নভেম্বর বিপ্লব
দুনিয়‌া বদলানোর ডাক

দীপক নাগ

২২ জানুয়ারী, ২০১৭

নভেম্বর বিপ্লব মানব সমাজের ইতিহাসকেই স্পষ্ট দু’ভাগে ভাগ করেছে ১৯১৭ সালের ৭ই নভেম্বরের আগে এবং তার পরে। এর আগে দার্শনিকগণ নানাভাবে অত্যাচারিত ও অবহেলিত মানুষের জন্য অনেক জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরা প্রায় সবাই এই জীবনে নয়, মারা যাওয়ার পর কল্পিত অজানা জগতের সুখ ও শান্তির বাণী প্রচার করেছেন। এজগতের দুঃখ-দুর্দশা-অত্যাচার-যন্ত্রণাকে গতজন্মের পাপের ফল বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের মতে, সুখ-দুঃখ দেবার মালিক যে‍‌হেতু ভগবান, সুতরাং তার আরাধনা করাই মানুষের মুক্তির একমাত্র পথ। ক‍‌য়েক হাজার বছরের এই চিন্তা‍‌কে অস্বীকার করে ১৮৪৮ সালে ২৮ ও ৩০ বছরের দুই জার্মান যুবক মার্কস এবং এঙ্গেলস প্রথম ঘোষণা কর‍‌লেন যে মানুষের দুঃখ আছে, দুঃখের কারণ আছে এবং মানুষই দুঃখ দূর করতে পারে। এই কথাটি যে কত মূল্যবান তা বোঝা গেলো, ১৮৭১ সালে প্যারি কমিউন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তার আয়ু খুব কম হলেও এই ঘটনা দুনি‌য়ার শাসকশ্রেণির বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। আর সারা দুনিয়ার অত্যাচারিত ও অবহেলিত মানুষের কাছে মুক্তির পথ দেখায়। ১৯১৭ সালের ৭ই নভেম্বরের আগের দিনও সারা দুনি‌য়া, বিশেষ করে রাশিয়ায় সর্বহারা শ্রেণির ১লা নভেম্বরে দুশমনও ভাবতে পারেনি ওদের ঠাঁই হবে সমাজের আঁস্তাকুড়ে। সমাজের আমূল পরিবর্তন করা যে সম্ভব, তা প্রমাণ করে নভেম্বর বিপ্লব। কিন্তু‍‌ শোষিত মানুষের পক্ষে এই পরিবর্তন যে কত কাম্য ছিল তা বোঝা যায় বিপ্লবের প্রতি সারা দুনিয়ার বিশিষ্ট মানুষের সমর্থন থেকেই।

চীনের প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং প্রজাতান্ত্রিক চীনের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা সান ইয়েত সেন নভেম্বর বিপ্লব উপলক্ষে বলেন : ‘‘রুশ বিপ্লব বলবানকে সংযত এবং দুর্বলকে সাহায্য করার স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন দেখে ধনীকে ধ্বংস ও গরিবকে সাহায্য করতে, স্বপ্ন দেখে ন্যায়কে সবার ওপরে তুলে ধরতে, স্বপ্ন দেখে মানুষে মানুষে অসাম্য দূর করার। রাশিয়ার জনসাধারণ এমন নির্মমভাবে শোষিত হচ্ছিল যে, তারা সমাজতন্ত্রের তত্ত্বকে বাস্তবায়িত করার জন্য বিদ্রোহ করলো। এই বিদ্রোহ জোর যার মুলুক তার এই তত্ত্বের বিরুদ্ধে। ইউরোপীয় শক্তি এই তত্ত্বের বিরোধিতা করেছিল এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সবাই মিলে সেনা পাঠিয়েছিল’’। গোটা দুনিয়ার শোষিত ও অত্যাচারিত মানুষ এবং প্রতিষ্ঠিত কবি, সাহিত্যিক, বার্নাড শ’র মতো নাট্যকার, আইনস্টাইনের মতো বিজ্ঞানীও সমাজ বিকাশের এই নতুন স্তরকে স্বাগত জানিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছেন। শত্রুর হাত থেকে এই শিশুকে রক্ষা করার জন্য কলম ধরেছেন। রবীন্দ্রনাথ সমাজবিকাশের এই নতুন স্তরকে উল্লেখ করলেন ‘নবযুগের উষা সমাগমের প্রভাতী তারা’ হিসেবে। তাঁর মতে, ‘‘এ বিপ্লব অনেকদিনের পাপের প্রায়শ্চিত্তের বিধান’’, রাশিয়া ভ্রমণ তাঁর কাছে ‘‘তীর্থদর্শন’’।

নভেম্বর বিপ্লব একশ’ বছর পাড়ি ‍দিলো। অত্যাচারিত মানুষের মুক্তির জন্য গড়ে ওঠা কোনো আদর্শের মৃত্যু হয় না। তবে দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের নিয়ম অনুসারে কোনো পরিবর্তনের পথই সহজ-সরল নয়। সমাজ পরিবর্তনের পথ অনেকটা পাহাড়ি রাস্তার মতো। কখনো এগিয়ে, আবার কখনো পিছিয়ে নানা আঁকাবাঁকা পথে শেষ পর্যন্ত গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে হয়। তাই একশ’ বছর পর সারা দুনিয়াতেই চলছে নভেম্বর বিপ্লবকে ফিরে দেখা।গত শতকের শেষ দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাময়িক বিপর্যয়ের পর এই মূল্যায়ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এই উপলক্ষে প্রকাশিত সি আই টি ইউ-র হাওড়া জেলা কমিটির ‘‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’’ নামে সংকলনটি বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে। বিভিন্ন দিক থেকে নভেম্বর বিপ্লবকে দেখার জন্য সংকলকদের তরফ থেকে ১০টি প্রবন্ধ দিয়ে আলোচ্য সংকলনটি সাজানো হয়েছে। তাছাড়া রয়েছে প্রাসঙ্গিক তিনটি কবিতা। দীপক দাশগুপ্ত তাঁর লেখায়‌ স্বল্প পরিসরে ১৮৪৮ সালে সংগঠিত বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবগুলোর উল্লেখসহ প্রথম আন্তর্জাতিক, ১৮৭১ সালের প্যারি কমিউন, ১৯০৫ সালে রাশিয়ায় ফেব্রুয়ারি বিপ্লব, ১৯১৭ সা‍লের নভেম্বর বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিত, সাম্রাজ্যবাদ সম্বন্ধে লেনিনের ব্যাখ্যা, লেনিনের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, তৃতীয় আন্তর্জাতিক গঠন, সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় সহ সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাদের বিপর্যয় এবং ২১ শতকের সমাজতন্ত্র ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাধারণ মানুষের বোঝার মতো করে বিশ্লেষণ করেছেন। বিপ্লব মজুমদার ‘নতুন প্রজন্মের শ্রমজীবী ‍ও শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর প্রসঙ্গে’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন, ‘‘শতবর্ষ আগে রুশ দেশের নভেম্বর বিপ্লব শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর যে দিক নির্দেশ রেখে গিয়েছিল আজকের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই কালজয়ী দিশা এখনও অপরিবর্তিত’’ (পৃঃ২৩)। ‘‘রাশিয়ায় তিনবার বিপ্লবী পরিস্থিতি দেখা দিয়েছিল ১৮৫০-এর দশকের শেষের দিকে, ১৮৭০-এর দশকের শেষের দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে’’ (ইশাক মিন্টস, কি করে বিপ্লবের জয় হয়েছিল, পৃঃ ১৩)। ১৯০৫ সালে রাশিয়ায় বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব জারের সিংহাসন নড়বড়ে করে দেয়। এই বিপ্লবে‍‌ সেনাবাহিনী প্রথম বিপ্লবীদের পক্ষে যোগদান করে। যুদ্ধজাহাজ ‘পোতেনকিন’-এর নাবিকেরা জারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। কিন্তু তবুও এই বিপ্লব সম্পূর্ণ সফলতা লাভ করেনি। কৃষ্ণস্বপন মিত্র তাঁর নিবন্ধে ১৯০৫ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পর্যালোচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথের আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং মানবদরদী মনের কথা তাঁর বিভিন্ন কবিতা, গান, ছোটগল্প, নাটক, উপন্যাস ‍ও প্রবন্ধে ফুটে উঠেছে। স্বাভাবিক কারণেই নভেম্বর বিপ্লবের মূলকথা তাঁর বিভিন্ন রচনায় উল্লেখিত হয়েছে। ‘রাশিয়ার চিঠি’ তার একটা বড় প্রমাণ। ড. শুভঙ্কর চক্রবর্তী ‘নভেম্বর বিপ্লবের বাণী ‍‌ও রবীন্দ্রনাথ’ নামক নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধে নভেম্বর বিপ্লব ও তার পরবর্তী সময়ে রাশিয়‌ায় মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও গরিব মানুষের আর্থিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে অবিশ্বাস্য অগ্রগতি ঘটেছিল সে বিষয়টি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। প্রবীর পুরকায়স্থ একুশ শতকের পরিপ্রেক্ষিতে অক্টোবর (নভেম্বর) বিপ্লবের মূল্যায়ন করেছেন। প্রবন্ধটি সময়োপযোগী। পুঁজি এবং পুঁজিপতিদের চরিত্র পালটেছে। শোষণের ধরন বদলেছে। শ্রমিকশ্রেণি এবং উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদনের উপকরণও আর আগের অবস্থায় নেই। আজকের দিনে শ্রমিক সংগঠন ‍‌ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা নিয়ে তিনি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন। অধ্যাপক সুস্নাত দাশ নভেম্বর বিপ্লবের প্রাসঙ্গিকতায় ভারতের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের এক সাবলীল পর্যালোচনা করে পাঠকবর্গকে মূল্যায়ন প্রবন্ধ উপহার দিয়েছেন। সমীর সাহা, শংকর মৈত্র ‍‌ও কল্যাণ দাস নভেম্বর বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে উদারীকরণ এবং ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থার বিশ্লেষণ করেছেন। নভেম্বর বিপ্লব সম্বন্ধে প্রাথমিকভাবে জানার জন্য আলোচ্য বইটি বামপন্থী সাধারণ কর্মীদের কাজে লাগবে। সুন্দর প্রচ্ছদে মোড়া ১৪৪ পৃষ্ঠার এই বইটির দামও অবিশ্বাস্য রকমের কম রাখা হয়েছে। সব মিলি‍‌য়ে সি আই টি ইউ-র হাওড়া জেলা কমিটির এই উদ্যোগকে অভিনন্দন জানাতেই হবে। বইটির ব্যাপক প্রচার একান্তভাবে কামনা করি।

বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক, সি আই টি ইউ, হাওড়া জেলা কমিটি

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement