মুক্তচিন্তার কণ্ঠরোধ

কলতান দাশগুপ্ত

১৯ জুন, ২০১৭

গোটা দেশ জু‍‌ড়ে উৎস‍‌বের মরশুম চলছে। মোদী সরকারের তৃতীয় বর্ষপূর্তি। নেতা-মন্ত্রীরা ছড়িয়ে পড়ছেন দেশের কোনায়, কোনায়। দলিতের বাড়িতে পাত পেড়ে খাওয়ার হাসি মুখ ছবি আছড়ে পড়ছে ফেসবুকের দেওয়ালে। ‘আচ্ছে দিন’ এসেই গেছে!

এরই মাঝে, গত তিন বছরের নানান ঘটনার রেশ ধরে মোদী সরকার ফের কোপ মেরেছে শিল্প সংস্কৃতির আঙিনায়। কেরালা আন্তর্জাতিক তথ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবির আর্ন্তজা‍তিক উৎসবে আরও নানান ছবির পাশে ছিল তিনটি ছবি। একটি কাশ্মীরের প্রতিবাদ নিয়ে, একটি হায়দরবাদ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রোহিত ভেমুলার মৃত্যুর ঘটনার নিয়ে এবং অন্যটি জে এন ইউ-তে উত্তাল ছাত্র আন্দোলন নিয়ে। কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক এই তিনটি ছবি দেখানোর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এই নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক।

মোদী সরকারের জমানায় ফতোয়া শব্দটি আর আমাদের কাছে নতুন নয়। কে কি খাবে, কে কি পরবে, এই জাতীয় নানা ফতোয়া গত তিন বছরে দে‍‌শের মানুষের উপর নেমে এসেছে। কিন্তু সেইসব ফতোয়ার বড় অংশ আসত আর এস এস- বি জে পি’র কোন নেতার মুখ থেকে। আর এস এস-এর থেকে এইরকম ফ‍‌তোয়া আসতে পারে, এটা এই সময়ের ভারতবর্ষে প্রায় ধরেই নেওয়া হয়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, কেন্দ্রীয় সরকারের একটি দপ্তর থেকে এই অগণতান্ত্রিক ফরমান জারি করা হচ্ছে। কারো কোনো বক্তব্য যদি সরকারের ভাবনায় কোন আঘাত হানে বা ভাবনার বিরোধী হয়, নির্মম আঘাত নামিয়ে আনা হ‍‌চ্ছে সেই মতামতের উপর। বার্তা খুব স্পষ্ট, সমস্ত ভাবনার গতিমুখ একইরকম হতে হবে, হতে হবে মোদী বা আর এস এস ঘোষিত হিন্দু জাতীয়তাবাদের যে লাইন, সেই লাইন অনুযায়ী। তার বাইরে কিছু হলেই, থামিয়ে‍‌ দেওয়ার সবরকম চেষ্টা হ‍‌চ্ছে ওই মতামতকে।

এককথায় বলতে গেলে,‍ দেশের সংবিধান সাধারণ মানুষকে যা যা অধিকার দি‍‌য়েছে, তার বিরুদ্ধেই কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করেছে মোদী সরকার। এইরকম চলতে থাকলে ‘সাংবিধানিক অধিকার’ শব্দটি কয়েকদিন পর জাদুঘরে স্থান পাবে। সিনেমার মাধ্যমে বা অন্য কোনও ভাবে, নিজের ভাবনাকে লোকের সামনে উপস্থাপিত করতে কেন্দ্রীয় সরকার আটকাচ্ছে — এর থেকেই এটা স্পষ্ট হয় যে, মতপ্রকা‍‌শের স্বাধীনতাকে এখন থেকে শুধু বইয়ের পাতাতেই আটকে রাখার চেষ্টা করছেন মাননীয় মোদীজী।

‘In the shade of fallen chinar’ তথ্যচিত্রটি কাশ্মীরের ঘটনাবলি নিয়ে তৈরি। এর অন্যতম নির্মাতা শন সেবস্টাইন ইতি‍‌মধ্যেই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। শন এবং অপর সহ নির্মাতা ফয়জল এন সি দেখাতে চেয়েছিলেন যে, কিভাবে কাশ্মীরি যুবকরা শিল্পের মাধ্যমে নিজের রাগ, ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রশিল্পী ও সংগীত ‍‌নিয়ে যারা পড়াশোনা করেন, তাদের কথাই উঠে এসেছিল ছবিতে।

১৬মিনিটের কিছু বেশি সময়ের তৈরি তথ্যচিত্রটি দেখিয়ে কিভাবে কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল ছাত্রছাত্রী কিভাবে বন্দুকের বদলে সংস্কৃতিকেই প্রতিবাদের মাধ্যম করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পড়ে যাওয়া একটি মৃত চিনার গাছকে কেন্দ্র করে যে প্রতিবাদের নতুন মাধ্যম গড়ে তোলা হয়েছিল, তাই দেখানো হয়েছে এই তথ্যচিত্রে। গত বছর হিজবুল কম্যান্ডার বুরহান ওয়ানির হত্যার আগেই জুন মাসে এই তথ্যচিত্রটি তৈরি হয়েছিল। গ্রাফিক আর্ট থেকে সঙ্গীত থেকে জার্নাল- তারা কিভাবে জীবনকে দেখছে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। তথ্যচিত্রের শেষে ছায়াছন্নভাবে দেখানো হয় বুরহান হত্যার পরে কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শিল্পীদের আন্দোলনে দমন করা হয়। তাই এই তথ্যচিত্রে যে ছাত্রদের দেখানো হয়েছে তাদের সাথে নির্মাতারা যোগাযোগ করতে পারেননি।

‘March March March’ তথ্যচিত্রটি তৈরি হয় জে এন ইউ-তে ঘটে চলা ছাত্র আন্দোলন নিয়ে। সেই উত্তাল ছাত্র আন্দোলনের সময়ে কাথুলুকোসে ওখানে ছাত্রী ছি‍‌লেন। তথ্যচিত্রটি না দেখে, শুধুমাত্র সংক্ষিপ্তসার পড়েই তথ্যচিত্রটিকে ঐ উৎসবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়! জে এন ইউয়ের ছাত্র আন্দোলনকেও দেশবিরোধী তকমা লাগায় আর এস এস- বি জে পি। তীব্র দমনপীড়নের মুখে দাঁড়িয়েও জে এন ইউয়ের ছাত্রদের অসমসাহসী লড়াই গোটা দেশের কাছেই প্রেরণা হয়ে ওঠে। জে এন ইউ নিয়ে আর এস এস- বি জে পি যে হিংস্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ছাত্রছাত্রীদের ওপর, তা কার্যত নজিরবিহীন। ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ে জে এন ইউয়ের ছাত্ররা সমস্ত চক্রান্ত ব্যর্থ করে জয় ছিনিয়ে আনে। মুখ পোড়ে সরকারের।

অন্যদিকে, দলিত গবেষক রোহিত ভেমুলার আত্মহত্যার ঘটনার পর হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের যে উত্তাল আন্দোলন তারই প্রেক্ষিতে তৈরি ‘The Unbearable being of lightness’। হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ছাত্রের বিরুদ্ধে আর এস এসের ছাত্র শাখা এ বি ভি পি-র আক্রমণের ঘটনা এবং তার পরবর্তীতে রোহিতের আত্মহত্যা করতে বাধ্য হওয়া দেশের ক্যাম্পাসে আগুন ধরায়। কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের তল্পিবাহক উপাচার্যের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ ওঠে। রামচন্দ্র পি এন এর তৈরি এই তথ্যচিত্রের ক্ষেত্রে ঘটনাটি আরও চমৎকার। রোহিত ভেমুলার জীবন অবলম্বনে তৈরি এই তথ্যচিত্রটি আগে কয়েকবার দেশের অন্যত্র প্রদর্শিত হয়েছে ! নির্মাতা স্পষ্টতই এই ঘটনাটিকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ আখ্যা দিচ্ছেন।

কেরালা রাজ্য চলচ্চিত্র অ্যাকাডেমির চেয়ারম্যান কামাল কেন্দ্রীয় তথ্য সম্প্রচার মন্ত্রকের এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, দেশে সাংস্কৃতিক জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। কেন কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক এই তথ্যচিত্রগুলিকে নিষিদ্ধ করলো সেই বিষয়ে কোনো বক্তব্য জানানো হয়নি। In The Shade of Fallen Chinar এর পরিচালক সেবাস্টিয়ান বলেছেন, এই উৎসবে আমার ছবিটি প্রতিযোগিতামূলক ছবির বিভাগে ছিল। সংবাদপত্রের রিপোর্ট থেকে জানতে পেরেছি ছবিটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে উৎসবে। তথ্যচিত্রটি শুধু এই উৎসবের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে নাকি যেকোনো প্রকাশ্য জায়গায় প্রদর্শনীতেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে সেটাও জানা নেই বলে জানিয়েছেন সেবাস্টিয়ান। উল্লেখ্য, তথ্যচিত্রটি অনেকদিন ধরেই ইউটিউবে দেখা যাচ্ছে। ‘March March March’ তথ্যচিত্রটিও প্রতিযোগিতা বিভাগে ছিল। ‘Unbearable Being of Lightness’ দেখানোর কথা ছিল ফোকাস বিভাগে। কামাল বলেছেন, এটা শিল্পীদের জন্য অত্যন্ত খারাপ সময়। যাঁরা দেশজুড়ে অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে তাদের কাজের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

তিনটি তথ্যচিত্রের ক্ষেত্রেই একটি বিষয় স্পষ্ট। তা হলো তিনটি ঘটনাতেই বেকায়দায় পড়েছে মোদী সরকার। এবং তিনটিই দেশের তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা। দেশের বিভিন্ন অংশের ছাত্র-যুবদের প্রতিবাদ। সেই প্রতিবাদের ছবিকে চাপা দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা। ইট-পাথর ছুঁড়ে নয়। বোমা-গুলি নয়। শিল্পের মাধ্যমে, ছবির মাধ্যমে প্রতিবাদকে তুলে ধরলেও এত আতঙ্ক কেন? শিল্পের মাধ্যমে বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনাবলি তুলে ধরলে কেন ভয় পে‌য়ে যান মোদী-অমিত শাহরা ? দেশের কোনও কোনায় সামান্য সরকার বিরোধী কথা হলেই কেন সেই স্বরের কণ্ঠরোধ করতে ঝাঁপিয়ে‌ পড়ে উগ্র হিন্দুত্বের বাহিনী? প্রশ্নগুলো সহজ —উত্তর আপনার জানা। মুক্তচিন্তার মানুষগুলো একের পর এক খুন হয়ে যাচ্ছেন আমাদের দেশে। মুক্তচিন্তার জমিতে জায়গা করতে না পেরে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়কেই দেশদ্রোহী বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সরকার বিরোধিতার আশঙ্কায়, না দেখেই বাতিল করা হচ্ছে তথ্যচিত্র প্রদর্শনী। যুক্তিহীন ঘৃণা এবং অসীম আনুগত্য মি‍‌শিয়ে‌ চলছে দেশীয় হিটলার তৈরির ঘৃণ্য প্রচেষ্টা। এই ঘৃণা ও আনুগত্য ঠিকঠাক মিশে গেলে গোটা দেশ জুড়ে যুক্তিবাদের কাঠামোকে ভেঙে ফেলা যায়।

এই প্রবণতা রোধ করতেই হবে আমাদের। অঘোষিত জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে ঘোষিত যুদ্ধ। কেরালাতে এস এফ আই এই ‘নিষিদ্ধ’ তথ্যচিত্রগুলি দেখানোর ব্যবস্থা করেছে রাজ্যের প্রায় ১৫০ ক্যাম্পাসে। কিন্তু প্রতিবাদ বা প্রতিরোধটা শুধুমাত্র একটা ক্ষেত্রে আবদ্ধ থাকলে হবে না।

জেগে‍‌ থাকার সময়‌ এখন। জে‍‌গে না থাকলে লুট হতে পারে দেশের মানুষের অধিকার, যুক্তিবোধ, ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহ্য। রুটি, রুজির মতোই সমান আক্রান্ত হচ্ছে মনের ভাবনা, গলার স্বর। এই পরিস্থিতিতে ‘আমাকে আমার মতো থাকতে’ দেওয়ার সুযোগ নেই। সুযোগ নেই কোনও মধ্যপন্থা নেওয়ার। যে কোনরকম অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম তীব্রতর করতে হবে। অস্বীকার করতে দ্বিধা নেই, একটা কঠিন, অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ের মধ্যে দিয়ে চ‍‌‍‌‍‌‍‌‍লেছি, আসলে অন্ধকার দূর করতে আগুন জ্বালা‍‌তে হবে। আমাদেরকেই আগুন হয়ে দাঁড়াতে হবে রাস্তায়। আখলাকের বাড়ির সামনে, রোহিতের ইউনিভার্সিটির গেটে, মধ্য প্রদেশে পুলিশের গু‍‌লিতে খুন হওয়া কৃষকের লা‍শের পাশে আমরাই আগুন হয়ে দাঁড়াবো। পুড়িয়ে দিতে হবে শাসকের ঔদ্ধত্য, গোপন অভিসন্ধি। সকলকে পাশে চাই। আমার-আপনার দুবেলার ভাত থেকে শুরু করে সন্ধ্যার আড্ডার তর্ক — গোটাটা বাঁচিয়ে রাখতে হলে আপনাকেও রাস্তায় নামতে হবে। আমরা আপনার অপেক্ষায় থাকব। রাস্তাতেই থাকব।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement