ক্লাসরুম থেকে রাজপথ
রাজপথ থেকে জেল

শুভ্রালোক দাম

২২ জানুয়ারী, ২০১৭

গত ৮ই ডিসেম্বর পড়ন্ত বিকেলে জেলা দপ্তরে কর্মীসভায় বসে। হঠাৎ সেলফোন বেজে উঠলো; এক পরিচিত সাংবাদিকের ফোন— ‘‘২০শে জানুয়ারি কোচবিহার জেলার সমস্ত কলেজে ছাত্র-ছাত্রী সংসদ নির্বাচন। আজ ডি এম অফিসে সমস্ত কলেজের অধ্যক্ষ ডি এম, এস পি, পি বি এম কর্তৃপক্ষের যৌথ মিটিংয়ে ‍‌সিদ্ধান্ত হয়েছে ২২শে ডিসেম্বর নোটিফিকেশন জারি হবে।’’ আর কিছুক্ষণ কথোপকথন চালা‍‌নোর পর ফোনটি রেখেই পাশে বসে থাকা মাথাভাঙা জোনাল সম্পাদক কমরেড জাভেদ আলি বলল বন্ধ‍ু কলেজ নির্বাচন ঘোষণা হবে ২২ তারিখ। জাভেদ শুনেই বলে বাস্তব পরিস্থিতি কি বুঝছিস, কোনো কলেজে গণতান্ত্রিক পরিবেশই নেই, তবু লড়তে হবে ‘গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফেরানোর লক্ষ্যে’।

এরপর সমস্ত কমরেডদের কলেজ নির্বাচনের খবর জানানো শুরু করলাম। সবার একটাই উত্তর ছিল বিনা লড়াইয়ে ক্যাম্পাস ছাড়বো না। এরপর দফায় দফায় মিটিং করলাম কিন্তু দেখলাম ন্যূনতম কোনো কলেজে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নাই পরিস্থিতি বুঝে আমরা ডি এম-কে ডেপুটেশনের সিদ্ধান্ত নিলাম। ১৯শে ডিসেম্বর আমরা ডি এম-কে দাবিসনদ দিয়ে জানাই অনলাইন নমিনেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। কলেজ ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সেদিনই ডি এম অফিসে আমরা জানিয়ে আসি নির্বাচনে আমরা এস এফ আই অংশগ্রহণ করবোই, বাধা পেলে রাস্তায় নেমেই আন্দোলন হবে।

২২শে ডিসেম্বর কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তৃপক্ষ যে নোটিফিকেশান জারি করলো তার ছত্রে ছত্রে ছিল কলেজ নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করার ব্লুপ্রিন্ট। অনলাইন নমিনেশনের কথা তো নেই বরং মনোনয়ন তোলা, জমা দেওয়া ও ভোটের সময় সীমা ২ঘণ্টা করা হয়েছে। ২৪ তারিখ আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য তথা রাজ্যপালের দ্বারস্থ হই। আমাদের দাবি ছিল —

(১) অনলাইন অ্যাডমিশন হলে অনলাইন নমিনেশন নয় কেন?

(২) কাদের স্বার্থে সময় সীমা ২ঘণ্টা করা হলো।

(৩) কলম যার, ক্যাম্পাস তার- কলেজ ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।

কিন্তু জেলা প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাদের দাবিতে কর্ণপাত করেনি। আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ৩রা জানুয়ারি মনোয়ন তোলার প্রথম দিন জেলার প্রতিটি কলেজের সামনে তৃণমূলী অ-ছাত্র দুষ্কৃতীরা বিপুল সংখ্যায় জমায়েত হয়। পু‍‌লিশ প্রশাসন নির্লিপ্তভাবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে। সকাল ১১টা ‍‌ থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত তৃণমূলীরা কলেজ অবরুদ্ধ ক‍‌রে রাখে। ফলস্বরূপ কোনো কলেজে কোনো ‍‌বিরোধী দল মনোনয়ন তুলতে পারেনি। অন্যদিকে মাথাভাঙা কলেজে গোষ্ঠী কোন্দলে গুলি চলে; কোচবিহার শহরের এ বি এন এস এল কলেজ, কোচবিহার কলেজ গোষ্ঠী কোন্দলে রক্তাক্ত হয়। মনোনয়ন তোলার প্রথম দিন থেকেই আমরা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম — যদি ‍‌ মনোনয়ন তোলার দ্বিতীয় তথা শেষ দিনেও যদি একইভাবে তৃণমূলীদের (ছাত্র নয়) দ্বারা কোচবিহার জেলার কলেজ ক্যাম্পাসগুলো অবরুদ্ধ থাকে তবে মনোনয়ন তোলার শেষ সময় পর্যন্ত আমরা চেষ্টা করবো অন্যথা ২টার পর কোচবিহার শহর অবরুদ্ধ হবে।

আমরা দেখলাম মনোনয়নের শেষ দিনেই প্রায় একই পরিস্থিতি শুধুমাত্র ঠাকুর পঞ্চানন মহিলা মহাবিদ্যালয় ও মেখলিগঞ্জ কলেজ বাদ দিয়ে কোনো কলেজেই বিরোধী ছাত্র সংগঠন মনোনয়ন তুলতে পারেনি। ৪ঠা জানুয়ারি দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে এস এফ আই কোচবিহার জেলা কমিটির ডাকে প্রশাসনে ছাত্র ভোট বাতিলের দাবিতে মিছিল জেলা কার্যালয় থেকে শুরু হয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল স্থান ঘুরে কোচবিহার কাছারি মোড়ে পথ অবরোধ শুরু হয়। ধীরে ধীরে কোচবিহার শহর অবরুদ্ধের চেহারা নেয়। পু‍‌লিশ অবরোধ তুলতে এলে আমরা পরিষ্কার জানাই ডি এম/ এস পি এখানে এসে জানাতে ‍‌হবে কেন ছাত্রছাত্রী সংসদ নির্বাচন প্রহসনে পরিণত করা হলো? অবরোধের ৪৫ মিনিট অতিক্রান্ত হলেও প্রশাসন নির্লিপ্ত আচরণ করতে থাকে। মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছিল দেখে প্রশাসনকে বারবার বার্তা দেওয়া হয় কিন্তু কাজ না হওয়ায় পুলিশমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা পোড়াতে প্রশাসন অতি সক্রিয় হয়ে ওঠে।

কোচবিহারের রাজপথ অবরুদ্ধ হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ বাড়তে থাকে তাই এস এফ আই সিদ্ধান্ত নেয় ডি এম অফিসে ধরনায় বসবে। তাই অবরোধ তুলে দিয়ে ছাত্রদের দৃপ্ত মিছিল ডি এম অফিসের দিকে এগিয়ে চলে ততক্ষণে বিশাল পুলিশবাহিনী মিছিলকে ঘিরে ফেলে। ডি এম অ‍‌ফিস চত্বরে ধরনায় বসামাত্র র‌্যাফ ও পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ করে, পুরুষ পুলিশরাও ছাত্রীদের পেটায়। এস এফ আই -র ডাকে শামিল হওয়া ছাত্রছাত্রীরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মার খায়, রক্তাক্ত হয় ডি এম অফিস চত্বর— যা পশ্চিমবঙ্গে মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে টিভি পর্দায়। এস এফ আই কোচবিহার জেলার সভাপতি আকিক হাসানকে মারতে পুলিশ গাড়িতে তুলতে গেলে আমি ছুটে আসি তাকে ছাড়াতে কিন্তু পুলিশ আমাকে ঘিরে ধরে লাঠিচার্জ শুরু করে। একাংশ পুলিশ অফিসারকে বলতে শুনে‍‌ছি ওরা ছাত্র, এভাবে ওদের মারছ কেন? কিন্তু তৃণমূলী পুলিশকর্মীরা তাতে কর্ণপাত করেনি। আকিকদা ও আমাকে পুলিশ মারতে মারতে গাড়িতে তোলে। পু‍‌লিশের গাড়ি আমাদের নিয়ে কিছু দূর এগোলেই ছাত্রছাত্রীরা পুলিশের গাড়ি আটকায় ও স্লোগান দিতে থাকে। পুলিশ আবার লাঠিচার্জ করে, সেখান থেকে এস এফ আই নেত্রী চঞ্চরিকা ভট্টাচার্য, স্বরূপা সরকার ও যুবনেতা শম্ভু ‍চৌধুরিকে পুলিশের গাড়িতে তুলে থানায় নিয়ে আসে। পুলি‍‌শের গাড়িতে করে থানায় আনার সময় আমাকে ও আকিকদাকে গোপালদা নামে এক কনস্টেবল পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ করে থানায় নিয়ে এসে চড়াও হয়। পরে জানতে পারি যখন স্বরূপা সরকার ও চঞ্চরিকা ভট্টাচার্যকে গাড়ি করে আনা হয় পুলিশকর্মীরা তাদের মোবাইলে ছবি তুলে রাখে। আমাদের সবাইকে দাগি অপরাধীদের সাথে একই লকআপে রাখা হয়। আমাদের সাথে থানায় দেখা করতে আসা তিন কমরেডকে আটক করে পুলিশ। লকআপের ভিতরেই বাথরুম— তার গন্ধে বমি হতে থাকে। রাত ১টায় ২বার বমি করার পর ডিউটি অফিসার লকআপ থেকে বের করে একটি রু‍‌মে বসিয়ে রাখে। ছাত্রী কমরেডদের যেখানে রাখা হয়েছিল সেখানে রাতভর মদ্যপ পু‍‌লিশকর্মীরা গালিগালাজ করতে থাকে। বারবার মনে হচ্ছিল আমি কি দুঃস্বপ্ন দেখছি? নাকি এটাই বর্তমান প্রশাসনে আসল নগ্ন প্রতিচ্ছবি।

গভীর রাতে আমাদের গ্রেপ্তারের কাগজে সই করিয়ে নেওয়া হয়। কোতোয়ালি থানায় এক অফিসার আমাদের বিরুদ্ধে এফ আই আর দায়ের করেন। এফ আই আর-এ আমাদের ৫ জনসহ প্ররোচনা দেওয়ার ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব তারিণী রায়, অনন্ত রায়, তমসের আলি, বনমালী রায়, মহানন্দ সাহার নাম যুক্ত করা হয়। বিভিন্ন ধারা দেওয়া হয়। ধারাগুলো দেখে ‍বোঝা যায় আমাদের গ্রেপ্তার করা একটা বড় চক্রান্তের অংশ বিশেষ। পুলিশ যখন লকআপ থেকে বের করে গাড়িতে তোলে তখন থানার সামনে প্রাক্তন ছাত্র নেতা‍ থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ আমাদের মেডিক্যাল করানোর জন্য এম জে এন হাসপাতালে নিয়ে গেলে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ডাক্তার অর্থপেডিক্স দেখাতে বলেও সময় নেই বলে পুলিশ জি আর কোর্টে নিয়ে আসে। পুলিশ কোর্টে নিয়ে আসার পর যে দৃশ্য দেখলাম তা কোনদিনও ‍ভোলার নয় এবং ছাত্র আন্দোলনের কর্মী হিসেবে নিজেদের গর্ববোধ ‍হচ্ছিল। এস এফ আই কর্মী সমর্থক তো বটেই, প্রাক্তন ছাত্র, যুব নেতৃত্ব, মা-বাবা, গণতান্ত্রি প্রিয় মানুষ, পরিবার পরিজনের ঢল নামে জি আর কোর্টে যা দেখে পুলিশকর্মীরা বিব্রতবোধ করতে থাকে।

৫ই জানুয়ারি বেলা ২টায় ব্যাপক পুলিশি প্রহরায় আদালতে আমাদের তোলা হলে ৫০ জন আইনজীবী এক‍‌যোগে দাঁড়িয়ে আইনি লড়াই শুরু করেন। বিশিষ্ট আইনজীবী পার্থ সেনগুপ্তের নেতৃত্বে আইনজীবীরা এক একটি ধারা ধরে ধরে ব্যাখ্যা দেন ততোই পু‍‌লিশ যে আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ধারা দিয়েছে তা প্রকাশ পেতে থাকে। প্রশাসন যে কতোটা মিথ্যাচার করছে তার প্রমাণ পাওয়া যায়, যখন ১৬ বছরের নাবালিকা এস এফ আই নেত্রী স্বরূপা সরকারকে ১৯ বছর দেখিয়ে কোর্টে চালান করে। বিচারক সব শুনে ও তথ্য প্রমাণ দেখিয়ে স্বরূপা সরকারকে জুভেনাইল কোর্টে ও বাকি ৪ জনকে জেল হেপাজতে পাঠায়। এই সময়টা টেনশন হচ্ছিল কিন্তু‍ নিজের জন্য নয়, মা-বাবার জন্য, দু’জনেই অসুস্থ। বামপন্থী রাজনীতি করতে আসছি আর তৃণমূলী প্রশাসন মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে পাঠাবে এটাই ভবিতব্য।

জি আর কোর্ট থেকে জেলে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত কমরেডরা দাঁড়িয়ে থাকে— এ দৃশ্য লিখে প্রকাশ করার মতো শক্তি আমার নেই। স্বরূপা সরকারকে শহীদ বন্দনা ‍ হোমে পাঠায় আদালত ও আমাদের কোচবিহার জেল সংশোধনাগারে নিয়ে আসে পুলিশ। জেলে ঢুকেই একটা অন্যরকম অনুভূতি হলো, এর আগেও পুলিশ অনেকবার আটক করছে কিন্তু জেলে এই প্রথমবার। জেলের ভেতরে নিয়মকানুন বুঝে নিতে কিছুটা সময় লাগলো। জেলরক্ষীরা ততক্ষণে ভেতরে বাকি ইউ টি দের জানিয়ে দিয়েছে এরা ছাত্র — এদের সাথে জেলে ভালো ব্যবহার করা হয়। আমাদের নিয়ে রাখা হয় ক্লাব সেল-এ, যার অন্য নাম রিক্রিয়েশন হল। ক্লাবে ৫৩ জন আবাসিক। তাদের নেতা ও রাইটার সমরদা — দুজনেই অথিয়েতায় আমা‍‌দের ভরিয়ে দেয়। ক্লাব সেল-এর দায়িত্বে থাকা রক্ষী ও জুমাদের আমাদের প্রত্যেকে ৩টা করে কম্বল দেয়, থালা দেয়, ফ্লোরের মধ্যে কম্বল দিয়ে আমরা বিছানা করি। বিশাল হলঘর তার মধ্যে ৫৩ জন ইউ টি আবাসিক এদের কিন্তু কয়েদি বলে না। জে‍‌লে ভেতরে নিয়ম আগে পুরানো আবাসিকরা খাবার নেবে তারপর নতুনরা। লাইন ধরে সবাই খাবার নিচ্ছে সুশৃঙ্খলভাবে। জে‍‌লে খাবারের মান খুব নিম্নমানের কিন্তু সময়মত খাবার আসছে। জেলে এসে নতুন অনেক শব্দে সাথে পরিচয় হলাম। তারমধ্যে অন্যতম হলো ফাইল-এর অর্থ ওষুধের পাতার মতো সবাইকে বসতে হয়, জুমাদার সাহেব কাউন্ট করেন — সব ইউ টি আছে কিনা, দিনে ৭বার গণনা করা হয়। জেলে প্রথম রাত আমি, আকিদা, শম্ভুদা গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরেরদিন অর্থাৎ ৬ তারিখ সকাল বেলা ফাইল ফাইল চিৎকারে ঘুম ভাঙলো, বুঝলাম আবার গুনবে, ঘড়িতে সকাল ৬টা, গণনা শেষ হলে সেল ‍‌থেকে বাইরে বেরোতে দেওয়া হলো হাত মুখ ধোওয়া, ব্রাশ করার জন্য, চা আর মুড়ি চলে আসলো সব আবাসিকদের জন্য। আমরা তিনজন স্নান করে নিয়ে রেডি হলাম কোর্টে যাওয়ার জন্য। সেদিন ঠিক ২টায় আমাদের কোর্টে তোলা হলো, কোর্ট চত্বরে এস এফ আই সহ গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষের ঢেউ আছড়ে পড়লো, ভিড় নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে হিমশিম খেতে হলো। বিচারক দুই পক্ষের আইনজীবীদের কথা শুনে এস এফ আই নেত্রী চঞ্চরিকা ভট্টাচার্যকে ১০ই জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করলেন আর আমাদের তিনজনকে ১০ই জানুয়া‍‌রি পর্যন্ত জেল হেপাজতে পাঠালেন। এস এফ আই আরেক নেত্রী স্বরূপা সরকারকে জুভিনাল কোর্টের বিচারক জামিন দি‍‌লেন। দুই নেত্রী জামিন পাওয়ায় আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। আমরা জেলের ভেতরে যতোটা নিশ্চিন্তে ছিলাম জেলের বাইরে মানুষগুলো ততোটাই উদ্বিগ্ন ছিল। জেলে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা হলো। জেলে থাকা ইউ টি দের সাথে কথা বলেই আমাদের দিন কাটতে লাগলো। তাস, লুডো, কেরামবোর্ড সবই আছে জেলে।

জেলে যে কদিন ছিলাম প্রত্যেক দিনই দলবেঁধে সবাই দেখা করতে আসতো। ডি ওয়াই এফ আই রাজ্য সভাপতি সায়নদীপ মিত্র জেলে এসে দেখা করেছে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ এসেছেন বার বার দেখা করতে। দিনহাটার প্রিয় কমরেডরাও জেলে গেছেন দেখা করতে। এই অসম লড়াইয়ে প্রত্যেক কমরেড যেভাবে সাহস জুগিয়েছেন তা এককথায় অনবদ্য —যা‍‌ কোনোদিনও ভুলবো না। প্রত্যেক ইউ টি আবাসিকরা সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গিতে আচরণ করেছেন। জেলে বসেই পরিকল্পনা হয়েছে মেখলিগঞ্জ ক‍‌লেজ ভোটে কিভাবে লড়াইয়ে ঝড় তোলা যায়, সংগঠনকে আগামী দিনে কিভাবে ‍‌গোছানো যায়। ২০শে জানুয়ারি যখন আমাদের জামিন হলো তখন সবার মুখে সাময়িক লড়াই জেতার হাসি। কোর্ট চত্বরে এস এফ আই কর্মী সমর্থকদের ভিড়ে উপচে পড়লো — সাথে গণতান্ত্রিক প্রিয় মানুষরা। জেল থেকে মুক্ত হয়ে কমরেডদের যে উষ্ণ ভালোবাসা আর অভ্যর্থনা পেয়েছি তা কোনোদিনও ভুলবার নয়।

জেল থেকে বেরিয়ে সোজা অফিসের দিকে যখন এগিয়ে চলেছি তখন পেছনে তাকিয়ে দেখি তা মিছি‍‌লে আকার নিয়েছে। এস এফ আই রাজ্য কমিটির সভাপতি মধুজা সেনরায়, রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অর্ণব বোস, দীপক বর্মণ আমাদের স্বাগত জানাতে কোচবিহারে হাজির হন। স্লোগানে স্লোগানে কমরেডরা আমাদের জেল থেকে ফেরার বার্তা কোচবিহারবাসীর কাছে পৌঁছে যায়। তারপর দাস ব্রাদার্স চৌপথীতে এস এফ আই -র ডাকে সমাবেশ হয়। আমাদের তিনজনকে ফুল আর মালায় বরণ করে সবাই। কমরেডদের এতো ভালোবাসা ও আবেগ দেখে চোখে জল চলে আসে। যখন বিষ্ণুকাকু সহ যুব ও ছাত্র নেতাদের নিয়ে দিনহাটা অফিসে এলাম তখন স্থানীয় নেতৃত্ব ফুল মিষ্টি দিয়ে স্বাগত জানালো আর মনের মণিকোঠায় চির জাগুরুক হয়ে থাকবে। তারপর বাড়ি পৌঁছানোর পর পরিবার প্রতিবেশী যেভাবে সাহস জুগিয়েছে তা আগামীতে লড়াইয়ে প্রেরণা দেবে। মোবাইল ফোন অন করতেই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ফোন আসে রাত ২টা পর্যন্ত। কেউ উদ্বিগ্ন বা কেউ লাল সেলাম জানিয়েছে, কেউ আবার সতর্ক করেছে। ফেস বুক আর হোয়াটস আপ খুলতেই এস এম এস আর পোস্টে ফেস বুক দেওয়াল ভরে গেছে। মন দিয়ে আবেগ দিয়ে বুঝবার চেষ্টা করলাম সবকিছুই আগামী দিনে লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্রের লড়াই জারি থাকবে আমৃত্যু।

Featured Posts

Advertisement