গুরমেহর ও সেওয়াগ

প্রশান্ত দাস

৫ মার্চ, ২০১৭

ক্রিকেটার বীরেন্দ্র সেওয়াগ সফল। আবার ব্যর্থও। ব্যাট হাতে নামলে তাঁর ব্যাট ঝড় তুলতো। ঠিক। মাঝে মাঝে দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে চলতো। যখন সাবধানী হওয়া উচিত, পরিস্থিতি অনুযায়ী সংবেদনশীল হওয়া উচিত, তখনও বেপরোয়া ছিলেন।

সম্প্রতি সেই বেপরোয়াভাব আরেকবার প্রকাশ পেল। এবার আরও কদর্যরূপে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের রামজাস কলেজে আর এস এসের ছাত্র শাখা এ বি ভি পি’র হামলা, মারধরের বিরুদ্ধে শিরদাড়া সোজা করে দাঁড়িয়েছিলেন গুরমেহর কৌর। প্রকাশ্যে বলার সাহস দেখিয়েছিলেন : ‘‘আমি এ বি ভি পি’কে ভয় পাই না।’’ তাতেই বেজায় ক্ষিপ্ত গেরুয়া বাহিনী এক বছর আগে গুরমেহরের পোস্ট করা একটি ভি ডি ও নিয়ে হই চই শুরু করে। কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করে গুরমেহরকে। ১৯৯৯সালে মাত্র দুই বছর বয়সে কারগিল সংঘর্ষে নিজের সৈনিক বাবা মনদীপ সিংকে হারিয়েছিলেন গুরমেহর। যুদ্ধের ভয়াবহতা কি তা পিতৃহারা মেয়ের জানা। কারা যুদ্ধের জিগির তোলে, কারাই বা এর ফল ভোগ করে, প্রত্যক্ষ করেছেন বছর কুড়ির গুরমেহর।

অনেক চিন্তনের পর যুদ্ধ থামানোর আবেদন করেছিলেন ভারত-পাকিস্তানের সরকারের কাছে। লিখেছিলেন, যদি দুটি বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্স ও জার্মানি একে অপরের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে পারে, যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান পরস্পরের বন্ধু হতে পারে তাহলে কেন ভারত-পাকিস্তান বন্ধু হতে পারবে না! দু’দেশের মানুষই তো শান্তি চায়। আর সেই পরিপ্রেক্ষিতেই লিখেছিলেন : ‘‘পাকিস্তান আমার বাবাকে মারেনি। যুদ্ধ হত্যা করেছে।’’

এই ছোট্ট দুটি লাইনই বিতর্কের বিষয় হয়ে যায়। সবার আগে ‘ব্যাট’ উচিয়ে রে রে করে ওঠেন বীরেন্দ্র সেওয়াগ। কড়া সমালোচনা নয় শ্লেষ করেন সেওয়াগ। ঠাট্টা করেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় গুরমেহরকে নকল করে পোস্ট করেন, ‘আমিও দুটি ত্রি-শতরান করিনি। আমার ব্যাট করেছে।’ গুরমেহর কৌরের বার্তাকে বিদ্রূপ করে তাঁকে ‘দেশদ্রোহী’র পর্যায়ে ফেলার চেষ্টা করেছে। একজন সাধারণ নাগরিকের কথায় যত সংখ্যক মানুষ উদ্বুদ্ধ হন, একজন ‘আইকন’ বা তারকার কথায় প্রভাবিত হয় তার কয়েকগুণ বেশি মানুষ। অথচ সেওয়াগ সেই ভুলটাই করেছেন। সংবেদনশীলহীনতার নজির গড়েছেন। যে কোনো খেলাধুলা একজনকে সংবদেনশীল, সহমর্মী, অপরের দৃষ্টিভঙ্গীকে সম্মান জানানোর পাঠ দেয়। কিন্তু সেওয়াগের বার্তায় সেই ‘স্পোর্টসম্যানশিপ’ ব্যপারটাই নেই।

প্রশ্ন হচ্ছে কেন নেই! গুরমেহর তো আর সেওয়াগের পাকা ধানে মই দিতে যায়নি। সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলেই আওয়াজ তুলেছেন। তাহলে সেওয়াগের সমস্যা কোথায়! ঠিক সমস্যাও নয়। সেওয়াগ আসলে তাঁর ট্যুইট বিক্রি করেন। মজার ছলে অন্যকে হেয় করার প্রবণতাই বেশি। যে কোনো ম্যাচের হিন্দি ধারাভাষ্য শুনলেই তা স্পষ্ট। সোয়েব আখতারকে স্টুডিওতে ঠারে ঠোরে অনেক কথাই শোনান। গত এক মরশুমে তাঁর টুইট থেকে আয় হয়েছে তিরিশ লক্ষ টাকা। ১৪০ অক্ষরের টুইট নয়। ব্যবসা বাড়ানোর জন্য ইউটিউবেও চালু করেছেন ‘বীরুকে ফান্ডে।’

ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পর নিজের একটি স্কুল খুলেছেন সেওয়াগ। দ্বিতীয়বার ত্রিশতরান করার পর হরিয়ানার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ভূপিন্দর সিং হুডা গুরুগ্রাম-ঝজ্ঝর হাইওয়ের পাশে ৪০ একর জমি দিয়েছিলেন। তারপরেও টুকিটাকি উপঢৌকন পাওয়ার অন্ত নেই। আর যদি সরকারের নেক নজরে থাকা যায় তাহলে তো কথাই নেই। সেই মোদী সরকারের নেক নজরে থাকার কাজটিই করছেন সেওয়াগ। নিজের একটি ক্রিকেট ইনিংসের সঙ্গে যুদ্ধের তুলনা করেছেন। সারা ভারত জুড়ে যে সমস্যা রগরগে ক্ষতে পরিণত হয়েছে তাতেই জল দিয়ে যাচ্ছেন। বীরেন্দ্র সেওয়াগের টুইটার চালানের দায়িত্বে যে অমৃতাংশু নামের একজন রয়েছে, তাঁর টুইটারে নরেন্দ্র মোদীর ‘৫৬ ইঞ্চির সিনার’ ভূয়সী প্রশংসা ছড়িয়ে রয়েছে। তাই বীরেন্দ্র সেওয়াগের টুইটারে বা কথায় যে চাটুকারিতা থাকবে না এটা একপ্রকার অসম্ভব।

গুরমেহরের সমর্থনে অনেকেই সরব হয়েছে। প্রাক্তন সেনা জওয়ানরাও গুরমেহরের সাহসের প্রশংসা করেছেন। এর পরেও কিন্তু প্রাণনাশের হুমকি যেমন দেওয়া হয়েছে, ধর্ষণের হুমকিও দিয়েছে ‘দেশ ভক্ত’ সঙ্ঘীরা। সেওয়াগ ও সঙ্ঘীদের সঙ্গেই যোগ দিয়েছেন ববিতা ফোগট, যোগেশ্বর দত্তের মতো খেলোয়াড়রাও।

অথচ গুরমেহরের কথা বুঝতে পেরে, পাকিস্তানের যুদ্ধ বিধ্বস্ত সোয়াত উপত্যকা থেকে ফৈয়জ খান নামের এক তরুণ ইউটিউবে পোস্ট করেছিলেন, ‘‘বাবার ভালোবাসা আমি দিতে পারবো না কিন্তু ‘দুশমন দেশ’ থেকে একজন ভাই পেলে তুমি।’’ যা সেওয়াগরা পাশে থেকেও বুঝে উঠতে পারেননি।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement