সব সাদা দাগই শ্বেতী নয়

ডাঃ সন্দীপন ধর

৮ মার্চ, ২০১৭

খুব শখ করে ছোট্ট মেয়ে রিঙ্কুর পায়ে আলতা পরিয়েছিলেন রিঙ্কুর মা। পরদিন আলতা ধুয়ে উঠে গেল, কিন্তু সারা পরিবারকে দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে রেখে গেল পায়ে আলতা লাগানো স্থানগুলিতে ধবধবে সাদা দাগ। যতই মন খারাপ হোক জেনে আশ্বস্ত হবেন যে, এই সাদা দাগগুলি শ্বেতী নয়। আলতা, সিঁদুর বা এই ধরনের রাসায়নিকের সংস্পর্শে এলে অনেকেরই ত্বকে এক ধরনের সাদা দাগ হয়। চিকিৎসকের পরিভাষায় এই সাদা দাগগুলিকে বলা হয় কেমিক্যাল লিউকোডার্মা। হাওয়াই চটি বা প্লাস্টিকের চটির সংস্পর্শেও পায়ে এই ধরনের দাগ হতে পারে। আবার দিনের পর দিন খুব কষে শাড়ি, শায়া বা বেল্ট পরলেও কোমরে অনেক সময় সাদা দাগ হয়। চিন্তা করবেন না, দীর্ঘদিনের চিকিৎসায় রিঙ্কুর পায়ের দাগ মিলিয়ে গেছে। বিভিন্ন কারণে সৃষ্ট এই সাদা দাগগুলির কোনওটাই শ্বেতী নয়। শ্বেতীর চিকিৎসা আরম্ভের আগে নিশ্চিত হতে হবে। আসলে অন্য সাদা দাগের সঙ্গে শ্বেতীর একটি মূলগত পার্থক্য থাকে। শ্বেতী দুধ সাদা দাগে লোম, চুল সবই সাদা হয়ে যায়। আর এখানে চুলকানি বা অন্যকোন উপসর্গ থাকে না।



শ্বেতীর রকমফের :

শ্বেতী বা ভিটিলিগো একটি অটো ইমিউন ডিজিজ। শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম ত্বকের বর্ণনির্ধারক কোষ মেলানোসাইট বা ব্যাপক অর্থে এই কোষে উপস্থিত রঞ্জক মেলানিনকে ধ্বংস করে ফেললে ত্বক সাদা হয়ে যায় ও শ্বেতী হয়। প্রাথমিক অবস্থায় এই অসুখে শরীরের বিভিন্ন অংশে সাদা‍‌ গোল দাগ দেখা যায়। ধীরে ধীরে সেগুলি শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন ধরনের শ্বেতী আছে। এক্সটেনসিভ ভিটিলিগোয় শরীরের অনেকখানি জায়গা জুড়ে সাদা দাগ দেখা দেয়। আর খুব তাড়াতাড়ি সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। আবার আঙ্গুলের ডগা বা ঠোঁট আক্রান্ত হয় লিপটিপ ভিটিলিগোতে। তবে সব শ্বেতীর ক্ষেত্রেই চিকিৎসা আরম্ভ করতে হয় তাড়াতাড়ি, একেবারে প্রাথমিক অবস্থায়।

শ্বেতীর নতুন চিকিৎসা :

শ্বেতীর নতুন চিকিৎসা ন্যারোব্যাল্ড আল্ট্রা ভায়োলেট ফোটোথেরাপির নামেই বোঝা যায় এই থেরাপিতে ওষুধ হিসাবে অতিবেগুনি রশ্মি বা আল্ট্রা ভায়োলেট রে আরো বিশদ করে বললে ৩১১-৩১২ ন্যানোমিটার তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের ন্যারোব্যান্ড আল্ট্রা ভায়োলেট রে প্রয়োগ করা হয়। যদিও শ্বেতীর চিকিৎসায় সূর্যালোক বা সাধারণ অতিবেগুনি রশ্মির ব্যবহার বহুদিন ধরেই চলছে। এখনো প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে শ্বেতীর সাদা দাগে ওষুধ লা‍‌গিয়ে নির্দিষ্ট সময় রোদ্দুর লাগাতে বলা হয়। আবার সাধারণ ব্রডব্যান্ড আল্ট্রা ভায়োলেট ফোটোথেরাপিতে ব্রডব্যান্ড আল্ট্রা ভায়োলেট ল্যাম্পের সাহায্যে সাদা দাগের উপরে ইউ ডি রশ্মি ফেলা হয়। কিন্তু প্রচলিত এই চিকিৎসায় অধিকাংশ সময়ে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না। তাছাড়া ব্রডব্যান্ড ইউ ভি ফোটোথেরাপিতে অনেক রোগীরই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসাবে প্রচণ্ড চুলকানি দেখা দেয়। কারো বা সারা শরীর ফু‍‌লে ওঠে। অনেক সময়েই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে স্টেরয়েড খেতে হয় বা মলম হিসাবে লাগাতে হয়। পরবর্তীকালের গবেষণায় দেখা গেল ২৮০-৩২০ ন্যানোমিটার তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আল্ট্রা ভায়োলেট রশ্মিগুচ্ছের মধ্যে কেবলমাত্র ৩১১-৩১২ ন্যানোমিটার তরঙ্গ দৈর্ঘ্যেরই ওষধিগুণ আছে। আর এই তথ্যের উপরে ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে ন্যারোব্যান্ড আল্ট্রা ভায়োলেট ল্যাম্প।

এন বি ইউ ভি ফেটোথেরাপিতে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক বা চিকিৎসা কর্মীরা কম্পিউটার সফ্‌টওয়্যার নিয়ন্ত্রিত এই ল্যাম্পের সাহায্যে ন্যারোব্যান্ড ইউ ভি রে প্রয়োগ করেন। দুই বছর বয়সের ওপর থেকেই এই ফোটোথেরাপি নেওয়া যায়। অবস্থা বুঝে সপ্তাহে দুই তিনটি করে দেড় দুই বছরে তিন থে‍‌কে চারশ’ সিটিং নিতে হতে পারে। তবে ষাট-সত্তরটি সিটিংয়ের পরেই চিকিৎসায় উপকার পাওয়া যায়। শরীরের একাধিক স্থানে দাগ থাকলে একটি সিটিংয়ে সব দাগের ওপরেই থেরাপি করা হয়। সিটিং-এর সময় চোখকে রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচাতে এক বিশেষ ধরনের চশমা পরিয়ে দেওয়া হয়। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই থেরাপিতে ভাল ফল পাওয়া গেলেও বড়দের জন্যও ট্রিটমেন্টটি যথেষ্ট কার্যকরী। শ্বেতী ছাড়াও এন বি ইউ ভি ফোটোথেরাপি আজকাল প্রয়োজনে সোরিয়াসিস, অ্যাটোপিক ডার্মাটাইটিস, কোনো কারণ ছাড়া চুলকানি বা টি সেল লিম্ফোমা নামের বিশেষ এক ধরনের রক্তের ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে অত্যন্ত সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়।

ছোঁয়াচে নয় :

শ্বেতী কিছুটা পরিমাণে বংশগত হলেও কোনো অবস্থাতেই ছোঁয়াচে নয়। বিদেশে তো শ্বেতীকে অসুখ বলেই মনে করা হয় না। সেই জন্য কোনও অবস্থাতেই শ্বেতীর জন্য ভয় পাবেন না বা শ্বেতী আক্রান্ত ছোট-বড় কাউকেই দূরে সরিয়ে দেবেন না। তাছাড়া শ্বেতীর চিকিৎসা তো রইলই। মনে রাখবেন প্রাথমিক অবস্থায় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসা আরম্ভ করবেন। এক থেকে ছয় মাসের মধ্যে থেরাপি শুরু করলে ভাল ফল পাওয়া যায়। আর এই নতুন চিকিৎসার খরচ আপনার সাধ্যের মধ্যেই।

যোগাযোগ - ৯৮৭৪৯৬৮১৩৯

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement