্গেই তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

কিন্তু নতুন বছর সঙ্গী হোক হাফিজাদের প্রবল আত্মমর্যাদা, চোখে চোখ রেখে উত্তর দেওয়ার রঙীন লড়াইয়ের উপাখ্যানেই।

স্বাগত ২০১৭।

আগাম স্বাগত প্রতিরোধের নয়া অঙ্কুরোদ্গমকে ।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement