আশ্রয়দাতা ও জাদুকর

গৌতম চট্টোপাধ্যায়

৪ জুন, ২০১৭

বিরল সৌজন্য মনে হয় একেই বলে!

রোনাল্ডো কী এর আগে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সম্পর্কে এমন অগাধ প্রশংসা করেছেন? রোনাল্ডো আবেগতাড়িত হয়ে বলেছেন ‘আমি ওঁকে প্রচণ্ড সম্মান করি। পেশাদার জগতে আমরা সহযোদ্ধা, কিন্তু পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নই।’ এবারের লা-লিগাতে রিয়েল মাদ্রিদ চ্যাম্পিয়নের শিরোপা পেয়েছে, কিন্তু ফুটবলমোদীদের অনেকদিন মনে থাকবে ‘এল ক্ল্যাসিকো’র সেই লড়াই যেখানে রক্তাক্ত হয়েও রিয়েলের জালে দু’বার বল ঠেলেছিলেন বার্সার হয়ে লিও মেসি এবং ম্যাচও জিতেছিলেন। গোল লাইন থেকে জর্ডি আলবার মাইনাস যেভাবে পেছন থেকে অদৃশ্যভাবে উঠে এসে রিয়েল রক্ষণকে দাঁড় করিয়ে রেখে গোলে পুশ করে দিয়েছিলেন তা যেন ফুটবলের অবিস্মরণীয় দৃশ্যকল্প হয়ে রয়ে গেল। মাঠে দাঁড়িয়ে সেদিন রোনাল্ডো বোধহয় মেসির খেলাই দেখছিলেন। আর্জেন্টিনার টিভিতে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে রোনাল্ডো বলেন ‘সব ভালো ফটবলারদের মতো মেসির খেলাও আমার দেখতে ভালো লাগে। মেসি মানে উৎকর্ষ। ওঁর খেলা উপভোগ করি।’ বিগত সময়ে সংবাদমাধ্যমে বহু লাইন খরচ হয়েছে মেসি ও রোনাল্ডোর সম্পর্কের দ্বৈরথ নিয়ে। প্রচারমাধ্যমকে দোষারোপ করে রোনাল্ডো শুধু বলেছেন ‘আমাদের দুজনের সম্পর্ককে ইস্যু করে প্রচারমাধ্যম ব্যবসা করে। কিন্তু মেসিকে যখন আমাকে নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হয় ও আমাকে প্রশংসায় ভরিয়ে দেয়। গত ১০ বছরে ‘ব্যালন ডি ওর’ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ওঁর সঙ্গে বহুবার দেখা হয়েছে আমার। ওঁকে আমি শ্রদ্ধা করি।’

আর মেসি? উয়েফা চ্যাম্পিয়নস ফাইনালের আলোকবৃত্ত থেকে বহু দূরে মেসি তখন ব্যস্ত সিরিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুদের জন্য ২০টা ক্লাসঘর তৈরিতে। ইতিমধ্যে লিও মেসি ফাউন্ডেশন থেকে এই মর্মে অনুদান তুলে দিয়েছেন তিনি ইউনিসেফের হাতে। প্রায় ১৬০০ শিশু উপকৃত হবে এতে যাদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ সিরিয়ার এই যুদ্ধের কারণে মাথার ওপরে ছাদটুকু পর্যন্ত হারিয়েছে, বাড়ি ছাড়তেও বাধ্য হয়েছে অনেক বাচ্চা। মেসির দেওয়া টাকাতে সৌর প্যানেল সহ সমস্ত সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন ক্লাসরুম তৈরি হচ্ছে ওই শিশুদের জন্য। ২০১০ থেকে ইউনিসেফের দূত মেসি সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্টে লিখেছেন ‘যুদ্ধের দিনগুলো ভয়ংকর। সিরিয়ার শিশুরা ৬ বছর ধরে এই হিংস্রতার শিকার হয়ে আসছে যেখানে অনেক সময় তাদের পণবন্দিও করা হচ্ছে। একজন বাবা ও ইউনিসেফের দূত হিসেবে আমার হৃদয় ভেঙে গেছে। এই যুদ্ধ এখনি শেষ করার জন্য আপনার প্রতিবাদের কণ্ঠস্বরও ইউনিসেফের মাধ্যমে পৌঁছে দিন।’

মেসির দেশ আর্জেন্টিনাতে কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী আলফ্রেজে অস্টিজ। ‘মৃত্যুর স্বর্ণকেশ প্রতিভূ’ নামে খ্যাত অস্টিজ ১৯৭৬-৮৩ আর্জেন্টিনাতে সেনা শাসনের সময় নৌবাহিনীর অফিসার ছিলেন। আর্জেন্টিনায় জর্জ রাফায়েল ভিদেলার রক্তাক্ত একনায়কতন্ত্র চলাকালীন এই অস্টিজ কুখ্যাত হয়েছিলেন মানবতাবিরোধী নিপীড়ন, নির্যাতনের জন্য। ২০১১ সালে খুন, নির্যাতন, অন্তর্হিত করে দেওয়া প্রভৃতি অপরাধের বিচারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় ৬৫ বছর বয়স্ক অস্টিজের, সম্প্রতি আর্জেন্টিনার একটি সংবাদপত্রে ‘রূপান্তর’ শিরোনাম দিয়ে এহেন আলফ্রেজে অস্টিজের পরপর কয়েকটি ছবি প্রকাশ করা হয়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে তার মুখটা ক্রমশ পালটে মেসির মতো হয়ে যাচ্ছে। মেসির পরিবার এতে প্রচণ্ড চটেছেন ও তাঁরা ওই সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও ভাবছেন। অবশ্য মেসির সঙ্গে তাঁর স্বদেশের সম্পর্ক সবসময় মধুর থেকেছে এমন নয়। বার্সার হয়ে ৫০০ গোল করা মেসি আর্জেন্টিনার নীল সাদা জার্সিতে তেমন ঝলসে ওঠেননি বেশিরভাগ সময়। লা-লিসাথে যেখানে তাঁর গোলের গড় ম্যাচপিছু ১:১০, আর্জেন্টিনার হয়ে সেই গড় ১ এর অনেক নিচে।

‘মেসিকে কোচিং করতে পারলে তা হবে এক অনন্য অভিজ্ঞতা’ বলেছেন এরনেস্তো ভ্যালভেরডে। বার্সেলোনা ফুটবল ক্লাবে ম্যানেজারের শূন্য আসনে সবে অধিষ্ঠিত হয়েছেন তিনি এবং আগামী মরশুমের স্বপ্ন দেখছেন তিনি সেই লিও মেসিকে ঘিরে। মেসিকে তাঁর দেখা ফুটবলারদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলেছেন ভ্যালভেরডে। কিন্তু বার্সেলোনায় মেসির ভবিষ্যৎ? স্পেনের ফুটবল মহলে হালফিলে ঘুরছে প্রশ্নটা। বার্সার সঙ্গে মেসির বর্তমান চুক্তি ২০১৮’র জুন পর্যন্ত। বার্সা কর্তৃপক্ষ চুক্তি নবীকরণ চান। কিন্তু শোনা যাচ্ছে তাদের দেওয়া ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের নতুন চুক্তি নাকি প্রত্যাখ্যান করেছেন বার্সা কিংবদন্তী। বার্সায় তাঁর সতীর্থ লুই সুয়ারেজ বলেছেন মেসি হলো সর্বকালের সেরা। সুয়ারেজ ও নেইমার দু’জনেই নতুন চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছেন বার্সার সঙ্গে। ত্রিমুখী ফলার শীর্ষ বিন্দু কি করেন এখন তার অপেক্ষায় স্পেনের ফুটবল মহল।

Featured Posts

Advertisement