নগদহীন অর্থনীতি আর যন্ত্রণা

১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

তিন ভিন্ন জীবন। অপরিচিত। আপাতদৃষ্টিতে নেই কোনও বন্ধন। কিন্তু, তিনমাস আগের এক সন্ধ্যা যেন আচমকাই এই তিন জীবনকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছে।

ওঁরা কাজ করেন না। ওঁরা যে কর্মহীন।

আসলে ওঁরা কাজ পান না। যে কাজটুকু ছিল, ‘পেট চালাতে’ অন্তত যেটুকু আয় ছিল, আজ তা পুরোপুরি বন্ধ। জীবন চলছে প্রতিবেশীদের ‘দয়া’য়।

‘সৌজন্যে নোটবন্দি’!

তথাকথিত ‘আচ্ছে দিন’র ফেরিওয়ালা দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সেই সান্ধ্য-ঘোষণা সোনামতি, গুলাম, সুরেশকে জীবনের লম্বা সুতোর তিনটে আলাদা-আলাদা গিঁটে বেঁধে ফেলেছে। পুরানো পাঁচশো-হাজারের নোট হঠাৎ বাতিলে মোদীর ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’র অন্দরে একটু চোখ বোলালেই বোঝা যাবে ঝাড়খণ্ড থেকে মুম্বাই, মুম্বাই থেকে রাজধানী দিল্লি— দেশের আসল চিত্র। মোদীবাহিনীর জোরালো কণ্ঠস্বরের আওয়াজ যে আদপে ফাঁপা, তা-ও স্পষ্ট হবে দিনের আলোর মতোই।

সোনামতির কথা...

কাকভোরে উঠে ছেলে-মেয়েকে তৈরি করে রান্না সেরে কাজে বেরনো। অটোয় উঠে আরও পাঁচজনের সঙ্গে কিছুক্ষণ খোশগল্প। তারপর গ্রাম থেকে ৩০কিলোমিটার দূরে কাজের জায়গায় পৌঁছেই শুরু দৈনন্দিন যুদ্ধ। পিঠে সিমেন্টের বস্তা বা অন্য কোনও ভারী সামগ্রী নিয়ে নির্মাণকাজের জায়গায় পৌঁছে দেওয়া। নির্মাণক্ষেত্রের কুলি সোনামতি। আবার কাজ শেষে ঘরে ফেরার তাড়া। ছেলে-মেয়ের মুখগুলো দেখে সারাদিনের খাটনি ভুলে যাওয়া। যৎসামান্য রোজগারেই হাসিমুখে মাস চালানো।

ঝাড়খণ্ডের ওঁরাও উপজাতির সোনামতি নাগ কষ্টের মধ্যেই ছেলেমেয়েদের জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখেন। সোনামতির স্বামী নেই, আধুনিক ভাষায় বললে, কাচ্ছাবাড়ির সোনামতি ‘সিঙ্গল প্যারেন্ট’।

সেই সোনামতির জীবনের ব্যস্ততা আজ নেই বললেই চলে। জীবনের দিনপঞ্জি বদলে গিয়েছে, ৮ই নভেম্বরের পর।

রোজ সকাল আটটায় কাচ্ছাবাড়ি গ্রামের মোড়ে একটি অটো এসে থামত। সেই অটোই সোনামতি এবং আরও পাঁচ-ছ’জনকে কাজের জায়গায় পৌঁছে দিত। ‘বেশ কয়েকদিন মোড়ের মাথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছি, ঠিক আটটায়। কিন্তু অটো আসত না’, সোনামতির হতাশা বুঝিয়ে দেয় তার অস্পষ্ট গলার স্বর আর সোনামতির ক্ষোভ ফুটে ওঠে ওঁর মুখে।

অটো আর আসে না। নোট বাতিলের চক্করে নোটের আকালে কাজ হারিয়েছেন সোনামতি।

মাসের শেষে সর্বসাকুল্যে হাতে থাকত দু’হাজার টাকা। দিনপিছু যদিও সোনামতির বরাদ্দ ছিল ২৬০ টাকা, কিন্তু অটোভাড়া, কন্ট্রাক্টরের কমিশন বাদ দিয়ে সপ্তাহের শেষে কখনওই ৬০০’র বেশি টাকা চোখে দেখতে পেতেন না সোনামতি। কিন্তু চোখে অপার স্বপ্ন আর আত্মবিশ্বাসে ভর করে জীবন যুদ্ধে লড়ছিলেন সোনামতি। স্কুলে ভর্তি করেছিলেন ছেলে-মেয়েকে। মানুষের মতো মানুষ করতে চেয়েছিলেন।

পারলেন না! স্বপ্নে ধাক্কা বাস্তবের।

খাবারই জুটছে না! তো পড়াশোনা? প্রতিবেশীদের কৃষিখামার থেকে সবজি আর গণবণ্টনের ১টাকা কেজি চাল—কোনওরকমে বাঁচছে ওই ক’টা পেট। বাড়িভাড়া আর ছেলেমেয়ের স্কুলের খরচ শাশুড়িই দিয়ে দিতেন। সোনামতির উপার্জনের টাকায় চলত সংসার। অভাব ছিল সচ্ছলতার, তবে সুখে ছিল ছোট পরিবারটি। ৮ই নভেম্বর মোদীর ঘোষণার পর সোনামতির মাথায় প্রথমবার বাজ ভেঙে পড়ে। আর তার একমাসের মধ্যেই ডিসেম্বরে শাশুড়ির মৃত্যুতে সোনামতির জীবনের কালো মেঘ আরও ঘন হয়ে ওঠে। ‘বছরের শুরুতে ছেলেমেয়ের স্কুলে ১২০০টাকা দিতে হয়, কিন্তু দিতে পারিনি। ওদের পড়তে দিতে বারবার অনুরোধ করেছিলাম’, চোখে জলের ধারা বইলেও স্পষ্ট হয় ক্ষোভও। পরক্ষণেই হতাশ কণ্ঠ বলে ওঠে, ‘মাত্র ২০০টাকা পড়ে আছে। অনেক কষ্ট করে ২০০০টাকা জমিয়েছিলাম। নভেম্বরে ব্যাঙ্ক থেকে তা তুলে নিলাম। সংসার খরচে সবই শেষ’!

কাচ্ছিবাড়ির মোড়ে কবে আবার ভোলার অটো থামবে? কবে সোনামতিরা কাজ পাবেন? ‘আচ্ছে দিন’র কান্ডারি এই উত্তরগুলো দিতে পারবেন না স্বাভাবিকই। সোনামতির ভরসা এখন মাসে ৬০০টাকা। শাশুড়ির মৃত্যুর পর গ্রামের মুখিয়া বিধবাদের পেনশন প্রকল্পে সোনামতির নাম লিখিয়েছেন। সেখান থেকেই প্রতিমাসে ৬০০টাকা পাওয়ার কথা সোনামতির। কিন্তু অনিশ্চিত ওঁর ভবিষ্যৎ! অনিশ্চয়তার পথে হাঁটছে সোনামতির ছেলে-মেয়েও...

মুম্বাইয়ে রহমান...

বছর কুড়ি পর!

তখন যুবক ছিলেন গুলাম রহমান। বাংলা থেকে পাড়ি দিয়েছিলেন মুম্বাইয়ে, আরও ভালো কাজের আশায়। কুড়ি বছর আগের কথা। বাণিজ্য নগরীতে পা দিয়েই শুরু হয় হাড়ভাঙা খাটুনি। রোজের ভিত্তিতে কাজ করতেন রহমান। ছিলেন গয়না শ্রমিক। ব্যবসায় ওঠা-নামা থাকেই। সেইমতো কাজে কখনও মন্দা আসেনি তা নয়। কিন্তু এখন চারদিকে ধোঁয়াশা, কোনও দিশা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ৮ই নভেম্বরের পর থেকে রহমান হাতেগুনে ১০দিন কাজ করেছেন। ‘কুড়ি বছরে এই প্রথম, কাজ খুঁজতে গিয়ে এরকম অবস্থা কখনও হয়নি। ২০০৮-এ একবার ব্যবসায় বেশ মন্দা এসেছিল। কিন্তু তখনও এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি’, ক্ষোভ নাকি হতাশা বুঝতে দেয় না রহমান।

‘সান্তাক্রুজ ইলেক্ট্রনিক্স এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন’ (এস ই ই পি জেড)-এ একটি গয়না প্রস্তুতকারক সংস্থায় দিনমজুর হিসাবে কাজ করতেন রহমান। এস ই ই পি জেড-এ প্রায় ৪০০টি এরকম গয়না সংস্থা রয়েছে। সেখানে বিভিন্নরকমের কাজ করেন রহমানরা। কেউ গয়না পালিশ করেন, কেউ বা গয়না তৈরির আগে সোনা গলানো বা গরম করার সঙ্গে যুক্ত ইত্যাদি। কয়েকশো শ্রমিকের মধ্যে রহমানও ছিলেন একজন। কিন্তু ‘বড়’ নোট বাতিলের আকস্মিক সিদ্ধান্তে ওঁরা দিশাহারা হয়ে পড়েন। ‘কোম্পানির কাছে নগদ টাকা নেই বলে তারা আমাদের বেতন দিতে পারছে না, এমন নয়। নোট বাতিলে গয়নার চাহিদা কমে যাওয়ায় কাজই তো বন্ধ হয়ে গিয়েছে’, বলে চলেন রহমান। সামান্য কাজের তাগিদে কন্ট্রাক্টরের নজরে পড়তে একবুক আশা নিয়ে সংস্থার বাইরে শয়ে-শয়ে শ্রমিকের মাঝে মুখ তোলার চেষ্টা করেছিলেন রহমান, কোনও লাভ হয়নি!

‘ডিমানিটাইজেশন’র পর কেটে গিয়েছে দু’মাস। এখনও কোনও সঠিক কাজ খুঁজে পাননি রহমান। মার্চে নিজের গ্রামে ফিরে যাওয়ার চিন্তাভাবনাও শুরু করে দিয়েছেন। তবে শুধু এস ই ইি পি জেড নয়, ভিওয়ান্দিতে রেডিমেড পোশাক হাবও প্রায় বন্ধই। ৫০দিনেরও বেশি কোনও কাজ নেই সেখানকার দিনমজুরদেরও। এমনকী মহারাষ্ট্র পূর্বে শ্রমিকদের কাছ থেকে ক্ষুদ্র মাইক্রো ফিনান্স কোম্পানিগুলি বার্ষিক ৩৬ শতাংশ সুদ নিচ্ছে’, অভিযোগ করেছেন এ আই টি ইউ সি নেতা সুকুমার দামলে।

কোথাও শ্রমিকরা কাজ পেলেও তাঁদের দিনপিছু বেতন মারাত্মক হারে কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এস ই ই পি জেড-এ শ্রমিকদের ৪০০টাকা করে দেওয়া হতো প্রতিদিন। এখন তা ২০-২৫শতাংশ কমানো হচ্ছে। শ্রমিকদের অভিযোগের আঙুল কন্ট্রাক্টরের দিকে, আর কন্ট্রাকটররা বলছেন কম চাহিদার কথা। দু’টিই স্বাভাবিক। ‘আগে আমি প্রতিদিন ৪০-৫০জনের কাজের জোগাড় করতাম। এখন খুব কষ্ট করে ১৫জন শ্রমিকের কাজ জোগাড় হচ্ছে’, বলছেন পি এল ভার্মা, একজন এজেন্ট।

বাড়ি থেকে প্রায় হাজার কিলোমিটার দূরে বসে আজ রহমানের চোখের সামনে ভাসছে পরিজনদের মুখগুলো।

সোনামতির মতোই অনিশ্চয়তা ঘিরেছে ওঁদের জীবনেও!

রাজপথে হন্যে সুরেশ...

‘১২ই নভেম্বর, অন্যান্য দিনের মতোই সকালে কাজে গিয়েছিলাম। সেদিনই যে কাজ হারাবো ভাবিনি!’ কথাগুলো বছর ৩২’র সুরেশ কুমারের। পশ্চিম দিল্লিতে মায়াপুরি শিল্পাঞ্চলের ইলেক্ট্রনিক মোটর কারখানায় কাজ করতেন তিনি। ‘ডিমানিটাইজেশন’র প্রভাব। ‘বেতন যা বাকি ছিল, সেই সাড়ে আট হাজার টাকা ১২তারিখ মালিক দিয়ে দেন, সবই পুরানো নোট। তারপর বললেন, একমাসের ছুটি নিয়ে নিতে। তখন গ্রামে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনও পথ খোলা ছিল না’, সুরেশের চোখ কখনও আকাশের দিকে, কখনও মাটিতে! সামনের পথটা কীভাবে হাঁটবে, সেই চিন্তা ওঁকে স্থির হতে দিচ্ছে না।

সুরেশ এখন উত্তর প্রদেশে, আজমগড়ে ওঁর নিজের গ্রামে। বলছেন, ‘একমাস পেরিয়ে যাওয়ার পর ডিসেম্বরে কারখানায় খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম। শুনলাম, আরও ৬জন বরখাস্ত হয়ে গিয়েছেন। চাকরি পাওয়ার আর কোনও আশাই নেই।’ চারজনের পরিবার সুরেশ কুমার একমাত্র রোজগেরে। দুই সন্তানের মধ্যে একজন পাঁচ বছরের অন্যজন দুই বছরের। নগদ সাড়ে আট হাজার টাকা আর কিছু সেভিংস—সম্বল সুরেশের। বাড়ি ফিরে ব্যাঙ্কে লাইন দিয়ে পুরানো নোট বদলে নিয়েছিলেন। ডিসেম্বরের শেষে ফের দিল্লি যান সুরেশ, যদি কোনও কাজ পাওয়া যায়! ‘প্রথমেই মালিকের কাছে গিয়েছিলাম। কিন্তু মালিক সাফ বলে দিলেন, কাজ দেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে তিনি নেই। তারপর দিল্লির রাস্তায় হন্যে হয়ে ঘুরেছি, সমস্ত শিল্পাঞ্চলে গিয়েছি, মেলেনি কোনও কাজ।’ রাজধানীর প্রায় সমস্ত বড় শিল্প তালুকের কমপক্ষে ৭৫শতাংশ কর্মী নোট বাতিলের পরে কাজ হারিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন, বলেছেন ‘ইন্ডিয়ান ফেডারেশন অব ট্রেড ইউনিয়নস’র সাধারণ সম্পাদক রাজেশ কুমার।

তাঁদের মধ্যেই রয়েছেন সুরেশও। একাধিক সুরেশ কর্মহীন। বেকারত্ব মেটানোর মিথ্যে প্রতিশ্রুতি ২০১৩ লোকসভা প্রচারে বারবার নরেন্দ্র মোদীর গলায় ধ্বনিত হয়েছে। বেকার যুবকের সংখ্যা কমানো তো দূরের কথা বাড়িয়ে দিয়েছেন।

সোনামতি, রহমান, সুরেশ ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন। মিলেছেন দিনপঞ্জিতে, দুর্দশায়। মিলিয়েছেন স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রী, নিজের হঠকারিতায়।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement