ভয় কাটিয়েই জীবনের চ্যালেঞ্জ

স্নিগ্ধা বন্দ্যোপাধ্যায়

১৫ জানুয়ারী, ২০১৭

বর্ষশেষ ও নতুন বছরের আগমনে নানা প্রান্তের মানুষ উৎসবমুখর। কলকাতায় পার্ক স্ট্রিট চত্বর আলোর রোশনাই‍‌তে ঝলমল করে উঠছে। বিভিন্ন শপিং মল, সিনেমা হল, রেস্তোরাঁগুলোতে যখন উপচে পড়া ভিড়, চারিদিকে হইহই করে চলছে মেলা, উৎসব, তখন ঠিক একই সময়ে সমাজের আরেক কোণে পড়ে রয়েছেন এক অংশের মানুষ। তাদের জীবনে কীভাবে উৎসবের ছোঁয়া এসে লাগে বা আদৌ আনন্দ, স্বস্তি, শান্তির কোনো প্রভাব আছে কিনা, তা একবার খুঁজে দেখলে কেমন হয়। তাঁদের জীবনে আদৌ কোনো রঙ রয়েছে কিনা, নাকি আলো-আঁধারির মাঝে আটকে থাকা শুধুই গেরো, তারই খোঁজে বেরোনো।

রাণাঘাট স্টেশন থেকে ১০ কিমি ভেতরের এক গ্রাম থেকে কোলের দুই সন্তানকে নিয়ে প্রতিদিন ভোরবেলা বেরিয়ে পড়েন ৩৮ বছরের রূপা দাস। একজন বারো, আরেকজন আট। এমন দুই ছেলেই রূপার বেঁচে থাকার একমাত্র তাগিদ। চার বছর হলো রূপা তাঁর স্বামীকে হারিয়েছেন, যদিও মনে হয় এই তো সেদিনের ঘটনা, বলতে গেলে চোখের কোণগুলো জলে টলটল করে ওঠে। এখন রূপা মেলায় মেলায় চপ ভাজেন। এটাই তাঁর রোজগার। ছোটোবেলা থেকেই রান্নার কাজে রূপার হাত পাকানোই ছিলো, কিন্তু জীবনের কঠিন সময়ে এটাই যে এমনভাবে কাজে লাগবে রূপার কোনো ধারণাই ছিল না। মেলার সন্ধ্যাগুলোতে রূপার চপের দোকানে ভালোই ভিড়, বিক্রিও ভালো। কিন্তু বছরের অন্য সময়ে পালা পার্বণে গ্রামের বড় বাড়িতে রান্না করার ডাক পড়ে। এই নিয়েই সংসার চলে কোনোক্রমে। দুই ছেলের লেখাপড়া আপাতত বন্ধ। পেটের জোগান দিতে গিয়েই নাজেহাল হতে হচ্ছে ওদের মা-কে, প্রত্যেক অন্ধকার রাতেই নেমে আসে পরের দিনের চিন্তা।

লক্ষ্মী মণ্ডল, বাড়ি কৃষ্ণনগরে। বাড়িতে তাঁর স্বামী, চার বছর ধরে বেকার। মাঝে মাঝে জোগাড়ের কাজে ডাক পড়লেও বাকিদিনগুলোতে লক্ষ্মীর সংসারের কাজে সাহায্য করেন। তার আগে শহরের দিকে জুটমিলে কাজ করতেন। বিনা নোটিসে হঠাৎ মিলের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একসঙ্গে ৪৫০ জন বেকার হয়ে পড়েন। আর এর ফলেই লক্ষ্মী এখন এই সংসারের রোজগারের একমাত্র ভরসা। কৃষ্ণনগর থেকে ৮টা ২০’র ট্রেন ধরে লক্ষ্মী বেরিয়ে পড়েন দু’ব্যাগ ঠাসা প্লাস্টিকের পিঠে পুলি, কচুরির ছাঁচের সেট বিক্রি করতে। কোনো মেলার মাঠ বা উৎসবের প্রাঙ্গণের একটা কোণই লক্ষ্মীর কেনাবেচার দস্তুর জায়গা। শীতকালে একটা বস্তা বিছিয়ে বসে পড়েন, প্যাকেট প্রতি ২০ টাকা। সারাদিনে রোজগার যা হয় তাই পরিবারের খাবারের জোগান। রাতের ট্রেনে ঘরে ফিরে হাঁড়ি চাপান লক্ষ্মী, আর ততক্ষণে তাঁর স্বামী, একমাত্র সন্তানকে ‍‌নিয়ে পথ চেয়ে থাকেন, দুশ্চিন্তায় কাটান তাঁর না ফেরা পর্যন্ত। ফিরে এসে আবার পরের দিনের বেরোনোর প্রস্তুতি। এইভাবেই দিন গুজরান লক্ষ্মী ও তাঁর পরিবারের।

ব্যান্ডেল থেকে মাথায় ঝাঁকা নিয়ে ট্রেনের ভিড়ে গাদাগাদি করে নিজের জায়গা করে নেন প্রতিদিন নিয়ম করে হারুণ রশিদের স্ত্রী ফতিমা। ঝাঁকায় প্লাস্টিকের রঙবাহারি ফুল। অন্য কম্পার্টমেন্টে হারুণ ওঠেন আর একটা ঝাঁকা নিয়ে। শহরের রাস্তায় রাস্তায় ফুল ফেরি করে বেরান দু’জনে মিলে। সন্ধ্যা হলে আগে থেকে ঠিক করা নির্দিষ্ট মোড়ের চায়ের দোকানে একসঙ্গে দেখা করেন। রোজগারের পয়সা হিসেব করে, সেই দোকানেই চা, মুড়ি খেয়ে আবার রাতের ট্রেনে বাড়ি ফেরা। শিয়ালদহ থেকে ট্রেন ছাড়তেই ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসে ফতিমার। উলটো দিকের দরজায় বসে চাদর মুড়ি দিয়ে বাইরের তীব্র গতিতে ছুটে যাওয়া আলো-অন্ধকারের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে বলে চলেন নিজের জীবনের অব্যক্ত কথাগুলো।

শ্যামনগর স্টেশন থেকে মাঝে মাঝেই ট্রেনে উঠতে দেখা যায় জয়া দামকে। অফিস টাইমের ব্যস্ততার মধ্যে একটা ভারী বিগ শপার নিয়ে ট্রেন বদলের তাড়াহুড়ো তাঁর মধ্যেও। উলটোদিকের ট্রেন ধরে কখনও কল্যাণী, কখনও কৃষ্ণনগর, কখনও রানাঘাট অবধি। ট্রেনেই রঙবেরঙের পাপড়, বিভিন্ন ডিজাইনের বড়ি বিক্রি করেন জয়া। মহিলা কম্পার্টমেন্টে নিত্যযাত্রীদের কাছে তিনি বিশেষভাবেই পরিচিত। মুখে সর্বদা মিষ্টি হাসি, আর আপনজনের মতোই তাঁর ব্যবহার। এটাই তাঁর রোজগারের একমাত্র সম্বল। বাড়িতে এবছরই হায়ার সেকেন্ডারি দেবে তাঁর একমাত্র মেয়ে। মেয়ের লেখাপড়ায় অর্থ জোগান দিতে গিয়ে বাড়িতে বাড়তি সেলাইয়ের কাজ করতে হয়। তাকিয়ে আছেন সামনের দিনের কোনো আশার আলোর দিকে।

এমনভাবেই লক্ষ্মী, জয়া, ফতিমারা সূর্যের আলো দেখা দিতেই তাঁদের দিন শুরু করেন আর তারপর থেকে লড়াই। দিন আসে দিন যায়, কিন্তু দিনের আলোকে মুঠোয় ধরে তাঁরা জীবনযুদ্ধে শামিল হন প্রতিদিন। যে সময় শহরের অন্ধকার গলির হাতছানি প্রতিদিন একটু একটু করে গ্রাস করছে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মহিলাদের, আর জীবনে রঙিন আলোর স্বপ্ন দেখিয়ে বিপথে এরাজ্যের মেয়েরা দিনের আলোয় পাচার হয়ে যাচ্ছে অন্য রাজ্যে। বাসে, ট্রামে, ট্রেনে খেতের মাঠে প্রতিদিন গড়ে ৭ জন ধর্ষিতা হচ্ছেন, তবুও ভয় না পেয়ে, থমকে না থেকে এঁরা জীবনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে মোটেই কুণ্ঠাবোধ করছেন না।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement