পাথর হাতে শত শত আশিক

৪ জুন, ২০১৭

কাশ্মীর উপত্যকায় ‘ইন্ডিয়া’ নামটাই এখন নিপীড়ণের প্রতীক হয়ে উঠেছে। মার খেতে খেতে তরুণ প্রজন্ম শিখে নিয়েছে ভয়কে জিতে নেওয়ার কৌশল। পেন-পেনসিল ফেলে শাল বোনা হাত তুলে নিয়েছে প্রতিবাদের নতুন মাধ্যমে। উপত্যকার সেই পাথর যুবার কথাই উঠে এলো প্রশান্ত দাসের কলমে।

--------------------------------------------------------------

নীল সালোয়ার। পিঠে স্কুল ব্যাগ। দুপাট্টায় ঢাকা মুখ। হাত থেকে বেরিয়ে আসা পাথর।

সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের দানিশ ইসমাইলের তোলা এই ছবি এখন প্রতীকি।

দুপাট্টায় মুখ ঢাকা মেয়েটি একবারই পাথর তুলেছিল। আর কোনোদিন ছোঁড়েনি। বরাবর পাথর ছোঁড়ার বিরুদ্ধে ছিলেন আফশান আশিক। জম্মু কাশ্মীরের মহিলা ফুটবল কোচ। বছর একুশের আফশান এখনও পাথর ছোঁড়ার বিরুদ্ধেই।

আফশান আশিক ভারতের জাতীয় দলে খেলতে চান। পাতিয়ালার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্পোর্টসেও প্রশিক্ষণের সুযোগ আদায় করেছেন। শান্তির পথে বিশ্বাসী আফশান কেন আচমকা পাথর ছুঁড়তে গেলেন?

আজাদ কাশ্মীরের জন্য নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার জন্যই প্রথমবার হাতে পাথর তুলেছিলেন। ‘দুর্বল নই’ বোঝানোর জন্য পাথর তুলেছিলেন। ২৪শে এপ্রিলের আগেও আফশান অনেক প্রতিবাদ দেখেছেন। তরুণ প্রজন্মের বিক্ষোভ। টিয়ার গ্যাস, ছররা বন্দুকের বিরুদ্ধে পাথর হাতের প্রতিবাদ। প্রতিবারই পাশ কাটিয়ে চলে গিয়েছেন। এড়িয়ে চলেছেন। ২৪শে এপ্রিলও ঠিক এমনটাই করেছিলেন।

দুপুর আড়াইটে। কোঠি বাগের গভর্নমেন্ট গার্লস হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল থেকে টুরিস্ট রিসেপশন সেন্টারের মাঠে যাচ্ছিলেন আফশান। সঙ্গে দশ পনেরো ফুটবলারের একটা দল। সকলেরই বয়স ১২ থেকে ২২-এর মধ্যে। কাছের এক্সচেঞ্জ রোডে সেই সময় বিক্ষোভ ছড়ায়। আশিক ও তাঁর সঙ্গী মেয়েরা কিছুই জানতেন না। জম্মু কাশ্মীর পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়া শুরু করে। একবার সেই বিক্ষোভের আঁচ পেতেই অন্য রাস্তা নেন আশিক। প্রতাপ পার্কের সেই রাস্তাতেই তাঁদের আটকে ধরে গালিগালাজ শুরু করে বাহিনী। দলের একজন মেয়েকে চড় মারে। প্রতিবাদ করতে গেলে আরও বেশি গালিগালাজ। উর্দি থাকায় গায়ে হাত তুলতে পারেননি। তাই পাথর তুলেছিলেন আশিক।

এরকম আশিকেই ভরে গিয়েছে আজকের কাশ্মীর উপত্যকা। অন্যায়ের প্রতিকার পাওয়ার উপায় নেই। তাই তরুণ প্রজন্ম বিক্ষোভের পথে হেটেছে। তরুণ প্রজন্ম পথে নেমেছে পাথর হাতে। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে কেন কম বয়সী ছেলে মেয়েরা পাথর হাতে রাস্তায় নেমেছে? কেন পেন-পেনসিলের জায়গায় পাথর হাতে উঠে এসেছে? কেন পাথর প্রতিবাদের ভাষায় পরিণত হয়েছে?

হিসেব বলছে ২০০৮ সালের পর নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে প্রায় ৩৫০জন কাশ্মীরি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। হাজারেরও বেশি মানুষ ছররা বন্দুকের আঘাতে দৃষ্টি খুইয়েছেন। আহতের সংখ্যা অগুণতি। সামান্য কারণে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আক্রান্ত হচ্ছে তরুণরা। অকারণে জেলে ভরে অকথ্য অত্যাচার চালানো হচ্ছে। আর এই কারণেই যুবক যুবতীদের মধ্যে ক্ষোভ জমেছে।

রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কোনো ভবিষ্যৎই উজ্জ্বল নয়। চাকরির অভাব, নিরাপত্তাহীনতা, আত্মসম্মানে আঘাত, নিরাপত্তা বাহিনীর নিপীড়ণ তরুণ প্রজন্মকে ক্রমশ ভারত বিরোধী পথে সরিয়ে নিয়ে গেছে। হিজুবল কমান্ডার বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর থেকে বিদ্রোহের আগুন ফের জ্বলে ওঠে। পথে নামে হাজারে হাজারে। কিন্তু সে ক্ষোভ যুবকদের মধ্যে আবদ্ধ ছিল, এখন তা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। পুলওয়ামা ডিগ্রি কলেজে নিরাপত্তাবাহিনীর হাতে প্রায় ৫০জন ছাত্রছাত্রী আহত হয়। ডিভিশনাল কমিশনারেটের নির্দেশে সব স্কুল কলেজ বন্ধ করা হয়।

এবার ছাত্রছাত্রীরা পথে নামে। পাথর হাতে নেয়। বিক্ষোভের পথ আর কীই বা হতে পারে? আফস্পার দৌলতে নিরাপত্তা বাহিনীর ইচ্ছা খুশিমতো নির্যাতন চালানোর নজির অঢেল। সাম্প্রতিক কালে জিপের সামনে শাল প্রস্তুতকারক ফারুখ দারকে বেঁধে ঘোরানোর মতো নিকৃষ্ট উদাহরণ তৈরি হয়েছে। এমন কাজকে বাহবা দেওয়ার স্রোত বয়ে যাচ্ছে। সাধারণ অছিলায় যেখানে গালিগালাজ আর অত্যাচার সহ্য করতে হয়, সেখানে ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদের ভাষা আর কী হবে? সারা বিশ্বের সর্বত্রই বিক্ষোভ প্রদর্শনে এই রকম পাথর ছোঁড়ার ঘটনাও মামুলি ব্যাপার। ছররা বন্দুক, টিয়ার গ্যাসের বিরুদ্ধে পাথরই পন্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে কাশ্মীরের মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ ৩৫ বছরের নিচে। ৮৯’য়ের পর থেকে বহু তরুণের হাতে বন্দুক তুলে দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রজন্মের মনে তাও ভয় ছিল। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের মনে সাধারণ ভয়টুকুও অবশিষ্ট নেই। নির্ভীক হওয়ার অন্যতম কারণ আত্মসম্মান হনন। আশাহীনতা। ঝাপসা ভবিষ্যৎ। রাজনৈতিক নেতাদের উপর থেকে আস্থা চলে যাওয়া। কাশ্মীরিদের দাবি দাওয়া নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে কথা বললে সুরাহা বের করা, ছররা বন্দুক নিষিদ্ধ করা বা আফস্পা প্রত্যাহার কোনো সমাধান মেলেনি। তার প্রতিফলন পড়েছে ২০১৭ নির্বাচনে। শ্রীনগর বিধানসভায় ভোটের হার গত পাঁচ দশকের মধ্যে সবথেকে কম। ৭.১৪ শতাংশ। পুনর্নিবাচনে বাদগাম জেলার ৩৮টি বুথে সেই পরিমাণ ২ শতাংশেরও কম। কাশ্মীরের সরকারে থাকা পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টির যুব শাখার সভাপতি ওয়াহিদ উর রহমান পারার কথায়, ‘বড়রা নয়, এখন আমাদের আট বছর দশ বছরের ছোটোরা রাস্তায় নেমে নিজেদের ক্ষোভ উগরে দিচ্ছে। একজন তরুণ কাশ্মীরি ভারতকে এখন নিপীড়নের প্রতীক হিসেবেই মনে করে।’

গত শতাব্দীর নয়ের দশকে কাশ্মীরের তরুণ প্রজন্মকে ভারত বিদ্বেষী করে তোলার জন্য চেষ্টাও করা হয়েছে। আর এখন নিরাপত্তা বাহিনীর অত্যাচারের জন্য তরুণ প্রজন্মকে আর কাউকে বিশেষ শিখিয়ে দিতে হচ্ছে না। উসকানিরও প্রয়োজন ফুরিয়েছে। নিজোরই দলে দলে পথে নামছে। আত্মসম্মান রক্ষার জন্য। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। কাশ্মীরের এক মনস্তত্ত্ববিদের কথায়, ‘আশাপাশে যা ঘটছে ছোটরা তা নিজের মতো করে গ্রহণ করছে। নিজের মতো করেই তার বহিঃপ্রকাশও করছে। এত বেশি ভয় দেখানো হয়েছে যে ওরা নির্ভীকে হয়ে গেছে।’

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement