কেউ কথা রাখে না

প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়

৪ জুন, ২০১৭

অনি কান্নায় ভেঙে পড়ছিল। এখন সারা চত্বরটা জুড়ে ঘন অন্ধকার নেমে এসেছে। মোল্লাপুর স্টেশনের ওভার ব্রিজের ওপর ও দাঁড়িয়ে আছে । আপাতত ট্রেন চলে গেছে তাই স্টেশন নিঃঝুম। আর নিঃঝুম হবে না-ই বা কেন। এই গণ্ডগ্রাম মোল্লাপুরে ট্রেন থেকে আর কটা লোক নামে। বলতে গেলে গোটা বিশ-পঁচিশজন। তারা চলে গেলেই স্টেশন চত্বর একেবারে শুনশান। তার ওপর এখন শীত আসছে। ক্রমশ ধূসর হচ্ছে পরিবেশ। রাতের গায়ে লাগছে আলতো শীতের প্রলেপ। তাই ক্রমে আরো কমে যাবে ট্রেনের যাত্রী। ওভার ব্রিজটার উচ্চতা বেশ উঁচু হওয়ায় অনিরও ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব লাগছিল। অনি কান্নাকে দাঁতে দাঁত চেপে পেটে ঢুকিয়ে নিল।

অনি চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। ও বুঝতে পারছে না এটা সম্ভব কিনা। কেউ কী কখনও অনেক কিছু ভাবা-টাবার পর সুইসাইড করেছে! অনেক ভেবেও ও এর কোনও উত্তর পেল না। তবে একজনের কথা মনে পড়ল। হাসিকাকিমা। সে অনেক দিনের কথা। তখন ও ক্লাস এইটের ছাত্র। তবু বেশ মনে আছে। অনেকদিন ধরে হাসিকাকিমা বলত আর বাঁচার ইচ্ছা নেই। একদিন নিজেকে শেষ করব। তারপর সত্যিই একদিন ট্রেনে মাথা দিয়ে হাসিকাকিমা সুইসাইড করল। এর কারণ একটাই, ভোম্বলকাকা তাকে সব সময় সন্দেহ করত। হাসিকাকিমার অপরাধ, সে ছিল পরমা সুন্দরী। হঠাৎ করে এই স্টেশনের ওভার ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে কেন যে হাসিকাকিমাকে মনে পড়ল কে জানে! অনি চারিদিকটা চেয়ে দেখল, ওদিকটা স্টেশন মাস্টারের ঘর। সেখানে কিছু লোকজন আছে। ওদিকে কাউন্টারের কাছে একটা ছোট্ট জটলা আছে। আর প্ল্যাটফর্মের পাশেই একটা ঝুপড়িতে চলছে সাট্টার আড্ডা। অনি জানে, একটু পরেই ওই সাট্টার ঠেকে ঝামেলা শুরু হবে। মদো-মাতালদের খিস্তি-খেউর শুরু হবে। ও ঠিক করল লাস্ট ট্রেন এলেই ও কাজটা সেরে ফেলবে। শুভস্য শীঘ্রম।

এই ওভার ব্রিজে দাঁড়িয়ে ওর হঠাৎ জীবনানন্দ দাশকে মনে পড়ল। আর তখনই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। এখনও গভীর শীত আসেনি। সবে শীতের পাপড়ি খুলতে শুরু করেছে। আর তাতেই শীত শীত অনুভূতি এসে গেছে সন্ধের পর। হঠাৎ হাসি পেল অনির। এই শীত শীত সন্ধ্যায় জীবন আর মৃত্যুর অদ্ভুত এক সীমানায় দাঁড়িয়ে ওর কেন মনে পড়ল জীবনানন্দ দাশকে! ভেবে পেল না। তবু একটু জোর গলাতেই ও উচ্চারণ করল তাঁর কবিতার সেই লাইন গুলো। ‘এই সব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে; বাইরে হয়ত শিশির ঝরছে কিংবা পাতা, কিংবা প্যাঁচার গান; সেও শিশিরের মতো...।’ হঠাৎ থেমে গেল অনি। আর উচ্চারণ করতে ভালো লাগছে না।

কেউ কথা রাখেনি।

তার মায়ের কথা মনে পড়ল। এখনও স্পষ্ট মনে আছে অনির। ভাঙাচোরা বাড়ির বিশাল ঘরের জানালার ধারে বিছানায় সে আর মা শুয়ে আছে। পাশের ঘরে বাবা। ঘরের জানালা দিয়ে বাইরের অনেকটা আকাশ দেখা যাচ্ছে। যতই হোক গ্রাম তো। আকাশ ঢাকতে পারেনি সুউচ্চ অট্টালিকা। সেই আকাশে মেঘ ভেসে চলেছে। বিছানায় সে আর মা। বাইরের পরিবেশ আলো-আঁধারিতে মেশা। মা তার কপালে হাত বোলাচ্ছে। মাথার চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে রূপকথার গল্প শোনাছে। মায়ের গল্প বলার মধ্যে অদ্ভুত শিল্প কাজ করত। বলার অসাধারণ ঢঙে কোনোদিনও মনে হত না মা বানিয়ে বলছে। গল্পের কোন্‌ অতলে ঢুকে যেত অনি। মা কখনও কখনও গল্প থামিয়ে চুপি চুপি তার কপালে চুমো খেতে খেতে বলত, সারা জীবন তোর পাশে থাকব অনি। তুই বড় হ’। কেউ কথা রাখে না। মা কথা রাখেনি।

এখনও অনির মনে পড়ে সেই সন্ধেটার কথা। হঠাৎ মা মারা গেল। বাবা তখন অফিস থেকে ফিরে এসেছে। সমস্ত প্রতিবেশীরা তাদের বাড়ির ভিতর। মাকে তারা সিঁন্দুর দিয়ে লেপে দিয়েছিল। ওরা বলাবলি করছিল, বড় ভাগ্যবতী। কথাটা অনির বুকে তীরের মতো লেগেছিল। এই সাজানো সংসার পড়ে আছে। মা চলে গেছে, আর কোনোদিনও ফিরবে না। ভাগ্যবতী কেন! কাউকে প্রশ্ন করতে সাহস পায়নি সেদিন। মাকে দাহ করে আসার পর বাবা গভীর রাতে তার কপালে স্নেহের হাত বোলাতে বোলাতে বলেছিল, এখন থেকে আমিই তোর মা এবং বাবা। অনি এই আধো শীত সন্ধ্যা পেরনো রাতে স্টেশনের ওভার ব্রিজে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলো, বেইমান। কথা রাখেনি বাবাও। মায়ের মৃত্যুর কয়েকমাস পরেই আবার বিয়ে করেছিল।

সে ঘড়ি দেখলো, রাত ন’টা। লাস্ট ট্রেন আসতে এখনো একঘন্টা বাকি। মোল্লাপুর গ্রাম যদিও এই ন’টাতেই গভীর রাতের আকার নিয়েছে পরিবেশ। অনি দূরের দিকে তাকিয়ে ছিল। রেল লাইনের ওপর আবছা ধোঁয়ার আস্তরণ। যতদূরে চোখ যায়, শূন্য আর শূন্য। শূন্যতার তেপান্তর যেন। কেউ কথা রাখে না। বুকটা হু হু করে উঠলো অনির।

দীপশিখা। কথা রাখলো না। অনি কান পেতে কিছু শোনার চেষ্টা করলো। মনে হল, সানাইয়ের সুর আসছে। সানাই! বড় আজব সুরের কারিগর। আনন্দে-সুখে-দুঃখে-শোকে সুর হয়ে জড়িয়ে আছে মানুষের অনুভবে। কথা রাখলো না দীপশিখা। অথচ বলেছিল, কথা রাখবে সে। বলেছিল, এ কথা যেমন সত্যি তেমন এ কথাও সত্যি করবে সে, কেউ কেউ কথা রাখে। হায়, কেউ কথা রাখে না। হঠাৎ যন্ত্রণায় ভাঙতে ভাঙতে হাসি পেল অনির। রাত এগোছে। পেরিয়ে যেতে চলেছে ঘড়ির কাঁটা সাড়ে ন’টার ঘর। আর কিছুক্ষণ পরেই দূরে ভেসে উঠবে ক্ষীণ আলো, তারপর সে আলো হবে জোরালো, বাজবে হর্ন। প্ল্যাটফর্মে ঢুকবে ট্রেন। তার আগেই তাকে প্রস্তুত হতে হবে। অপেক্ষা করল না সে। নেমে এল প্ল্যাটফর্মে।

প্রায় যাত্রী নেই বললেই চলে। তবে ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকলে বেশ কিছু যাত্রী নামে। লাস্ট ট্রেনে চিরদিনই কিছু না কিছু যাত্রী থাকেই। অনি আধো আলোছায়ামাখা জায়গায় দাঁড়ালো। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। এই মুহূর্তে কোনও ভাবনাই নেই তার মধ্যে। ভাবনারা হয়তো হারিয়ে গেছে। আর তখনই ট্রেনের হেড লাইট উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। এক অদ্ভুত চিন্তাশূন্যতায় প্ল্যাটফর্মের একেবারে ধারে চলে গেল ও। কেউ যেন ওর শরীরের কন্ট্রোল নিয়েছে। এমনই অবস্থা অনির। ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢোকাবার আগেই গতি কমায়। অনি ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করল লাইনের ওপর। ঠিক তখনই কেউ যেন প্রবল শক্তিতে ওর জামাটা খামচে ধরে ওকে টেনে নিল। অনি প্ল্যাটফর্মের ওপর পড়ে আছে। ট্রেন থামতেই কয়েকজন যাত্রী ওকে দেখে সমবেদনা জানাল। কেউ বা যাচ্ছেতাই করে বলে গেল। কেউ বা বলল, জোর বেঁচে গেছেন। অনি মাথা তুললো না। মুখ গুঁজে পড়ে রইল প্ল্যাটফর্মে। নিজেও কথা রাখতে পারল না মৃত্যুর কাছে। এখন তার লজ্জা করছে। ঠিক করল, আর কিছু করার নেই। প্ল্যাটফর্ম শূন্য হলে তবেই মুখ তুলবে ও।

রাত বাড়ছে হু হু করে। কখন বেজে গেছে দশটা। অনি সেই ভাবেই পড়ে আছে। হঠাৎ তার মনে হল, কেউ যেন তার পিঠে হাত বোলাচ্ছে। অবিকল মায়ের স্পর্শ। সে চিৎ হয়ে বলল ‘কে?’ আর তখনই চমকে উঠে বলল, দীপশিখা তুমি! তোমার না বিয়ে!

দীপশিখা স্থির ভাবে চেয়ে আছে অনির মুখের দিকে। তার চোখে টলটল করছে জল। শুধু বলল, ওঠো, আমাদের এক্ষুণি কেটে পড়তে হবে। আমার বাড়ি জুড়ে হইচই শুরু হয়ে গেছে এতক্ষণে। অনি তড়াক করে উঠে পড়ে বলল, কোথায় যাব? আমার বাড়ি তো যাবার উপায় নেই, তোমার পাশেই তো আমার বাড়ি। দীপশিখা বলল, আমার বান্ধবীর বাড়ি। তাকে সব বলা আছে।

এখন রাত গভীর। বান্ধবীর বাড়ির একটা ঘরে অনি আর দীপশিখা। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে মনে হয়। কারণ বাড়ি একেবারে স্তব্ধ। অনি বলল, আমায় বাঁচালে কেন? দীপশিখা মৃদু হেসে বলল, কথা রাখব বলে? ঘরের আলো নিভে গেল। সুখ-অন্ধকার ওদের ঢেকে দিল।

Featured Posts

Advertisement