দেশজোড়া ব্যাঙ্ক ধর্মঘট ৭ই

নিজস্ব প্রতিনিধি

২৩ জানুয়ারী, ২০১৭

আক্রান্ত দেশের মানুষ। আক্রান্ত দেশের ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্র। আক্রান্ত ব্যাঙ্কের গ্রাহকদের সঙ্গেই ব্যাঙ্ককর্মী অফিসারেরাও। দেশজোড়া এই আর্থিক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে দেশের সরকারের স্বৈরাচারী ভূমিকার প্রতিবাদে যৌথ আন্দোলনে শামিল হচ্ছেন ব্যাঙ্ক কর্মচারী, ব্যাঙ্কের অফিসাররা। আগামী ৭ই ফেব্রুয়ারি দেশজোড়া ব্যাঙ্ক ধর্মঘটের ডাক দিল দেশের ব্যাঙ্কিং পরিষেবার মধ্যে থাকা ব্যাঙ্ককর্মী ও অফিসারদের সংগঠনগুলি। কালো টাকা উদ্ধারের নামে দেশের আম-জনতার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যন্ত্রণার অবসানের দাবিতেই সোচ্চার ব্যাঙ্ক কর্মী ও আধিকারিকদের সংগঠন। কালো টাকা উদ্ধারের নামে বিত্তবান ঋণখেলাপীদের ছাড় ও সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে এবং তারসঙ্গেই এই আর্থিক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে কঠিন পরিশ্রমে যুক্ত ব্যাঙ্ককর্মী অফিসারদের বাড়তি পারিশ্রমিক দেওয়ার দাবিতে এই ধর্মঘটে শামিল দেশের ব্যাঙ্কের কর্মচারী ও আধিকারিকদের তিনটি সর্বভারতীয় সংগঠন।

অল ইন্ডিয়া ব্যাঙ্ক এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশন (এ আই বি ই এ)-র সাধারণ সম্পাদক সি এইচ ভেঙ্কটচলম, অল ইন্ডিয়া ব্যাঙ্ক অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন (এ আই বি ও এ)-র সাধারণ সম্পাদক এস নাগরাজন এবং ব্যাঙ্ক এমপ্লয়িজ ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (বেফি)-র সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ বিশ্বাস এক যৌথ বিবৃতিতে এই আন্দোলন কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেছেন।

গত ৮ই নভেম্বর মোদী সরকারের নোট বাতিলের ফতোয়ায় গোটা দেশের ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্র টালমাটাল। একদিকে ব্যাঙ্কের গ্রাহকেরা এবং দেশের আম-জনতা চরম সমস্যার মধ্যে, অন্যদিকে ব্যাঙ্ককর্মী ও অফিসারেরাও গ্রাহকদের এই সমস্যার পাহাড়ের মধ্যে ডুবে রয়েছেন। এই সমস্যার দিনগুলোতে ব্যাঙ্ককর্মীরা দিবারাত্র অসামান্য পরিশ্রম করেছেন গ্রাহকদের সমস্যার কথা ভেবে তাঁদের পরিষেবা দেওয়ার কাজে। আমরা আশা করেছিলাম এই সময়ে দেশের সরকার অন্তত ব্যাঙ্ককর্মীদের এবং গ্রাহকদের বা সাধারণ মানুষের এই জরুরি সমস্যার বিষয়টি অনুভব করে সমাধানের পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু এতগুলো দিন পর আজও ব্যাঙ্কে নোটের সরবরাহ এতটাই অপর্যাপ্ত যে এখনও টাকা তোলার প্রশ্নে গ্রাহকদের ওপর চেপে বসা নিষেধাজ্ঞা (প্রতি সপ্তাহে ২৪হাজার/ ১লক্ষ টাকা) জারি রাখতে হয়েছে। আজও বহু এ টি এম বন্ধ অবস্থায় এবং যেগুলি খোলা রয়েছে তার মধ্যেও বহু এ টি এম-এ ‘টাকা নেই’ এমন নির্দেশিকা টানানো। সমস্যা এমন চূড়ান্ত পর্যায়ে যে গ্রাহকদের ক্ষোভ, হতাশা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছেন ব্যাঙ্ককর্মীরা। এমনকি ব্যাঙ্কের শাখাগুলোয় গ্রাহকদের দুর্ব্যবহারের শিকার হচ্ছেন ব্যাঙ্ককর্মীরা।

এই পরিস্থিতিতে ব্যাঙ্কে নোট সরবরাহের ক্ষেত্রেও কোন স্বচ্ছতা বজায় রাখা হচ্ছে না। যে সময় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলো নোটের অপ্রতুলতার সমস্যায় ভুগছে সেইসময় কিভাবে বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলোতে অবাধ টাকার জোগান দেওয়া চলছে? ব্যাঙ্ককর্মীরা এও বুঝতে পারছেন না যে সময়ে দেশের সর্বত্র নতুন নোটের অভাবে হাহাকার পরিস্থিতি তখন কিভাবে কিছু ব্যক্তির হাতে প্রচুর পরিমাণ নতুন নোট পাওয়া যাচ্ছে? এমনকি কিভাবে ব্যাঙ্ক থেকে এই বিশাল পরিমাণ নতুন নোট বেরিয়ে যাচ্ছে তারও উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়তি কর্মসংস্থান, বাড়তি কর্মী নিয়োগের কোনরকম পদক্ষেপ না নিয়ে দেশের সরকার এই সমস্যা ও কাজের পাহাড় চাপিয়ে দিয়েছে ব্যাঙ্ককর্মী ও অফিসারদের ঘাড়ে। আর এই পরিস্থিতিতেই নোট সরবরাহের একছত্র দায়িত্বে থাকা রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার অফিসার নিয়োগে স্বেচ্ছাচার স্বৈরাচারী পদক্ষেপ নিচ্ছে দেশের সরকার। তার ফলে আর বি আই-র সার্বভৌম ক্ষমতার ওপর হস্তক্ষেপ ঘটছে।

নোট বাতিলের এই ফতোয়ার জেরেই দেশের নানা প্রান্তে ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়ানো বেশকিছু সংখ্যক ব্যাঙ্কের গ্রাহক, সাধারণ মানুষ এমনকি ব্যাঙ্ককর্মীরও মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু সরকারের তরফে এই কঠিন দিনগুলোতে নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কোনও পদক্ষেপ নেই। যা সমস্ত ব্যাঙ্ককর্মী অফিসারদের সংগঠন মনে করে অন্যায় অবিচার। দেশজোড়া এই আর্থিক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে সমস্ত ব্যাঙ্ককর্মী অফিসারদের এই কঠিন পরিশ্রমের কথা সকলেই স্বীকার করলেও সরকারের তরফে ব্যাঙ্ককর্মী অফিসারদের বাড়তি কাজের জন্য কোনও অভারটাইম বা ক্ষতিপূরণের পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। এটা ব্যাঙ্ককর্মী ও অফিসারদের কাছে অনভিপ্রেত। কালো টাকা উদ্ধারের নামে দেশের আম-জনতা যে সময়ে চরম আর্থিক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে গভীর যন্ত্রণার মধ্যে তখন ব্যাঙ্কের বড় বড় ঋণখেলাপীরা ছাড় পাচ্ছেন এবং অনাদায়ী ব্যাঙ্কঋণ আদায়ের প্রশ্নে সরকারের কোনরকম পদক্ষেপ নেই এটাও মেনে নেওয়া যাচ্ছে না।

এই জরুরি বিষয়গুলি সরকারের কাছে তুলে ধরে কোনও সুরাহা হয়নি। তাই বাধ্য হয়েই আজ ব্যাঙ্ককর্মী ও অফিসারেরা দেশজোড়া ধর্মঘটের পথে শামিল।

নোট বাতিলের ইস্যুতে ব্যাঙ্ককর্মী অফিসারদের দাবি

১। রুরাল রিজিওনাল ব্যাঙ্ক ও সমবায় ব্যাঙ্কসহ সমস্ত ব্যাঙ্কের শাখায় পর্যাপ্ত টাকার যোগান সুনিশ্চিত করতে হবে।

২। সমস্ত এ টি এম-গুলোকে অবিলম্বে নোট সরবরাহের জন্য স্বাভাবিক করতে হবে।

৩। ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তোলার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের ওপর জারী থাকা সমস্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে।

৪। নোট সরবরাহের প্রশ্নে সমস্ত ব্যাঙ্কের মধ্যে পছন্দ অপছন্দ বাছাই তুলে নিতে হবে।

৫। ব্যাঙ্কে নগদ টাকা সরবরাহের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে।

৬। যখন ব্যাঙ্কের শাখায় নগদ টাকার চরম অভাব তখন কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া বিপুল নতুন নোট নিয়ে সি বি আই তদন্ত শুরু হোক।

৭। মুদ্রা পরিচালনার ক্ষেত্রে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের স্বশাসনকে শিথিল করা চলবে না।

৮। নোট বাতিলের সময়কালে সাধারণ মানুষ, ব্যাঙ্কের গ্রাহক এবং ব্যাঙ্ককর্মী যাঁরা প্রান হারিয়েছেন তাঁদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

৯। এই কঠিন সময়ে ব্যাঙ্ক কর্মচারী ও আধিকারিকদের নিরাপত্তা সুরক্ষিত করা। গ্রাহকদের ক্ষোভের আঁচ থেকে রক্ষার প্রশ্নে আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে প্রতিটি ব্যাঙ্কের শাখায়।

১০। গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে অক্লান্তভাবে পরিশ্রম করে চলা সমস্ত ব্যাঙ্ককর্মী ও আধিকারিকদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

ব্যাঙ্কের অনাদায় ঋন

১। এক কোটি বা তার বেশি পরিমান টাকার অনাদায়ী ঋণ রয়েছে এমন ঋন-খেলাপী গ্রাহকদের নামের তালিকা প্রকাশ করতে হবে।

২। অনাদায়ী ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে ব্যাঙ্ককে।

৩। আরও বেশি ঋণ আদায়ের জন্য ট্রাইব্যুনাল এবং ফাস্ট ট্র্যাক ট্রাইব্যুনাল গড়তে হবে।

৪। ইচ্ছাকৃত ঋণ-খেলাপ ফৌজদারী অপরাধ বলে গণ্য করতে হবে।

ব্যাঙ্ক কর্মী ও অফিসারদের আন্দোলন কর্মসূচী:

আগামী ৩০শে জানুয়ারি সমস্ত কেন্দ্রে যৌথ অবস্থান ক্ষোভের কর্মসূচী সংগঠিত হবে।

ব্যাঙ্ককর্মী ও অফিসারদের বিভিন্ন ইউনিয়নের সমস্ত ইউনিটগুলির পক্ষ থেকে আগামী ১লা ফেব্রুয়ারি দেশের অর্থমন্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠানো হবে।

আগামী ২রা ফেব্রুয়ারি দেশের সমস্ত আর বি আই-র শাখাগুলির সামনে বা কাছে ধরণা অবস্থান বিক্ষোভের কর্মসূচী সংগঠিত করবেন ব্যাঙ্ককর্মী ও অফিসাররা।

আগামী ৩রা ফেব্রুয়ারি থেকে ধর্মঘটের দিন পর্যন্ত পোস্টার প্রদর্শন কর্মসূচী চলবে।

আগামী ৬ই ফেব্রুয়ারি দেশের সমস্ত কেন্দ্রে যৌথ ধরনা অবস্থান কর্মসূচী সংগঠিত হবে।

এই লাগাতার আন্দোলনের পর্ব পেরিয়ে আগামী ৭ই ফেব্রুয়ারি দেশজোড়া ধর্মঘট সংগঠিত করবে ব্যাঙ্ককর্মী ও অফিসারদের সংগঠন।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement