মৃত্যুর অজুহাতে বাল্য বিবাহ!

১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

চোখে আই এ এস অফিসার হওয়ার স্বপ্ন। ও পড়তে ভালোবাসে। সদ্য স্কুলের গণ্ডি টপকানো রাধা জীবনে অনেক-অনেক বড় হতে চেয়েছিল। কিন্তু সমাজের অদ্ভুত রীতি, নিয়মের বাধ্যবাধকতা ওঁকে স্বপ্ন দেখতে দিলো না। বছর ১৬’র রাধাকে ওঁর পরিবার জোর করেই বেঁধে দিয়েছে সাংসারিক জীবনে।

শুধু বাল্য বিবাহ নয়, গণবিবাহ। গণ বাল্য বিবাহ। আর তা-ও পরিবারের কারও মৃত্যুতে। এটাই রীতি, এটাই ঐতিহ্য। পরিবারের কোনও প্রবীণ সদস্যের মৃত্যুতে তৈরি হওয়া অন্ধকারে আলো ফোটাতেই বিয়ের সানাই বাজানোর এক অদ্ভুত পন্থা গ্রামবাসীদের। অথবা পরিবারের কোনও এক মেয়ের বিয়ে মানেই সেই বাড়ির আরও অন্য মেয়েদেরও বিয়ে! পাত্রীর বয়স দুই মাস হলেও বিয়ে আটকায় না। দেখা হয় না বয়স, যারা বিয়ের অর্থই বোঝে না বা যারা বিয়ে শব্দটাই হয়তো শোনেনি — তাদেরও বিয়ে!

মরু অঞ্চলে ধূসরতা আরও বাড়ছে। তবে নিজের জীবন দিয়ে বুঝে পরবর্তী প্রজন্মকে সেই অনিশ্চিত জীবনে যাতে না পড়তে হয়, সেই চেষ্টাও শুরু হয়েছে। বছরের শেষ, বছরের শুরু এঁদের জীবনে আলো ফেরাতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু নিজের মেয়েদের ঝলমলে ভবিষ্যত দেওয়ার অঙ্গীকার রাজস্থানের যোধপুরে ছোট্ট গ্রামের মেয়েগুলোর।

বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে অঙ্গীকার করেছে ভিয়ানসার, রাজস্থানের যোধপুরের একটি ছোট্ট গ্রাম। সেখানেই প্রচলিত এমন প্রথা। সমাজের জটিল গোলোকধাঁধার মাঝে পড়ে দিক পায় না ভিয়ানসারের নাবালিকারা, শিশুরা। হাতে মেহেন্দি, মাথায় ওড়না। কিন্তু কেন, তা বোঝে না ওদের শিশুমন। নিজেরা সমাজের অদ্ভুর রীতির ‘শিকার’ হলেও পরের প্রজন্মকে এর থেকে আড়াল করার তাগিদ থেকেই এই অঙ্গীকার।

গ্রামে যখনই কারও মৃত্যু হয়, তখনই ধূমধাম করে আয়োজন হয় বিয়ের। ছোট-ছোট মেয়েদের ধরে বেঁধে বিয়ে দেওয়া হয়। সামান্য কোনও অজুহাতে কী বিয়ের অর্থ না বোঝা মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া যায়?

‘আমার ঠাকুমা যখন মারা যান, তখন আমার বিয়ে দেওয়া হয়। আমার তখন মাত্র সাত বছর বয়স। একইদিনে আমাদের পরিবারের আটজন মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমার নিজের বোনেরা, কাকার মেয়েরা সবাইকেই বিয়ে করতে হয়েছিল’, বলছিল ভগবতী। আজ থেকে প্রায় ন’বছর আগেকার কথা। ১৬ বছরের ভগবতী এখন আক্ষেপ করলেও সমাজের জাঁতাকল তাকে মুক্তি দেয়নি।

কোনও একজন বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার মৃত্যু হলেই গ্রামের এক বা একাধিক নাবালিকার বিয়ে! দুঃখের উপর আনন্দের প্রলেপ দিতে আজও সামান্য এক অজুহাত খাড়া করে চলছে বাল্য বিবাহ।

মায়ের বকুনিও শুনতে হয়েছে ভগবতীকে। সে কামাই করেছে স্কুলও। তবু যোগ দিয়েছে বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ আন্দোলনে। গ্রামের বড়ো এবং ছোট প্রত্যেকেই ভিড় জমিয়েছিলেন, গ্রামের পুরুষ মাথারা সেখানে বয়সের আগে বিয়ের কু প্রভাব নিয়ে কথা বলছিলেন। এক কোণায় জড়োসড়ো হয়ে বসেছিলো ভগবতী। ওই অনুষ্ঠানে যাওয়া নিয়েই যত অশান্তি মায়ের সঙ্গে। সমাজের অদ্ভুত গতবাঁধা নিয়মের সঙ্গে অভ্যস্ত ভগবতীর মা চান, মেয়েদের কমবয়সেরই বিয়ে হোক।

ভগবতীরা তা চায় না। চোখে-মুখে হতাশা। কিন্তু ছোট থেকেই এই নিয়ম-নীতি দেখেশুনে বড় হওয়া ভগবতীরা জোর দিয়ে কিছু বলতেও পারে না। জানাতে পারে না প্রতিবাদ। আবার মানেও বোঝে না এই অদ্ভুত নিয়মের।

ভগবতী বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের। আর এই প্রথাও প্রচলিত এই সম্প্রদায়ের মধ্যেই। অথচ এই সম্প্রদায় পরিবেশ সচেতনতা নিয়ে পরিচিত। একটি অত্যন্ত প্রচলিত শোনা কথা হলো, যোধপুরের রাজা বনজঙ্গল সাফ করে রাজপ্রাসাদ বানাতে চাইলে নিজেদের দেহকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন বিষ্ণোইরা। গাছ কেটে প্রাসাদ বানানোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, আন্দোলন স্মরণীয় করে রেখেছে বিষ্ণোইদের। সেই বিষ্ণোইদের মধ্যেই এখনও অদ্ভুত সামাজিক রীতি।

তবে পরিবারের কারও মৃত্যুতে গণবিবাহের আয়োজন শুধু বিষ্ণোইদের মধ্যেই দেখা যায়, এমন নয়। ‘রাজস্থানেই জাঠ এবং অন্যান্য অনগ্রসর অংশের মধ্যেও এই রীতিটি প্রচলিত রয়েছে’, জানিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আইদান সিং ভাটি।

আই এ এস অফিসারের চেয়ারে বসার স্বপ্ন আজও জ্বলজ্বলে রাধার চোখে। কিন্তু হতাশা প্রকাশ করেছে সে, ‘আমার কাকার মেয়েদের বিয়ের সময় আমার বাবাও বিয়ে দিয়ে দেয়। আমি বারবার বাবা-মা’কে বলেছিলাম বিয়ে করতে চাই না। পড়তে চাই। কিন্তু বাবা-মায়ের উপরও যে সমাজের চাপ ছিল, তাই কিছু করার ছিল না।’

শুধুই কী সমাজের বাধ্যবাধকতা নাকি অন্য কোনও কারণও লুকিয়ে রয়েছে এমন অদ্ভুত রীতি-নীতির পিছনে?

সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গিয়েছে, অর্থনৈতিক চাপও সেক্ষেত্রে একটি বড় কারণ। আয়ের সংস্থান অত্যন্ত কম হওয়ায় ‘এক ঢিলে দুই পাখি’ মারার চেষ্টাও করা হয়ে থাকে। ভাটি ব্যাখ্যা করেছেন, ‘রাজস্থানের এই মরু অঞ্চলগুলিতে প্রায়ই খরা লেগে থাকে। ফলে কৃষিকাজ থেকে নিশ্চিত কোনও আয়ের সম্ভাবনা থাকে না। পর্যাপ্ত আর্থিক আয়ের কোনও পথ খোলা না থাকায় বাবা-মায়েরা ভাবেন, কারও মৃত্যুর পর যখন আত্মীয়-প্রতিবেশীদের নিমন্ত্রণ করতেই হবে বা কোনও একজনের বিয়ে দেওয়ার সময়ও যখন নিমন্ত্রিতরা আসবেন, তখন পরিবারের সমস্ত মেয়েদেরই একবারে বিয়ে দিয়ে দেওয়াই শ্রেয়। অর্থের অভাবে বারবার আয়োজন করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই বয়স নির্বিশেষেই গণবিবাহ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে এই গ্রামে।’

দারিদ্র্য, অর্থের অভাব অন্যতম কারণ ঠিকই। কিন্তু প্রাধান্য অন্য বিষয়ে। শুধুমাত্র দারিদ্র্য বা অর্থের অভাবেই যে গণবিবাহ, বাল্য বিবাহের এই রীতি তা মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, কারও মৃত্যুতে বা পরিবারের কোনও একজনের বিয়ের দিনে অন্য মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার রীতি এমনভাবেই শিকড়ে গেঁথে গিয়েছে, তা উপড়ে ফেলা কার্যত অসম্ভব। এই রীতি এমনভাবে গ্রামের মানুষের মজ্জায় রয়ে গেছে যে গ্রামের এমন কোনো পরিবার যেখানে কোনো মৃত্যু হয়েছে অথচ সেই পরিবারে মেয়ে নেই। সেই পরিবার তাদের আত্মীয়দের মেয়ের বিয়ে দিয়ে রীতি বজায় রাখে। ফলে গণবিবাহ এবং মেয়েদের বাল্য বিবাহ চলছেই। সার্বিক চিন্তাভাবনার বদল ছাড়া পরিবর্তন সম্ভব নয়।

পরিবারের কারও মৃত্যু যে শোকের আবহ তৈরি করে, সেই দুঃখের রেশ বিয়ের মাধ্যমে কাটানো সম্ভব বলে মনে করেন গ্রামবাসীরা, বলছেন ‘গার্লস নট ব্রাইডস’র এক সদস্য অরবিন্দ ওঝা। ‘এই সম্প্রদায়ের মানুষরা পরিবারের প্রবীণ সদস্যের মৃত্যুকে খুব দুঃখজনক ঘটনা বলে মনেও করেন না। তাঁরা অতিরিক্ত আবেগপ্রবণও হয়ে পড়েন না। বরং মনে করেন মৃতের আত্মা সদ্য বিবাহিত দম্পতিকে আশীর্বাদ করবেন’, ব্যাখ্যা করেছেন ভাটি। শিক্ষার সুযোগ কম থাকা এবং আর্থিক সঙ্গতির অভাবেই এমন সিদ্ধান্ত নিতে গ্রামের মানুষজন বাধ্য হন, মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

উল্লেখযোগ্যভাবে, বিষ্ণোই সম্প্রদায়ভুক্তরা যে বাল্য বিবাহের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জানে না, এমনও নয়। তার প্রমাণও পাওয়া যায়। খুব অল্প বয়সে গ্রামের মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলেও; ১৮, ১৯ বছর বয়স না হলে তারা শ্বশুরবাড়ি যায় না। কিন্তু সেইসময় গিয়ে সেখানে মানিয়ে নেওয়া তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

সাত বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল ভাউরির, কাকার দুই মেয়ে এবং নিজের দুই বোনের সঙ্গে। ভাউরির দুই বোনের একজনের বয়স তখন মাত্র দু’মাস। আর ভাউরি তখন সাত বছরের। আঠারো বছর পেরিয়ে আজ পঁচিশে ভাউরি। বিয়ের ১১বছর পর শ্বশুরবাড়ি যায় সে। তখন জানতে পারে, তার স্বামী বেকার এবং নেশাগ্রস্ত। ‘আমি জানতাম না বিয়ে কী, বিয়ে মানে কী। শুধু এইটুকুই জানতাম যে আমার হাতে মেহেন্দি পড়ানো হবে এবং আমি ভালো কাপড় পড়বো। যদি জানতাম একজন নেশাগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে আমার বিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাহলে প্রতিবাদ করতাম। কিন্তু এখন কিছুই করার নেই। কারণ কিছু করতে গেলে আমার সম্প্রদায় তাহলে আমাকে নিচু নজরে দেখবে। আমাদেরকে যে কোনোভাবে মানিয়ে নিয়েই চলতে হবে।’ নিরুপায় ভাউরির উপলব্ধি।

তবে এই পরিবেশ বদলানোর সুস্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে। আজ ভাউরি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। যতো পরিশ্রমই করতে হোক সে করবে। তার মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করবে। মেয়েকে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই শুরু হয়েছে ভাউরির। ‘আমি জানি আমার স্বামীর ঠাকুমার যখনই মৃত্যু হবে, পরিবারের লোকজন চাইবে আমার মেয়ের বিয়ে দিতে। কিন্তু সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে আমি প্রস্তুত। যখন আমার মেয়ে চাইবে এবং যাকে ও চাইবে, তখনই ওর বিয়ে হবে’, ভাউরির গলার দৃঢ় স্বর বুঝিয়ে দেয় তার আত্মবিশ্বাস।

রাধা, ভগবতী, ভাউরিরা জেগে উঠুক... জাগুক সমাজ।

(রুরাল ইন্ডিয়া অনলাইনের সৌজন্যে)

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement