বয়ষ্কদের শীতের কষ্ট

২৫ জানুয়ারী, ২০১৭

এই সময় বয়স্কদের শরীরে নানা উপসর্গ দেখা দেয়। তাঁরা কী করলে সুস্থ থাকবেন সেই পরামর্শ দিলেন বিশিষ্ট চেস্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ দিপালী ভৌমিক। লিখলেন পার্থ ভট্টাচার্য



প্রশ্ন : শীতের সময় প্রবীণদের কী কী সমস্যা বেশি করে দেখা দেয়?

উত্তর : বয়স্কদের মধ্যে যাঁদের ক্রনিক অসুখ নেই, তাঁদের বুকের সংক্রমণ হতে পারে। এই সময় হাতে ও পায়ের আঙুলে ক্ষত হওয়ার সম্ভাবনা হতে পারে। যাঁদের ক্রনিক বুকের অসুখ আছে তাঁদের তা বাড়াবাড়ি হতে পারে। আর্থ্রাইটিস থাকলে ব্যথা বাড়তে পারে।

প্রশ্ন : তবে কী করা উচিত ?

উত্তর : সাধারণত সারাবছর যে ওষুধগু‍‌লো চলছে তা চালিয়ে যাওয়া, বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ মতো ওষুধের সঠিক মাত্রা ব্যবহার করা, নিয়মিত চেক-আপ করানো, পরিবারের অন্তত একজন সদস্যা যিনি বয়স্ক ব্যক্তির কাছে আছেন তার ঐ রোগীর রোগ ও ওষুধ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকলে অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। ধুলোবালি (নিজের বাড়ির ভেতরে ও বাইরে) পরিহার করতে হবে। বিশেষ করে ধোঁয়া। যেমন, যেসব বাড়িতে স্টোভ ব্যবহার করা হয়, তা পরিহার করা বা‍‌ চিমনি ব্যবহার করা, পরিবারের এক বা একাধিক সদস্য ধূমপান করেন — সেখানে ধূমপান বন্ধ করা। অবশ্যই ধূমপান করবেন না। আমাদের মতো দেশে আমরা বসবাসের ঘরে ঠিকমতো ভেন্টিলেশন (হাওয়া চলাচল) রাখতে পারি না। সেখানে ছত্রাক জন্মাবার সম্ভাবনা থাকে। যাঁদের শ্বাসনালী ও শরীরের ইমিউন সিস্টেম সংবেদনশীলতা তাঁদের সহজেই ছত্রাক, আরশোলা, পোষ্য জানোয়ারের লোম থেকে হাঁপানি বাড়ে। তবে বাড়ির স্নানঘর ও শৌচালয় পরিষ্কারের জন্য ব্যবহৃত ব্লিচিং পাউডার কীটনাশক ও বিনোদনের জন্য ব্যবহৃত পারফিউম পরিহার করা। আমাদের দেশের ঘনজনবসতি ও দ্রুত নগরায়ণের ফলপ্রসূ আমাদের Outdoor Population.

প্রশ্ন : কেমন সাবধানতা দরকার?

যে-কোনও প্রকার ক্রনিক অসুখে Indoor & Outdoor Population যতোটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। সূর্যের আলো আসে ও হাওয়া চলাচল করে এমন ঘরে বসবাস করতে হবে। গরম খাবার খাওয়া, শরীরে সূর্যের রোদ লাগানো— এইসব সামান্য সাবধানতাও আমাদের অনেক রোগমুক্তি দেয়। বেশি রাত ও বেশি সকালে বাড়ির বাইরে না বেরনোই ভালো।

প্রশ্ন : যাঁদের ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে?

উত্তর : সময় মতো স্নান করা ও অল্প জল ব্যবহার করা। মাথায় জল না-ঢালা ও বসবাসের ঘর বাতানুকূল না হওয়া। এই সাবধানতাগুলি ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস রোগীদের জন্য প্রযোজ্য। স্নানের আগে যদি বাথরুমের মধ্যে এক মগ গরম জলে ঢেলে দেওয়া যায় তাহলে বয়স্ক রোগীদের পক্ষে খুবই আরামদায়ক।

প্রশ্ন : ব্রঙ্কাইটিসের লক্ষণ কী?

উত্তর : ব্রঙ্কইটিসের প্রধান লক্ষণ কাশি ও তার সঙ্গে কফ ওঠা। রোগী অনুভব করতে পারেন যে তাঁর বুকের ভিতরে বেশি পরিমাণ কফ তৈরি হচ্ছে। সঙ্গে শ্বাসকষ্ট ও শ্বাসের আওয়াজ যা সারা বছর থাকতে পারে বা মাঝে মাঝে হতে পারে, বাড়তে পারে। কোনও-কোনও রোগী বুকে ব্যথা অনুভব করেন।

প্রশ্ন : যাঁরা সারা বছর ভোগেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ?

উত্তর : এঁদের কফ, কাশি বাড়া-কমা ও শ্বাসকষ্ট চলতেই থাকে। রোগ যত পুরানো হবে ততই নিজেদের জীবনযাত্রায় সীমাবদ্ধতা আসবে ও একসময় হবে যখন নিজেদের জীবনধারণের দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হবে। সেজন্য দেরি না-করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

প্রশ্ন : কী কী কারণে ফুসফুসে কফ জমে?

উত্তর : যাঁদের ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের ক্রনিক অসুখ নেই তাঁদের শরীরের তাপমাত্রা কমে গেলে যেমন : ঠান্ডা তাপমাত্রায় উপযুক্ত সাবধানতা না নিয়েও শরীর শুকনো না রাখলে বুকে কফ জমে। যাঁদের ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রে ক্রনিক অসুখ আছে, তাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় ঠান্ডা আবহাওয়া ও জনাজীর্ণ পরিবেশ— যেমন মেলা প্রাঙ্গণ, স্টেশন, হাট-বাজারে বুকে সংক্রমণ হয়ে কফ হয়।

প্রশ্ন : কী কারণে কফ হলুদ হয়?

উত্তর : অনেক বুকের অসুখের কারণেই বুকে কফ পেকে যেতে পারে। কফ পেকে যাওয়া বলতে বোঝায় কফের রং হলুদ হয়ে যাওয়া। যেসব রোগের কারণে কফ হলুদ হয়ে যায় তার মধ্যে ফুসফুসে ফোঁড়া, ব্রংকিংএকটেসিস, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস-সহ অনেক ধরনের বক্ষব্যাধি যেখানে জীবাণু সংক্রমণ ঘটে সেগুলোকে বোঝায়। ব্রংকিংএকটেসিস হলে বেশির ভাগ রোগীরই পাকা হলুদ কফ কাশির সঙ্গে বের হয়। এটা ফুসফুসের একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ। এ রোগের ফলে ফুসফুসের কিছু শ্বাসনালিতে বড় ধরনের প্রদাহ দেখা দেয়। আক্রান্ত স্থানের শ্বাসনালিগুলো তখন ফুলে মোটা হয়ে যায়। ব্রংকিংএকটেসিসের অন্যতম প্রধান উপসর্গই হলো দীর্ঘস্থায়ী কফ-কাশি। বেশির ভাগ রোগীই চিকিৎসকের কাছে আসেন কাশির সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে কফ পড়ার সমস্যা নিয়ে। ঘুম থেকে সকালে ওঠার পর কাশি বেশি হয়। একটু কাশিতেই প্রচুর পরিমাণে কফ বেরিয়ে আসে। যখনই জীবাণু সংক্রান্ত রোগী রক্ত স্বল্পতায় ভোগেন, ফ্যাকাশে হয়ে যায়। আঙুলের মাথা মোটা হয়ে যায়। যাকে আমরা ক্লাবিং বলে থাকি। অনেক দিন ধরে এ রোগ চলতে থাকলে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। ফুসফুসে ফোঁড়া হলেও হলুদ পাকা কফ কাশির সঙ্গে বের হয়। ফুসফুসে ফোঁড়া বিভিন্ন রোগ জীবাণু দিয়েই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই ফোঁড়া হতে দেখা যায়। ত্বকে ফোঁড়া হলে চিকিৎসক ছোট একটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পুঁজ বের করে দিয়ে এক কোর্স অ্যান্টিবায়োটিক লিখে দেন। কিন্তু ফুসফুসের ফোঁড়া কাটাতে এত সহজ ব্যাপার নয়। বিভিন্ন ধরনের জীবাণু দিয়ে এই ফোঁড়া হতে পারে। তাই প্রকৃত চিকিৎসার সফলতা নির্ভর করে কোন্‌ জীবাণু এই রোগের আক্রমণকারী সেটা প্রথমে চিহ্নিত করা। যক্ষ্মার জীবাণু দিয়ে যদি এই ফোঁড়া হয়ে থাকে তবে তো আর সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে কোনও কাজ হবে না। ফুসফুসে ক্যানসার বা টিউমার হলে সেখানে জীবাণু সংক্রমণ হয়ে ফোঁড়ার সৃষ্টি হতে পারে। তবে স্টেফাইলোকক্কাস দিয়ে যে ফোঁড়া হয়, সেগুলো সংখ্যায় কয়েকটি হয়ে থাকে এবং ফোঁড়াগুলোর দেয়ালটা এত পাতলা থাকে যে, যে-কোনও সময় সেটা ফেটে গিয়ে ফুসফুসের পর্দায় বাতাস জমা হয়ে নিউমোথোরাক্স তৈরি হতে পারে। এছাড়া শরীরের অন্য স্থানে প্রদাহ থেকেও ফুসফুসে ফোঁড়ার জন্ম হতে পারে। এ রোগের লক্ষণ হঠাৎ করে অথবা আস্তে-আস্তে শুরু হতে পারে। এক্ষেত্রে বেশ জ্বর আসে এবং খুব কেঁপে জ্বর আসে। প্রচুর ঘাম হয়, বুক ব্যথা, কাশি থাকে এবং কাশির সঙ্গে পাকা দুর্গন্ধযুক্ত প্রচুর কফ যায়। ফুসফুসে ফোঁড়া হলে শতকরা ৩০ থেকে ৪০ ভাগ ক্ষেত্রে কাশির সঙ্গে রক্ত যায়। রক্তশূন্যতা দেখা যায় এবং ওজন বেশ কমে যায়। হাতের আঙুলের মাথায় এক ধরনের পরিবর্তন আসে যাকে আমরা ক্লাবিং বলে থাকি। কোন্‌ জীবাণু দিয়ে এই রোগ হয়েছে সেটা নির্ণয় করা খুবই প্রয়োজন। কফে অনেক সময় আমরা ক্যানসার সেলেরও সন্ধান করে থাকি। তবে এই রোগ নির্ণয়ের জন্য এক্স-রে পরীক্ষা করে আমরা ফোঁড়ার সন্ধান পাই। আগেই বলেছি আক্রমণকারী জীবাণুকে শনাক্ত করতে হবে। যথোপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে অনেক দিন ধরে। আমরা রোগীকে বিভিন্নভাবে শুইয়ে এবং বসিয়ে কফ ফেলার ধরন প্রশিক্ষণ দিয়ে পুঁজের মতো কফ নির্গত করার চেষ্টা চালাই। কারণ এই বিষাক্ত কফ বের করতে না পারলে হাজার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে কোনও আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া দুষ্কর। ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসের রোগীর কফ ও জীবাণু সংক্রমিত হয়ে পেকে হলুদ হয়ে যেতে পারে।

প্রশ্ন : অনেকের ফুসফুসে ফোঁড়া হয়। এর কারণ কী?

উত্তর : বুকে বা ফুসফুসে ফোঁড়া হতে পারে— দাঁত ও মাড়ির রোগ থাকলে, অতিরিক্ত নেশার দ্রব্য সেবন করলে ও ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে নেশার দ্রব্য নিলে, হার্টের ডান ভাগের ভালভ্‌ খারাপ থাকলে, বুকের সংক্রমণ চিকিৎসা ঠিক সময়ে না হলে। ফুসফুসের ফোঁড়া এক ধরনের মেডিক্যাল Urgency সুতরাং সঙ্গে সঙ্গে সময় নষ্ট না করে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। নব্বই ভাগ অ্যাজমা রোগীর ক্ষেত্রে জিনগত কারণ থাকে— মানে পরিবারের অন্য সদস্য ও অ্যাজমার শিকার বা অন্যান্য এলার্জির অসুখে ভুগছেন। যেমন— চামড়ায় একজিমা, চোখের এলার্জি, হাঁচি, কাশি— ইত্যাদি।

প্রশ্ন : ব্রঙ্কাইটিস সাধারণত কাদের বেশি হতে পারে?

উত্তর : ব্রঙ্কাইটিস সাধারণত, ধূমপানের কুফল অ্যাজমা শিশু ও বড় বয়সে হয়ে থাকে। ব্রঙ্কাইটিস সাধারণত বেশি বয়সের অসুখ। অ্যাজমাতে সাধারণত কাশির সাথে কফ থাকে না, ব্রঙ্কাইটিসে থাকে। কোনও-কোনও পরিস্থিতিতে তাঁদের শ্বাসকষ্ট, কাশি বাড়তে পারে (ডাক্তারি পরিভাষায় Tregger factor বলা হয়।) সর্বোপরি শরীরের কয়লশন System দুর্বল থাকলে— যেমন মধুমেহ রোগ কিডনির বা লিভারের অসুখ।

প্রশ্ন : কীভাবে এই ফোঁড়া নির্মূল করা সম্ভব?

উত্তর : সঠিক চিকিৎসা ছাড়া এই রোগ কখনোই নির্মূল করা সম্ভব নয়।

প্রশ্ন : ফুসফুসে ক্যানসার বা টিউমার হলেও কি ফোঁড়া হতে পারে?

উত্তর : হতেই পারে।

প্রশ্ন : সে ক্ষেত্রে কী করণীয়?

উত্তর : উপযুক্ত চিকিৎসা নেওয়া— ক্যানসার বিশেষজ্ঞর পরামর্শ নেওয়া।

প্রশ্ন : ফুসফুসে ফোঁড়া হয়েছে তা কীভাবে জানা সম্ভব?

উত্তর : ফুসফুসের ফোঁড়ার লক্ষণগুলো হলো— তীব্র জ্বর, বুকে ব্যথা, হলুদ/সবুজ বা দুর্গন্ধযুক্ত কফ। শ্বাসকষ্ট হওয়া (বিশেষ করে যাঁদের বুকের অসুখ রয়েছে)। কিছু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ফুসফুসের রোগের লক্ষণের চাইতে অন্যান্য লক্ষণ — যেমন লোকজন চিনতে না পারা, জ্ঞান হারিয়ে ফেলা, বমি হওয়া, হঠাৎ করে খুব অল্প সময়ের মধ্যে রোগীর রক্তচাপ কমে যাওয়া— এসব হতে পারে। নিশ্চিত হবার জন্য বুকের X-Ray(PA) করতে হবে।

প্রশ্ন : তারপর?

উত্তর : আগেই বলেছি। আবার বলি— অ্যাজমা রোগীদের শুধু শ্বাসকষ্ট হতে পারে অল্প কাশির সাথে, শুধুই কাশি থাকতে পারে যা বছরের বিভিন্ন সময়ে বাড়া-কমা হতে পারে ও নিজে থেকেই (চিকিৎসা ছাড়া) কমে যেতে পারে। মনে রাখতে হবে অ্যাজমা শিশুবয়স থেকে শুরু করে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত হতে পারে।

প্রশ্ন : অ্যাজমা নিরাময়ের উপায়?

উত্তর : সঠিক চিকিৎসা করা এবং Tregger factor থেকে দূরে থাকা।

প্রশ্ন : কেমন সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার?

উত্তর : সঠিক চিকিৎসা নেওয়া। আলো-হাওয়া যুক্ত ঘরে বসবাস করা ঠান্ডা হাওয়া, ঠান্ডা আবহাওয়ার গরম পোশাক পরা। সর্বোপরি Tregger factor পরিহার করা।

প্রশ্ন : ব্রঙ্কাইটিস কিংবা অ্যাজমা নিরাময় হয় না?

উত্তর : ব্রঙ্কাইটিস ও অ্যাজমা পুরো নিরাময় সম্ভব নয়। তবে সাবধানতা অবলম্বন করলেও ওষুধ ঠিকমতো ব্যবহার করলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সুস্থ থাকা যায়।

যোগাযোগ: ৯৮৩২৪৬৩২৬০

ছবি : রবীন গোলদার

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement