‘ইচ্ছুক’ বানানোর পাঠশালার
নাছোড় ছাত্রী নূরজাহান’রা...

সুদীপ্ত বসু

২৯ জানুয়ারী, ২০১৭

সাফিয়া বিবি, বয়স ষাট। বিধবা ভাতার তালিকায় নাম তুলতে পারেননি এখনও। আফশোসও নেই তা নিয়ে। ভাঙড় তাঁর জন্মভূমি, ‘বহিরাগত’ নন তিনি। খামারআইট গ্রাম, তিন মেয়ে, দুই ছেলে,নাতি-নাতনি নিয়েই তাঁর ভুবন। রোজই যে ভুবনের হাসি-কান্না নিয়ন্ত্রণ করে দারিদ্র্য।

কিন্তু জেল জীবন? নাতনিকে এক মুহূর্ত না দেখতে পারলে ছটফট করেন। সেই তিনি ১৮দিন কাটিয়েছেন জেলে! কেন?

ভাঙড় জুড়ে প্রতিরোধের রঙমশাল। আন্দোলন, স্লোগান, অবরোধে ভাঙড়ে উত্তাপ। সেই উত্তাপের সঙ্গেই, আন্দোলনের প্রথম সারিতেই সাফিয়া বিবি’রা।

১৮দিনের জেল জীবন ষাট বছর বয়সী এক প্রৌঢ়া’কে নামিয়ে এনেছে রাস্তায়, মিছিলে।

***************************

লড়াইয়ের সেই ভাঙড়ে এক পড়ন্ত বিকালে বিদ্যাধরীর তীরে খামারআইট গ্রামে পুরোনো মসজিদের সামনের রাস্তায় পড়ে থাকা খড়ের ওপরেই পা মেলে বসেছিলেন সাফিয়া বিবি।কিন্তু কেন তাঁকে জেল খাটতে হলো?

তাঁর মেয়ের ব্রেস্ট ক্যানসার ধরা পড়েছে। খামারআইট থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরের এক গ্রামে মেয়ের শ্বশুড়বাড়ি। সেখানেই মেয়েকে দেখতে যান মাঝেমাঝে। এমনই এক দুপুরে মেয়েকে দেখে ফিরছিলেন খামারআইট গ্রামে। সেই সময়ই তাঁর গ্রামে তাঁরই জমির ওপর পাওয়ার গ্রিডের খুঁটি পোঁতার কাজ চলছিল। না, তার জন্য তাঁর সম্মতিও চাওয়া হয়নি। এটা প্রকল্প এলাকার বাইরে, ক্ষতিপূরণের প্রশ্নও তাই নেই! কিন্তু কেন তাঁর জমিতে খুঁটি পোঁতা হচ্ছে শুধু এটুকুই জানতে গিয়েছিলেন সেখানে হাজির থাকা পাওয়া গ্রিড কর্পোরেশনের লোকজন ও তৃণমূল নেতা আরাবুল ইসলামের কাছে।

গ্রামে তখন পুলিশ দাঁড়িয়ে, হাই টেনশেনের লাইন জমির ওপর দিয়ে টানা হচ্ছে। স্রেফ প্রশ্ন করায় রীতিমত ঘাড় ধাক্কা খেতে হয়। মাটিতে পড়ে যান, তারপরেও পুরুষ পুলিশ কর্মীরা তাঁকে টানতে থাকে। ‘পাশেই দাঁড়িয়েছিল আরাবুল। ওঁকে বললাম আমি মায়ের বয়সী, কী অপরাধ হয়েছে আমার, এটা তো আমারই জমি। এরপর আরাবুল পুলিশকে ইশারা করলো দেখলাম’। তারপর তাঁকে টানতে টানতে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়। সোজা কাশীপুর থানা। রাত কাটলো সেখানেই। পরের দিন বারুইপুর কোর্ট, ১৮দিন জেলে। ‘গুলি চালানো, হামলা এসব তো তিন চারদিন আগে হলো, তার দু’মাস আগেই তো এসব চলছিল। কোন কাগজ খবর করেনি। ১৮দিন আমরা জেলে কাটিয়েছি, কী দোষ ছিল?’ চোখে জল, বলছিলেন সাফিয়া বিবি। থানায় লক আপের ভিতর পুলিশ কর্মীদের গালিগালাজও শুনতে হয়েছে ষাট বছর বয়সী এই মহিলাকে।

পরিণাম? ভাঙড়ের আন্দোলনে এসে মিশেছেন সাফিয়া বিবি। তাঁর কথায়, ‘অপরাধ না করেও এই বয়সে জেল খেটেছি, আর ভয় কী?

***************************

তিনি তৃণমূলের খামারআইট পঞ্চায়েতের সদস্য। তৃণমূলের হয়ে মিছিল মিটিংয়ে সামনেই থাকতেন। গত চার বছর ধরে প্রকল্পের নামে তাঁর দলের বাহিনী যে অত্যাচার করেছে, বন্দুক ঠেকিয়ে জমিদাতাদের সাদা কাগজে সই করিয়েছে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন।

তিনি রাবেয়া বিবি। তাঁর স্বামী সফিকুল ইসলামও তৃণমূলের স্থানীয় নেতা।

গত ১৭ই জানুয়ারি পুলিশ ও তৃণমূলের যৌথ বাহিনী যে তাণ্ডব চালিয়েছিল ভাঙড়-২নম্বর ব্লকের পোলেরহাট-২নম্বর পঞ্চায়েতের এই বিস্তীর্ণ এলাকায়, তার থেকে রেহাই পাননি তিনি। এখনও অজানা জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে গিয়েই দেখা করতে হয়েছিল। হাতে এখন কালশিটে দাগ। সারা শরীরে লাঠির ঘা, চোখে মুখে আতঙ্ক। ‘আরাবুলের লোকজন জোর করে দরজা ভেঙেই আমাদের ঘরে ঢুকে বললো, হারামজাদি আন্দোলন করা! বলেই টানতে টানতে বাইরে নিয়ে এলো। পা ধরলাম ওদের, আমাকে মারিস না’। না তাতেও রেহাই পাননি রাবেয়া বিবি। মাটিতে ফেলে গাছের ডাল দিয়েই পেটানো হয়েছিল মধ্যবয়সী এই মহিলা, দুই সন্তানের সামনেই।

চিকিৎসার সুযোও পাননি। বেরোতে পারেননি গ্রাম ছেড়ে। সেই রাবেয়া বিবির উপলব্ধি, ‘মহিলাদের এভাবে কেউ মারতে পারে জানতাম না। নিজের দলের লোকেরাই মারছে, বিশ্বাস করুন নিজের দিকেই তাকাতে পারছি না এখন। আমি পঞ্চায়েত সদস্য অথচ কোন কাজ করতে পারি না। গ্রামকে সুন্দর করে সাজাবো ভেবেছিলাম, কোন টাকা খরচ করতে পারিনি, সব ওরাই ঠিক করে দেয়। মহিলাদের স্বনির্ভর গোষ্ঠীও করতে পারিনি’।

***************************

অবরুদ্ধ এক জনপদ। প্রবল ক্ষোভ আর পুলিশি সন্ত্রাসে বিধ্বস্ত গ্রামের রাস্তাতেই দেখা হয়েছে নূরহাজান বিবি’র সঙ্গে। তাঁর তিন মেয়ে। কৃষক পরিবারের গৃহবধূ। নিতান্তই সাধারণ এক পরিবারের গৃহবধূ নূরজাহান বিবি’কেও ১৮দিন জেল খেটে আসতে হয়েছে! নূরজাহান নাকি রাষ্ট্রবিরোধী, প্রবল ক্ষমতাধারী মমতা ব্যানার্জির প্রশাসনের কাছে নাকি বিরাট বিপদ!

‘গত অক্টোবর মাসে এই গ্রামের জমির ওপর দিয়ে হাই টেনশেনের লাইন টানা হচ্ছিল। আমরা কয়েকজন মহিলা মাঠে কাজ করছিলাম, খবর পেয়ে তা দেখতে যাই। দেখি আরাবুল ইসলাম সেখানে দাঁড়িয়ে আছে, আমাদের দেখেই পুলিশকে নির্দেশ দিল সবকটাকে ধরে থানায় নিয়ে যা’, এক নাগাড়ে এদিন দুপুরে বলছিলেন নূরজাহান। পুরুষ পুলিশ কর্মীরাই এরপর মারতে মারতে তাঁকে প্রিজন ভ্যানে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। আরাবুলের কাছে হাতজোড় করেছিলেন নূরজাহান, যাতে গ্রেপ্তার না করা হয়। তবুও ১৮দিন জেল খাটতে হয়েছে তাঁকে। নভেম্বরের শেষ দিকে জামিন পান তিনি।

জেল খেটে সোজা রাস্তায়, গ্রামবাসীদের অবরোধ, মিছিলে, এমনকি রাত পাহারাতেও তিন সন্তানের জননী নূরজাহান বিবি। ‘ধমকে লাভ হয়নি। উলটে এতদিনে বুঝলাম চিৎকার করেই দাবি আদায় করতে হবে। আমার জমি আমাকে না জানিয়েই নেওয়া হচ্ছে, আমার জমি আমি দেবো না- এটা বলা যদি অপরাধ হয়, তাহলে বেশ করেছি। আমি অনিচ্ছুক, মারধর করে ইচ্ছুক বানাতে পারবে না’। বলছিলেন নূরজাহান।

আসলে শুনছে গোটা রাজ্য।

Featured Posts

Advertisement