রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে কেন্দ্র

দীপন মিত্র

২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

এক অভূতপূর্ব কর্মবিরতি

এমন কথা বোধ হয় কখনো শোনা যায়নি যে একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের কর্মচারী ও আধিকারিকগণ গণছুটি নিয়ে ব্যাঙ্কের কাজকর্ম স্তব্ধ করে দিয়েছেন কেননা দেশের নির্বাচিত সরকার দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ককে ধ্বংস করছে। সত্যিই হুবহু এমনই ঘটল ১৯নভেম্বর ২০১৫ তারিখে এই দেশের বুকে। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সমস্ত কর্মচারী ও আধিকারিকরা এই কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ককে ধ্বংস করার অভিযোগে সেদিন গণছুটি নিলেন। গোটা দেশজুড়ে বিভিন্ন রাজ্যে অবস্থিত রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কার্যালয়গুলিতে এবং মুম্বাইয়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কাজ বন্ধ থাকল।

এই সংবাদ দেশের সমস্ত বড় বড় দৈনিকে, টিভি চ্যানেলে তো বটেই এমনকি বিদেশি মিডিয়াতেও গুরুত্ব দিয়ে প্রচারিত হলো। আসলে কর্মবিরতির কারণটাই আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে। সাধারণত এধরনের কর্মবিরতি কর্মচারীরা মাইনে বাড়ানোর জন্য বা অন্যান্য সুযোগসুবিধা আদায় করার জন্য করে থাকে। এইক্ষেত্রে নিজেদের সংস্থাকে সরকারি আক্রমণের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য এই লড়াই সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

পটভূমি

যেদিন থেকে ড. মনমোহন সিং ভারতে নয়া-অর্থনীতি চালু করেন সেই ১৯৯১ সালের পর থেকেই রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলির বেসরকারিকরণ শুরু হয়। মজার কথা হলো অন্যদিকে একইসঙ্গে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের “সরকারিকরণ”–এর অভিযানও শুরু হলো। এই সরকারিকরণের অবশ্য ধরনটা একটু ভিন্ন। এর ধরনটা হলো রিজার্ভ ব্যাঙ্কের স্বাধীনভাবে কাজকর্মের উপর বাড়তে থাকা সরাসরি সরকারি হস্তক্ষেপ। লক্ষ্য একই, আর্থিক ও ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রকে আরও উদার করা, যাতে বিদেশি পুঁজি সেখানে ঢুকতে পারে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক যেন সেখানে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।



রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাজকর্ম

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নামের সঙ্গে অনেকেই পরিচিত কিন্তু রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাজকর্ম বলতে তারা একটা কথাই জানে যে এই ব্যাঙ্কটিই টাকা পয়সা ছাপে। বস্তুত টাকা ছাপা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাজ না হলেও এটা সত্যি যে এই সংস্থাই টাকা পয়সা বাজারে ছাড়ে এবং তার হিসেব রাখে, অর্থাৎ দেশের বাজারে কত টাকা জোগান দেওয়া প্রয়োজন, কত টাকা চালু আছে, আবার ময়লা টাকা বাজার থেকে তুলে নিয়ে নতুন টাকা বাজারে ছাড়া ইত্যাদি।

কিন্তু এই কাজ বাদেও রিজার্ভ ব্যাঙ্ক দেশের অর্থনীতির পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলি কাজ কর্ম করে থাকে।

১. দেশের সমগ্র ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার জন্য নিয়মনীতি তৈরি করে এবং দেখে যে সত্যিই ব্যাঙ্কগুলি সেই বিধি নিয়ম মেনে চলছে কিনা। পারিভাষিক ভাষায় একে বলা হয় ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ করা ও তত্ত্বাবধান করা।

২. সমস্ত ব্যাঙ্ক, আর্থিক সংস্থা ও সরকারকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক হলো শেষ উৎস। অর্থাৎ কোন ব্যাঙ্ক যদি দেউলিয়া হওয়ার অবস্থায় আসে তখন রিজার্ভ ব্যাঙ্ক টাকা দিয়ে তাকে রক্ষা করে। ইংরেজিতে এই ভূমিকাকে বলা হয় লেন্ডার অফ দি লাস্ট রিসর্ট।

৩. রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সরকারের আর্থিক লেনদেনের হিসেব রাখে ও কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলির হয়ে ঋণ সংগ্রহ করে। একে বলে লোকঋণ অথবা পাবলিক ডেট।

৪. ব্যাঙ্কের ঋণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে, যেমন কৃষি, শিল্প, ক্ষুদ্রশিল্প, পরিবহণ, নির্মাণ ইত্যাদিতে কী পরিমাণে এবং সুদের কী হারে দেওয়া হবে তা ঠিক করে।

সবশেষে উল্লেখ করব কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক হিসেবে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দুটি কাজের কথা।

১. প্রথমটি বিদেশি মুদ্রা বিনিময় সংক্রান্ত কাজ। আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় টাকার মূল্য স্থিতিশীল রাখা, বিদেশি মুদ্রার আসা যাওয়ার উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা ইত্যাদি

২. দ্বিতীয়টি, দেশের মুদ্রানীতি নির্ধারণ করা। মুদ্রানীতি মানে ব্যাঙ্কঋণে সুদের হারের উপর নিয়ন্ত্রণের সাহায্যে বাজারে টাকার জোগান ঠিক করা যাতে জিনিসপত্রের বাজারদর স্থিতিশীল থাকে। অন্যভাবে বললে দেশের কারেন্সি বা টাকার মূল্য ঠিক রাখা, টাকার দাম (অর্থাৎ সুদের হার) স্থির করা এবং টাকার ক্রয়ক্ষমতা বজায় রাখা (অর্থাৎ মুদ্রাস্ফীতি রোধ করা)।

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাজকর্ম লক্ষ্য করলে দেখা যাচ্ছে তার মূল কাজ হলো দেশের টাকাকড়ি-কে (মুদ্রা-কে) কেন্দ্র করে। বলাবাহুল্য, এই মুদ্রা বা টাকাকড়িই বাজারি ব্যবস্থায় সমস্ত পণ্য, কাজকর্মের মূল্য নির্ধারণ করে এবং যেটি ছাড়া দেশ অচল। অতএব বোঝা যাচ্ছে এই কেন্দ্রীয় সংস্থাটির কাজ কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক-এর অবস্থান

আন্তর্জাতিক মহলে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক-এর সুনাম আছে। এর কারণ হলো এই সংস্থা বারংবার বিশ্বব্যাপী আর্থিক বিপর্যয়ের পরিস্থিতিতেও (১৯৯১, ১৯৯৭, ২০০৭-০৮, ২০১৩) ভারতীয় আর্থিক ও ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার গায়ে তার আঁচ পড়তে দেয়নি।

এই কাজ সে করতে সক্ষম হয় কেননা দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের চাপের মুখেও দীর্ঘদিন বিদেশি পুঁজির অবাধ বিনিয়োগে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক রাজি হয়নি, বিশেষত,শেয়ার (ইকুইটি) বাজারে বিদেশি স্বল্পমেয়াদি লগ্নির ক্ষেত্রে তো বটেই। আসলে দুনিয়ায় বিশেষ করে উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশগুলিতে অনেক ব্যক্তি বা আর্থিক সংস্থা আছে যাদের কাছে বিশাল পরিমাণের টাকা রয়েছে, এবং এরা কোনও শিল্পে বা উৎপাদনে টাকা লগ্নি করার পরিবর্তে নানা ধরনের ফাটকাবাজি কারবারে টাকা লগ্নি করে। এই সব বাজারগুলিতে লেনদেন করা বস্তুত এক ধরনের জুয়াখেলা। স্বভাবতই, এই ধরনের বিদেশি স্বল্পমেয়াদি লগ্নি (চালু কথায় যাকে বলা হয় গরম টাকা বা হট মানি) বিভিন্ন দেশে সুদের হারের তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ করে, মুনাফার হার দেখে বন্যার মতো বিনিয়োগ করে এবং পরিস্থিতির সামান্য হেরফের হওয়া মাত্রই বন্যার বেগেই বিদায় নেয় এবং ছেড়ে যাওয়া দেশটিকে রাতারাতি এক অভূতপূর্ব বিপর্যয়ের মধ্যে ঠেলে দিয়ে যায় (এখন অবশ্য শেয়ার বাজারে বা ইকুইটি বাজারে স্বল্পমেয়াদি লগ্নিকে বাধা দেওয়ার সেই ক্ষমতা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হাত থেকে জোর করে কেড়ে সরকার নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছে)।

একইভাবে কেন্দ্রীয় সরকার, মিডিয়ার একটা বড় অংশ, তামাম কর্পোরেট গোষ্ঠী, অর্থমন্ত্রক এমনকী স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর চাপের মুখে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক কিন্তু মুদ্রাস্ফীতির বৃদ্ধি রোধ করার প্রয়াসের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দীর্ঘদিন ব্যাঙ্কে সুদের হার কমাতে রাজি হয়নি (এই ক্ষমতাটিও সরকার এখন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের থেকে নিয়ে নেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে)। অর্থাৎ সরকার আর রিজার্ভ ব্যাঙ্কের দৃষ্টিভঙ্গিতে বেশ কিছু বিষয়ে পরিষ্কার মতান্তর আছে। উদার-অর্থনীতির যুগে আমেরিকাসহ উন্নত পশ্চিমি দেশের পুঁজির দাপট এবং বিশেষত বিকাশশীল অর্থনীতিতে তাঁদের ইচ্ছেমত প্রবেশ ও প্রস্থানে বাধা পড়লে স্বভাবতই তারা ছেড়ে দেবে না। এই অবস্থায় দেশের শাসকশ্রেণির উপর তারা চাপ দেবেই এবং উক্ত দেশের শাসকশ্রেণির পক্ষে নিরপেক্ষ থাকা সম্ভব নয়। অতএব বাধা হিসেবে কোন ব্যক্তি বা সংস্থা সামনে পড়লে তাকে ক্ষমতাহীন করা বা ধ্বংস করা সরকারের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াবে। আমাদের দেশের এন ডি এ সরকার আজ ঠিক এই কাজটিই করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ককে এড়িয়ে গিয়ে অর্থনৈতিক এবং বিশেষত আর্থিক ক্ষেত্রে বিদেশি পুঁজির গতিবিধি অবাধ হতে পারে না। এমন হওয়া তখনই সম্ভব যখন কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কটিকে ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করা যায়। এন ডি এ সরকার সেই কারণেই রিজার্ভ ব্যাঙ্কের স্বাধীনতার ঘোর বিরোধী। সেই জন্যই তারা মরিয়া হয়ে তার ক্ষমতা ছেঁটে বাদ দিয়ে সেটিকে নামেই একটি কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক হিসেবে রাখতে চায়। তার প্রতিটি কাজকর্ম, এমনকি অর্থের জোগানের জন্যও যেন এই সংস্থাটিকে সরকারের সম্মতি নিতে হয়, অনুগ্রহ চাইতে হয় সেই ব্যবস্থাই তারা করছে।

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ওপর আক্রমণ

২০১৫-এর মার্চ মাসে নতুন সরকারের বিত্তমন্ত্রী অরুণ জেটলি সংসদে বাজেট পেশ করেন। বাজেট প্রস্তাবের সংযোজনী অর্থবিলের মাধ্যমে তিনি রিজার্ভ ব্যাঙ্কের যে বিভাগটি সরকারি ঋণ পরিচালনা করে, সেই ‘লোকঋণ বিভাগ’ বা ‘পাবলিক ডেট অফিস’টিকে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে তুলে নিয়ে স্বতন্ত্র এক কার্যালয়ের রূপ দিতে চান, যার নাম রাখা হয় ‘পাবলিক ডেট ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি’। এই কাজটি সুসম্পন্ন করার জন্য ‘রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এ্যাক্ট ১৯৪৫’, ‘গভর্নমেন্ট সিকিউরিটিজ অ‌্যাক্ট ২০০৬’, ‘সিকিউরিটিজ অ‌্যান্ড কন্ট্রাকট রেগুলেশন অ‌্যাক্ট’ এবং ‘পাবলিক ডেট অ‌্যাক্ট’ সংশোধন করার প্রস্তাবও সেই বিলে ছিল। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কর্মচারী ও আধিকারিকদের আন্দোলন ও প্রচারের জেরে সরকারকে এই প্রস্তাবগুলি প্রত্যাহার করতে হয়। যদিও অতি সম্প্রতি আবার তারা বিষয়টির বাস্তবায়নের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

এই একই বিলে ‘ফরেন এক্সচেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট অ‌্যাক্ট, ১৯৯৯’ (ফেমা)-র ধারা ৬ বাদ দেওয়ার প্রস্তাবও ছিল, যার ফলে মূলধনী খাতে (ক্যাপিটাল অ‌্যাকাউন্টে) কোন লেনদেনের ওপর রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নিয়ন্ত্রণ আর বরদাস্ত করা হবে না। সরকার নিজেই এই বিষয়টির পরিচালনা করবে। পাবলিক ডেট রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে সরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে হইচইয়ের মধ্যে সরকার পক্ষ চুপিসারে ফেমা ১৯৯৯ সংশোধন করিয়ে নেয় এবং ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের একটি বড় ক্ষমতা কেড়ে নিজের হাতে নিয়ে নেয়। ক্ষমতায় এই পরিবর্তনগুলির গভীরতা ও গুরুত্ব অনুধাবন করার জন্য বিষয়টি নিয়ে এখনই একটু বিশদ আলোচনা করা জরুরি। গত কয়েক মাসে আরও বড় আক্রমণ নামিয়ে এনেছে সরকার। সেই আলোচনায় আমরা একটু পড়ে যাব।

লোকঋণ (পাবলিক ডেট) কী এবং সরকার তার দায়িত্ব নিলে ক্ষতি কোথায়?

লোকঋণ বা পাবলিক ডেট বলতে বোঝায়, সরকার কর সংগ্রহের বাইরে কোন প্রয়োজনে অতিরিক্ত টাকা তুলতে চাইলে হয় তাকে বিদেশ থেকে ঋণ নিতে হয় অথবা সে নিজেরই দেশের মানুষ বা সংস্থাগুলির থেকে ঋণ নেয়। অভ্যন্তরীণ ও বিদেশ থেকে গৃহীত এই ঋণকেই লোকঋণ অথবা পাবলিক ডেট বলে। প্রশ্ন হলো, সরকার তার ঋণ নিজে সামলাবে সে তো ভালো কথা। আমরাও তো তাই করে থাকি। নিজের নেওয়া ঋণের দায়িত্ব তো নিজেরই ওপর বর্তানো উচিত। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তাতে নাক গলাতে চায় কেন? রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কর্মচারীরাও বা এমন অদ্ভুত দাবি করছেন কোন যুক্তিতে?

অর্থনীতিবিদদের বক্তব্য, ব্যক্তিবিশেষের ঋণ নেওয়া আর সরকারের ঋণ নেওয়ার মধ্যে গুণগত পার্থক্য রয়েছে। প্রথমটি একেবারেই ব্যক্তিগত যার প্রভাবও সীমিত এবং পরেরটি সমস্ত সমাজকে জড়িয়ে। সরকার লাগামহীনভাবে বিদেশ থেকে ঋণ সংগ্রহ করতে থাকলে সমস্ত দেশকে তার জন্য ভুগতে হয়। বর্তমান ইউরোপেই তো তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। স্পেন, পর্তুগাল, গ্রিস তো এই বিদেশি ঋণের বোঝায় আজ দেউলিয়া হয়ে গেছে। যে কোন দেশই লাগামহীনভাবে বিদেশি ঋণ নিলে তা সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সরকার যেহেতু রাজনৈতিক দল বা কয়েকটি দলের জোটে গড়া হয়ে থাকে, তাই তাঁদের নিজস্ব স্বার্থে, বিশেষ করে নির্বাচনের সময় জনদরদি কাজ কর্মের জন্য তারা দেদার ঋণ নেয়। বিদেশি ঋণের প্রতি তাঁদের আবার বেশি ঝোঁক থাকে। ফলে সরকার যথাক্রমে ঋণ ও বাড়তে থাকা সুদের ফাঁদে পা দেয় এবং তার পরিণতি হয় সাধারণের দুর্ভোগ, দেশের অর্থনীতির দুর্বলতা, ঋণগ্রস্ততা ও বিদেশি পুঁজিনির্ভরতা। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক সাধারণত রাষ্ট্র কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত থাকে ও সংসদে কাজের জবাবদিহি দিতে বাধ্য হওয়ার কারণে পেশাগতভাবে স্বতন্ত্র। তারা অনেকটাই নিরপেক্ষ ভুমিকা পালন করতে পারে। সরকারগুলির মেয়াদ পাঁচ বছর, তার পরই তাঁদের আবার নির্বাচনে যেতে হয়, কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক একটি স্থায়ী সংস্থা তাই সরকারের লক্ষ্য সাময়িক হওয়াটাই স্বাভাবিক কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের লক্ষ্য দীর্ঘ মেয়াদি। সরকার নিজের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে নীতি গ্রহণ করে কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক গোটা অর্থনীতির দিকে লক্ষ্য রেখে নীতি গ্রহণ করে থাকে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কও এই ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থারই রক্ষক, কোন সমাজতান্ত্রিক বা জনদরদি সংস্থা সেটি নয়। কিন্তু সে পাঁচ বছর মেয়াদের সরকারের বা শুধু তাঁদের সমর্থক গোষ্ঠীর স্বার্থের রক্ষক নয়, গোটা শাসকশ্রেণির দীর্ঘকালীন রক্ষক। এই সব কারণেই একটি কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের হাতে দায়িত্ব থাকলে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির ওপর নীতি গ্রহণের প্রশ্নে অনেক বেশি নিরপেক্ষতা, দূরদৃষ্টি, স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব প্রত্যাশা করা যায় যা কোন সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়।

লোকঋণ ও রাজ্যগুলির আর্থিক অবস্থা

রাজ্য সরকারের হাতে রাজ্যের উন্নয়নমূলক কাজ করার জন্য যথেষ্ট অর্থ কখনোই থাকে না। ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নামেই যুক্তরাষ্ট্রীয়, আসল ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। রাজ্যের থেকে সংগৃহীত করের সিংহভাগই কেন্দ্র কুক্ষিগত করে। রাজ্যের ভাগ্যে যা জোটে তাতে রাজ্য-কর্মচারীদের মাইনেপত্তর, পূর্বে নেওয়া ঋণের ওপর দেয় সুদের বোঝা মেটাতেই প্রায় ফুরিয়ে যায়। ফলে রাজ্যের উন্নয়নের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের কাছে অভ্যন্তরীণ লোকঋণ একটি বিরাট উৎস। এই ঋণপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হলে রাজ্যের অর্থনৈতিক ক্ষমতা বিপন্ন হবে।

রিজার্ভ ব্যাঙ্ক কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার উভয়েরই পক্ষে অভ্যন্তরীণ ঋণ সংগ্রহ ও পরিচালনার কাজ করে থাকে। বাজেটে প্রস্তাবিত নতুন সংস্থাটি ‘পাবলিক ডেট ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি’(পিডিএমএ) কিন্তু শুধুই কেন্দ্রীয় সরকারের হয়ে এই কাজ করবে এবং তার এক্তিয়ারের মধ্যেই বিদেশি ঋণ সংগ্রহ ও পরিচালনাও থাকবে। প্রশ্ন হলো তাহলে রাজ্য সরকারগুলির হয়ে কোন সংস্থা এই কাজ করবে? এর কোন জবাব কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রকের কাছে নেই। ফলে এক আইনি ফাঁক থেকেই যায়। দ্বিতীয়ত, ‘গভর্নমেন্ট সিকিউরিটিজ অ‌্যাক্ট’-এর অধীনে রাজ্য সরকারের ঋণও পরিচালনার বিষয়টিও ধরা আছে, সেই কারণেই এই আইন তুলে দিতে গেলে সংবিধানের ধারা ২৫২-এ প্রদত্ত রাজ্যের অধিকার লঙ্ঘিত হয় এবং এই বাতিলকরণের বৈধতা থাকে না।

অন্যদিকে যদি সরকার ভেবে থাকে যে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক কেন্দ্রের ঋণ সংগ্রহ না করলেও রাজ্যের হয়ে এই কাজ চালিয়ে যাবে সেটা একেবারেই অনভিজ্ঞ অনুমান ভিন্ন কিছু নয়। কেন্দ্রীয় সরকারের ঋণপত্র জারি করার নির্দিষ্ট সময়, অন্তরাল, পরিমাণ এবং সুদের হারের ওপরই নির্ভর করে রাজ্য সরকাররের ঋণপত্র বাজারে ছাড়ার সময়, পরিমাণ ও সুদের হার। ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের ঋণের দেখভাল থেকে সরে এলে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পক্ষে রাজ্য সরকারগুলির হয়ে লোকঋণ পরিচালনা করা সম্ভব হবে না।

রাজ্যের লোকঋণ – রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সরে গেলে কী হতে পারে?

রিজার্ভ ব্যাঙ্ক রাজ্য সরকারগুলির লোকঋণ পরিচালনা থেকে সরে গেলে কী হতে পারে? প্রথমত, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক গ্যারান্টার হিসেবে রাজ্য সরকারগুলির পিছনে থাকার কারণই তাঁদের ঋণপত্রগুলি পুরোপুরি বিক্রি হয়। কোন রাজ্যের ঋণপত্র যদি পুরো বিক্রি না হয়, অবিক্রিত ঋণপত্রের অংশ রিজার্ভ ব্যাঙ্ক নিজেই কিনে নেয়। এই ধরনের শক্তিশালী গ্যারান্টার থাকার কারণেই রাজ্যগুলির পক্ষে লোকঋণ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সরে যাওয়া মাত্রই রাজ্য সরকারগুলির মধ্যে একটি অসম প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যাবে। অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে থাকা রাজ্যগুলি, যেমন মহারাষ্ট্র, গুজরাট, কর্ণাটকের ঋণপত্র কেনায় আগ্রহী গ্রহীতা পাওয়া গেলেও যেতে পারে। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা রাজ্যগুলি, যেমন উত্তরপূর্বের রাজ্যগুলিসহ গোটা পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির ঋণপত্রের আগ্রহী গ্রহীতা পাওয়া নিতান্তই কঠিন হয়ে পড়বে। রাজ্যগুলি রেটিং এজেন্সিগুলির দেওয়া নম্বরের উপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হবে। অতএব যাদের মূল্যায়ন নিম্নমানের হবে ক্রেতাদের টানতে তাঁদের সুদের হার বেশি বেশি করে দিতে হবে। স্বভাবতই ধনতন্ত্রের অধীনে এমনিতেই অসম বিকাশের শিকার রাজ্যগুলি আরও বেশি বৈষম্যের শিকার হবে এবং অনিবার্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। বলাইবাহুল্য যুক্তরাষ্ট্রীয় অধিকারবলে রাজ্যগুলি নিজেদের মতো উন্নয়নের যেটুকু কর্মসূচি নিতে পারে সেটুকুও ব্যাহত হবে। এর সুদূরপ্রসারী ও বহুমাত্রিক প্রভাব অনস্বীকার্য।

ফেমা ১৯৯৯ আইনে বদলের তাৎপর্য

ফেমা ১৯৯৯-এর ধারা ৬-এর অধীনে রিজার্ভ ব্যাঙ্কই মূলধনী খাতে (ক্যাপিটাল অ‌্যাকাউন্ট) যে কোন লেনদেনের নিয়ন্ত্রক। অর্থাৎ রিজার্ভ ব্যাঙ্কই মূলধনী খাতে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের উপর নিয়মনীতি অথবা বিধিনিষেধ কখন কী হবে তা ঠিক করবে বা কোন ধরনের বিনিয়োগে সম্মতি অসম্মতি জানাবে। সরকার এই সংশোধনের মাধ্যমে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হাত থেকে সেই ক্ষমতানিজের হাতে নিয়ে নিলো।

বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় পরিচালনার নীতি এক এমন হাতিয়ার যার সাহায্যে বিদেশি মুদ্রার বিনিময়-হারে দ্রুত পরিবর্তনের প্রবণতাকে (ভোলাটিলিটি) খানিকটা রোখা যায়। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বাজার থেকে ডলার কিনে নিয়ে বা বাজারে আরও ডলার ছেড়ে টাকার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করে থাকে মূলধনী খাতে লেনদেন এবং আর্থিক বাজার যেমন ফোরেক্স, সরকারি ঋণপত্র (সিকিউরিটি), মানি মার্কেট ইনস্ট্রুমেন্ট ইত্যাদির উপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা না থাকলে উদারিকৃত বাজারে মুদ্রা নীতি পরিচালনা করা কখনই যথাযথ বা সর্বাঙ্গিন হতে পারে না। এর ফলে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক টাকার মূল্য, সুদের হার, মুদ্রাস্ফীতি ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সংকটের মুখে পড়বে। সেই কারণে মূলধনী খাতে নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় পরিচালনার ক্ষমতা রিজার্ভ ব্যাঙ্কেরই হাতে থাকা অনিবার্য।

এছাড়াও, ইকুইটি বা ডেট যে পথেই হোক অতি মাত্রায় পুঁজির প্রবেশ ঘটলে বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হার, অর্থের জোগানের পরিমাণ, সুদের হার সব কিছুকেই তা প্রভাবিত করে, বিশেষ করে ইকুইটি ও ভূসম্পদ (রিয়াল এস্টেট)-কে তো করেই। স্বভাবতই মুদ্রানীতির কার্যকারিতার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পক্ষে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করা কঠিন হয়ে পড়বে । অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের পরিবর্তে সরকারের হাতে ফাটকাপ্রবণ স্বল্পমেয়াদি পুজির গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকলে তারা তাদের অল্পকালীন উদ্দেশ্য সাধনে তার ব্যবহার করবে, অর্থনীতির পক্ষে প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের কথা ভাববে না। সেই কারণেই রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হাতেই ইকুইটি বা ডেটসহ পোর্টফোলিও বিনিয়োগের ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ম নীতি তৈরি করার ভার থাকা উচিত।

সরকার এবছর নভেম্বরে অভাবিতভাবে ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফ ডি আই) পথ উদার করে দিলো। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কিন্তু বেসরকারি ব্যাঙ্ক ও ভূসম্পদে (রিয়েল এস্টেট) বিদেশি পুজির বিনিয়োগ নিয়ে যথেষ্ট আপত্তি ছিল। সম্ভাবনা এটাই যে সরকার আদৌ রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সঙ্গে এই ব্যাপারে কোনও রকমের আলোচনাই করেনি।

রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে ধ্বংস করার উদ্যোগ

যে কোন দেশে মুদ্রানীতি নির্ধারণ করা, দেশের কারেন্সির মূল্য ও মান রক্ষা করাই কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের আসল বা কেন্দ্রীয় কাজ। আমাদের সরকার বেসরকারি পুজির এমনই বশংবদ যে ব্যাঙ্কঋণে সুদ কমানোর জন্য যেহেতু রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে তারা ইচ্ছে মতো রাজি করাতে পারছে না তাই মুদ্রানীতি পরিচালনার ক্ষমতাও রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে নিজেদের হাতে নিয়ে নিতে সমস্ত রকমের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

কয়েকদিন পূর্বে কেন্দ্রীয় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুদ্রানীতি (মনিটারি পলিসি) নির্ধারণ করার ক্ষমতাও রিজার্ভ ব্যাঙ্কের থেকে কেড়ে নেবে। এখনও পর্যন্ত রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নিজস্ব একটি কমিটি আছে যারা মুদ্রানীতি(যেমন ব্যাঙ্কে সুদের হার ইত্যাদি) নির্ধারণ করে থাকে। একটি প্রায়োগিক (টেকনিকাল) উপদেষ্টা কমিটি আছে যারা মুদ্রানীতি নিয়ে নিজেদের মতামত জানায়। তবেভেটো প্রয়োগ করার ক্ষমতা আছে একমাত্র রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নরের। কমিটি যে সিদ্ধান্তই নিক শেষমেশ গভর্নরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। বিগত বেশ কিছু বছর ধরে ব্যাঙ্কের সুদের হার কমানোর প্রশ্নে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের (ইউ পি এ ও এন ডি এ দুই সরকারই) জবরদস্ত মতানৈক্য প্রকাশ পেয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার মিডিয়ায় বয়ান দিয়ে জানিয়েছে তারা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের থেকে কী চায়। সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলগুলিতে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা, বিতর্ক হয়েছে। বর্ধিত মুদ্রাস্ফীতির প্রেক্ষিতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সুদ কমাতে পারে না। না হলে মুদ্রাস্ফীতি ওপর রাশ আলগা হয়ে পড়বে এবং বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে, যা শেষমেশ সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করবে। সাধারণ মানুষের কথাও কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ককে ভাবতেই হয় কেননা সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা না থাকলে বাজার সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং দেশের শিল্পের বিকাশও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিতে নিম্নমুখী হয়ে পড়ে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গবেষণাপত্রে প্রকাশ পেয়েছে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি ও শিল্পের বিকাশ পরস্পরবিরোধী। সেই কারণেই সরকারের শত চাপের মুখেও প্রাক্তন গভর্নর সুব্বারাও সুদের হারে নমনীয়তা দেখাননি। তাঁর স্মরণীয় উক্তি ছিল “ শিল্পমহলের পক্ষে লবি করার জন্য অনেকে আছে কিন্তু নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠের (সাইলেন্ট মেজরিটি) হয়ে বলার কেউ নেই”। একই কথা ওয়াই. ভি. রেড্ডি বলেছেন, “সমাজ কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কে নিজের আস্থা রেখেছে এটা সুনিশ্চিত করার জন্যই যে ব্যাঙ্ক ও আর্থিক ক্ষেত্র যেন সাধারণ জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে কেবলমাত্র অভিজাত ও আর্থিকভাবে সচ্ছল মানুষদের নয়। শেষ বিচারে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক সাধারণ জনগণের স্বার্থ দেখার জন্য নিযুক্ত এক এজেন্ট বা ট্রাস্টি।’’

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তহবিলে সরকারের অনৈতিক হস্তক্ষেপ

কেন্দ্রীয় সরকার এতটাই আগ্রাসী হয়ে পড়েছে যে তারা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের দীর্ঘ বছর ধরে গড়ে তোলা রিজার্ভ তহবিলে ও হস্তক্ষেপ করছে। একটি কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের কাছে আপৎকালীন প্রয়োজনের নিরিখে একটি প্রমাণ পরিমাণের তহবিল থাকা দরকার। আমরা প্রায়শই সংবাদপত্রে পড়ি রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এত কোটি টাকার ডলার কিনেছে বা সরকারি ঋণপত্রের বাজারে তারা নিত্য কেনা বেচা করে যাতে বাজারে টাকার তরলতা থাকে অর্থাৎ ঘাটতি না হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক হলো ‘ঋণদানের অন্তিম উৎস’ (লেন্ডার অফ লাস্ট রিসর্ট)। কারেন্সির মূল্যে অবনমন ঘটলে, বা বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারে বড় রকমের হেরফের হলে, অথবা আচমকা কোন ব্যাঙ্ক দেউলিয়া হলে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ককেই অর্থের জোগান দেওয়ার তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা রাখতে হয়। বর্তমান প্রেক্ষিতে আমরা এও জানি যে আমাদের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় প্রচুর অনাদায়ী ঋণ পড়ে রয়েছে যাকে অনুৎপাদক সম্পদ বলা হয়ে থাকে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে প্রয়োজনে ব্যাঙ্কগুলির রিজার্ভ তহবিলের জন্য পুঁজি সরবরাহ করতে হয়। এতদ্‌সত্ত্বেও সরকার রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে তার তহবিল থেকে ১লক্ষ কোটি টাকা কেন্দ্রীয় কোষাগারে জমা করতে বলা হয়েছে (ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫)। এই টাকা নাকি সপ্তম পে কমিশনের সুপারিশ লাগু করতে এবং ফৌজিদের ‘এক পদ এক পেনশন’ প্রদান করতে লাগবে। বিগত পর পর দুটি অর্থ-বছরে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তার উদ্বৃত্তের ১০০ ভাগই কেন্দ্রীয় সরকারকে হস্তান্তরিত করেছে (২০১৩-১৪ সালে ৫৩ হাজার কোটির ওপরে এবং ২০১৪-১৫ সালে ৬০ হাজার কোটিরও বেশি)।

এরকম করার কারণ যে আকস্মিক প্রয়োজনে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের টাকার প্রয়োজন হলে সরকারের কাছে হাত পাততে হবে। বলা বাহুল্য, এই নির্ভরতা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের নামান্তর। সরকারের এই অনৈতিক কাজের বিরোধিতা অবিলম্বে সর্বস্ত

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement