নিকষ অন্ধকারে এলিফান্টা দ্বীপ

২০ মে, ২০১৭

মহারাষ্ট্রে ট্রাভেল ডেভলপমেন্ট কর্পোরেশনের উদ্যোগে দুদিনব্যাপী উৎসবে এলিফান্টা দ্বীপের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ঝলমল উজ্জ্বল আলোয় সেজে ওঠে, গণমাধ্যমের ফ্লাশ লাইটের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে এই দ্বীপ ও দ্বীপের বাসিন্দারা। উৎসব শেষ, দ্বীপে নেমে আসে নিকষ কালো অন্ধকার, আর দ্বীপবাসীরা ফিরে যায় তাদের দৈনন্দিন ক্লান্তিময় অব‍‌হেলিত জীবনযাপনে। যে দ্বীপটির কথা বলা হচ্ছে সেটি দেশের কোন প্রান্তিক সীমানায় অবস্থিত নয়, পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম দামি শহর মুম্বাই, মুম্বাইয়ের গারাপুরি (Gharapuri) থেকে মাত্র ১০ কিমি এবং কোলবা থেকে নৌকায় মাত্র ৪০ মিনিট — দ্বীপটির নাম এলিফান্টা দ্বীপ (Elephanta Island)। দ্বীপটি একটি ভ্রমণ কেন্দ্র হিসাবে চিহ্নিত, কারণ প্রাচীন জনপ্রিয় গুহাগুলি এই দ্বীপের পাহাড়ে অবস্থিত। বাণিজ্য নগরীর মূল কেন্দ্রের কাছে অবস্থিত হলেও সেখানে নেই কোন ডাক্তার, নেই বিদ্যুৎ, নেই সুচিকিৎসার ন্যূনতম বন্দোবস্ত। দ্বীপের বাসিন্দারা বাস করে এক নিশ্ছিদ্র গভীর অন্ধকারে।

এলিফান্টা দ্বীপের বাসিন্দা সারিকা ভগত (Sarika Bhagat) বয়স ১২, শিক্ষার আলো দ্বীপে প্রবেশ করেনি তাই কোনদিনই সে স্কুলে যায়নি। কোল্ড ড্রিংকসের খালি বোতলের বাক্সগুলি দ্বীপের কাছে অবস্থিত জেটিতে পৌঁছে দেওয়ার কাজে সে তাঁর বাবাকে সাহায্য করতো।

একদিন সন্ধ্যাবেলায় সারিকা তাঁর বাবা নামাদেও ভগতকে (Namdeo Bhagat) অন্যান্য দিনের মতোই খালি কোল্ড ড্রিংকস বোতলের বাক্সগুলি জেটিতে পৌঁছে দেওয়ার কাজে সাহায্য করছিল, ঠিক এমন সময় জেটির ভেতরে কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়ে থাকা একটি সাপ লাফ দিয়ে ওঠে এবং তাকে ছোবল দেয়। তার বাবা দ্রুতগতিতে গ্রামের প্রধান, যিনি গ্রামের একমাত্র হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে সারিকাকে নিয়ে যান।

গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তার ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সারিকাকে সাপে কামড়ানোর যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়ার কাজ শুরু করে। একটি ছোট পাখি শিকার করে তার ছোট টুকরো দংশনের জায়গায় লাগিয়ে দিল এবং অপর অংশটি পাখির মলদ্বারের ভিতর বলপ্রয়োগ করে ঢোকানো হলো, পাখিটি নিদারুণ যন্ত্রণায় তীব্র চিৎকার করে শেষে মারা গেলো। ধর্মীয় কুসংস্কারের প্রতীক স্বরূপ সারিকার সাপে দংশনের জায়গায় বিষ চুষে বের করা হয়। এরপর পাখিটিকে মেরে ফেলা হয়। সারিকার জীবন ফিরে পাওয়ায় দ্বীপের বাসিন্দারা আনন্দিত। কিন্তু সারিকার শারীরিক অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে শুরু করলো।

সারিকাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য মূল ভূখণ্ডে নিয়ে আসা হলো। কিন্তু সন্ধ্যে ৬টার পর খেয়া পারাপারের সব দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে একটি বেসরকারি মাছ ধরার নৌকা করে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো। এক ঘণ্টার এই দুঃসহ পথ অতিক্রম করার পর তাঁর প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু হয়, কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থা আগের মতোই খারাপ হতে লাগলো। পরের দিন সকালে মুম্বাইয়ের কিং এডওয়ার্ড মেমোরিয়াল হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে সে শেষ‍‌ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। দ্বীপের বাসিন্দারা তাঁকে বাঁচানোর জন্য তখনও ঝাঁকুনি দিয়ে ডাকতে থাকে কিন্তু ১২বছরের নিষ্পাপ মেয়েটির মৃত্যু তখন চিহ্নিত হয়ে যায়।

অন্ধকারের নিচে আলো (Darkness under Light)

ইউনেস্কো ১৯৪৭ সালে, এলিফান্টা দ্বীপকে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ হিসাবে চিহ্নিত করে। এর ফলে প্রত্যেক বছর ১০ লক্ষেরও বেশি পর্যটক এই দ্বীপ পরিদর্শন করতে আসে কিন্তু দুঃখের বিষয় এই দর্শনার্থীদের সর্বশেষ সংখ্যা লিপিবদ্ধ করা হয়নি। পর্যটকরা এই দ্বীপের প্রাচীন গুহাগুলির ভাস্কর্য শিল্প দেখে মুগ্ধ হয়ে যান কিন্তু তাঁদের কোন ধারণা নেই যে দ্বীপের বসবাসকারী মানুষরা কতটা দুঃখ কষ্টের মধ্যে দিয়ে জীবন অতিবাহিত করে। দ্বীপটি তিনটি গ্রাম— শেট বাউন্ডার (Shet bounder), মোরা বাউন্ডার (Mora bounder), রাজ বাউন্ডার ( Raj bounder) নিয়ে গঠিত। প্রায় ১,২০০ মানুষ দ্বীপটিতে বাস করেন — বাস করে এমন একটি দ্বীপে যেখানে প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রগতির বিবর্ণতা স্পষ্ট, উন্নত জীবনযাত্রা যেখানে অকল্পনীয়। তাঁরা ন্যূনতম প্রাথমিক চিকিৎসার সুযোগ সুবিধা পান না, নেই পরিবহণ ব্যবস্থা, পান না পরিস্রুত পানীয় জল, নেই বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা। কর্তৃপক্ষ উন্নত পরিষেবা দেওয়ার বিষয়ে দ্বীপবাসীদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা কাজে পরিণত করার বিষয়ে উদাসীনতাই ছিল।

পাহাড়ের উপর চূড়াগুলিতে অবস্থিত প্রাচীন গুহাগুলি হাজার পর্যটক দুর্গম পথ অতিক্রম করে দর্শন করতে যান, কিছু পর্যটক যাঁরা পায়ে হেঁটে যেতে পারে না, তাঁদের দ্বীপের বসবাসকারী স্থানীয় প্রৌঢ়রা ঢুলিতে করে প্রায় ১২০ ধাপ দুর্গম পাথুরে পথ পেরিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় দর্শন করতে নিয়ে যান। পাহাড়ের উপর গুহার কাছে একটি পরিস্রুত জলের পুকুর আছে। স্থানীয় গ্রামের মহিলারাও এই বয়স্ক ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রত্যেকদিন পাহাড়ের দুর্গম পথ অতিক্রম করে পাত্রতে করে জল নিয়ে গ্রামে ফিরে আসে। তাঁদের ক্লান্তি তাঁদের পথ চলার গতিকে মন্থর করলেও এই কাজ তাঁদের রোজই করতে হয়।

এলিফান্টা দ্বীপের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার জন্য খুব দ্রুত কিছু পরিকল্পনা এক বছর আগে কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছিল, কিন্তু বাস্তবে এক বছরে কোন পরিকল্পনাই বাস্তবায়িত করা হয়নি। বাসিন্দাদের জলের কষ্ট দূর করার জন্য বৃষ্টির জল সংগ্রহ করে তা সংরক্ষিত করার জন্য একটি জলের রিজার্ভার দ্বীপে স্থাপন করা হয়েছিল, কিন্তু এটি ব্যবহার না করার ফলে পাইপে লোহার মরচে পড়ে যায়। তার ফলে জল সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি, বাসিন্দাদের দুর্গম অঞ্চল থেকে জল নিয়ে আসার কষ্টও দূর হয়নি।

২৫ বছর আগে কমলা ভইরুকে মদ খাওয়া সংক্রান্ত বিষয়ে চিকিৎসার জন্য কষ্টকর ও ক্লান্তিকর পথ অতিক্রম করে মুম্বাইয়ের হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। পঁচিশ বছর পরেও, কিছু বছর আগে কমলকারের শরীরবৃত্তীয় জৈবিক ক্রিয়াকলাপগুলো কাজ করছিল না, তখন তাঁর পুত্র বেসরকারি একটি মাছ ধরার নৌকা নিয়ে মুম্বাইয়ের মূলদ্বীপের একটি নার্সিংহোমে চিকিৎসার জন্য নিয়ে এসেছিল। অশক্ত, দুর্বল শরীরের বৃদ্ধ কমলকারের পক্ষে এই কষ্টকর যাতায়াতের ধকল নেওয়া কখনই সম্ভবপর ছিল না। ‘‘যদি কিছু চিকিৎসার সুবিধা এই দ্বীপে থাকতো তাহলে আমরা কখনওই যাতায়াতের জন্য এতটা সময় নষ্ট করতাম না, আমাদের বাবা আজও হয়তো প্রাণবন্ত হয়ে বেঁচে থাকতো।’’ বললেন কমলকারের ছেলে মিঠুন ভইরু। এখন তাঁকে কষ্ট করে আয় করতে হয় এবং তাঁর বাবার কাছে আয়ের টাকা জমা দিতে হয়, যিনি পাহাড়ের মূল দেশের একটি আস্তাবলে শুয়ে আছেন।

এলিফান্টা দ্বীপে প্রত্যেক বছর দুটি জোড়া মাসে, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত পর্যটকদের গুহাগুলি দর্শন করতে নিষিদ্ধ করা হয়, বর্ষাকালে প্রকৃতির অস্থির গতি প্রকৃতি জন্য এবং তার সঙ্গে মুম্বাই থেকে নৌকাগুলি যাতায়াতের সময়ে ভেঙে পড়তে পারে এই দুটি কারণে রাজ্য সরকার সকল প্রকার সামুদ্রিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে দেয়। এর ফলে এলিফান্টা দ্বীপের বাসিন্দাদের ভ্রমণের ব্যবসা যার উপর তাঁদের জীবনযাত্রা প্রায় সম্পূর্ণ নির্ভরশীল সেই ব্যবসা থেকে তাঁদের আয় এই দুটি মাসে শূন্যে নেমে যায়।

এখানেই শেষ নয়। বর্ষার আগে থেকেই এখানে শুরু হয়ে যায় সাপের কামড় এবং জীবনহানি, সাথে আরও অনেক শারীরিক অসুস্থতা, কিন্তু চিকিৎসা পরিষেবার অভাব এদের জীবনকে ভয়াবহ করে তুলেছে। নিয়মিত ফেরি চলাচল ছাড়া জরুরি অবস্থায় মূল ভূখণ্ডে চিকিৎসার জন্য দ্রুত পৌঁছানো এখানকার অধিবাসীদের কাছে প্রায় অসম্ভব।

এলিফান্টা দ্বীপের তিনটি গ্রামের অধিবাসীদের কাছে রুজি রোজগারের পথ খুব কম। খুব অল্প সংখ্যক মানুষ ধান ও মাছ চাষ করে নিজেদের গ্রাসাচ্ছাদানের জন্য। কিছু মানুষ এখানে নৌকা মেরামতির কা‍‌জে যুক্ত। যদিও বেশিরভাগই নিজের ব্যক্তিগত নৌকা সারাইয়ের কাজে যুক্ত থাকে। ভৌগোলিক অবস্থানও এই ভূখণ্ডে উপযুক্ত ফসল উৎপাদনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুটো পাহাড়ের মধ্যে অবস্থিত এই দ্বীপটি একটি উপত্যকা দ্বারা বিচ্ছিন্ন। যা এঁদের উন্নয়নের পথে বাধার সৃষ্টি করেছে।

মুম্বাই এবং রাইগদ (Raigad) এই দ্বীপের নিকট হওয়া সত্ত্বেও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরিষেবা এঁদের কাছে এখনও জটিল সমস্যার সৃষ্টি করেছে। হার্ট অ্যাটাক, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ এবং সাপের কামড়ে মৃত্যু এখানকার লোকের কাছে নিত্যদিনের সমস্যা। খুশবু এই দ্বীপের একমাত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স, এই দ্বীপের বাসিন্দাকে বিয়ে করে যতদিন এখানে ছিলেন, ততদিন এঁরা মনে করতেন যে কিছুটা হলেও স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়া যাবে। কিন্তু তাঁদের ভরসাতে জল ঢেলে দিলো খুশবুর মূল ভূখণ্ডে বদলি হওয়া। এই দ্বীপ ফিরে গেল আগের অবস্থাতেই।

উৎসবের মরশুমে (Festival gets prominence)

মহারাষ্ট্রে ট্রাভেল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের উদ্যোগে দুদিনব্যাপী এলিফান্টা উৎসবে সেজে ওঠে এই দ্বীপ। জেনারেটরের উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত সমস্ত অঞ্চল। বিদেশি এবং দেশীয় পর্যটকদের জন্য আয়োজন করা হয় নাচ এবং সংগীতের অনুষ্ঠান। উৎসব শেষ হয়, পর্যটকরা দ্বীপ ছেড়ে চলে যায়, এলিফান্টা দ্বীপটি আবার ডুবে যায় গাঢ় অন্ধকারে। বার্ষিক উৎসব সংক্রান্ত খবর সংগ্রহে ব্যস্ত থাকে বেশিরভাগ গণমাধ্যম। কিন্তু গণমাধ্যমের ফ্লাশ লাইট পড়ে না স্থানীয় মানুষদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম প্রয়োজনের দিকটিতে, অবহেলিত এই মানুষেরা আঁকড়ে ধরেন অন্ধকার রাত্রিকে, বেঁচে থাকে আসন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অসুস্থতা এবং মৃত্যুকে সঙ্গী করে।

খুব সামান্য অংশ খরচ করে দীর্ঘদিন চালানোর জন্য। গ্রামবাসীরা মুম্বাই থেকে এলিফান্টা দ্বীপে প্রতিদিন চীনের তৈরি পোশাক, প্যাকেটজাত খাবার এবং পানীয় নিয়ে আসে। সারা বছরের রোজগার পর্যটন মরশুমে এই আট মাসের মধ্যে তাঁদের করে নিতে হয়। বছরের চার মাস, যখন পর্যটনের সময় নয়, যখন ফেরি চলাচল করে না, তখন এদের জীবনধারণের কোন পথ খোলা থাকে না। স্থানীয় বাসিন্দা সমীর ভোড় জানালেন ‘‘এক বোতল নরম পানীয় এম আর পি (MRP) মূল্যে বিক্রি করাও এখানে অসম্ভব — কারণ নিয়মিত ঠান্ডা করা এবং যাতায়াত খরচ এখানে খুব বেশি।’’



দেবযানী ভট্টাচার্য

Featured Posts

Advertisement