বিকল্প বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট

বিশ্বজিৎ দাস

১১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

Image

+

মণিপুরের ইউনাইটেড নানা কাউন্সিলের (ইউ এন সি)-র সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের আলোচনা ভেস্তে গেলো। মঙ্গলবার (৭ই ফেব্রুয়ারি) দ্বিতীয়বার ইউ এন সি’র সঙ্গে বৈঠক করেও কোনও সমাধান সূত্র বের করতে পারেনি কেন্দ্রীয় সরকার। নানা কাউন্সিলের নেতারা পৃথক জেলার দাবিতে অনড় থাকায় এদিনের আলোচনা বেশিদূর এগোতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত নাগা নেতা গেইডন কাসেই ও এস স্টিফেনকে ফের ১৫ দিনের বিচার বিভাগীয় হেপাজতে নিয়ে নেয় মণিপুর পুলিশ। এদিকে, মণিপুরে আর্থিক অবরোধ আরও দৃঢ় করতে ২নং ও ৩৭নং জাতীয় সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বুধবার শক্তি প্রদর্শন করে নানা ছাত্র সংগঠন। তাঁরা এদিন জানায়, নানা কাউন্সিলের দাবি না মানলে আগামী রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন করতে দেবে না। নানা নেতাদের হুমকির পর নড়েচড়ে বসেছে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারী বিবেককুমার দেওয়াং বুধবার সাংবাদিক সম্মেলন করে জানান, যে কোনও মূল্যে মণিপুরে নির্বাচন নির্ধারিত দিনে হবেই। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোট করাতে প্রচুর সংখ্যক আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করেছে ইলেকশন কমিশন।

এদিকে, সেনা বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন (আফসন্দা) প্রত্যাহারের ইস্যুই মণিপুরে নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হয়ে উঠেছে। আফসনা প্রত্যাহারের দাবিতে সবচে‍‌য়ে বেশি সরব লৌহ মানবী ইরম শর্মিষ্ঠা চানু ও বামপন্থীরা। এই ইস্যু নিয়ে চানুর নবগঠিত দল পিপ্‌ল রিসার্জেন্স অ‌্যান্ড জাস্টিস অ্যালায়েন্স (পি আর জে এ) ও ছয় দলীয় বাম-গণতান্ত্রিক জোট ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছে। মঙ্গলবার ইরম শর্মিষ্ঠা ঘোষণা করেছেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রী ওক্রাম ইবোবি সিং-এর বিরুদ্ধে প্রার্থী হচ্ছেন। ইবোবি সিং রাজ্যের থাউবেন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই আসনে এবারও প্রার্থী হচ্ছেন তিনি। চানু জানিয়েছেন, শুধু কংগ্রেসের পরাজয় নিশ্চিত নয়, সঙ্গে ইবোবিকে পরাস্ত করতে তিনিও থাউবেন আসনে লড়াই করবেন। আফস্পা মণিপুরের মা-বোনেদের জন্য কালো আইন। এই আইন বলবতের পর অসংখ্য মণিপুরী মহিলা সেনাদের দ্বারা ধর্ষিতা হয়েছেন। অসংখ্য নিরীহ মানুষকে গুলি করে মেরেছে সেনা বাহিনীর জওয়ানরা। এই আইন প্রত্যাহারের দাবিতে মণিপুরে বহুদিন ধরে আন্দোলন চলছে। বামপন্থীরাও এই আন্দোলনে শামিল। এবারের নির্বাচনে এটি একটি জ্বলন্ত ইস্যু।

নির্বাচনে উত্তর-পূর্বের ছোট রাজ্য মণিপুরেও ভোটের প্রস্তুতি জোরকদমে চলছে। ছোট পাহাড়ি রাজ্য মণিপুরে আগামী ৪ ও ৮ই মার্চ দুই দফায় ভোটগ্রহণ কবে। তাই এ মুহূর্তে রাজ্যে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে। মোট ৬০ আসন ‍ বিশিষ্ট বিধানসভা সমষ্টির ভোটদাতা ১৮লক্ষ ২০ হাজার ৫৮১ জন। রাজ্যের ২০টি আসন তফসিলি উপজাতি ও ১টি আসন তফসিলি জাতির জন্য সংর‍ক্ষিত।

ইতোমধ্যে শাসক কংগ্রেস মোট ৬০ আসনে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে। বি জে পি এখনও কার্যত ২১টি আসনের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করতে পেরেছে। বাকিগুলি কয়েকদিনের মধ্যে হবে বলে দলের সূত্রে জানা গেছে। ৭ই ফেব্রুয়ারি থেকে মনোনয়ন জমা নেওয়া কাজ শুরু হবে।

তবে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হচ্ছে বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট ও পিপল রিসার্জেন্স অ্যান্ড জাস্টিস অ্যালায়েন্স (পি আর জে এ)। মণিপুরে বামপন্থীদের মধ্যে তুলনামূলক শক্তিশালী হচ্ছে সি পি আই। ওই রাজ্যে সি পি আই এবং সি পি আই (এম) অতীতে জোট করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও এবার মোট ছয়টি রাজনৈতিক দল যথাক্রমে সি পি আই (এম), সি পি আই, আপ, এন সি পি, জে ডি (ই) ও মণিপুর ন্যাশনাল ডেমোক্রেটি ফ্রন্ট একসঙ্গে এসে লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট অব মণিপুর (এন ডি এফ এম) গঠন করে কংগ্রেস-বি জে পি’কে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। এছাড়া, লৌহমানবী ইরম শর্মিলা চানু তাঁর ১৬ বছরের অনশন ভঙ্গ করে পিপল রিসার্জেন্স অ্যান্ড জাস্টিস অ্যালায়েন্স (পি আর জে এ) নামে রাজনৈতিক মঞ্চ গঠন করে মণিপুরের রাজনীতিতে পা দিয়েছেন। বাম-গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট রাজ্যের সবকটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ঘোষণা করেছে। এ বিষয়ে সি পি আই (এম) রাজ্য কমিটির সম্পাদক শরৎ সালাম এবং সি পি আই রাজ্য সম্পাদক মৈরাংথেম নারা সাংবাদিক সম্মেলন করে জানান, গত ১৫ বছরের কংগ্রেসের অপশাসন থেকে মুক্তি চাইছেন, রাজ্যের মানুষ। মণিপুরের উন্নয়নে ব্যর্থ ওক্রাম ইবোবি সিং-এর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার। বেকারি, মূল্যবৃদ্ধি, দুর্নীতি, বেহাল যোগাযোগ এগুলি জ্বলন্ত ইস্যু। এনিয়ে কংগ্রেসের উপর মানুষ ক্ষুব্ধ। এছাড়া কেন্দ্রের বি জে পি সরকারের আড়াই বছরের শাসনে মণিপুরবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছেন। রাজ্যে বি জে পি’র এক সাংসদ থাকা সত্ত্বেও রাজ্যের উন্নয়নে তাঁর কোনো ভূমিকা নেই।

তাই কংগ্রেস-বি জে পি’র বিরুদ্ধে নবগঠিত বাম-গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট রাজ্য নির্বাচনে গুরুত্ব বেড়েছে। ইতোমধ্যে ফ্রন্টের প্রার্থীদের দিয়ে ব্যাপক প্রচার শুরু হয়েছে। নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসবে তখন বড় বড় জনসভা, সমাবেশ করা হবে। এখন শুধু মিছিল, স্কোয়াডিং ও গ্রা‍মে গ্রামে সভা চলছে। ছোট ছোট সভার উপর জোর দিয়েছে ফ্রন্ট। ফ্রন্টের প্রচারে মহিলাদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। মণিপুরের নির্বাচনে পুরুষ ভোটারের চেয়ে মহিলা ভোটারেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়।

মণিপুরে এবার শাসক কংগ্রেসের পতন ঘটার সম্ভাবনা প্রবল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। গত ১৫ বছরের শাসনের ব্যর্থতার পাশাপাশি গত তিনমাস ধরে অর্থনৈতিক অবরোধে মণিপুরের আর্থিক হাল প্রায় ভেঙে পড়েছে। নাগাদের জন্য পৃথক জেলা গঠনের দাবিতে গত তিনমাস ধরে রাজ্যের ২নং ও ৩৭নং জাতীয় সড়ক অবরোধ করে রেখেছে ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল (ইউ এন সি)। এই অবরোধে রাজ্যে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে, ভয়ে অ-মণিপুরী ব্যবসায়‌ীরা রাজ্য ছেড়ে পালাচ্ছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর আকাল দেখা দিয়েছে। কাউন্সিলের দাবি, রাজ্যের নাগাদের জন্য পৃথক জেলা গঠন করতে হবে। কিন্তু এই দাবি মানতে চাইছে না শাসক কংগ্রেস। অর্থনৈতিক অবরোধ থেকে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে আসতে নেমেছে বি জে পি। কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে গত ৩রা ফেব্রুয়ারি নতুন দিল্লিতে ত্রি-পাক্ষিক বৈঠক হয়েছে। এই বৈঠকে রাজ্য সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার ও ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিলের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। নাগা কাউন্সিলের সভাপতি গেইডন কেমি এবং সম্পাদক (প্রচার) এস স্টিফেন জেল থেকে সাময়িক জামিন পেয়ে এদিনের বৈঠকে যোগ দেন। তবে বৈঠক থেকে কোনও সমাধান সূত্র বেরিয়ে আসেনি। নাগা নেতারা পৃথক জেলা গঠন না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে বলে জানান। এদিকে কেন্দ্রীয় সরকার নতুন জেলা গঠনের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি রাজ্যের উপর ছেড়ে দিয়েছে। রাজ্য সরকার থেকে জানানো হয়েছে, আগে অবরোধ তুলতে হবে। তারপর নতুন জেলা গঠন নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। সব পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকায় অবরোধ অব্যাহত আছে। আবার নাগা নেতাদের সঙ্গে গোপনে সভাও করছে বি জে পি। অবরোধ তুলতে ৬০ কোম্পানি প্যারা মিলিটারি পাঠাতে কেন্দ্রের কাছে আবেদন করেছে রাজ্য। যদিও কেন্দ্র থেকে প্রয়োজনীয় আধা সামরিকবাহিনী পাঠানো হয়নি।তবে নির্বাচনের কমিশনের দাবিমতো ১৭ হাজার আধা সামরিক পাঠানোর কাজ শুরু হয়েছে। এদের নির্বাচনী কাজে নামানো হবে।

মণিপুরের নির্বাচনে ফায়দা তুলতে বি জে পি বিভাজনের রাজনীতি চাঙা করছে। মণিপুরী-নাগা আবার মেইথাই মণিপুরী—অ-মেইথাই মণিপুরী এবং হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে বিভেদের রাজনীতি গঠন করতে চাইছে। মণিপুরের ক্ষমতা দখল করতে আসামের বি জে পি নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আসামের মন্ত্রী-বিধায়করা প্রতিদিন মণিপুরে ছুটছেন।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement