সিংহের ইতিহাস গড়েছিল যারা

সৃজন ভট্টাচার্য

৫ মার্চ, ২০১৭

ভারতবর্ষ বহুত্বের দেশ। বিবিধের মাঝে তার মিলন মহান।

এতরকম ভাষা, সংস্কৃতি, জাতি, ধর্মের মিশেলে তৈরি আমাদের সমাজ। বিগত তিন-সাড়ে তিন হাজার বছরে তার নিজস্ব বহুমুখীনতায় মিশেছে আর্য, তুর্কি-পাঠান-মোঘল বা তারও পরে ওলন্দাজ-পর্তুগিজ-ফরাসি এবং অবশ্যই ‍‌ ইংরেজি সংস্কৃতির স্রোত, যা তার বৈচিত্র্যের সম্ভার বাড়িয়েছে বহুগুণ। এমনই দেশের এক বড় অংশের মানুষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। জাতপাত, বর্ণভেদপ্রথা ইত্যাদির প্রচলনও হয়ে এসেছে সহস্রাধিক বছরকাল ধরে। শাসকের শ্রমবিভাগের পুরানো কায়দা—ধর্মের নামে, ঈশ্বরের নামে ভুখা মানুষকে বোকা বানিয়ে রাখা, এ চলে এসেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পরম্পরায়। যাকে আমরা জাত ব্যবস্থা বলি, তার শেকড় ছড়িয়ে আছে ভারতের সমাজ-জনমনের গভীরে।

তবে জাতপাতের বিরুদ্ধে লড়াইটাও নেহাত কম হয়নি আমাদের ইতিহাসে। সুদূর মহাভারতে একলব্যের কাহিনী থেকে আজকের রোহিত ভেমুলা বা উনা- ইতিহাসেও বারবার নিজেদের দমেই জায়গা করে নিয়েছে সিংহরা। উত্তর ভারতের মতো দক্ষিণেও প্রসার ঘটছে জাতপাত-বিরোধী বিভিন্ন আন্দোলনের। মহারাষ্ট্রে জ্যোতিরাও-সাবিত্রীবাঈ ফুলে বা মহাদেব গোবিন্দ রাণাডের মতো মানুষই শুধু নন, ব্রাহ্মণ্যবাদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন কেরালার শ্রীনারায়ণ গুরু থেকে দাক্ষিণাত্যের ‘পেরিয়ার’ বা মহর্ষি রামস্বামী নাইয়ারের মতো সমাজ সংস্কারকরাও। তবে নিজেদের বক্তব্যকে এঁরা মূলত সামাজিক শোষণের বিরুদ্ধাচরণেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন, তাকে শ্রেণি সংগ্রামের সাথে যুক্ত করার প্রসঙ্গে বিশেষ ভূমিকা পালন করেননি। যাইহোক, তা সত্ত্বেও সামাজিক শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইটা বারংবার হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রান্তিক শোষিত মানুষের সঙ্গে ক্ষমতাবলে শাসকের লড়াই।

আজকের আলোচনা দক্ষিণ ভারতের এমনই এক বিদ্রোহের ঘটনা নিয়ে। চান্নার বিদ্রোহ। পাঠকের নিশ্চয়ই মনে আছে কেরালা-তামিলনাডু অঞ্চলের কুৎসিত ‘ব্রেস্ট ট্যাক্স-এর কথা। তার বিরুদ্ধেই, প্রতিদিন শোষিত হতে থাকা মানুষের রূপকথাসম লড়াইয়ের গল্প, চান্নার বিদ্রোহ।

উনিশ শতকে ত্রিবাঙ্কুরের রাজার রাজত্বে নদর এবং এঝাভা জনগোষ্ঠীর মহিলাদের দেহের উপরিভাগ অনাবৃত রাখতে বাধ্য করা হতো। অব্রাহ্মণ হলেই তার জন্য বিধান ছিল ঊর্ধ্বাঙ্গ খোলা রাখা—এটা নাকি উঁচুজাতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের এক ভঙ্গিমা। নিচুজাতের মহিলাদের ভোগ করা থেকে তাদের শারীরিক নির্যাতন—সবই ছিল ‘সমাজসিদ্ধ’। কেউ যদি ঊর্ধ্বাঙ্গে পোশাক পরতে চাইত তবে তাকে আলাদা করে ‘ব্রেস্ট ট্যাক্স’ গুনতে হতো। তথাকথিত এই নিচুজাতের মানুষ ওই অঞ্চলে খ্রিস্টধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়েন। চার্চের ধর্মপ্রচারে ও প্রসারে সুবিধা হয় অনেক।

তবে সবাই এ জিনিস মেনে নেননি। নদর এবং এঝাভা সম্প্রদায়ের নারীরা রুখে দাঁড়ান এই প্রথার বিরুদ্ধে। ১৮১৩ সালে ব্রিটিশ দেওয়ান জন মানরো বিদ্রোহীদের অনুকূলে রায় দিলেও রাজসভার গোঁড়া পিণ্ডকারদের আপত্তিতে তা আটকে যায়। ‘অবর্ণ’ বা অস্পৃশ্যদের থেকে অজস্র অন্যায় কর আদায় করত রাষ্ট্র, যা মূলত জমা হতো পদ্মনাভ মন্দিরে। এর প্রতিবাদে নতুন করে আওয়াজ তোলেন তথাকথিত অবর্ণ মহিলারা। কথিত আছে অধুনা কেরালার আলাপুঝা জেলার চেরথালা গ্রামে নাঙ্গেলি নামে এক এঝাভা মহিলা নিজের স্তন কেটে ফেলেন সর্বসমক্ষে এই জঘন্য ‘মুল্লাক্কারাম’ বা ‘ব্রেস্ট ট্যাক্স’ -এর প্রতিবাদ স্বরূপ। প্রচুর রক্তক্ষরণে নাঙ্গেলির মৃত্যু হয় এবং মানুষের চরম প্রতিক্রিয়ার মুখে দাঁড়িয়ে ত্রিবাঙ্কুরের রাজা অবশেষে বাধ্য হন এই অন্যায় করপ্রথা তুলে দিতে। তবে এই লড়াই সহজ ছিল না খুব। ব্রাহ্মণ্যধর্মের ভাগাভাগিতে নিমজ্জিত সমাজে বারবার আক্রমণ এসেছে—কখনো নদর বা এঝাভা সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি বা চার্চ পুড়িয়ে, কখনো বা ১৮২৯ সালে রানির নোটিস জারি করে, যার মূল কথা, কিছুতেই অস্পৃশ্য নিচুজাতের মহিলাদের ঊর্ধ্বাঙ্গ আবৃত করতে দেওয়া চলবে না। অবশেষে ১৮৫৯ সালে মাদ্রাজের গভর্নর চার্লস ট্রেভেলিয়ানের চাপে ত্রিবাঙ্কুরের রাজা বাধ্য হন নদর এবং এঝাভার মতো পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের নারীদের দেহের উপরাংশ আবৃত রাখার অধিকার দিতে। তবুও খ্রিস্টধর্মে রূপান্তরিতদের মতো করে জ্যাকেটের মতো ‘কুপ্পায়াম’ পরার অধিকার মেলে প্রথমে, উচ্চবর্ণের মহিলাদের মতো করেই পোশাক-আশাক পরার অধিকার ছিনিয়ে আনতে লড়তে হয়েছে আরো বহু। ইতিহাস এই বিদ্রোহকে মনে রেখেছে ‘চান্নার লহলা’ বা ‘মারু মারাক্কেল সমরম’ নামে।

তবে ইতিহাস শুধু মনে রাখলেই তো হলো না। ইতিহাসের বইয়ের ওপরেও কিঞ্চিৎ এই ঘটনাগুলিকে মনে রাখার দায়িত্ব বর্তায়। আর সেখানেই বেধেছে সাম্প্রতিক বিতর্ক। মাদ্রাজ হাইকোর্টের নির্দেশানুসারে ‘অবজেকশনেবল কনটেন্ট’ বা আপত্তিকর অংশ সিলেবাস থেকে সরাতে গিয়ে সি বি এস ই এই চান্নার বিদ্রোহের গোটা অধ্যায়টাই তার নবম শ্রেণির পাঠ্যবই থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছে। ‘জাত, সংঘর্ষ এবং পোশাক পরিবর্তন’ শিরোনামে ইতিহাসের এই অংশটি পডানো হতো প্রায় ১৫টি রাজ্যে, যারা সি বি এস ই-র পাঠ্যপুস্তক ব্যবহার করে। সম্পূর্ণ মৌলিক তথ্যের অভাবের ফলেই, একথা ঠিক যে, দক্ষিণ ভারতের ইতিহাসে এই ঘটনাক্রম সম্পর্কে প্রচুর ধোঁয়াশাও রয়েছে। এর আগে প্রয়াত জয়ললিতাও আপত্তি জানিয়েছিলেন এই মর্মে যে, সিলেবাসে নদরদের ‘পরিযায়ী’ বলে অভিহিত করা হয়েছে, যা আদতে ছাত্রদের কাছে ভুলবার্তা পৌঁছে দিতে পারে ওই সম্প্রদায় সম্বন্ধে। এ প্রশ্ন স্বভাবতই উঠছে, আরো নির্ভুল তথ্যসমৃদ্ধ ইতিহাসবীক্ষা ছাত্রদের মনে গড়ার প্রচেষ্টা না করে বিতর্কিত অংশ দেখলেই তাকে সরাসরি পাঠক্রম থেকে বাদ দিয়ে দেওয়ার রাস্তাটা আদৌ যুক্তিযুক্ত কিনা।

নিজেদের অতীতকে গৌরবোজ্জ্বল করে দেখাতে গিয়ে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক-মোড় মুছে ফেলছি আমরা, আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আই আই টি মাদ্রাজের সহকারী অধ্যাপক আর সন্তোষ। তিরুবনন্তপূরম সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের ইতিহাসবিদ জে দেবিকা আলোকপাত করেছেন নদরদেরই উপর। নিজেদের প্রান্তিকতার, অস্পৃশ্যতার শিকার হবার অতীতকে সচেতনভাবেই সামনে আনতে অস্বস্তিবোধ করেন ওই সম্প্রদায়েরই কিছু অংশ, যা দেবিকার মতে খুবই দুর্ভাগ্যজনক কারণ নদরদের লড়াই শুধুমাত্র রাজার বিরুদ্ধে ছিল না, তা ছিল ব্রিটিশবিরোধীও বটে এবং সামগ্রিকভাবে ইতিহাসের চাকা সামনে ঘোরানোর লড়াই। অতীতের তথ্য সম্পর্কে আরো সাবধানী হয়েই আগামী প্রজন্মের কাছে সমস্ত মতামতকেই তুলে ধরার পক্ষে জোরদার সওয়াল করেছেন নেট দুনিয়ার পরিচিত নিউজ প্ল্যাটফর্ম –‘ইন্ডিয়া রেসিস্ট’-এর এডিটোরিয়াল কো-অর্ডিনেটর অমৃতরাজ স্টিফেনও। নাহলে নদরদের মত ঐতিহাসিকভাবেই পশ্চাৎপদ সম্প্রদায়েরা আরো গভীর অস্তিত্ব সংকটে পড়বে বলে তাঁর অভিমত।

দেশজুড়ে আসলে চলছে ভারতের ইতিহাসকে হিন্দুত্বের ইতিহাসে পরিণত করার চেষ্টা। পুষ্পক রথকে এরোপ্লেন বানানো বা গণেশকে প্লাস্টিক সার্জারির নমুনা হিসেবে পেশ করার প্রাণপণ চেষ্টা আসলে এই প্রচারেরই অংশ। গৌরবময় স্বর্ণযুগের গল্প ঘরে ঘরে ছড়িয়ে দিতে পারলে, আগামী প্রজন্মের মগজে জোর করে খুঁজে দিতে পারলে তবেই প্রশস্ত হবে চরম দক্ষিণপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিষ ছড়ানোর জমি। সেজন্য অতীত ভুলিয়ে দিতে হবে। ভুলিয়ে দিতে হবে বাল্যবিবাহ থেকে রূপ কানোয়ার। ভুলিয়ে দিতে হবে বর্ণাশ্রম প্রথার নিপীড়ন। সব দোষ চাপিয়ে দিতে হবে মধ্যযুগের ইসলামীয় শাসকদের উপর। ব্রাহ্মণ্যধর্মের জগদ্দল পাথর ভেঙে, চরম শক্তিশালী জাতপাত প্রথার বিরুদ্ধে, সামাজিক শোষণের সমস্ত ফরমুলাকে হাতেকলমে জিইয়ে রাখা প্রতিষ্ঠানের বিপরীত স্রোতে জানকবুল সাঁতার কেটেই যে এগোতে হয়েছে নাঙ্গেলিদের, একথা মনে রাখা যাবে না। মনে রাখলেই তোমার চেয়ে বড় দেশদ্রোহী আর কেউ হতে পারে না।

সি বি এস ই-র এই সিদ্ধান্ত দুর্ভাগ্যজনক। এর ফলে ব্রাহ্মণ্যবাদের উত্থান যে শুধু সহজ হবে তাই নয়, তথাকথিত অস্পৃশ্য ও নিচুজাতের মানুষের লড়াইও বাধাপ্রাপ্ত হবে, হতাশ হবে কিঞ্চিৎ। এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে চান্নার বিদ্রোহকে সিলেবাসে ফিরিয়ে আনা হোক। বহুত্বের দেশ ভারত, তার প্রতিটি অংশের লড়াইকে স্বীকৃতি দেওয়াই হবে তার বহুমাত্রিকতার প্রতি যথাযথ মর্যাদা দেওয়া। তা না করলে? তবুও নাঙ্গেলিরা থাকবেন। অবিরাম যাত্রার চিরসংঘর্ষেই তাঁদের দেখা যাবে ভিড়ের মাঝে। সিংহের ইতিহাসে তাঁদের নামেই নামকরণ হবে অধ্যায়ের। শিকারীদের সেদিন হাত কামড়ানো ছাড়া বিশেষ কিছুই করার থাকবে না।

Featured Posts

Advertisement