অবাধ্যতার মিছিলে সংসদ অভিযানে

অর্ণব বসু

১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

৩রা রাজধানীর দখল নেবে ছাত্ররা। রাজধানীর রাজপথের দখল নিয়ে এস এফ আই দেশের প্রতিটি ক্লাসরুমের বার্তা পৌঁছে দেবে শিক্ষা বেচাকেনার সওদাগরদের ‘গডফাদার’দের কাছে।

এখন হয়তো স্বাভাবিক প্রশ্ন জমছে, যে দাদা-দিদিটা, বন্ধুটা ২টো টাকা নিয়ে হাতে একটা কাগজ ধরায়, কাগজে লেখা ‘শিক্ষা হোক সকলের, না বাজারের, না ধর্মের’ — তাদের দৌড় কতদূর? দিল্লির রাস্তাটাও তাদের দখলে নিতে পারে!

ইতিহাস খনিক বাদ দিয়ে, একটু রোজকার পথচলার কথা হোক। আজ থেকে এক বছর আগে জানুয়ারির শীতকাল, রাজস্থানের সিকর জেলার এক মাঠ ভর্তি ছাত্রছাত্রী। এস এফ আই-র ১৫তম সর্বভারতীয় সম্মেলনের প্রকাশ্য সমাবেশ। কাতারে কাতারে মিছিল আসছে, স্লোগান উঠছে হৃদয় উদ্বেলিত ‘হোয়াট সেজ ভগৎ সিং, উই শ্যাল ফাইট উই শ্যাল উইন’। মঞ্চে রাজস্থানের ছাত্র শহীদ কমরেড অজিত সিং বেনিয়াল, পশ্চিমবঙ্গের ছাত্র শহীদ কমরেড সুদীপ্ত, কমরেড সায়ফুদ্দিনের অমর প্রতিকৃতিগুলি পাশাপাশি।

সূর্য তখন বাইশ গজে নট আউট, তবু ততোধিক উদ্যমী ছাত্রছাত্রীরা ভাষণ শুনছে অধীর আগ্রহে, উপাদান খুঁজছে সামনের লড়াইয়ের। একের পর এক আগুন ঝরা বক্তৃতা, যৌবনের বুকে জমে থাকা বারুদের সলতেগুলোকে তাজা করে দিচ্ছে। গোটা মাঠ থমকে, থমকে থাকা নিশ্বাসগুলো হঠাৎ আবেগে বিস্ফোরিত হলো যখন তৎকালীন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ঋতব্রত বলে উঠলেন, ‘‘ইয়ে পঞ্চনামা অখিল ভারতীয় সম্মেলন, আপ তক ইয়ে প্যায়গাম ভেজ দেনা বসুন্ধরা রাজে, এস এফ আই রোজ রোজ কা বাত হ্যায়, রোজ রোজ কা বাত থা, রোজ রোজ কা বাত রহেগা...’’।

এই বক্তৃতা শুনে মনে হচ্ছে না যে এলাকার কলেজে এস এফ আই করার অপরাধে আক্রান্ত দাদা-দিদিটা বা বন্ধুটার পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ সভাটায় বা মিছিলে একই কথা বলে মমতা ব্যানার্জিদের স্বৈরাচারী রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে ‘‘মমতা ব্যানার্জি জেনে রেখো মেরে ধরে, খুন করে এস এফ আই-কে আটকে রাখা যায় না, যাবে না’’। মনে দাগ তো কাটেই, কারণ প্রতি দিন স্কুলে বা কলেজে দেখছেন ক্লাসরুমের প্রতিটা বেঞ্চ একসাথে কথা বলার অভ্যেস হারিয়েছে। একসাথে কথা বলতে দিতে চায় না ওরা। প্রতিটা রাজ্যে ধর্মের নামে হানাহানি, মহিলাদের ওপর অত্যাচার, ছাত্রীদের ওপর ধর্ষণের প্রবণতা বৃদ্ধি, সম্মানের নামে লাশের রাজনীতি। নিজের স্কুলের গেট থেকে হরিয়ানার স্কুলে যাওয়ার আলপথ নিরাপদ নয়, নিরাপদ নয় ‘বিধর্মী’ বন্ধুত্বগুলো, একসাথে খেলাধুলোর মাঠগুলোও।

এটা তো জানাই আছে, জানবারই কথা এই গুগল-সোস্যাল মিডিয়ার যুগে। হিমাচল প্রদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এস এফ আই-র নেতৃত্বে লাগাতার আন্দোলন করছে কারণ ফি বাড়িয়েছে একশগুণ রাজ্যের বি জে পি সরকার। ১৩৯ দিন অনশন করেছে এস এফ আই, ফি বাড়তে দেয়নি। আমাদের রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে প্রতি বছর ফি বাড়‍‌ছে, পরীক্ষা থেকে রেজাল্ট প্রতিটা বিষয়ে বর্ধমান-কলকাতা-কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের গাফিলতি, স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় মান ধুঁকছে প্রতিদিন। কলেজগুলোর উপর লাগাম হারাচ্ছে, কলেজ কর্তৃপক্ষও ব্যর্থ ছাত্রছাত্রীদের সঠিক ক্লাস, ফ্রি শিপ, হাফ ফ্রি-শিপ প্রদান করতে।

এস এফ আই লড়াই করছে, পোস্টার পড়ছে, ডেপুটেশন দিচ্ছে, দেওয়ালজুড়ে লিখছে, মিছিল করছে, পঙ্গু উচ্চশিক্ষা দপ্তরের প্রতি কামান দাগছে, চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের কথা তুলে ধরার। ভাবতে তো হয়ই যে হিমাচল বা বর্ধমান আপনার গুমরে পড়া হতাশার অন্ধকারে মশাল জ্বালিয়ে এখনও পথ বাতলায় এস এফ আই। এস সি-এস টি স্কলারশিপ, ছাত্রীদের ভাতা, বিভিন্ন মেরিট স্কলারশিপগুলোর দাবি বন্ধুর হয়ে তুলে ধরে যাঁরা, তাঁরা মিছিল করবে রাজধানীতে। রাজধানীতে মিছিলের অভিমুখ সেদিনই নির্ধারণ হয়ে গিয়েছিল যেদিন সিকরের মাটিতে ১৪তম সর্বভারতীয় সম্মেলন হচ্ছে অথচ সিকর জেলা এস এফ আই-র সম্পাদক সুভাষ জাখর জেলের গরাদে বন্দি, বন্দি আরও শতাধিক কমরেড, কারণ ওদের লড়াই ছিল ক্যাম্পাসে আর এস এস-এর বিরুদ্ধে, ‘ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ’— এই ফতোয়ার বিরুদ্ধে।

মনে এই লড়াই নাড়িয়ে দেয় কারণ এ রাজ্যেও গতবছর ফতোয়া জারি ছিল ‘ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ’। কলেজে প্রতিদিন এস এফ আই-কে লড়তে হয় তৃণমূলের দুষ্কৃতীদের দাপাদাপির বিরুদ্ধে। ক্যাম্পাসে গণতন্ত্রের লড়াইটা, আপনার মতপ্রকাশের অধিকারের দাবিতে লড়াইটা, অলিগলি থেকে রাজপথ নাগরিকের গণতন্ত্রের লড়াইটা লড়তে দেখেই তো আপনি শহীদ সুদীপ্ত, সাইফুদ্দিন এবং হিমাচলের শহীদ রোহিতের খুনটাকে মেনে নিতে পারেন না। দেশের প্রতিটা কোণায় কোণায় শাসকের চরিত্রগুলো আপনাকে চিনতে শেখায় ত্রিপুরা, কেরালার সাথে গুজরাট, মহারাষ্ট্রের তফাত কোথায়। ত্রিপুরায় যখন শিক্ষা ছড়িয়ে পড়ে বৃষ্টির ধারার মতো তখন মহারাষ্ট্রের পিছিয়ে পড়া মেধাবী ছাত্রছাত্রীর এবং শিক্ষার মাঝে দেওয়াল খাড়া করা হয়।

আমাদের দেশের সরকারের শিক্ষানীতির খোরাকগুলো আপনার কাছে যথেষ্ট উদ্বেগের, কারণ ‘বিকৃত’ ও ‘বিক্রিত’ এই কাঠামোয় শিক্ষার মাপকাঠি তৈরি হচ্ছে প্রতিদিন। নাগপুরের আর এস এস দপ্তর ও ভারতবর্ষের পুঁজির একচেটিয়া মালিকরা যৌথ পার্টনারশিপ তৈরি করেছে শিক্ষা ব্যবস্থায় এবং বোর্ড অফ ডিরেক্টরস হচ্ছে সরকারের ক্যাবিনেটের মন্ত্রীরা। ক্লাসরুম বেচে দেওয়ার চক্রান্ত প্রতিদিন, তাই ইউ জি সি থেকে এম এন এন ডি প্রতিটা দপ্তর নীতিহীনতা ও দেউলিয়াপনার আখড়া হয়ে উঠেছে। খোলাবাজারে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে শিক্ষা। লোহাকারবারি, তেল কারবারিরা স্যুট পরে স্কুল-কলেজের ব্যবসা ফেঁদে বসছে, আপনার এলাকাতেও বসছে, সুদূর অন্ধ্র প্রদেশেও একই চিত্র। প্রতিদিন সরকারি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ কমছে। ইউ জি সি-র ওয়েবসাইটে হঠাৎ ভাসিয়ে দিল ‘Some inputs for Draft National Education Policy, 2016’। শিক্ষার ভবিষ্যতের এই ফ্রেমওয়ার্কে দেখা যাচ্ছে — একদিকে বলা হচ্ছে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সুযোগ বাড়ানো হবে, কারিগরি ও প্রফেসনাল শিক্ষার ক্ষেত্রেও। ঐ বিলেই বলছে সরকার নতুন শাখা খুলতে অক্ষম কারণ অর্থের জোগান নেই, এ ধরনের প্রবঞ্চনা, সাজানো প্রতিশ্রুতি মিলছে এই সময়ে এই সরকারের থেকে।

শিক্ষাকে সওদা করার এবং সঙ্কুচিত করার খুড়োর কল এই নয়া শিক্ষা বিল নয়া উদারনীতির পদলেহনকারী এই বি জে পি সরকার তৈরি করছে। পিছিয়ে পড়া অংশের মেধাবী ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার সুযোগকে শুধুমাত্র শিক্ষানীতি দিয়ে নয় রাজনৈতিকভাবে আর এস এস-এর অঙ্গুলি হেলনে প্রতিমুহূর্তে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা। রোহিত ভেমুলার পরিণতি শিখিয়েছে যে, এই শিক্ষা কাঠামোয় ব্রাহ্মণ্যবাদ, মনুবাদকে রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রয়োগ করার নোংরা খেলা চলছে নাগপুরের দপ্তর থেকে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনকে ‘দেশদ্রোহীতার’ তকমা দেওয়া নিয়ে শুরু করে হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃশংস রাষ্ট্রীয় আক্রমণ আপনার মনে তো পরিষ্কার করে রাষ্ট্রের উলঙ্গ ফ্যাসিবাদী ঝোঁকের চিত্রটাই।

রোহিতের মৃত্যু দেশের কোণায় কোণায় দলিত সংখ্যালঘু ছাত্রছাত্রীদের উপর যে প্রতিবন্ধকতা শিক্ষার পরিসরে এই সরকার তৈরি করেছে তার প্রতিবাদেই তো এস এফ আই অভিমুখটা রাজধানীর দিকে নির্ধারণ করেছে। রাজধানীতে প্রতিদিন মিছিল চলছে ‘নাজিব কোথায়’, ‘উচ্চশিক্ষায় পিছিয়ে পড়া অংশের মেধাবীদের সুযোগ কোথায় দাবি নিয়ে। গোটা দেশের কোণায় কোণায় মিছিল চলছে ‘নাজিব কোথায়’? ‘রোহিত থেকে সুদীপ্ত জবাব চাই’। প্রতিটা মিছিলে, ঐক্যবদ্ধ লড়াইতে, গণতন্ত্রের লড়াইতে, সামগ্রিক ন্যায়বিচারের লড়াইতে রাষ্ট্র ভয়ংকর আক্রমণ নামিয়ে আনছে। তাই তো, এস এফ আই সব মিছিলের অভিমুখ নির্ধারণ করেছে রাজধানীতে। এবার শাসকের দেখার পালা যে, সব মিছিল যখন রাজধানীর রাস্তাজুড়ে মহাসমুদ্রের আকার নেয় এবং ‘মিছিল’ হয়ে ওঠে তখন অবাধ্যতার চেহারা কতটা ভয়ংকর হয়, যৌবনের চেহারা কতটা উদ্ধত হয়। রাষ্ট্রের ঔদ্ধত্য যদি রোহিতের প্রাণ কাড়তে পারে। নাজিবের মায়ের বুকের হাহাকারে দাঁড়িয়েও উল্লাস করে ডিমানিটাইজেশনোর মতো মানুষ মারার ষড়যন্ত্রের, তাহলে সজোরে ধাক্কা দেওয়াটা এস এফ আই-র কর্তব্য।

এখনও নাজিব ঘরে ফেরেনি, রোহিতের বিচার হয়নি, এবার আপনার অভিমুখ নির্ধারণের পালা। পক্ষ নির্বাচন করুন, কারণ এস এফ আই ‘প্রতিশ্রুতি’ নয়, কলম তুলে দেওয়ার জন্য ঐক্যবদ্ধ। বসন্তের মিছিল প্রতিটা বেঞ্চে বেঞ্চে বার্তা দেবে ‘জিনা হ্যায় তো মরনা শিখো/ কদম কদম পে লড়না শিখো।’

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement