ভারতের বিদ্যুৎকর্মী ফেডারেশনের
অষ্টম জাতীয় সম্মেলন
নীতি বদলের লড়াই

তিলক কানুনগো

৬ মার্চ, ২০১৭

আগামী ৪ঠা-৬ই আগস্ট, ২০১৭ নবগঠিত রাজ্য তেলেঙ্গানায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ভারতের বিদ্যুৎকর্মী ফেডারেশনের অষ্টম জাতীয় সম্মেলন। এমন একটা সময়ে এই সম্মেলন অনু‍‌ষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যখন দেশ এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। দেশের সরকার নিয়ে চ‍‌লেছে জনবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক নীতি। প্রধানমন্ত্রী কথার ছলচাতুরি দিয়ে একাংশের মধ্যবিত্তকে প্রভাবিত করতে পেরেছে। সরকারের বিমুদ্রাকরণ নীতি দেশের সাধারণ মানুষকে এক চরম সংকটের মধ্যে ফেলেছে। অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট ভাষণে বলেছেন মার্চ, ২০১৮-র মধ্যে দেশের সমস্ত গ্রাম বৈদ্যুতিকীকরণ করে ফেলবেন। গ্রাম বৈদ্যুতিকীকরণের অর্থ হলো গ্রামের ১০ শতাংশ বাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া। অর্থাৎ প্রতিটি গ্রামের ১০ শতাংশ বাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়ে দাবি করা হবে সমস্ত গ্রাম বৈদ্যুতিকীকরণ করা হয়ে গেছে। কিন্তু গ্রাম বৈদ্যুতিকীকরণ নীতির কোন পরিবর্তন করা হয়নি। সমস্ত গৃহ বিদ্যুৎ সংযোগের প্রশ্নে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় একটি বাক্যও ব্যয় করা হয়নি।

কেন্দ্রের বি জে পি সরকার দেশের মানুষের বিদ্যুৎ পাওয়ার অধিকার খর্ব করার উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ আইন সংশোধনী বিল, ২০১৪ নিয়ে এসেছে। এই বিল আইনে পরিণত হলে বেসরকারি কোম্পানিগুলির চাপে দরিদ্র প্রান্তিক গ্রাহক ও ক্ষুদ্র কৃষককে বিদ্যুৎ ব্যবহার করার জন্য অনেক বেশি দাম দিতে হবে। এই ধরনের গ্রাহকদের স্বার্থে বর্তমানে চালু পারস্পরিক ভরতুকি বন্ধ হয়ে যাবে। মুনাফাখোর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে ভারত সরকার এই বিলকে আইনে পরিণত করতে চায়। অথচ ২০০৫ সালে গৃহীত বিদ্যুৎ নীতিতে বলা হয়েছিল :

১) ২০১২ সালের মধ্যে সমস্ত গৃহে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হবে।

২) প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংস্থাগুলির দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।

৩) বিদ্যুৎ গ্রাহকদের উন্নত ও নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবা সুনিশ্চিত করা হবে।

৪) বিদ্যুৎ মাশুল কমানো হবে।

বাস্তবে আমরা দেখছি মাশুল কমার পরিবর্তে বাড়ছে। দক্ষতা বৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু আমরা যদি দেশের বিদ্যুৎচিত্র দেখি তাহলে দেখবো ডিসেম্বর, ২০১৬-তে দেশে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১,৫১,৫৬২ মেগাওয়াট। সেখানে চাহিদা মেটানো গিয়েছে ১,৪৯,৪২৫ মেগাওয়াট। বলা হয়েছিল, বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেশি বিদেশি পুঁজির বিনিয়োগ হবে। বাস্তব চিত্রটা হলো বর্তমানে দেশে পুনর্নবীকরণ যোগ্যসহ সংস্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা ৩,১০,০০৫ মেগাওয়াট। যার মধ্যে ব্যক্তি মালিকানাধীন সংস্থার হাতে আছে ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ সরকারি ব্যবস্থায় মোট উৎপাদন ক্ষমতার অধিকাংশ উৎপাদন হয়। ২০১৬-১৭ আর্থিক বছরে কেন্দ্র ও রাজ্য যৌথভাবে ৬৬৪০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে সেখানে ব্যক্তি মালিকানায় ৬৮০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। দ্বাদশ পরিকল্পনায় কেন্দ্র ও রাজ্য যৌথভাবে ৪১,৭১২ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সংযোজনের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে সেখানে ব্যক্তি মালিকানায় ৪৬,৮২৫ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে বেসরকারিকরণ করার ব্যবস্থা পাকা করা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে কোন কোন রাজ্য নিজস্ব উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ‍‌ রেখে দিচ্ছে ব্যক্তি মালিকানাধীন সংস্থার মুনাফার স্বার্থে।

২০১২ সালের মধ্যে সমস্ত গৃহে বিদ্যুৎ সংযোগের কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে এখনো দেশের ৩০ কোটি মানুষের গৃহে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। পশ্চিমবঙ্গে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারেরও ঘোষিত নীতি ছিল ২০১২ সালের মার্চের মধ্যে সমস্ত ঘরে বিদ্যুৎ দেওয়ার। সেই কাজ প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পূর্ণ করে ফেলেছিল। কিন্তু বর্তমান তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার সেই কাজ আজও সম্পূর্ণ করতে পারেনি। কেন্দ্রীয় সরকার দাবি করছে ৯৮.৭৫ শতাংশ গ্রামীণ বিদ্যুতায়নের কাজ সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। বাস্তব চিত্র হলো বিহারে ৮৭ শতাংশ, উত্তর প্রদেশে ৭১ শতাংশ, মধ্য প্রদেশে ৪৫ শতাংশ এবং ঝাড়খণ্ডে ৬৩ শতাংশ গ্রামীণ গৃহে আজও বিদ্যুৎ সংযোগ হয়নি। একইরকমভাবে শহরাঞ্চলে বিহারে ৩৩ শতাংশ, উত্তর প্রদেশে ১৯ শতাংশ, ঝাড়খণ্ডে ১২ শতাংশ ও মধ্য প্রদেশে ৭ শতাংশ গৃহে আজও বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। দেশের শক্তিমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল বিদ্যুৎকর্মী ও ইঞ্জিনিয়ারদের যুক্তমঞ্চ জাতীয় সমন্বয় কমিটির কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এই বিল নিয়ে সংগঠনের সাথে আলোচনা করবেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই আলোচনা শেষ হয়নি। তিনি বলেছিলেন এই বিল রাজ্য সরকারগুলির কাছে ঐচ্ছিক থাকবে। যদিও এই বিলে লাভজনক এলাকাগুলি ব্যক্তি মালিকানধীন সংস্থার হাতে তুলে দেবার সংস্থান রাখা হয়েছে। প্রায় প্রতিটি রাজ্য সরকার এই বিলে তাঁদের আপত্তির কথা বললেও আশ্চর্যজনকভাবে নীরব থেকেছে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার। এই সরকার বিল সম্পর্কে একটি কথাও বলেনি। যার উদ্দেশ্য পরিষ্কার। দুইপক্ষেরই উদ্দেশ্য বিদ্যুৎ শিল্পের বেসরকারিকরণ।

ব্যক্তি মালিকানাধীন সংস্থার দুর্নীতির একটি বড় উদাহরণ রিলায়েন্স গোষ্ঠীর সাসান বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ সংস্থার নিয়ম অনুসারে যে-কোন বিদ্যুৎ উৎপাদন সংস্থা বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগে ইউনিটকে অন্তত ১৪ দিন পরীক্ষামূলকভা‍‌বে চালাতে হবে যার মধ্যে অন্তত ৭২ ঘণ্টা (৩ দিন) নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘোষিত উৎপাদন ক্ষমতার সম্পূর্ণ উৎপাদন করতে হবে। কিন্তু মাত্র কয়েকঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে রিলায়েন্স নিজেরাই জানিয়ে দেয় বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের দিন ৩১শে মার্চ, ২০১৩। এর মধ্যে দিয়ে মধ্য প্রদেশ, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান, দিল্লি, উত্তর প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডের বণ্টন কোম্পানিগুলিকে বোকা বানানোর চেষ্টা করে। এই ঘটনায় অল ইন্ডিয়া পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারস ফেডারেশন কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কাছে তাঁদের আপত্তির কথা জানালে সমস্ত দিক খতিয়ে দেখে কমিশন জানায় বাণিজ্যিক উৎপাদনের দিন ১৬ই আগস্ট, ২০১৩। রিলায়েন্স গোষ্ঠী কমিশনের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এপিলেট কমিটির কাছে আপিল করে এবং এপিলেট ট্রাইবুনাল রিলায়েন্সের নির্ধারিত দিনকেই মান্যতা দেয়। এবং এর মধ্যে দিয়ে রিলায়েন্স প্রায় ১০৫০ কোটি টাকা বাড়তি মুনাফা অর্জনের সুযোগ পেয়ে যায়। এপিলেট ট্রাইবুনালের এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে অল ইন্ডিয়া পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারস ফেডারেশন মহামান্য সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করে। সেই মামলার রায়ে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট বলেন, রিলায়েন্স বণ্টন কোম্পানিগুলির সাথে প্রতারণা করেছে এবং এই প্রতারণার কাজে সহযোগিতা করেছে এপিলেট কমিটি। এইভাবে বেসরকারি পুঁজি বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করছে। বিদ্যুৎ সংশোধনী বিল, ২০১৪ আইনে পরিণত হলে বেসরকারি পুঁজির স্বার্থকে আরও বেশি সাহায্য করবে।

শ্রম আইন সংস্কারের মধ্যে দিয়ে কেন্দ্রের সরকার শ্রমজীবী মানুষের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে দেশের সর্বোচ্চ আদালত প্রচলিত আইনের মধ্যেই সমকাজে সমবেতনের দাবিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালতের এই রায়কে কার্যকর করার কোন উদ্যোগ না কেন্দ্রীয় সরকার না বিভিন্ন রাজ্যের সরকারের আছে। আদালতের এই রায়কে এড়িয়ে চলার সুযোগ করে দিতে কেন্দ্রীয় সরকার সংসদের এই অধিবেশনেই মজুরি কোড বিল এবং শিল্প সম্পর্ক কোড বিল তৎপরতার সাথে উত্থাপন করছে।

ভারতের বিদ্যুৎকর্মী ফেডারেশনের অষ্টম জাতীয় সম্মেলনে এই বিষয় আলোচনায় উঠে আসবে। এই সম্মেলন আগামীদিনে দেশের শক্তিক্ষেত্রকে যেভাবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে দেশে বিদেশের ব্যক্তি পুঁজির তোষামোদ করে চলেছে কেন্দ্রের সরকারসহ বিভিন্ন রাজ্য সরকার তার বিরুদ্ধে, দেশের সাধারণ মানুষ যাতে ক্রয়সাধ্য মূল্যে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারে সেই দাবিকে সামনে রেখে আগামীদিনের লড়াই আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ করবে। এই সম্মেলন কথার বাগাড়ম্বর নয় প্রকৃত অর্থে শক্তি ক্ষেত্রকে দেশের কল্যাণকর কাজে ব্যবহারের দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলার শপথ গ্রহণ করবে।

Featured Posts

Advertisement