শিল্পরক্ষা একার লড়াই নয়
যৌথ আন্দোলনে বুক বাঁধছে দুর্গাপুর

দেবদাস ভট্টাচার্য

২৩ জানুয়ারী, ২০১৭

দুর্গাপুর বলে দিয়েছে, যা খুশি করতে দিচ্ছি না। অ্যালয় স্টিল বেসরকারি হাতে তুলে দেবে। ডি এস পি-কে শুকিয়ে মারবে। তাহলে দুর্গাপুরের থাকলোটা কী ? দুর্গাপুরের এক কথা, অ্যালয় স্টিল বেসরকারি মালিকের হাতে তুলে দিতে দেবো না। কে না জানে দুর্গাপুর মানে ইস্পাতনগরী, ইস্পাত করাখানা। রাষ্ট্রায়ত্ত সেইল-এর এই কারখানাগুলোকে কেন্দ্র করে শিল্পমালায় গ্রথিত হয়েছে শিল্প শহর দুর্গাপুর। কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে সেইল তার স্পেশাল স্টিল উৎপাদনকারী তিনটি কারখানাকে স্ট্রাটেজিক সেলের মধ্যদিয়ে বেসরকারি হাতে তুলে দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। কারখানাগুলি হচ্ছে দুর্গাপুরের অ্যালয় স্টিল প্ল্যান্ট (এ এস পি), সালেম ও ভদ্রাবতী।

আজ নয়, ১৯৬৫ সালে ৪৬৭.২২ হেক্টর জমির ওপর তৈরি হয়েছে অ্যালয় স্টিল কারখানা। সারা দেশে সেইল-র মাত্র তিনখানা স্পেশাল স্টিল উৎপাদনের কারখানা রয়েছে। তারমধ্যেই দুর্গাপুর এ এস পি-তে উৎপাদিত সামগ্রীর কদর রয়েছে। মহাকাশ গবেষণা, সামরিক বিভাগের সাবমেরিন, রকেট লঞ্চিং প্যাড, রেলের প্রয়োজনীয় ইস্পাত দুর্গাপুর এ এস পি সুনামের সঙ্গে সরবরাহ করে আসছে। এই শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই সেইল আজও বিজ্ঞাপন দিচ্ছে —‘নেশন ট্রাস্টস সেইল স্টিল’। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, জাতীর আস্থার ইস্পাত কেন বেসরকারি হাতে?

যুক্তির ধার ধারছে না কেন্দ্রের মোদী সরকার। এ এস পি’র আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ জরুরি। বার কয়েক বিশেষজ্ঞ সংস্থাদের দিয়ে এ এস পি’ আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণের জন্য সমীক্ষাও হয়েছে। সর্বশেষ সমীক্ষা করেছে সেইল-এর নিজস্ব সংস্থা সি ই টি। এই সমীক্ষক সংস্থার রিপোর্টেই এ এস পি’র আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণের জন্য ১১০৬ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সেইল নবরত্ন থেকে মহারত্ন সংস্থা হয়েছে। ২০০৮সাল থেকে পর্যায়ক্রমে সেইল তার বিভিন্ন কারখানায় মোট ৭২হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। বিনিয়োগ করলে কী হতে পারে তার উদাহরণ ইস্কো কারখানা। মাত্র ১০০ কোটি টাকায় মুকুন্দ ইস্কো কিনে নিচ্ছিলো। বাধা হয়ে দাঁড়ালো ইস্কো বাঁচাও কমিটি। ইস্কো সেইল অধিগ্রহণ করেছে এবং বিনিয়োগও হয়েছে ইস্কোতে। বর্তমানে ইস্কো সেইল-এর ইস্পাত উৎপাদনকারী অন্যতম কারখানা। কিছুদিনের মধ্যে ইস্কো সেইল-এর সর্বোচ্চ ইস্পাত উৎপাদনকারী কারখানার গরিমা পেতে চলেছে। এ এস পি’র জন্য প্রয়োজন ছিলো মাত্র ১১০৬ কোটি টাকা বিনিয়োগের। বিনিয়োগ হলে এ এস পি-ও তাক লাগিয়ে দিত। সেইলের সমীক্ষক সংস্থার দেওয়া বিনিয়োগের প্রস্তাব এখন সেইল নিজেই কার্যকর করছে না।

এরাজ্যের বুকে একমাত্র স্পেশাল স্টিল উৎপাদনকারী কারখানা এ এস পি। কেন্দ্রীয় সরকার বেসরকারি হাতে এই কারখানা তুলে দিচ্ছে। অবশ্য রাজ্য সরকারের কোনো তাপ-উত্তাপ নেই। দুর্গাপুর সার কারখানা প্রাকৃতিক গ্যাস পেলে পুনরুজ্জীবিত হতো। গ্যাস পাইপ লাইন হচ্ছে। দুর্গাপুর সার কারখানা প্রাকৃতিক গ্যাস পাচ্ছে না। সার কারখানাকে জমি জটেও জড়িয়ে রেখেছে রাজ্য সরকার। হাজার-হাজার টন ইউরিয়া ভিনরাজ্য থেকে এই রাজ্যে আনতে হচ্ছে। রাজ্যে বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত ইউরিয়া উৎপাদনের কারখানা চালু করার জন্য রাজ্য সরকারের কোনো মাথা ব্যথা নেই। উদাসীনতার একই চিত্র আর এক বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা এম এ এম সি-কে ঘিরে। কলকাতা উচ্চ আদালতের (কোম্পানি আদালত) মাধ্যমে এম এ এম সি-র দায়িত্ব পেয়েছে কনসোর্টিয়াম। তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, বি ই এম এল, ডি ভি সি এবং সি আই এল-কে নিয়ে গঠিত কনসোর্টিয়াম চালু করবে এম এ এম সি। এমনই কথা ছিল, কিন্তু আজ পর্যন্ত এম এ এম সি চালু হলো না। কনসোর্টিয়াম কারখানা কেন চালু হচ্ছে না —এই প্রশ্ন তোলার জন্য রাজ্য সরকারের কেউ নেই।

অশনি সংকেত কেবল এ এস পি-কে ঘিরে নয় দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানাকে ঘিরেও আশঙ্কার মেঘ জমেছে। সেইল-এর ক্ষুদ্রতম কারখানায় পরিণত হচ্ছে ডি এস পি। উৎপাদন ক্ষমতা ১০ মিলিয়ন টনে উন্নীত করার লড়াই লড়ছেন শ্রমিকরা। কিন্তু তারজন্য দরকার বিনিয়োগ। এ এস পি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অভিসন্ধি টের পাওয়া মাত্র লড়াইয়ে নেমেছে দুর্গাপুর। প্ল্যান্টে কনভেনশন হয়েছে। ইস্পাতনগরীসহ বৃহত্তর দুর্গাপুরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে লড়াইয়ের বার্তা। একদিনও বিরাম নেই। গেট মিটিং, অনশন, পদযাত্রা। জেগে উঠছে গ্রাম-শহর।

ভালো নেই শিল্প শহর দুর্গাপুর। প্রতিদিনই কাজ হারানো মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ডি এস পি কারখানাতেই ২০/২৫ বছর ধরে কাজ করছিলেন এমন সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি ঠিকা শ্রমিককে কাজ থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। শপিংমলের কাজ থেকে উচ্ছেদ, বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার কাজ থেকে উচ্ছেদ। উচ্ছেদ ডি পি এল-এর ঠিকা শ্রমিকের কাজ থেকেও। এরসঙ্গে যোগ হয়েছে একের পর এক কারখানা বন্ধ হবার যন্ত্রণা। এই সময়েই পরপর ১৭টা লৌহ ও ইস্পাত ভিত্তিক মাঝারি কারখানা বন্ধ হয়েছে। সরকারিভাবে বেশকিছু কারখানা চালু থাকলেও কারখানায় উৎপাদন নেই, শ্রমিক নেই। কোনরকমে টিকে রয়েছে রাজ্য সরকারের কারখানা দুর্গাপুর প্রজেক্ট লিমিটেড (ডি পি এল)। ডি পি এল-এর কোকওভেন প্ল্যান্টে ৫টা ব্যাটারিতে রমরমিয়ে উৎপাদন হচ্ছিল। কিন্তু শেষমেশ পুরো কোকওভেন প্ল্যান্টটাই তুলে দেওয়া হয়েছে। কারখানাকে চরম নৈরাজ্য গ্রাস করেছে। যন্ত্র এবং যন্ত্রাংশ প্রকাশ্যে লোপাট হয়ে গেলো। অপর একটি রাজ্য সরকারি কারখানা দুর্গাপুর কেমিক্যালস লিমিটেড-এর ১০০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে দেওয়া হবে বলে রাজ্য সরকার ঘোষণা করেছে। রাজ্য এবং কেন্দ্র দুই সরকারই এই সংস্থাকে বেসরকারি হাতে তুলে দেবার জন্য উদ্‌গ্রীব। ডি ভি সি-র দুর্গাপুর থার্মাল পাওয়ার স্টেশন (ডি টি পি এস) নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চারখানা ইউনিট ছিলো ডি টি পি এস-এ। এখন টিকেছে মাত্র একটা। সেটাও তুলে দেবার উপক্রম হয়েছে।

দুর্গাপুরের গৌরবে এখন কালি ছেটাতে চূড়ান্ত আয়োজন চলছে। বর্ধমান জেলা ভাগের নামে আঘাত হানা হয়েছে দুর্গাপুরের গরিমায়। বর্ধমান ভেঙে দু’টুকরো করা হচ্ছে। নতুন জেলা হচ্ছে আসানসোল। জেলা সদরও আসানসোল। দুর্গাপুরের হাজার-হাজার মানুষ গণস্বাক্ষর করে সরকারের কাছে নিবেদন করেছিলেন এই শহরের গুরুত্বকে যেনো খাটো করা না হয়। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলি যেন তুলে দেওয়া না হয়।

আন্দোলনের ভাষাতেই দুর্গাপুর জানিয়ে দিয়েছে অ্যালয় স্টিল প্ল্যান্ট কাড়তে দেবো না। অ্যালয় স্টিল কারখানার গেট থেকে ডি এস পি পর্যন্ত শ্রমিকরা দৃপ্ত মেজাজে দীর্ঘ পদযাত্রা করলেন। পদযাত্রা এমন মানুষও ছিলেন, যাঁদের কোনোদিন কোনো মিছিলে দেখা যায়নি। ২০শে জানুয়ারি ভিলাইয়ে গিয়েছিলেন ইস্পাত শিল্পের শ্রমিকরা। ২৪শে জানুয়ারি দুর্গাপুরে মিলিত হলেন যৌথ কনভেশনে। বেসরকারীকরণ বিরোধী লড়াইয়ের যৌথমঞ্চ গড়ে উঠছে ইস্পাত শিল্পে। এই প্রথম জাতীয় কনভেশন হলো ইস্পাত শিল্প শ্রমিকদের। ২০শে জানুয়ারি ভিলাইয়ে জাতীয় কনভেশন হয়। ইউনাইটেড ফ্রন্ট অব ট্রেড ইউনিয়নস ইন স্টিল ইন্ডাস্ট্রির ডাকে বেসরকারিকরণ বিরোধী জাতীয় কনভেনশনে পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, ওডিশা, তেলেঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাডু, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটকসহ ৯টা রাজ্য থেকে প্রায় ১৮০০ প্রতিনিধি উপস্থিত হয়েছিলেন। সি আই টি ইউ-র সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তপন সেনসহ এইচ এম এস, আই এন টি ইউ সি, এ আই টি ইউ সি এবং স্থানীয় বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা শপথ নিলেন, সেইল-র স্পেশাল স্টিলের কারখানা বেসরকারিকরণ হবে না। বিনিয়োগের দাবিতে যৌথ আন্দোলন জোরদার করার ডাক দেওয়া হয় কনভেনশনে। সরকারি নীতির কারণেই দেশীয় ইস্পাত শিল্প সংকটগ্রস্ত হয়েছে। পরপর দু’বছর সেইল-এর লোকসানের বহর প্রায় ৬হাজার কোটি টাকা। দেশীয় বাজার দখল করছে সস্তার বিদেশি ইস্পাত। আওয়াজ উঠেছে আমদানি বন্ধ করো, দেশীয় উৎপাদন বাড়াও।

ধারাবাহিক লড়াইয়ের পথে দুর্গাপুর। এ লড়াই কেবল এ এস পি রক্ষার লড়াই নয়। লড়াই দুর্গাপুর রক্ষার। সবাইকে নিয়েই লড়তে হবে। নাগরিক সমাজ যৌথমঞ্চ গড়ে লড়াই চলছে। আইনজীবিরা পথে নেমেছেন। যুবরা দিনভর বিক্ষোভ-ধরনায় শামিল। লড়াইয়ের সামনের সারিতে মহিলারা। শহরের প্রতিটি ওয়ার্ড পদযাত্রায় সোচ্চার হচ্ছে। দুর্গাপুরের বিধায়ক সন্তোষ দেবরায় উদ্বেগ জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে অনেকগুলি চিঠি পাঠিয়েছেন। কিন্তু একটিরও জবাব আসেনি। চিঠি পাঠিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতির কাছে। রাষ্ট্রপতির পক্ষে পত্রপ্রাপ্তির জবাবে বলা হয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রককে বিষয়টি জানানো হলো। প্রধানমন্ত্রীর কাছেও চিঠি পাঠিয়েছেন বিধায়ক। দুর্গাপুর আবার সবাইকে নিয়ে কনভেশন করবে। যৌথ নেতৃত্ব আন্দোলনের কর্মসূচি নিচ্ছে। ২৮শে জানুয়ারি শিল্প বাঁচাও-শিল্পাঞ্চল বাঁচাও- কৃষি বাঁচাও-কৃষক বাঁচাও-দেশ বাঁচাও আহ্বান জানিয়ে হাজার-হাজার মানুষ এই শিল্প শহরে পথে নামবেন। শিল্পবিহীন শিল্প শহর চায় না দুর্গাপুর। শিল্প রক্ষার দাবিতে জানকবুল লড়াইয়ের মেজাজে দুর্গাপুর।

Featured Posts

Advertisement