দরকার নারীবিদ্বেষী মনের বদল

মুনেশ ত্যাগী

১২ মার্চ, ২০১৭

Image

+

ভারতে অতীত থেকেই মহিলাদের লক্ষ্মী, সরস্বতী, গৃহস্বামিনী, সাম্রাজ্ঞী ইত্যাদি বলা হয়ে থাকে। আর এখন তাঁদের বিশ্বসুন্দরী, ব্রহ্মান্ড সুন্দরী, ভারত সুন্দরী, নগর সুন্দরী ইত্যাদি বলা হয়। যদিও মহিলাদের উপর অপরাধ যেমন- ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি, পণের জন্য পুড়িয়ে মারা, বধূহত্যা এবং ভ্রুণহত্যার মত ঘটনা বিকট রূপ ধারণ করছে। এই সব অপরাধের সমাপ্তির কোনো লক্ষ্মণ নেই।

পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে পড়ছে যে, না দেশের মহিলারা সুরক্ষিত, না বিদেশী পর্যটকরা নিরাপদ। মহিলাদের উপর অত্যাচার এবং অমানবীয় ব্যবহার করার মানসিকতা এখনও বজায় রয়েছে। দিনকে দিন বাড়ছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার সত্তর বছর পরেও এই মানসিকতা পীড়াদায়ক। হাজারো বছর ধরে নারী নির্যাতিতা। তাকে লালসার শিকার করা হয়েছে। বিনা করণে বিতাড়ন, অপহরণ, অগ্নিপরীক্ষা নেওয়া হয়েছে নারীর। গোরু, ছাগল, ধন এবং জমির মত দানে দেওয়া নেওয়া হয়েছে নারীর। নারীকে বেচা এবং কেনা হয়েছে। দাসী বানানো হয়েছে। কন্যাদান হয়েছে। যেন নারী কোনো মানবীয় প্রাণী নয়, কোনো বস্তু বা জিনিস। যাকে বেশ্যা, আইটেম গার্ল, মনোরঞ্জনের উপকরণ, উপভোগের বস্তু, কলগার্ল বানানো হয়েছে।

এটা শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়। এটা মহিলা বিরোধী মানসিকতার উজ্জ্বল উদাহরণ। এই সমস্যা আজও আমাদের গান, ধারাবাহিক, সিনেমা, রীতি নীতি, উৎসবে দিব্যি রয়েছে। নারী না পর্দায় নিরাপদ, না ঘোমটায়, না বোরখায়। নারী না সড়কে, না বাজারে, রেলে, বাসে, অফিসে। না হোটেলে, থানায়, সার্বজনিক জায়গায়, কাজের জায়গায় নিরাপদ। না ঘরে, না গর্ভে সে সুরক্ষিত। স্বল্প পোশাকে শ্লীলতাহানির শিকার হয় তো, সর্বাঙ্গ বোরখায় ঢাকা হলেও ধর্ষিতা। নারী না একা সুরক্ষিত, না বাবা বা ভাইয়ের সঙ্গে।

এখন তো দলবদ্ধভাবে নারীর উপর পাশবিকতা চলছে। প্রত্যেক মা, বাবা, ভাই তার ঘর থেকে বেরনো নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। এই সমস্যা দিনে দিনে আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। এত আইন, আদালত, আইনজীবী, মিডিয়া, রাজনৈতিক দল এবং মহিলা সংগঠন থাকা স্বত্বেও এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে হলে নারীবিরোধী মানসিকতা এবং চিন্তা থেকে বেরতে হবে। মহিলাদের সম্মান করার শিক্ষা শুরু থেকেই দিতে হবে। ছোট থেকে এই শিক্ষা দিতে হবে যে মহিলাদেরও নিজস্ব ব্যক্তিত্ব এবং মর্যাদা আছে। মেয়েদেরও শেখাতে হবে তার নিজের ইচ্ছা এবং মর্জি আছে। মেয়েরাও সমতা, সম্মান এবং সমানাধিকারের বরাবর হকদার। নারীরা মনোরঞ্জন এবং উপভোগের বস্তু নন। নারীদের সম্মান, সুরক্ষা এবং সমানাধিকারের বিষয়কে স্কুলশিক্ষায় আনার বিশেষ প্রয়োজন আছে।

যদি অর্ধেক দেশ অসুরক্ষা, ধর্ষণ, হিংসা, পণ, উৎপীড়ন, ভ্রুণহত্যা আর গার্হস্থ্য হিংসার শিকার হয়, তাহলে কিভাবে ভারত আর্থিক বা রাজনৈতিক সুপার পাওয়ার হওয়ার কথা ভাবছে। এই নারী বিরোধী মানসিকতা বদলের জন্য আমাদের নিজেদের সমাজ এবং রাজনীতি, সাহিত্য, অর্থনীতি, মিডিয়া জগতে তুফান তুলতে হবে। একে এক আন্দোলনের রূপ দিতে হবে। নারীদেরও পরাজিতের নয়, বিজয়ীর মানসিকতা তৈরি করতে হবে। তাই বলতে ইচ্ছে করে-

তোমার মাথার এই আঁচল অতি সুন্দর কিন্তু,

এই আঁচলকেই যদি লড়াইয়ের পতাকা বানাতে সঠিক হতো।

লেখক মীরাটের আইনজীবী।

Featured Posts

Advertisement