ছয় মাস পার
আজও কাজ খু্ঁজছেন কাজ হারানো মানুষ

১৪ মে, ২০১৭

দিল্লির তিহার জেলের কাছে একটি গ্রামে শুক্রবার সন্ধ্যায় ৩৬বছর বয়সী বৃজমোহন তিওয়ারি বাগ্‌দান অনুষ্ঠানের জন্য মণ্ডপ তৈরিতে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর বক্তব্য, ৮ই নভেম্বর দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর স্তম্ভিত করে দেওয়া ভারতের ৮৬% নোট বাতিল করে দেওয়ার পর ডিসেম্বর মাসে দিল্লির এক গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা থেকে তাঁর চাকরি চলে যাওয়ার পর থেকে তাঁর আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে নেহাতই সামান্য।

নতুন বছরে তিওয়ারি পশ্চিম দিল্লির একটি চকে কাজ খুঁজে পেয়েছেন, যেখানে বিভিন্ন কর্মসন্ধানী শ্রমিকরা দিনমজুরের কাজের খোঁজে একত্রিত হয় মূলতঃ নির্মাণশিল্পে দিনমজুরের কাজ করতে। তবে আজ অবধি কোনও কারখানায় শ্রমিকের চাকরি আর জোটেনি তাঁর।

বিহার থেকে আসা পরিযায়ি শ্রমিক তিওয়ারি জানান, “ওই শ্রমিক চকে প্রথম কিছু দিনে আমি মাসে ৩০দিনের মধ্যে ১০-১২দিনের কাজ পেতাম। এখন ১৫-১৭দিন কাজ পাই, ও নিজেকে জাতীয় রাজধানী অঞ্চলের শিল্পাঞ্চলে মাল লোডিং-আনলোডিং-এর কাজও খুঁজি মাঝে মধ্যেই।”

তিনি আরও জানান, “দিনমজুরির কাজ হয়ে যাওয়ার পর আমি প্রতিদিন কাজের খোঁজে বেরোই। আজকাল বিভিন্ন (বিয়ে ইত্যাদি অনুষ্ঠানের) মণ্ডপে দিনমজুরির কাজ পাই। একাজে তীব্র অনিশ্চয়তা রয়েছে। যতই হোক, বিয়ে তো মরশুমি অনুষ্ঠান।”

নোট বাতিলের বেশ কয়েক মাস পরেও দেশজুড়ে অর্থের তীব্র সঙ্কট ছিল। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইণ্ডিয়ার নোট ছাপানোর প্রেস দিনরাত এক করে ওভারটাইম কাজ করে বাতিল হয়ে যাওয়া নোটের বদলি নতুন নোট ছাপানোর কাজে নিজেদের নিয়োগ করলেও তা যথেষ্ট ছিলো না। বিভিন্ন যন্ত্রাংশ উৎপাদন কারখানা উৎপাদন বন্ধ বা কমিয়ে দেওয়ায় বেকারত্ব বেড়ে গিয়েছিল এক ধাক্কায় অনেকটাই। অনেক কারখানারই ক্রেতাদের চাহিদায় ভাঁটা পড়েছিল। বাকিদের কাছে কাজ চালানোর মতন কাঁচামাল কেনার নগদ টাকা ছিল না। দিল্লির ব্যস্ততম শিল্পাঞ্চল মায়াপুরীতে বিভিন্ন কারখানার কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছিলেন। নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের ছয় মাস পরেও তাঁদের অনেকেই এখনও কাজ ফিরে পাননি।

কারখানায় কাজের সম্ভাবনা দূর অস্ত্‌

বিশেষ করে কাজ হারিয়ে ফেলা মহিলা শ্রমিকরা জীবনধারণের জন্য নতুন কাজ খুঁজে পাওয়া নিয়ে কঠিনতম সঙ্কটে রয়েছেন।

Indian Federation of Trade Unions-এর দিল্লির সাধারণ সম্পাদক রাজেশ কুমার বলেন যে দিন মজুরির জন্য শ্রমিক চকে পুরুষ শ্রমিকরা কাজ খুঁজলেও মহিলা শ্রমিকদের লোডিং-আনলোডিং, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ভারী যন্ত্রাংশ-কেন্দ্রিক বহুবিধ কাজে নিয়োগ করা হয়না।”

উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর থেকে আসা ৪০বছর বয়সী পরিযায়ী শ্রমিক জ্ঞানমতী দেবী গত ডিসেম্বরে কাজ হারানোর আগে অবধি দিল্লিতে এক ব্যাগ তৈরির কারখানায় কাজ করতেন। তাঁর স্বামী দক্ষিণ দিল্লির এক কাঠের দোকানে কাঠমিস্ত্রীর কাজ করতেন। ২০১৬তে তিনি মারা যাওয়ায় কাজ হারানো ওই মহিলার এখন জীবন চালানোর জন্য একমাত্র ভরসা ১৯ ও ২২বছর বয়সী তাঁর দুই ছেলের দিনমজুরিই।

তিনি জানান, “মাসের পর মাস হন্যে হয়ে কাজ খুঁজেও নিরাশ হওয়ায় আমাকে এই মাসেই গ্রামে চলে আসতে হয়েছে।”

কোথায় গেল কাজ? মায়াপুরী শিল্পাঞ্চলের মালিক ও শ্রমিক, উভয়ের মতেই নোট বাতিলের ৬মাস পরেও কাজের অভাবের স্বাভাবিক কারণ নভেম্বরের পর বন্ধ হয়ে যাওয়া বা উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া ইউনিটগুলির অধিকাংশই নগদের ঘাটতি অনেকটা পূরণ হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতায় পৌঁছতে পারেনি।

মায়াপুরি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েছনের সাধারণ সম্পাদক নীরজ সেহগাল, যিনি নিজেও একটি বুলেট-নিরোধক ও অগ্নি-নিরোধক দরজা উৎপাদনের কারখানার মালিক, জানান, “৪মাস আগেও আমরা আমাদের উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ৪০%-এ থাকলেও এখন তা বাড়িয়ে ৭৫% করতে পেরেছি। পুরো বাণিজ্যচক্রই নোটবাতিলে তীব্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল – যার ফলে কাঁচামালের অভাব ও ক্রেতাদের চাহিদার সঙ্কট দেখা দিয়েছিল। আমরা এখনও সেই ক্ষতির ধাক্কা কাটিয়ে উঠছি। দ্বিতীয়ত, এখন নগদের অভাব না থাকলেও মালিকরা আয়কর দপ্তরের স্ক্রুটিনির কোপে পড়ার ভয়ে খুব বেশি টাকা তুলতে চাইছে না।”

শাটার বন্ধ

সেহগলের মতন কয়েক হাজার মালিক কম উৎপাদনে কাজ চালিয়ে গেলেও মায়াপুরির বহু কারখানাই আজও বন্ধ।

ঐ এলাকার কারখানার মালিকরা বলছেন যে বন্ধ ইউনিটগুলির অনেকাংশই দিল্লিতে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি হওয়ায় শেষ ৩মাসে হরিয়ানা ও রাজস্থানের শিল্পাঞ্চলগুলিতে স্থানান্তরিত হয়েছে।

সেহগল বলেন, “শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩৬% বাড়ানোর দিল্লি সরকারের সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো যখন নোট বাতিলের ধাক্কা বাজার কাটিয়ে উঠতে পারেনি। খবরটা ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই বিভিন্ন কারখানার মালিকরা তাঁদের শ্রমশক্তি-নির্ভর কারখানার ইউনিটগুলিকে মায়াপুরীতে আর পুনরায় চালু করতে চাইছিলেন না। যাঁদের সামর্থ্যে কুলিয়েছে, তাঁরা হরিয়ানা ও রাজস্থানের শিল্পাঞ্চলে, যেখানে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি অনেকটাই কম, ইউনিট গড়ে তুলেছে। এই শিল্পাঞ্চলের একটা রূপান্তর ঘটছে, ও বহু মালিকই আগামী দিনে অন্যত্র সরে যাওয়ার কথা ভাবছেন।”

এই বছরে দিল্লি বিধানসভায় পাশ হয় শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির সংশোধনী ও এই আইন লঙ্ঘনে কঠোরতর শাস্তির বিধি, এবং ৩রা মার্চ এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। কিন্তু, এই সংশোধিত মজুরি বৃদ্ধি কার্যতঃ এখনও লাগু হয়নি ৯ই মার্চ রাষ্ট্রপতি এই বিল আইন-লঙ্ঘনে বর্ধিত শাস্তির দাওয়াই-সহ বিভিন্ন কারণে আম আদমি পার্টি পরিচালিত দিল্লি সরকারের কাছে পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠিয়ে দেওয়ায়।

সহযোগী শিল্প সঙ্কটে

মায়াপুরীতে রেললাইনের পাশের ঘিঞ্জি বস্তিতে ৪৫বছর বয়সী তারা দেবী দুঃখ করে বলেন যে চলতি সপ্তাহে কাপড় রাখার হ্যাঙ্গার তৈরীর একটি কারখানায় কাজের খোঁজে গিয়েও তাঁকে বিফল হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে নিরক্ষর হওয়ায়। তাঁর বস্তির সামনেই পড়ে থাকা বাতিল এক রেললাইনে বসে তারাদেবী বলেন, “যখন তাঁদের কাছে জানতে চাই যে কেন এই কারখানায় কাজ করতে গেলে শিক্ষিত হতে হবে, তাঁরা জানান যে নিরক্ষর হলে তারা ঠিক স্টিকার চেটাতে পারবে না।” তাঁর স্বামী প্রতিদিন মায়াপুরী থেকে হরিয়ানার একটি কারখানায় গিয়ে শ্রমিকের কাজ করেন।

মায়াপুরীতে জুতো তৈরীর এক কারখানায় কাজ করে মাসে ৫০০০টাকা আয় করতেন তারাদেবী, যা ঐ কারখানার পুরুষ শ্রমিকদের তুলনায় অনেকটাই কম। তিনিও ডিমনিটাইজেশনের ধাক্কায় কাজ হারিয়েছেন, ও আর পাঁচজন শ্রমিকের চেনা গল্পের মতোই তিনিও আর অন্য কাজ আর জোগাড় করতে পারেননি।

মায়াপুরীর সহযোগী শিল্পের ইউনিটগুলি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কারণ তাঁদের ব্যবসা অন্যান্য উৎপাদনশীল ইউনিটের উপর পুরোপুরিই নির্ভরশীল। মায়াপুরীতে যে সমস্ত কারখানাগুলি এখনও বন্ধ হয়ে পড়ে আছে, তাদের অনেকগুলোই সহযোগী ইউনিট।

গাড়ির যন্ত্রাংশের জন্যে প্লাস্টিকের পার্টস তৈরীর একটি কারখানার মালিক রমেশ কাপূর বলেন, “সহযোগী ইউনিটগুলির ঘুরে দাঁড়ানো আরও কঠিন। নভেম্বর অবধি আমরা ৫টা সংস্থার জন্য উৎপাদন করতাম, এখন মাত্র ২টি সংস্থার জন্য করি। ৬মাস আগেও আমাদের ১২জন কর্মী ছিল। ডিমনিটাইজেশনের পরেই কিছুদিনের জন্য আমাকে কারখানা বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। এখন মাত্র ৩জন শ্রমিক নিয়ে ফের চালু করেছি।”

কাপূর কারখানাগুলির অন্যত্র সরে যাওয়া, ও তার জন্য দিল্লিতে অসময়ে মজুরি বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকেই দায়ী করেন তিনি। তিনি বলেন, “নোট বাতিলের ফলে আমরা যে ৩টি সংস্থার বরাত হারিয়েছি, তার মধ্যে একটি বাহাদুরগড়ে (হরিয়ানা) সরে গিয়েছে।”

তিনি জানান যে এই স্থানান্তর শুধুমাত্র শ্রমশক্তি-নির্ভর কারখানাগুলির পক্ষেই সম্ভবপর ছিল। “কারণ শুধুমাত্র সেক্ষেত্রেই তারা মজুরি খাতে খরচ বাঁচানোটাকে স্থানান্তরের খরচের থেকে বেশি করতে পারবে, যার মধ্যে রয়েছে কাঁচা মাল ও উৎপাদিত পণ্যের পরিবহন খাতে বাড়তি ব্যায়।”

সৌজন্যে: scroll.in

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement