রাজপথে আছড়ে পড়বে প্রতিবাদ...

অর্ক রাজপণ্ডিত

২১ মে, ২০১৭

হ্যাপি বার্থ ডে টু নির্ভয়া। মেনি মেনি হ্যাপি রিটার্নস অফ দ্য ডে।

১০ই মে ছিল নির্ভয়ার জন্মদিন। নির্ভয়াকে স্মরণ করেছে গোটা দেশ। নির্ভয়ার ছবির সামনে মোমবাতি জ্বালিয়ে নিশ্চই অঝোরে কেঁদেছেন নির্ভয়ার বাবা, মা।

নির্ভয়ার জন্মদিনের পাঁচ দিন আগেই সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিয়েছে পাঁচ অপরাধীর মৃত্যুদণ্ডের সাজা বহাল রাখা হবে।

সুবিচার পেয়েছেন নির্ভয়া। ভরসা ফিরে পেয়েছেন দেশের লাখো ‘নির্ভয়া’।

দক্ষিণ দিল্লি থেকে বাংলার পাণ্ডুয়ার দূরত্ব ১,৩৭৮ কিলোমিটার। নির্ভয়ার জন্মদিনের দিনই পাণ্ডুয়ার এক অখ্যাত গ্রামে মূক ও বধির যুবতীকে ধর্ষণ করে প্রতিবেশি যুবক। অত্যাচারের কথা, যন্ত্রণার কথা বলতে পারেনি ওই যুবতী। আকার ইঙ্গিতে যতটা পারে বুঝিয়েছে তার মা কে।

সেদিন পাণ্ডুয়া। পরের দিন অন্য কোথাও।

এটাই এই বাংলার দস্তুর। প্রতিদিন মহিলাদের ওপর আক্রমণ। খুন-ধর্ষণ-শ্লীলতাহানি-অ্যাসিড হামলা। থানায় অভিযোগ জানাতে গেলেও হেনস্তা।

প্রতিটি ঘটনাতেই নির্বিকার প্রশাসন। অপরাধীরা অধরা।

...................................

‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে মা ও বোনেদের জানাই আমার অন্তরের শ্রদ্ধা, অভিনন্দন, সালাম ও শ্রদ্ধা’। এই বছরেরই ৮ই মার্চ ট্যুইট করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

মুখ্যমন্ত্রীর হাসি হাসি মুখের সঙ্গে হাসি মাখা মা ও মেয়ের ছবি। ডানাওলা পরির মত ফুটফুটে একটি ছোট্ট মেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে তার মায়ের কোলে। এই ছবির সঙ্গেই মুখ্যমন্ত্রীর ট্যুইট।

ডানাওলা পরির মতো আনন্দে উদ্বেল হয়ে নয়। যন্ত্রনায় কুঁকড়ে যাওয়া শরীর নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মায়ের কোলে ৬বছরের ফুটফুটে বালিকা। মাকে জানিয়েছিল কিভাবে তার উপর কয়েকদিন ধরে পাশবিক অত্যাচার চালিয়েছে গৃহশিক্ষক। ধর্ষিতা ওই নাবালিকার বাবা পেশায় দিনমজুর। মা গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। বাড়ির লাগোয়া প্রাইমারি স্কুলের প্রথম শ্রেণীর ছাত্রী ভালোবাসে ছবি আঁকতে। রূপকথার বই পড়তে। ডানাওয়ালা পরির মতো আকাশে উড়ে যেতে চাইত মনে মনে। মেয়েটির বাবা মা কোতোয়ালি থানায় গৃহশিক্ষকের নামে অভিযোগও দায়ের করেন।

পুলিশ সটান জানিয়ে দেয় অভিযুক্ত ‘পলাতক’।

মা বোনেদের ‘শুভেচ্ছা, অভিনন্দন সালাম ও শ্রদ্ধা’ জানানো মুখ্যমন্ত্রীর ট্যুইট বার্তায় এখনও অবধি ‘লাইক’ পড়েছে ৬২৫টি, রিট্যুইট করেছেন মুখ্যমন্ত্রীর ৮০ জন শুভানুধ্যায়ী।

.....................................................

২০১১সালের মে মাসে এরাজ্যে প্রথম ক্ষমতায় আসে তৃণমূল সরকার। ২০১১-১২সালে ন্যাশানাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো’র রিপোর্টেও দেখা গিয়েছিল গোটা দেশে ৩০,৯৪২টি নারী নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে নারী নিগ্রহের ঘটনার হার ১২.৭শতাংশ। এন সি আর বি’র রিপোর্ট বলছে, ২০১১-১২সালে নারী নির্যাতনের ঘটনায় শীর্ষে পশ্চিমবঙ্গ। অথচ অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা, তদন্ত শেষে শাস্তির হারে অনেক নিচের সারিতে এরাজ্য।

মাঝে দু-বছর ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো’য় রাজ্যের তথ্য পাঠানো বন্ধ রেখেছিল তৃণমূল। বাধ্য হয়ে পরে আবার তথ্য পাঠানো শুরু করে। এন সি আর বি’র ২০১৫সালের রিপোর্টেও নারী নির্যাতনে ফের প্রথম সারিতেই পশ্চিমবঙ্গ। এক বছরে পশ্চিমবঙ্গে ৩৩হাজারের বেশি মহিলা আক্রান্ত হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ দ্বিতীয় স্থানে, সামনে শুধু উত্তর প্রদেশ। কেন্দ্রের এই রিপোর্ট বলছে, ২০১৫সালে রাজ্যে মহিলাদের ওপর আক্রমণের মোট ঘটনা ঘটেছে, ৩৩হাজার ২১৮টি। একই সঙ্গে এই রিপোর্টেই দেখা গেছে ঐ বছরে দেশে মোট ২০১৬টি দলবদ্ধ ধর্ষনের ঘটনা ঘটেছে। দেশের মধ্যে মাত্র যে সাতটি রাজ্য দলবদ্ধ ধর্ষণেই একশোর গণ্ডী পেরিয়েছে তার মধ্যেও রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ! তবে ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছে এমন ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গই দেশের শীর্ষ স্থান অর্জন করেছে। এরকম ঘটনার সংখ্যা হাজারের বেশি!

২০১২সালে রাজ্যে পাচার হওয়া নিখোঁজ কন্যার সংখ্যা ২হাজার ৩৫৯জন। ২০১৩সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫হাজার ৬৬৭। ২০১৪-য় সেই সংখ্যা ৫হাজার ৭৭২। আবার ন্যাশানাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো’র রিপোর্টে মানবপাচারের যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তা রীতিমত উদ্বেগজনক। ২০১৪সালে সারা দেশে মানবপাচারের সংখ্যা ছিল ৫৪৬৬। ২০১৫সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৬৮৭৭। এর মধ্যে ৮৫শতাংশই শিশু পাচারের ঘটনা। সিংহভাগই কন্যা শিশু।

‘এগিয়ে বাংলা’-র ক্ষেত্রে তা যেন আরও ভয়ানক। দেশে ৬৮৭৭টি শিশু পাচারের ঘটনার মধ্যে শুধু এরাজ্যেই পাচারের ঘটনা ঘটেছে ১২৫৫। সিংহভাগই কন্যাশিশু। উত্তরবঙ্গ, উত্তরবঙ্গের পাশাপাশি রাজ্যের দুই চব্বিশ পরগনা, সুন্দরবন, মুর্শিদাবাদ, হুগলী থেকেও অসংখ্য শিশু, নারী পাচারের ঘটনা সামনে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া আরেকটি রাজ্যে এই ভয়াবহ পাচারের ঘটনা ঘটেছে। তা হলো বি জে পি শাসিত আসাম। বি জে পি শাসিত মহারাষ্ট্রও রয়েছে তালিকায়।

.............................................

২০১৭সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি। বাজেট বক্তৃতায় রাজ্যের অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র সানন্দে জানিয়েছিলেন রাজ্যের দুলক্ষ আই সি ডি এস কর্মীদের ও পঞ্চাশ হাজার আশা কর্মীদের ৫০০টাকা ভাতা বাড়ানো হবে।

বসন্ত পেরিয়ে প্রখর গ্রীষ্ম।

না। বর্ধিত ভাতা পাননি এ রাজ্যের আই সি ডি এস, আশা কর্মীরা। বর্ধিত ভাতা তো দূর। মে মাস শেষ হতে চললেও এখনো অনেক জেলায় আই সি ডি এস কর্মীরা পাননি তাঁদের চলতি ভাতাও। এ রাজ্যে আই সি এস কর্মীদের ভাতা বাড়িয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার ২০১০সালে। গত ৬বছরে একটাকাও ভাতা বাড়ায়নি তৃণমূল সরকার। বামফ্রন্ট সরকারের সময় আই সি ডি এস কর্মীদের ভাতা বাড়িয়ে করা হয়েছিল ৪,৩৫০টাকা, সহায়িকাদের ২,৮৫০ টাকা। এখনও তাই।

৫০০টাকা ভাতা বাড়ানোর ঘোষণা এখনও পর্যন্ত ভাঁওতা।

এই গ্রীষ্মেও বিকল্প উদাহরণ রয়েছে। বিকল্পের অনুশীলন রয়েছে। গত ২৭শে এপ্রিল কেরালার বামফ্রন্ট সরকার আই সি ডি এস কর্মীদের ভাতা ২০৫০টাকা থেকে বাড়িয়ে করেছে ১২,০০০টাকা। সহায়িকাদের ১৪০০টাকা ভাতা বেড়ে হয়েছে ৮০০০টাকা।

লালঝাণ্ডার ইউনিয়ন করার জন্য এরাজ্যে আক্রান্ত হয়েছেন আই সি ডি এস কর্মী, মিড ডে মিল কর্মীরা। শুধু মার খাওয়া নয়, রয়েছে প্রতিরোধেরও নজিরও। সামনের সারিতে মহিলারাই।

২০১৬সালের ১৯শে মে। তখন সবে দুপুর। নির্বাচনী ফলাফলে স্পষ্ট, দ্বিতীয়বারের জন্য এরাজ্যে ক্ষমতায় আসছে তৃণমূল। একের পর পর বোমার শব্দে তখন কানপাতা দায়। বাড়িতেই ছিলেন তখন পাপিয়া কাজী। পেশায় মিড ডে মিল কর্মী, মহিলা আন্দোলনের নেত্রী। তাঁর বাড়ি লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়তে থাকে দুর্বৃত্তেরা। অশ্রাব্য গালিগালাজ। বাড়ির জানলার কাচ ভেঙে চৌচির। আশেপাশের বাড়িগুলোতেও আক্রমণ।

পরের দিন সকাল থেকেই হুমকি। লালঝাণ্ডা ছাড়তে হবে পাপিয়াকে। না হলে থাকবে না মিড ডে মিল কর্মীর চাকরি। ভয় পাননি পাপিয়া। হিংস্র দানবের আক্রমণকে অগ্রাহ্য করেই নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরের দিনও হেঁটেছেন মিছিলে। জামুরিয়ায় জিতেছে লালঝাণ্ডা। জিতেছেন মহিলা নেত্রী জাহনারা খান। এতেই গাত্রদাহ তৃণমূলের। রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের অশ্বমেধের বিজয় রথে বাধ সেধেছে জামুরিয়া। অতএব পাপিয়া কাজীদের লালঝাণ্ডার পার্টি করা চলবে না। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফতোয়া হেঁকেছিল তৃণমূল।

স্কুলে যাওয়ার পথেই একদিন পাপিয়া শুনলেন তৃণমূল জোর করে তাড়িয়ে দেবে তাঁদের। তাঁর মত লালঝাণ্ডা বওয়া অন্য মিড ডে মিল কর্মীদেরও। স্কুলে তখন রান্নার তোড়জোড়।

রুখে দাঁড়িয়েছিলেন পাপিয়ারা। হাতে আঁশবটি। বুকে শপথের ডাক। পালিয়েছিল তৃণমূল। দলবেঁধে এদের হুকুমকে সোচ্চারে ‘না’ বললেই এরা পালাবার পথ পায় না। ভয় যে মনের, মনের ভয়কে তাড়ালেই, রোখা যায় দুর্বৃত্তদের। বলেছেন পাপিয়া।

...............................................

লালঝাণ্ডা ছাড়তে হবে, নয়তো বাড়িতে থাকা যাবে না

-মানি না।

ধর্ষণের পরেও থানায় বাল্বের নিচে পুলিশের পাল্টা জেরা

-মানি না।

জেলের মধ্যেও শরীর তল্লাশি

-মানি না।

ইচ্ছে হলেই যখন তখন তিন তালাক

-মানি না।

একই কাজে পুরুষের জন্য বেশি, মহিলা বলে কম মজুরি

-মানি না।

হাত পা মুখ বেঁধে শরীরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া

-মানি না।

গর্জন হচ্ছে দলমাদলে। আদিবাসী গ্রামে। প্রস্তুত হচ্ছেন কেন্দুপাতা কুড়োনো আদিবাসী রমনী। চা বাগিচায় অনাহারে মৃত শ্রমিক পত্নী। গলায় দড়ি দেওয়া কৃষকের স্ত্রী।

মহিলাদের ওপর সব ধরণের শোষণ আর অত্যাচারের প্রতিবাদ আছড়ে পড়বে রাজপথে।

কে বলে সুজেট নেই? কে বলে মধ্যমগ্রামের কিশোরী নেই? কে বলে রেললাইনের ধারে পড়ে থাকা ধূপগুড়ির স্কুলপড়ুয়া নেই? কে বলে বুথরক্ষায় খুন হওয়া আশমিরা বেগম নেই?

ওই তো বেহালা থেকে এসে পি টি এস-এর জমায়েতে স্লোগান তুলছে সুজেট। ওই তো যশোর রোড হয়ে কলকাতায় এসে রাণী রাসমনি রোডে ব্যারিকেড ভাঙছে মধ্যমগ্রামের কিশোরি। ওই তো সারা রাত ক্লান্ত ট্রেন জার্নির শেষে ডাফরিন রোডে জলকামান রুখছে ধূপগুড়ির স্কুল পড়ুয়া। বর্ধমান থেকে ডানকুনি পেরিয়ে কোনা এক্সপ্রেসওয়েতে নবান্ন মুখী আশমিরা।

রাত পোহালেই এ শহরে নবান্ন অভিযান। ব্যারিকেড আর জলকামান রুখে মায়েরাও ‘পার্টিজান’।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement