ডিজিটাল ক্যাশলেস লেনদেনের নামে রাষ্ট্রায়ত্ত
ব্যাঙ্কের সর্বনাশ ডেকে আনা হচ্ছে

সত্যব্রত ভট্টাচার্য

৬ মার্চ, ২০১৭

কালো টাকা উদ্ধারের নামে মোদী সরকারের নোট বাতিলের চমক এবং কার্ডে ডিজিটাল লেনদেনের ঝোঁক আসলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির সর্বনাশ ডেকে আনছে।

নরেন্দ্র মোদী নোট বাতিলের পক্ষে কয়েকটি যুক্তি খাড়া করেছিলেন। কালো টাকা উদ্ধার, সন্ত্রাসবাদীদের গোপন তহবিল ধ্বংস, অবৈধ লেনদেনের বিরুদ্ধেই নাকি এই অভিযান। তাতে দেশের মানুষের একটু কষ্ট স্বীকার তো করতেই হবে। কিন্তু বাস্তবে এর পেছনে রয়েছে অন্য আর একটি উদ্দেশ্য। পে টি এম, বা জিও মানির নামে ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, অন লাইন পেমেন্ট পদ্ধতি দেশজুড়ে চালু করতে চায় কেন্দ্র। এইভাবে আর্থিক প্রযুক্তি সংস্থাগুলির মুনাফার স্বার্থ দেখছে সরকার। এই বিষয়ে সরকার পক্ষ থেকেই নিয়োজিত হয়েছে রতন ওয়াতাল কমিটি। তারা একটি পৃথক নিয়ামক ব্যবস্থার সুপারিশ করছে যা ডিজিটাল লেনদেন সহজতর করবে। এই ব্যবস্থা যদি চালু হয়, দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতে মহা বিপর্যয় নেমে আসবে বলে মনে করছে বেফি। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ক্ষমতা আরো খর্ব হবে এতে। যে ব্যাঙ্কগুলি আমাদের ২০০৮ সালের মন্দা থেকে বাঁচিয়েছিল- এবার তারাই বিপন্ন হয়ে পড়বে।

ব্যাঙ্ক এমপ্লয়িজ ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (বি ই এফ আই) সরকারের এই ভূমিকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি ভারতের অর্থনীতির মূল ধারক ও বাহক, দেশের কৃষি ও শিল্পের অগ্রগতি, কর্মসংস্থান তৈরি, অন্যান্য আর্থ-সামাজিক উন্নয়ণের কাজে যথেষ্ট অবদান রেখেছে এযাবৎ, তা এখন ধ্যুলিস্যাৎ হতে বসেছে। কেন্দ্রে একের পর এক সরকার এসে কোপ বসিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্কগুলির ওপর। ব্যাঙ্কগুলিকে ছোটো করে রুগ্ন করে তোলা এবং বেসরকারী হাতে তুলে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে তারা। বিপুলভাবে কর্মসঙ্কোচন ঘটেছে। শূন্যপদে নিয়োগ হয়নি পর্যাপ্তভাবে। উপরন্তু চুক্তিতে অস্থায়ীভাবে বহু ক্ষেত্রে নিয়োগ হয়েছে ব্যাঙ্কগুলিতে- যাঁদের চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই। একমাত্র প্রথম ইউ পি এ সরকারের আমলে বামপন্থী সাংসদদের প্রবল চাপে বেসরকারীকরণের প্রচেষ্টা সম্ভব হয়নি সে সময়ে। কিন্তু বর্তমানে বি জে পি সরকার ব্যাঙ্ক বেসরকারীকরণে আগ্রাসী ভূমিকা নিয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ব কোনো সংস্থাকেই তারা রেহাই দিচ্ছে না। ফলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার হাল ক্রমাগত খারাপের দিকে যাচ্ছে। ব্যাঙ্ক এমপ্লয়িজ ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ বিশ্বাস ও ব্যাঙ্ক এমপ্লয়িজ ফেডারেশন, পশ্চিমবঙ্গ-র সাধারণ সম্পাদক জয়দেব দাশগুপ্ত, উভয়েই কেন্দ্রের এই কাজের তীব্র বিরোধিতা করেছেন।

সরকার নগদ লেনদেন কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে চাইছে। রতন ওয়াতাল কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী এই তথ্যই পাওয়া গিয়েছে। আমাদের দেশে যেখানে প্রায় ৯৩ শতাংশ অসংগঠিত মানুষ। ইলেক্ট্রনিক কার্ড ব্যবহার সাধারণত তাঁদের অনেকের মধ্যে প্রচলন হয়নি। এরকম অবস্থায় এই ধরণের সিদ্ধান্ত হঠকারিতার শামিল। তার ওপরে বেসরকারী ব্যাঙ্কগুলি প্রতি পঞ্চমবার লেনদেনর জন্য ১৫০ টাকা করে সার্ভিস চার্জ ধার্য করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিও সেই পথে হাঁটছে। কেন্দ্রের এই পদক্ষেপে ব্যাঙ্ক ব্যবস্থাই পাল্টে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে বলে মনে করছে বেফি। কমিটির মতে আর বি আই-এর নতুন পেমেন্ট রেগুলেটরি পদ্ধতি এমনভাবে সাজানো হচ্ছে যাতে প্রযুক্তিগত সংস্থাগুলি তাদের ব্যবসা বাড়াতে পারে। কিন্তু এতে গ্রাহক স্বার্থ বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বি ই এফ আই।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধরণের বেসরকারীকরণের ঝোঁক ধীরে ধীরে গরিব মানুষ ও তাঁদের পরিবারের ওপর আক্রমণ নামিয়ে আনে। শেষে একেবারে গ্রাস করে ফেলে। জনজীবনে ধারণাটি ক্রমশ আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং তা এখন বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলিতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ভারত তার ব্যতিক্রম নয়। ভারতে সাম্প্রতিক নোট বদলের ঘটনায় দেখা গেল কীভাবে এই ডিজিটাল কার্ড পদ্ধতি চালু করার নামে কোটি কোটি গরিব মানুষের নগদ লেনদেনের ওপর নিষেধাজ্ঞা চেপে বসলো। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এই কার্ড সিস্টেম প্রথা বেশ ভালোই। সরকারের কাছে ভালো, কোম্পানি বা সংস্থাগুলির পক্ষে ভালো। কিন্তু গরিব মানুষের কাছে তা যথেষ্টই দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই ধরণের ব্যবসায়িক প্রকৃতি অর্থনৈতিক ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে সরকার ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে। আসলে সরকারী পরিষেবাগুলি বন্টন করেই ব্যাঙ্ক মুনাফা অর্জন করে। আর এটা মূলত হয় দেশের অর্থনীতির খারাপ সময়ে। কারণ বহু মানুষ তখন এইসব পরিষেবা নিতে বাধ্য হয়। সুদের হার বাড়লে সুবিধাভোগীদের বন্টনের জন্য যে অর্থ হাতে থাকে তা দিয়ে লাভ ওঠানো যায়। রিপোর্ট বলছে কর্পোরেট রেভিনিউ বা আয় আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করে ব্যাঙ্ক। যেহেতু অর্থনৈতিক আদান প্রদান বা লেনদেন ব্যাঙ্কের মাধ্যমেই হয়ে থাকে, তাই এই পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্ডের ব্যবহার ছাড়া সাধারণ মানুষের কাছে আর কোনো উপায় থাকে না। আর এই সুযোগই এখন নিচ্ছে সরকার।

একটি সাফাই দিয়েছে ভারত সরকার। তাতে বলেছে, নগদ লেনদেনের সঙ্গে বৈদ্যুতিন পেমেন্ট ব্যবস্থার জোবো সম্পর্ক নেই। এর সঙ্গে আমানত সংগ্রহ, ঋণ দেওয়া বা ঋণের ওপর পরিষেবা দেওয়ারও কোনো সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ পেমেন্ট ব্যবস্থা ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হাত থেকে সরিয়ে একটি পৃথক নিয়ামক সংস্থার হাতে দেওয়ার সুপারিশ করেছে রতন ওয়াতাল কমিটি। গত ডিসেম্বর মাসেই কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির কাছে রিপোর্ট পেশ করেছে ওয়াতাল কমিটি। রিপোর্টে দুটি উপায়ের কথা বলেছে কমিটি। এক পৃথক নিয়ামক বা রেগুলেটরি সংস্থা তৈরি। অন্যদিকে বোর্ড ফর রেগুলেশন অ্যান্ড সুপারভিশন অব পেমেন্ট অ্যান্ড সেটলমেন্ট পদ্ধতিকে স্বাধিকার প্রদান। কিন্তু রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এই ব্যবস্থায় খুব একটা আস্থা রাখতে পারছে না বলেই খবর।

অর্থাৎ একে ব্যাঙ্ক ব্যবস্থাকে রুগ্ন করে তোলা, অন্যদিকে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো- এই দুই ফাঁসে ফেঁসে রয়েছেন গ্রাহক। দেশে ৪০ হাজার শাখা রয়েছে ব্যাঙ্কের। নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে প্রায় ৭ কোটি। কিন্তু কাজ করার লোক নেই। ব্যাপক কর্মী সংকোচন চলছে, অন্যদিকে বাড়ছে অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ। সে ঋণ আদায় হচ্ছে না। নেট বাতিলের নামে সেই অনাদায়ী ঋণের কিছুটা পূরণ করে আবার ধনী শিল্পপতিদের আরো বেশি করে ঋণ দেওয়ার চেষ্টা করছে কেন্দ্র। ফলে আবারো ব্যাঙ্কগুলি অর্থ সংকটে ভুগবে এরপর। আবার দেশের কালো টাকাও অনেকটা সাদা হয়ে গেল মোদির এই কৌশলে। প্রায় ৭৫ লক্ষ কোটি টাকা ব্যাঙ্কের সম্পদ। এটি সাধারণ মানুষেরই গচ্ছিত অর্থ। ব্যাঙ্ক বেসরকারীকরণের চক্রান্ত করে বেসরকারী শিল্পপতিদের উৎসাহ দিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার। এর ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ছে। ফাটকা বাজারে ওই বিপুল পরিমাণ টাকা খাটানোর চক্রান্তে এবার সাধারণ মানুষের অর্থেরও আর নিরাপত্তা রইল না।

অর্থনীতির এই গভীর সংকটে উদ্বেগ জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ থেকে ব্যাঙ্ক কর্মী- সকলেই। সাধারণ মানুষের টাকারই যদি কোনো নিশ্চয়তা না থাকে তাহলে ডিজিটাল লেনদেন কাদের জন্য- উঠছে এই প্রশ্নই।

Featured Posts

Advertisement