বায়ুদূষণে শীর্ষে ভারত
ভ্রুক্ষেপ নেই মোদী সরকারের

বিশেষ সংবাদদাতা

৩ জুন, ২০১৭

বায়ুদূষণের ফলে অসময়ে মৃত্যুর হারে ভারত দুনিয়ার শীর্ষস্থানে। চীনকে পিছনে ফেলে এই বিপজ্জনক বিষয়ে ভারত শীর্ষস্থান দখল করেছে। গত আড়াই দশকে চীনে প্রতি লক্ষ জনসংখ্যায় বায়ুদূষণজনিত মৃত্যুর হার যখন কম-বেশি অপরিবর্তিত থাকছে, বিপজ্জনকভাবে ভারতে তা বাড়ছে তীব্র গতিতে। এই দেশে এখনও জ্বালানি বলতে কয়লা আর গাড়ি চালানোর জন্য ডিজেল। যদিও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সরকার এখনও কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

বাতাসের বিষেই এখন নাজেহাল এদেশের মানুষ। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক একটি সমীক্ষা থেকে পাওয়া গিয়েছে এমনই রিপোর্ট। আমেরিকার ‘হেলথ এফেক্টস ইনস্টিটিউট’ এবং ‘ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়’-র যৌথ সমীক্ষায় জানা গিয়েছে, বায়ুদূষণের জেরে ২০১৫সালে ভারতে অন্তত ১১ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যা কি না বায়ুদূষণের রাজধানী হিসেবে চিহ্নিত চীনের সমতুল।

বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহর হিসেবে নাম উঠে এসেছে দিল্লির। দেশের মহানগরীগুলির মধ্যে দূষণের নিরিখে কলকাতাও একেবারে প্রথম সারিতে, দিল্লির পরেই। অত্যধিক দূষণের কবলে মধ্য প্রদেশের গোয়ালিয়র ও ছত্তিশগড়ের রায়পুরও। অতিরিক্ত দূষণ, ধুলো, ধোঁয়া থেকে শ্বাসকষ্টজনিত রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। এছাড়াও যাঁরা কলকারখানায় কাজ করেন বা পেশার কারণে ধোঁয়া, রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসেন তাঁরাও আক্রান্ত হচ্ছেন।

২০১৫ সালের ওই রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, দূষণের কারণে ভারতে আড়াই লক্ষের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর হার এতটাই বেশি যে, তা প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৩গুণ এবং পাকিস্তানের চেয়ে ২১গুণ বেশি। পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, পৃথিবীর প্রায় ৯২শতাংশ মানুষ দূষিত বাতাসের মধ্যে বসবাস করছেন। পৃথিবী জুড়েই বাষুদূষণ উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। গবেষকদের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় দেখা গিয়েছে, ১৯৯০ সালের পর থেকে ১৯৫টি দেশে প্রায় তিনশো রোগের প্রকোপ বেড়েছে। যার নেপথ্যে সবচেয়ে বেশি দায়ী বায়ুদূষণ।

শুধু খনি বা কারখানা নয়, দূষণ ছড়াচ্ছে পরিবহণ, আইন না মেনে পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিনে চলা গাড়ি। এর জেরে বাতাসে নাইট্রিক অক্সাইড, নাইট্রিক ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইডসহ নানা বিষাক্ত পদার্থের মাত্রা বাড়ছে। এতে ক্রমাগত শ্বাসকষ্ট, সর্দি-কাশিতে ভুগছেন অনেকে। সমস্যা হচ্ছে চোখেরও।

চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানীরা বলছেন, বায়ুদূষণের অর্থ হাওয়ায় ভাসমান কণা এবং বিষাক্ত গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। দূষণ বাড়লে শ্বাসকষ্টজনিত রোগ এবং ফুসফুসের দুরারোগ্য ব্যধি বাড়ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বহু গবেষণায় উঠে এসেছে, শুধু ফুসফুস বা শ্বাসনালী নয়, বায়ুদূষণ শরীরের বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উপরেই প্রভাব ফেলে। তার ফলে ক্যানসার, হৃদরোগ, এমনকী অবসাদও দেখা দিতে পারে। বায়ুর বিষাক্ত উপাদান ফুসফুস থেকে সারা শরীরেই ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে বাকি অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলির উপরেও তার প্রভাব পড়ছে। শুধু ফুসফুস নয়, শরীরের অন্যান্য অঙ্গের ক্যানসারেও বায়ুদূষণ অনেকাংশে দায়ী। একই কথা প্রযোজ্য হৃদরোগের ক্ষেত্রেও। দূষণের জেরে রোগাক্রান্তের সংখ্যা শিল্পাঞ্চলে দ্বিগুণ হয়েছে দশ বছরে। ধারাবাহিক চিকিৎসার পরেও অনেকে ঠিক মতো সুস্থ হচ্ছেন না। চিকিৎসকদের মতে, উন্নত পরিকাঠামোর মাধ্যমে দূষণ পরিমাপ ও তা নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক ব্যবস্থাই এই সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে।

বহু চিকিৎসক বিজ্ঞানীর মতে, দূষণে লাগাম টানতে পারলে এই সব রোগের প্রকোপ কমতে পারে। বায়ুদূষণের মাত্রা যদি ঘনমিটার পিছু ১০ মাইক্রোগ্রাম কমানো যায়, তা হলে শ্বাসরোগ, হৃদরোগের মাত্রা তিন শতাংশ কমতে পারে। তবে, দূষণের প্রকোপ নিয়ে প্রশাসনের মাথাব্যথা তেমন নেই বলেই পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ। পরিবেশ দফতরের কর্তারাও তা মেনে নিচ্ছেন।

পরিবেশকর্মীদের অনেকেই বলছেন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ স্বীকার না করলেও শহরাঞ্চলে দূষণের মূল উৎস গাড়ির ধোঁয়া। ফলে দূষণ কমাতে হলে ধোঁয়ায় রাশ টানা জরুরি। একইসঙ্গে গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে উন্নত করলে এই সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব। পাশাপাশি, ব্যাটারিচালিত রিকশার মতো পরিবহণ ব্যবস্থাকেও প্রসারিত করতে হবে।

Featured Posts

Advertisement