সিংহীগর্জন

শুভ্র মুখোপাধ্যায়

৪ জুন, ২০১৭

সামনে বসে থাকা ঝুলন গোস্বামী আদৌ আমাদের পরিচিতা নন। এই ঝুলন আদৌ বিশ্বরেকর্ডের অধিকারী হননি। বঙ্গ ক্রিকেটে যে ঝুলন গোস্বামীকে আমরা চিনি তিনি দীর্ঘকায়, পেস বোলিং করেন। চাকদহে থাকেন, আর একদা ভারতীয় দলের অধিনায়িকা হয়েছিলেন।

এর বাইরে ‘বাংলার সিংহী’কে সেইভাবে চেনার অবকাশ কোথায়! যিনি নিজেও বেশ খানিকটা বদলে গিয়েছেন, সাধারণ থেকে মহাতারকা হওয়ার বৃত্তটা যিনি চিনে নিয়েছেন সহজেই। মনোভাব বদলে ফেলেছেন অনেকটাই, না হলে হোয়াটসঅ্যাপের স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘ওয়ার্ক হার্ড ইন সাইলেন্স লেট সাকসেস মেক দ্য নয়েজ...’ নিঃশব্দে কঠোর পরিশ্রম করে যাও, সাফল্য যখন আসবে, সেইসময় এমনিই হইচই হবে।

আচ্ছা ঝুলন, আপনাকে কোনওদিন বাড়িতে রান্না করতে হয়েছে? কিংবা ঘর পরিষ্কার, বাসন মাজা? পাড়ার দোকান থেকে ওষুধ কিনে খেতে হয়? এই প্রশ্নগুলির উত্তর যত নরম সুরে আসবে ভাবা গিয়েছিলো, সেটি হয়নি। তিনি অবিচল, ‘আমার বেঁচে থাকার জন্য যা করতে হয় করবো, আমি তো অন্যায় কিছু করছি না। বাড়ির ঝুলন, আর বাইরের ঝুলন আমি মিলিয়ে ফেলি না। ঘরের মধ্যের দুনিয়া আমার কাছে একেবারেই আলাদা।’

‘বাংলার মহিলা ক্রিকেটের সৌরভ গাঙ্গুলির সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মনে হয় বিশ্বনজির করে ফেলা মানুষকে অনেককিছু শিখিয়ে দেয়। তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাকি মানুষদের থেকে আলাদা হয়। আলো-অন্ধকার, উত্থান-পতন — তাঁদের জীবনকে কখনও মসৃণ হাইওয়েতে গিয়ে ফেলে, আবার কখনও সাফল্যের কুতুবমিনার থেকে নীচটা দেখতে শেখায় আরও বিস্তৃতভাবে। রবিবার গভীর রাতেই তিনি ভারতীয় দলের সঙ্গে লন্ডনে উড়ে যাবেন বিশ্বকাপ ক্রিকেটে অংশ নিতে। তার আগে দমদম পার্কের বাড়িতে বসে এমনভাবে কথা বলছিলেন, মনে হবে আসল ম্যাচের আগে আরও একটি ম্যাচের জন্য বোলিং এন্ডে গিয়ে পা ঘসছেন!

---------------------------------------------------

প্রশ্ন : চাকদহের লালপুর থেকে গত ১৫বছরের এমন কঠিন সফর আপনার। কখনও কী মনে হয়, এই কষ্টটা না থাকলে সাফল্যের এমন উড়ান সম্ভব ছিলো না? বা নিজেকে প্রমাণ করতে অসুবিধে হতো?

ঝুলন : না, না, আমি জীবনকে অন্যভাবে দেখতে শিখেছি, সেটি আমার পরিবার শিখিয়েছে। ভাবুন তো, সারা দেশে কত মানুষ একবেলা ভালো করে খেতে পায় না? তাঁদের মাথার ওপর কোনও ছাদ নেই, তাঁরা কষ্ট করছেন না? আমি আমার কাজ করে গিয়েছি, ওটাই আমার প্যাশন ছিলো বলতে পারেন। ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখার মধ্যে কোনও কৃতিত্ব নেই, জেগে স্বপ্ন দেখতে হবে। আমি সেটা করেছি, ভোর চারটেতে ঘুম থেকে উঠে মুখ-হাত-পা ধুয়ে ব্যাগ নিয়ে অন্ধকারের মধ্যে চাকদহ স্টেশন থেকে ফার্স্ট ট্রেন ধরেছি, সেইসময় যদি ঘুমিয়ে থাকতাম, তা হলে কী এই দিনটা পেতাম, আপনিই বলন? কিছু করতে গেলে কিছু ছাড়তে হবে, যাঁরা সাফল্য পায়, সবাই সেটি করেছেন, তা হলে আমার কষ্টকে অন্যভাবে দেখাবো কেন?

প্রশ্ন : বঙ্গ ক্রিকেটের সেরা আইকন বলতে আমরা এতোদিন বুঝতাম সৌরভ গাঙ্গুলিকে। কিন্তু এইপ্রথম সকলের মনে হচ্ছে ঝুলন আপনি নিজেও বাংলা ক্রিকেটের অন্যতম সেরা বিজ্ঞাপন। সত্যিই কী কৃতিত্বের দিক থেকে সৌরভকে ছোঁয়া গিয়েছে? না যাবে?

ঝুলন : আমি ওইভাবে ভাবতে চাই না, দেখিও না, তুলনা আমার পছন্দ নয়। আর এমন একজন ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আমার তুলনা, যিনি প্রথম লর্ডসের মাঠে অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি করে বাঙালিকে বুঝিয়েছিলেন তোমরাও পারো, তোমরাও স্বপ্ন দেখতে শেখো। আমি পারলে তোমরা পারবে না কেন? সৌরভ গাঙ্গুলি আমাদের কাছে রোলমডেল, তাঁকে দেখে আমরা শিখেছি, শিখছিও। তিনি আমাদের মতো সাধারণদের দর্শনকে পালটে দিতে শিখিয়েছেন। হয়তো আমাকে দেখে অনেক মহিলাদের মনে হচ্ছে ক্রিকেটার হলেও মন্দ হয় না, সেটি আমার কৃতিত্ব বলবো না, আমাদের মনোভাবের পরিবর্তন ঘটেছে। ক্রিকেট আমাকে অনেককিছু দিয়েছে, যা ভাবিনি, তাই পেয়েছি, সেই কারণে তার প্রতি ভালোবাসা গভীর, তার থেকেই এখনও দৌড়ে চলেছি।

প্রশ্ন : ঝুলন, আপনি এখন বাংলার মেয়েদের গর্বের চূড়ান্ত নিদর্শন। আপনার কী মনে হয়, সমাজের চেতনা ফেরাতে মহিলাদের সম্মান প্রতিষ্ঠার জন্য কী করনীয়?

ঝুলন : একে অপরকে সম্মান প্রদান, একে অপরের দুঃখে সামিল হওয়া। জাতিভেদ কেন থাকবে এখনও? নারী-পুরুষ ভেদাভেদ কেন বয়ে বেড়াবো আমরা? সামাজিক শিক্ষা জরুরি, সঠিক শিক্ষা, দেখবেন রাস্তাঘাটেও সেই মনোভাবের ছায়া তৈরি হবে। এখনও তো বাসে বয়স্ক মহিলা দেখে কেউ না কেউ সিট ছেড়ে দেয়, তা হলে সব শেষ হয়ে যায়নি। কিছুটা বাকি রয়েছে, সেটিকে ধরেই একশোয় একশো করতে হবে, আমার মনে হয় মহিলাদেরও নিজের ভুলটা ধরতে হবে, তাদের সীমাবদ্ধতা বুঝতে হবে।

প্রশ্ন : ওয়ান ডে ক্রিকেটে বিশ্ব রেকর্ড। সর্বোচ্চ উইকেটের মালকিন (১৮১টি উইকেট), সকলকে ছাপিয়ে নয়া কীর্তি, এইগুলি সম্ভব হলো কী করে?

ঝুলন : ক্রিকেটকে ভালোবাসি, তারজন্য সব ত্যাগ করেছি। তাকে ঘিরেই আমার জীবন, খেলতে খেলতেই কত কীর্তি পার হয়ে যায়। আমার নজিরও কেউ টপকে যাবে, ওসব আমি মনে রাখি না, তবে তৃপ্তি পাই, নিজের কাজের স্বীকৃতি পেতে গেলে আপনাকে কিছু করে দেখাতে হবে, না হলে সাধারণের ভিড়ে হারিয়ে যাবেন।

প্রশ্ন : কাকে দেখে ক্রিকেটে আসা, আপনার আইডল কে?

ঝুলন : কাউকে দেখে আসা নয়, বাড়ির উঠোনে ক্রিকেট খেলতাম। ১৯৯২সালের বিশ্বকাপ, পাড়ায় দারুণ উন্মাদনা, আমি তো অস্ট্রেলিয়ার বেলিন্দা ক্লার্ক বলতে পাগল, তাঁকে দেখছি, কী সুন্দর খেলতেন। নিজেই বলে উঠতাম বন্ধুদের, আমি বেলিন্দার মতো হবো। পাড়ায় ছেলেদের দলে খেলতাম, নিতে চাইতো না, কান্নাকাটি করে দলে ঢুকতাম, কয়েকটি ম্যাচে ভালো খেলার পরে আর বসাতে পারিনি।

প্রশ্ন : কোনও বিশেষ আক্ষেপ, যা এখনও পাওয়া হয়ে ওঠেনি?

ঝুলন : আমার ব্যক্তিগত কোনও আক্ষেপ নেই, যেটি পাবো না, তা নিয়ে আক্ষেপ করে লাভ নেই, নিজের সীমার মধ্যে যা রয়েছে, চেষ্টা করো। আর ক্রিকেট তো দলগত খেলা, সেখানে ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া থাকতে পারে না। বিশ্বকাপ যদি পেতাম, সেদিক থেকে দেশকে গর্বিত করতে পারতাম।

প্রশ্ন : এবার ইংল্যান্ডে মহিলা বিশ্বকাপে ভারত কতোটা ফেভারিট? কারাই বা কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারে?

ঝুলন : ভারতের ক্রিকেট সমৃদ্ধ, তারা জেতার জন্যই মাঠে নামে। আর ফেভারিট কেউ হয় না বড় মঞ্চে, সব দলই বাকি দলগুলির সম্পর্কে অবহিত। বিশ্বকাপের মতো মেগা ইভেন্টে খেলতে নামার আগে শারীরিক ও মানসিকভাবে তরতাজা থাকতে হয়, যে দল সেটি পারবে তারাই সাফল্য পাবে। যে দল অন্যদের বিষয়ে ভালো হোমওয়ার্ক করতে পারবে, তারাই জিতবে।

প্রশ্ন : সর্বকালের সেরার তালিকায় কাকে রাখবেন?

ঝুলন : আমার দেখা সেরা ক্রিকেটার দুজন, বেলিন্দা ক্লার্ক, আর শচীন তেন্ডুলকার। অস্ট্রেলিয়ার বেলিন্দা ওয়ান ডে ক্রিকেটে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি করেছিলেন, এই কৃতিত্ব কারোর ছিলো না। বেলিন্দা খেললেই মনে হতো মাঠকে শাসন করছেন। আর শচীন হলেন এক জাতি, একা একটা মানুষ দেশকে ক্রিকেটের দূত হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। ২৫বছর ধরে ক্রিকেট খেলা, সেইসঙ্গে অমন সাফল্য, কল্পনা করাও কষ্টকর। শচীনকে দেখে কোনও বিশেষ ব্যক্তি নয়, একটা জাতি মনে হয়, যিনি কিনা পুরো দেশকে সামনে থেকে মাঠে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

প্রশ্ন : শচীন না কোহলি? কাকে এগিয়ে রাখবেন?

ঝুলন : আমি আমার উত্তর দিয়ে দিয়েছি আগেই। শচীনের সঙ্গে কারোর তুলনা চাই না। তবে বিরাট আমাদের দেশের ক্রিকেটের নতুন সেনশেসন, নতুন রোমাঞ্চ নিয়ে এসেছেন, এটা উপেক্ষা করা যাবে না। বিরাটকে দেখে শচীন নয়, ওকে দেখে মনে হয় একজন ভালো ক্রিকেটারের যা গুণ দরকার, সবটাই রয়েছে বিরাটের খেলায়। নিজে জেতানোর ক্ষমতা রাখে, মাঠে নেতৃত্ব দেয় সামনে থেকে, লিডিং ফ্রম দ্য ফ্রন্ট। নিজে দায়িত্ব নিতে জানে, ব্যর্থতাও নিজের কাঁধে অনায়াসে নিতে পারে। বিরাটও অন্যরকম ধাতুতে গড়া।

প্রশ্ন : বাংলা থেকে জাতীয় দলে মহিলা ক্রিকেটারের সংখ্যা কমছে কেন? রুমেলি ধর, প্রিয়াঙ্কা রায়রা উঠেও হারিয়ে গেলেন, কেন এমন হচ্ছে?

ঝুলন : সার্বিক উন্নতি প্রয়োজন, সি এ বি-র উচিত জেলা ভিত্তিক লিগ করা, করছে না তা নয়, করছে, কিন্তু আরও বিস্তৃতভাবে করতে হবে, সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ, যদি দরকার লাগে আমিও থাকবো রূপরেখা দেওয়ার জন্য। স্কুলগুলিতে মেয়েদের জন্য ক্রিকেটের ব্যবস্থা করা। যদি খেলার সুযোগই না পায়, ক্রিকেটার উঠবে কী করে? স্কুল স্তরে মহিলা ক্রিকেট চালু করতে হবে, দেখবেন বাংলা থেকে অনেক ঝুলন উঠে আসছে।

প্রশ্ন : ক্রিকেট থেকে অবসরের পরে কী ভাবনা, কোচ না প্রশাসক, না রাজনীতি করবেন?

ঝুলন : এখনও কিছুই ঠিক করিনি, আরও খেলতে চাই, কোচ হবো কিনা জানি না, আর রাজনীতি তো নয়ই, ওটা আমার আসে না, বুঝিও না, ভালোও লাগে না। তবে খেলে যাবো, যতদিন শরীর ফিট রয়েছে, ততদিন খেলবো। কেউ যেন না এসে বলতে পারে, এবার সরো, জুনিয়ররা খেলুক, যেদিন দেখবো, আমার মন দিচ্ছে না, শরীরও বলছে থামতে, সেদিন কাউকে বলতে হবে না, আমি নিজেই সরে যাবো।

প্রশ্ন : সমাজে এখনও নারীদের নিরাপত্তা নেই, তারা নিজের শক্তিতে বলিয়ান, তবুও যেন সমাজে স্বীকৃতি মিলছে না, এর সমাধান কোথায়?

ঝুলন : নিজেদের দৃষ্টি বদলাতে হবে। যতদিন হিংসা থাকবে, এইসব থাকবে। মহিলারা কী না পারে, সবই পারে। এই তো আমি একটা লেখা লিখেছি, তাতে বলেছি সব স্তরের পরীক্ষায় মহিলারা প্রথম হচ্ছে, এতেই বোঝা যায়, মেধাতেও মহিলারা এগিয়ে। আমরা সবাই রক্তে মাংসে গড়া মানুষ, ভুল হতে পারে, ঠিকও হবে, তাকে সম্মান দেখাতে হবে। তবে ভয় পেলে হবে না, অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলে অপরাধীরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে, যা আমাদের সমাজের পক্ষে ভালো হবে না।

--------------------------------------

একঝলকে ঝুলন

--------------------------------------

ডাকনাম : বাবুল

বর্তমান ঠিকানা : দমদম পার্ক

সেরা ক্রিকেটার : শচীন তেন্ডুলকার/ বেলিন্দা ক্লার্ক

প্রথম কোচ : স্বপন সাঁধু

জীবনে বড় প্রভাব : ঠাকুমা

ক্রিকেটের বাইরে : ফুটবল ম্যাচ দেখা

প্রিয় দল : ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড

সেরা গায়ক/গায়িকা : কিশোর কুমার/লতা মঙ্গেশকর

অভিনেতা-অভিনেত্রী : আমির/কাজল

সেরা সিনেমা : রঙ দে বাসন্তি/থ্রি ইডিওটস

আদর্শ : স্বামী বিবেকানন্দ

বিবাহ : এখন তো নয়ই

নিজের মন্ত্র : কঠোর পরিশ্রম

সেরা ব্যক্তিত্ব : অমিতাভ/রেখা।

-----------------------------------

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement