ন্যায্য দাবি লড়েই নেব

ইন্দ্রজিৎ ঘোষ

৫ মার্চ, ২০১৭

সকলের জন্য শিক্ষা এবং শিক্ষান্তে কাজের অধিকার, এই দাবি আমাদের। এস এফ আই, ডি ওয়াই এফ আই এই দা‍বি নিয়ে সর্বদা লড়াই করে। কোথাও এর অন্যথা হলে আমরা সর্বশক্তি দিয়ে এই অধিকার অর্জনের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ি।

রাজ্যে তৃণমূল সরকার শিক্ষক নিয়োগে ব্যাপক অনি‌য়‌ম বেনিয়ম করছে। এই নিয়ে গোটা রাজ্য ব্যাপক সরগরম। মেধা তালিকা প্রকাশ করছে না। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সংরক্ষণের নিয়ম ১০০%রোস্টার মানছে না। চাকরি পাওয়ার পর নদীয়া জেলার ৪৩ জনের চাকরি বাতিল করেছে। ব্যাপক স্বজনপোষণ দুর্নীতির অভি‍‌যোগ। ময়নাগুড়ির বিধায়কের বাড়ির একাধিক ব্যক্তি চাকরি পেয়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুরের প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের চেয়ারম্যানের আত্মীয়রা চাকরি পেয়ে‌ছে। সাধারণ পরীক্ষার্থীদের বলা হচ্ছে একজামটেড ক্যাটাগরি — তাদের প্রমাণ‍‌পত্র দেখাতে বলা হচ্ছে — তারা পারছে না — পাশ করার পরও তারা নিয়োগপত্র পাচ্ছে না। আদালত বলে দিয়েছিল আগে প্রশিক্ষণ প্রার্থীরা সু‍‌যোগ পাবে তারপর শূন্য পদ থাকলে সেখানে প্রশিক্ষণহীনরা সু‍‌যোগ পাবে কিন্তু এখনো ১২০০ এর বেশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নিয়োগপত্র পেলো না — অথচ প্রশিক্ষণহীনরা নিয়োগ‍‌পত্র পেয়েছেন। সাধারণ পরীক্ষার্থীদের বলা হচ্ছে পার্শ্বশিক্ষক হিসাবে শিক্ষকতা করতে যা সংবিধান বিরুদ্ধ।—সারা রাজ্যজুড়ে একাধিক বিশৃঙ্খলা এবং বিক্ষোভের ঘটনা উঠে আসছে।

এখন প্রশ্ন হলো কেন এই বিশৃঙ্খলা এবং তার উৎসমুখ কোথায় ? তৃণমূল সরকার আসার আগে এমন অভিযোগ আসতো না কেন ? তৃণমূল সরকার আসার আগে ২০০৯ সালেও এন সি টি ই-র নিয়ম মেনে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ হয়েছি‍ল — সেই বার শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়ার মূল দায়িত্ব ছিল—জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের হাতে।

২০০৯সালে শিক্ষক নিয়োগের পদ্ধতি ছিল মাধ্যমিকের নম্বর আর প্রাথমিকের শিক্ষক-শিক্ষণ বা পি টি টি আই এর উপর মূল্যমান বা ওয়ে‍টেজ ধরা হ‍‌য়েছিলো যথাক্রমে ৬৫ও ২২ নম্বর। লিখিত পরীক্ষা ছিলো ১০নম্বরের আর ৩নম্বর ছিলো অতিরিক্ত কর্মকুশলতার জন্য। কো‍নো মৌখিক পরীক্ষা ছিলো না। ফলত যাদের মাধ্যমিকে স্টার মার্কস ছিলো আর শিক্ষক-শিক্ষণ (প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত) ছিলেন তাদের প্রাথমিকে নিয়োগ পেতে কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু তৃণমূল সরকার আসার পর নিয়োগ প্রক্রিয়াতে রদবদল ঘটা‍‌‍ল। বর্তমানে পদ্ধতিটি হলো ‍‌শিক্ষাগত যোগ্যতা মাধ্যমিকের ৩০, প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত-৫,লিখিত পরীক্ষা ৪৫ আর মৌখিক পরীক্ষা -২০।

ফলত, মেধা তালিকায় যোগ্যতাসম্পন্ন অনেকেই বাদ পড়ে শাসকদলের পছন্দমত ব্যক্তিরা অর্থের আনুকূল্যে স্থান পাওয়া ‍নিশ্চিত করছেন। বঞ্চিত হচ্ছে মেধাসম্পন্ন যোগ্যতাসম্পন্ন যুবক-যুবতীরা।

দ্বিতীয় বড় গোলযোগের স্থান হলো—বামফ্রন্ট সরকার ‍‌শিক্ষক নিয়ো‍‌গের স্বচ্ছতার জন্য পৃথক —স্বাধীন স্বশাসিত সংস্থা তৈরি করেছিলো স্কুল সার্ভিস কমিশন (এস এস সি)। এবং প্রাথমিকের শিক্ষক ‍নিয়ো‍গের দায়িত্ব ছিলো স্বাধীনভাবে জেলা বিদ্যালয় শিক্ষা সংসদগুলির উপর — জেলা বিদ্যালয় সংসদগুলির উপর সরকারি হস্তক্ষেপ ছিলো না। কিন্তু তৃণমূল সরকার আসার পর স্বাধীন স্বশাসিত সংস্থা এস এস সি‍-কে রাজ্য সরকারের শিক্ষাদপ্তরের অধীনে নিয়ে আ‍‌সে। তার স্বাধীনতা-কে খর্ব করে। তারপর প্রাথমিকে নিয়োগের ভার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের থেকে সরিয়ে কেন্দ্রীয়ভা‍‌বে প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের অধীনে নিয়ে আসে। এবং শাসকদলের বশংবদ লোকেদের দ্বারা সেটিকে পরিচালিত করতে শুরু করে। সরাসরি শাসকদলের মদতে তৈরি হয় নিয়োগের পদ্ধতি। ২০১৩ সালের নিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছিলাম শাসকদলের বিধায়করা নি‍জেদের প্যাডে তার এলাকার তৃণমূল কর্মীদের নাম‍ লিখে পাঠিয়ে তাদের চাকরি দিয়েছিলো। দেখেছিলাম আরাবুল ইসলামের ছেলে, অনুব্রত মণ্ডলের মেয়ে সবাই চাকরি পেয়েছিলো। কালনার তৎকালীন বিধায়ক বিশ্বজিৎ কুণ্ডু তার বাড়ির ৬ জন চাকরি পেয়েছিল। সার্বিক একটা স্বজনপোষণের ছবি উঠে এসেছি‍‍‍‍‌লো। সারা বাংলা জুড়ে একটাই কথা ছিলো — ‘‘টেটে সেটিং হয়েছে’’।

আর এবারের পরীক্ষার কথা ঘোষণা করা‍ হয়েছিলো ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। তখন থেকে পাড়ায় পাড়ায় টাকা তোলা শুরু হয়েছিল।— প্রথমে ঘোষণা করা হয়েছিলো — ৩০শে আগস্ট ২০১৫তে পরীক্ষা হবে— কিন্তু ২৭শে আগস্ট ২০১৫ বাসের জানালা দিয়ে প্রশ্নপত্র পালিয়ে যায়। ফলত ৩০শে আগস্ট পরীক্ষা বাতিল। এরপর ১১ই অক্টোবর পরীক্ষা নেওয়া হয় সেই দিনও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস হয়। অভিযোগ লক্ষ লক্ষ টাকার বিনি‌ময়ে প্রশ্নপত্র বিক্রি করা হয়েছে। গড়িয়াহাট থানায় এফ আই আর হয়। এখনো আদালতে মামলা বিচারাধীন। এরপর প্রায় ১বছর পর আদালতের নির্দেশে ফল ঘোষণা করা হ‍‍‌লেও প্যানেল ‍‌তৈরি করে নিয়োগ করা হচ্ছিল না। গত ৩০শে জানুয়ারি বলা হলো ১১হাজার ৩০০জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্তকে ‍‌নিয়োগ করা হবে। পরে ৭ই‍‌ ফেব্রুয়ারি বলা হলো যারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন, তাদেরও নিয়োগ‍ করা হবে। কিন্তু বেনজিরভাবে ওয়েবসাইটে বা পর্ষদের অফিসে কোনো তালিকা নেই। এস এ‌‌ম এস করে সফল চাকরি প্রার্থীদের ডাকা হচ্ছে। চাকরি প্রার্থীরা কাউন্সে‍লিংয়ে গি‍য়ে জানতে পারছেন সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ১০০% রোস্টার এর নিয়‌ম মানা হচ্ছে না। সাধারণ পরীক্ষার্থী তা‍‌দের এস এ‌ম এস করে ডেকে বলা হচ্ছে পার্শ্বশিক্ষক হিসাবে শিক্ষকতা করতে হবে। কাউকে বলা হ‍‌চ্ছে একজামটেড ক্যাটাগরি (প্রাক্তন সেনা ইত্যাদি)।

এত গেল প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগের বিষয়। পঞ্চম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষক নি‍‍য়োগের আপার প্রাইমারির ফল প্রকাশ হয়েছে গত ১৪ই সেপ্টেম্বর ২০১৬, এখনো তাদের ইন্টারভিউ শুরু করেনি।

নবম, দশম ও একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা এস এল এস টি- এর ফলপ্রকাশ আদালতের নির্দেশে স্থগিতাদেশ বহাল আছে। ফলত, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষকের অপ্রতুলতা চলছেই। রাজ্য সরকারের সরকারি স্কুল ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলিতে শিক্ষার সর্বনাশ ডেকে আনছে। এবং শিক্ষার বেসরকারিকরণের পথ প্রশস্ত করছে। বেসরকারি স্কুলগুলিকে শিক্ষাকে পণ্য করার সু‍যো‍‌গ বৃদ্ধি করছে।— হয়তো অদূর ভবিষ্যতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে আমরা দেখবো যে বেসরকারি স্কুলগুলির মালিকদের নিয়ে টাউন হলে সভা করছেন। টাকা না দিলে ভালো ছাত্রছাত্রীদের মার্কশিট আটকানো হবে। তখন আবার কো‍নো জেল ফেরত নেতা হয়তো টিভির পর্দায় রক্ষচক্ষু নিয়ে ভাষণ দেবে।

আমদের রাজ্যে শিক্ষার এই হাল নিয়ে এস এফ আই, ডি ওয়াই এফ আই চুপচাপ বসে থাকবে না। শিক্ষা আমাদের জন্মগত অধিকার। সংবিধান‍‌ প্রদত্ত অধিকার। আমরা লড়াই লড়ছি। ‍‌শিক্ষক নিয়োগের দাবি নিয়ে আমরা‍ দীর্ঘ লড়াই লড়ছি। যে দিন থেকে এই রাজ্য সরকার এই গোলো‍‌যোগ তৈরি করছে সেই দিন থেকে আমরা রাস্তায় নেমে লড়াই করছি।

চাকরি না পেয়ে প্যানেলে থাকা যুবক-যুবতীরা যখন আন্দোলন করেছে আমরা তাদের পাশে থেকেছি। মি‍‌ছিল, ‍বিক্ষোভ, রাজভবন অভিযান — আমরা করেছি। হজম করেছি পুলিশের লাঠি।

আমাদের আন্দোলনের চাপে পরীক্ষা নিতে বাধ্য হয়েছে। আমাদের আন্দোলনের চাপে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পুনঃনি‍‌য়োগের সার্কুলার প্রত্যাহার কর‍‌তে বাধ্য হ‍‌য়েছে।

এবা‍‌রের এই দুর্নীতি সামনে আসার সাথে সাথে আমা‍দের বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছে সারা রাজ্য। গত ২০শে ফেব্রুয়ারি সারা রাজ্যের ৮৮টি স্থানে পথ অবরোধ হয়েছে। গত ২৭ ও ২৮শে ফেব্রুয়ারি রা‍জ্যের সমস্ত ডি পি এস সি অফিসে আমাদের বিক্ষোভের ঢেউ উত্তাল হয়ে‍‌ছে। সারা রাজ্যে সাধারণ মানুষের কাছে আমরা সই সংগ্রহ করেছি। আগামী ৯ই মার্চ আবার উত্তাল হবে কলকাতার রাজপথ। আমরা এই অন্যায় কো‍‌নো ভাবে মেনে নেবো না। আমাদের ন্যায্য দাবি আমরা লড়েই আদায় করবো। সকলের কাছে আমাদের অনুরোধ আসুন শিক্ষাকে বাঁচাই, বাংলাকে বাঁচাই।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement