অনুপ্রবেশ : চর চপরই, একটি সমীক্ষা

বিশেষ সংবাদদাতা

১১ মার্চ, ২০১৭

গুয়াহাটি — দেশভক্তির ধুয়ো যত বাড়ছে,পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গোটা দেশের গরিবগুরবো প্রান্তিক মানুষগুলোর উপর নির্যাতন। প্রতিদিন। তাদের পায়ের তলার মাটি, মাথার উপর ছাদ, খিদের ভাত কেড়ে নিচ্ছে সরকার, স্বাধীনতার কানেস্তারা পেটানোর সময় কেউ যদি চিৎকার করে বলে ওঠে ‘মাঙ্গ হামারি আজাদি, ভুখমাড়িসে...’ তাহলেই দেশদ্রোহী বলে দেগে দেওয়া হচ্ছে।

আসামে দীর্ঘ দিনের বাস্তুহীন,অনাবাসী কিংবা শরণার্থী মানুষদের উচ্ছেদের যে ইতিহাস, তাকে আরও নির্মম অমানবিকতার পর্যায়ে নিয়ে গেছে আর এস এস, বি জে পি এবং তাদের জোট সঙ্গী আসাম গণপরিষদ। তাদের জোট সরকার রাজ্যের চর-চপরই অঞ্চলের উচ্ছেদ অভিযান রেয়াত করেনি সদ্যোজাত শিশুকেও। সরকারি নির্দেশ পালন করতে প্রশাসন সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে সহায় সম্বলহীন, সমস্ত সরকারি পরিষেবা বঞ্চিত, হতদরিদ্র মানুষগুলোর উপর। চলছে ভয় দেখানো, হুমকি, খুন,শারীরিক মানসিক নির্যাতন।

সরকারি তকমা বলছে এরা নাকি সবাই ‘বাংলাদেশি বেআইনি অনুপ্রবেশকারী’। তাই আইনের ভয় দেখিয়ে নজিরবিহীন উচ্ছেদ অভিযান চলছে। আসলে এরা মূলত আদাড়বাদাড় খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষ। কখনো বনাঞ্চলে,কখন নদীর চরে, কখনো দীর্ঘ দিনের অব্যবহৃত সরকারি জমিতে, অনেকে আবার ‘মেয়াদিপাট্টা’ পাওয়া জমিতেও বংশ পরম্পরায় বসবাস করে আসছেন। ২০১৬ সেপ্টেম্বর থেকে আসাম সরকার মূলত চর-চপরই আর সরকারি জমি থেকে (খাস, PGR, VGR etc)উচ্ছেদে উঠেপড়ে লেগেছে। ইতিমধ্যেই হাজার খানেক মানুষ উচ্ছেদ হয়ে গেছেন। সরকারি তরফে গোটা রাজ্যেই আরো কড়াভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। অভূতপূর্ব নৃশংসতায় সরকারি নির্দেশ কার্যকর করছে প্রশাসন। প্রথম অভিযান শুরু হয় কাজিরাঙ্গা অভয়ারণ্যের কাছে ‘কুঠারি’ অঞ্চলে। উচ্ছেদের সময় সরকারি তরফে পুনর্বাসন,আপৎকালীন ত্রাণ কোন কিছুর ব্যবস্থা রাখা হয়নি। পুরোপুরি মানবাধিকার লঙ্ঘিত করে শুরু হয় উচ্ছেদ। মানুষ বলপূর্বক প্রতিরোধ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দেয়। বাদ যায়নি ক্লাস টেন এর স্কুল ছাত্রী থেকে সদ্যোজাত শিশুও।

সরকারি রিপোর্ট বলছে ৬ মাসের মধ্যে কম করে ৩৫৫০টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। যদিও এই রিপোর্টের উল্লেখ থাক অংশের বাইরে অসংখ্য পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। মোরিগাঁও অঞ্চলে যেখানে সরকারি রিপোর্টে বলা হচ্ছে ৯৮ টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, বাস্তবে সেখানে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৩০০র বেশি পরিবার। মুখ্যমন্ত্রী বারংবার বলেই চলেছে এ অভিযান আগামী দিনেও চলতেই থাকবে।

চর-চপরই কি ?

‘চর’ অর্থাৎ ‘নদী মধ্যস্ত বালির চরা’ । ভারতীয় উপমহাদেশে ইন্দাস-গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার বাস্তুসংস্থানগত বা পরিবেশগত ভৌগোলিক প্রক্রিয়াতে চর সৃষ্টি হয়।

অনেক সময়ই নদীবাহিত পলি,বা নদীর তটের ভাঙনে নদীর বুকে পলি জমে। ব্রহ্মপুত্রের মতন পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘ নদে, প্রচুর উপনদী এসে মেশে। এরাও প্রচুর পরিমাণে পলি বহন করে এনে অনেক ছোট ছোট স্থায়ী বদ্বীপ, চর তৈরি করে, আবার কখনো নদীর ভাঙনে এই সব চর ভেসেও যায়, ভেঙে যায়, ক্ষয় হয়। মূলত এগুলোকেই চর-চাপরি অঞ্চল বলে। ২০০২-০৩এর আর্থ-সামাজিক সমীক্ষা বলছে, আসামের ৪.৬% অঞ্চল, গোটা ব্রহ্মপুত্র অববাহিকাজুড়ে প্রায় ৩৬০৩ স্কোয়ার কিমি বিস্তৃত, এই চর-চাপরি অঞ্চল।এই অঞ্চলে, আসামের ১৪টা জেলার ২৩ সাব ডিভিসনের ২২৫১ গ্রাম, ২৯৯ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রায় ২৫ লক্ষ লোকের জনবসতি। এই অঞ্চল অর্থনৈতিক ও শিক্ষার দিক থেকেও অনেক পিছিয়ে পড়া ।রাজ্যের ৪৪.৫৯% গরিব মানুষের বসতি এই চর-চাপরি অঞ্চলে।

চর-চাপরি অঞ্চলের আর্থ সামাজিক অবস্থান :

দারাং জেলার সিপাজহার ডেভেলপমেন্ট ব্লক এর অধীনে তিনটে চর গ্রামের প্রাথমিক সমীক্ষা করা হয়। ২০১১র জনগণনার রিপোর্ট অনুযায়ী গ্রাম তিনটির মোট লোকসংখ্যা ৯৮৬২ জন। সমীক্ষায় ৯৬ জন উত্তরদাতার মধ্যে ৭৯ জন পুরুষ, ১৭ জন মহিলা। ৮৬% উত্তরদাতা বিবাহিত। মাতৃত্বকালীন মৃত্যু ও শিশু মৃত্যুর হার অত্যন্ত বেশি। প্রায় প্রতিটা পরিবারই এ ঘটনার সাক্ষী। গড়ে ১৩ বছর বয়সে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। অপুষ্টিতে ভোগে শিশুরা। খুব অল্প কিছু পরিবার সরকারি ইন্দিরা আবাস যোজনার অন্তর্ভুক্ত, অল্প সংখ্যক বাড়িতে সৌর বিদ্যুৎ পৌঁছেছে। উন্নয়নের প্রধান বাধা যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব। নিকটবর্তী শহরতলির সাথে যোগাযোগের কোন রাস্তা বা সেতু নেই। কাছাকাছি গন্তব্যে পৌঁছাতে হলেও মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে, গোরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি বা ‘খাসার’এ যেতে হয়। স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা LP স্কুল প্রায় নেই। সরকারি ডাক্তার, শিক্ষক বা পরিষেবার স্বপ্ন এদের কাছে অধরা। স্বাভাবিকভাবেই জনসংখ্যার নিরিখে গ্রামের মহিলারা নানান দিক থেকে আরও বেশি বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারি পরিষেবার অন্ধকারময় ছবি নিয়ে তিনটে গ্রামে একটা মাত্র স্বাস্থ্যকেন্দ্র আর একটা স্কুল দাঁড়িয়ে আছে।

১) ১.৮২% পরিবার নিজেরাই টিউবওয়েল খুঁড়ে নিজেদের পানীয় জলের ব্যবস্থা করে নিয়েছে। ১৭.৬% সাধারণ টিউবওয়েল ব্যবহার করেন, বাকিরা ভূমধ্যস্ত প্রাকৃতিক জলের উপরেই নির্ভরশীল।

২) ১৯% বাড়িতে শৌচালয় আছে। প্রচার বিজ্ঞাপনে স্বচ্ছ ভারতের কথা তুলে ধরা হলেও এই অঞ্চলের ৭৭.১৫% প্রান্তিক মহিলারা উন্মুক্ত শৌচালয় ব্যবহার করতে বাধ্য হন। ২০১৬-র মানব উন্নয়ন রিপোর্ট বলছে আসামের চর অঞ্চলের জনসংখ্যার ৮৪.৬% শৌচালয় পরিষেবা থেকে বঞ্চিত।

৩) ৬৯% পরিবারের মায়েরা প্রসবের আগে ও পরের যত্ন থেকে বঞ্চিত।

৪) মাত্র ১০জন উত্তরদাতা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসবের কথা বলেছেন।

৫) ২৮% মানুষ কৃষিনির্ভর, বেশিরভাগই রুজির জন্যে একাধিক পেশায় যুক্ত। ৪৬% পরিবার কৃষিশ্রমিক, এটাই এঁদের প্রধান রুজি।

৬) ২৮% কৃষক নিজস্ব পাওয়ার পাম্পের সাহায্যে চাষ করে।

৭) মাত্র ২.০৮% এর নিজেদের নৌকা আছে। ৬৭% পরিবারের অন্তত একটা সাইকেল আছে। ৫.০২% পরিবারের মোটর সাইকেল আছে।

৮) ৯৫%পরিবার মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। বিলাসিতার জন্যে নয়,ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন চর অঞ্চলে এটা অত্যাবশ্যকীয় বলেই বাধ্য হয়েই মানুষ মোবাইল রাখে।

৯)কেবল ২.২৯% পরিবারের নিজস্ব যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবহার করে। ১৫% পরিবারের কিছুই নেই।

অবৈধ অনুপ্রবেশকারী অভিবাসী ?

আসামে গোটা ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় পার বরাবর অঞ্চল নানা ভাঙাগড়ার সাক্ষ্য বহন করে আসছে। নদীর একপাড় ভাঙলে অন্যপাড় গড়ে, ১৯১২-৯৬, ৮৬৮ স্কোয়ার কিমি অঞ্চল ভাঙনে হারিয়ে গেছে। ব্রহ্মপুত্র পার বরাবর বার্ষিক এই ভাঙন ও নতুন করে পলি জমে ভরাট হবার গড় ইউনিট প্রতি ০.১৭৮স্কোয়ার কিমি ও ০.৩৪৩ স্কোয়ার কিমি ।

সিপাজহার এর তিনটে ‘চর’ গ্রামের ৮৩.৩৮% মানুষ আসামের অন্যান্য ভাঙনপ্রবণ চরগুলোর থেকেই এখানে এসেছে। ৮৫% এসেছে বরপেটা জেলা থেকে। বরপেটা জেলার আয়কর চক্রের চেঙ্গা, বরপেটা, বাঘবার, কালগাছিয়া মুখ্য ভাঙনপ্রবণ অঞ্চল। এই অঞ্চল মূলত সংখ্যালঘু মানুষের বসতি। ১৯৬০ থেকে ২০০৪ অবধি বরপেটা জেলার দক্ষিণাংশের ৪৫৭৫৮.৯০ হেক্টর (৪৫৭.৫৮৯স্কোয়ার কিমি) জমি ভাঙনে হারিয়ে গেছে।

নাগরিকত্ব ও আইনি অবস্থান

সমীক্ষায় ৫০টি পরিবারের থেকে জমি ও নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নথি পাওয়া গেছে। সমীক্ষায় গৃহীত ৯৬টি পরিবারের মধ্যে ৫০টি পরিবারকেই উচ্ছেদের নোটিস দেওয়া হয়েছে।

এই নথিগুলো, ১) ভোটার লিস্টের শংসাপত্রের কপি, ২) আসাম সরকারের থেকে পাওয়া নাগরিকত্বের বংশ পরম্পরিক স্বীকৃতি। ৩) রাজস্ব বাবদ দেওয়া নথি।

উচ্ছেদের নোটিস প্রাপ্ত ৫০টি পরিবারের মধ্যে ৩৭টি পরিবারের বংশধরদের ন্যায়সঙ্গত ভোটার হিসাবে ভোটার লিস্টে নাম আছে। ৬৪% ১৯৬৬ তে N R C তে নথিভুক্তির আবেদন করেছে। ১৬% , ১৯৫১ র NRC ব্যবহার করছে। বাকি ২০% ১৯৭০,’৭১এর উত্তরাধিকার তথ্য ব্যবহার করছেন।

আসলে ভুলে গেলে চলে না আজকের উন্নত আসাম গড়ে তোলার পিছনে, এই মানুষগুলো বা এদের পূর্ব পুরুষদের অবদান অনস্বীকার্য। আসাম রাজারা বনাঞ্চল কেটে খেতি বানানোর কাজে, চায়ের বাগানে, শহরতলি নির্মাণে এই মানুষকে কাজে লাগিয়েছে। গোটা বিশ্বের সামনে আসামের চা শিল্পকে তুলে ধরার পিছনে এই সমস্ত মানুষের অবদান ভুলিয়ে দিতে চাইছে আজকের জাতিসত্তার রাজনীতি। সমাজে অভ্যন্তরীন উৎপাদন হার তৈরির ক্ষেত্রে এঁদের অবদান কিছু কম নয়। সরকারের বোঝা দরকার,এই অঞ্চলের বাসিন্দারা সরকারের ‘বোঝা’ নন, বরং এঁরা দেশের মানব সম্পদ। স্বাধীন রাষ্ট্রের কাছে এরাও মানবিকতার দাবি রাখে।

‘erosion, eviction marginalization of char-chapori dweller' শীর্ষক যে সর্মীক্ষা রিপোর্ট তৈরি করেছেন অংশু মান শর্মা ও আবুল কালাম আজাদ তার ভিত্তিতেই গণশক্তির এই প্রতিবেদন।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement