মিতালি নামা

গৌতম চট্টোপাধ্যায়

৩০ জুলাই, ২০১৭

সানিয়া মির্জা, পি ভি সিন্ধু, সাইনা নেহালের পর এবার মিতালি রাজ। হায়দরাবাদ ভারতীয় ক্রীড়াক্ষেত্রের অন্যতম রাজধানী হয়ে উঠেছে। বাকিদের কথা ছেড়েই দিলাম, যদি এই চার মহিলা ক্রীড়াবিদের সব ট্রফি দিয়ে হায়দরাবাদে কোনও জাদুঘর গড়া হয়, তা হলেও সেটি অন্যতম সংগ্রহশালায় রূপান্তরিত হবে। তারপর মিতালি রাজের মতো এক নামী ক্রিকেটারের উত্থানও এই শহরে, যিনি ২০০৫সালে ফাইনালে হারের পরেও এবার লর্ডসের ফাইনালেও হারলেন। জিতলে, দেশকে বিশ্বসেরা করতে পারলে মিতালি রাজ কপিলদেব, এম এস ধোনির সঙ্গে এক পঙতিতে বসতে পারতেন। হেরেও তিনি হৃদয় জিতেছেন, তাঁর নেতৃত্ব দেশকে গর্বিত করেছে। আই সি সি-র সেরা দলের অধিনায়িকা হয়েছেন। মহিলা ক্রিকেটের তিনি সেরা আইকন, তিনিই মহিলা দলের ‘শচীন তেন্ডুলকার’।

--------------------------------------

বিশ্বকাপ ফাইনালে লড়াই করেও হেরে গেলেন ভারতীয় ললনারা কিন্তু ভারতের ক্রীড়ামোদী মানুষের মন ছুঁয়ে গেছেন তাঁরা। বড় প্রাপ্তি আই সি সি সেরা বিশ্ব একাদশে শুধু স্থান পাননি ভারতীয় দলনায়িকা মিতালি রাজ। সেই দলে অধিনায়িকার সম্মানও পেয়েছেন তিনি। এই মুহূর্তে মহিলাদের একদিনের ক্রিকেটে সর্বাধিক রানসংগ্রহের তালিকায় শীর্ষে থাকার পাশাপাশি একমাত্র ক্রিকেটার যিনি ৬০০০ রানের গণ্ডী অতিক্রম করেছেন। ভারতীয়দের মধ্যে বিরল কৃতিত্বের অধিকারী মিতালি। কারণ তিনিই একমাত্র ক্রিকেটার, দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে দুবার বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছে দিয়েছেন। বিশ্বকাপের পরই একাধিক সংস্থা বিজ্ঞাপনে আবদ্ধ করার প্রস্তাব নিয়ে ছুটে গেছে তাঁর কাছে।

মেয়েদের সার্কিটে মিতালিকে ডাকা হয় ‘তেন্ডুলকার’ নামে। কারণ ভারতীয়দের মধ্যে টেস্ট, একদিনের আন্তর্জাতিক ও টি-টোয়েন্টি সব ফরম্যাটেই সর্বাধিক রানের রেকর্ড তাঁর দখলে। এহেন মিতালির জন্ম ১৯৮২’তে যোধপুরে হলেও তাঁর মাতৃভাষা তামিল। মাত্র ১০ বছর বয়সে ক্রিকেটে হাতেখড়ি তাঁর। সেকেন্দ্রাবাদে স্কুলে পড়াকালীন দাদার মতো তিনিও ক্রিকেট কোচিং নিতে যেতেন স্কুলের নেটে। এছাড়াও ছেলেদের সঙ্গে অনুশীলন করতেন তিনি। এই সময় শাস্ত্রীয় নৃত্যও শিখেছিলেন আট বছর ধরে। পরে সব ছেড়ে একমাত্র ক্রিকেটেই মনোনিবেশ। ১৯৯৭’তে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিশ্বকাপের দলে প্রাথমিক তালিকায় স্থান পেলেন। চূড়ান্ত দলে অবশ্য স্থান পেলেন না। বেশিদিন অবশ্য ভারতীয় দলে ঢোকার জন্য অপেক্ষা করতে হয়নি। ১৯৯৯’তে ইংল্যান্ডের মাটিতে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে একদিনের ম্যাচে আত্মপ্রকাশ এবং আবির্ভাবেই ঝকঝকে শতরানের ইনিংস (১১৪ রান) খেলে মিতালি বুঝিয়ে দিলেন তিনি থাকতে এসেছেন। ২০০১-০২’তে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্টে আত্মপ্রকাশ এবং জীবনের তৃতীয় টেস্টেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২১৪ রানের অসাধারণ ইনিংস। সেদিন ১৭ই আগস্ট, ২০০২। টনটনের মাঠে ১৯টা বাউন্ডারি সহযোগে এই রান তুলে সেদিন ভেঙে দিয়েছিলেন ফারেন রল্টনের ২০৯ রানের তৎকালীন সর্বকালের রেকর্ড। পরে অবশ্য ২০০৪ সালে পাকিস্তানের কিরণ বালুচ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ২৪২ করে এই রেকর্ড ভেঙে দেন।

২০০২’তে বিশ্বকাপের সময় টাইফয়েডে আক্রান্ত মিতালি দলকে সেভাবে সাহায্য করতে পারলেও ২০০৫ সালে নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালে নিয়ে গেলেন দলকে। অস্ট্রেলিয়ার কাছে সেবার অবশ্য শেষ রক্ষা হয়নি। ২০০৬-তে অবশ্য সাফল্য এলো প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়ে। ইংল্যান্ডের মাটিতেই তাদেরকে হারিয়ে সিরিজ জিতলো ভারত মিতালির নেতৃত্বে। সেই বছরের শেষদিকে আবার তাঁর সফল নেতৃত্বে ভারতের এশিয়া কাপ জয় একটিও ম্যাচ না হেরে। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচেও তাঁর আবির্ভাব ওই ২০০৬’তে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।

ডানহা‍‌তি মিতালির সব থেকে বড় গুণ, দ্রুত রান তুলতে পারেন। পাশাপাশি দরকারে লেগ স্পিনটাও করে দিতে পারেন তিনি। ১৮ বছরের কেরিয়ারে মিতালি টেস্ট খেলেছেন মাত্র ১০টি। কারণ ভারতীয় বোর্ড সেভাবে মহিলাদের টেস্ট খেলার সুযোগ করে দেয় না। এই ১০ টেস্টে একটি শতরান (২১৪) ও চারটি অর্ধশতরানের ইনিংস সহ মিতালির মোট সংগ্রহ ৬৬৩ রান। গড় ৫১.০০। লম্বা কেরিয়ারে অবশ্য ১৮৬টা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে ফেলেছেন মিতালি। ৫১.৫৮ গড় নিয়ে মোট ৬১৯০ রান তাঁর সংগ্রহে। এর মধ্যে শতরান ছয়টি ও অর্ধশতরানের ইনিংস ৪৯টি। শতরান আছে আয়ারল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। এর মধ্যে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ শতরানটি খুবই উল্লেখযোগ্য। এটি এসেছে সদ্যসমাপ্ত বিশ্বকাপের আসরে এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে। গ্রুপের শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হবার আগে ভারতীয় দলের সামনে যখন বিশ্বকাপের আসর থেকে ছিটকে যাবার ভ্রূকুটি, ঝলসে উঠল মিতালি রাজের ব্যাট। ১০৯ রানের ইনিংস খেলে ভারতকে নির্ধারিত ৫০ ওভারে পৌঁছে দিলেন ২৬৫ রানে। পরে এর ওপর দাঁড়িয়ে কিউইদের ভাঙলেন রাজেশ্বরী গায়কোয়াড়। ভারত পৌঁছে গেল সেমিফাইনালে। এই বিশ্বকাপেই এক‍‌দিনের ম্যাচে পরপর সাত ইনিংসে অর্ধশতরানের নজিরও স্পর্শ করেছিলেন মিতালি। একান্তভাবেই চেয়েছিলেন বিশ্বকাপ জিততে। প্রতি‍‌যোগিতা চলাকালীন বারবার ব্যক্ত করছিলেন সেই কথা। বারবার বলেছিলেন তাঁদের মতো কয়েকজন সিনিয়র খেলোয়াড়ের এটাই শেষ বিশ্বকাপ। সুতরাং ট্রফিটা তাঁদের কাছে খুব জরুরি। ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে ৯ রানে হেরে সেই স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়ে চোখের জলে মাঠ ছাড়লেন মিতালিরা। ২০১৩’র বিশ্বকাপেও প্রাথমিক পর্বে বিদায় নিয়েছিল ভারত। অথচ মিতালি তখন বিশ্ব ক্রমপর্যায়ে এক নম্বর জায়গায় রয়েছে। সেই মুহূর্তে টেস্টে একটি শতরান, ৪টি অর্ধশতরান, একদিনের ম্যাচে ৫টি শতরান, ও ৪০টি অর্ধশতরান এবং টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ১০টি অর্ধশতরান ছিল তাঁর দখলে। ওই বিশ্বকাপেও ভারতীয় মেয়েদের মধ্যে সর্বাধিক রান এসেছিল তাঁর ব্যাট থেকেই। ২০০৫ বিশ্বকা‍‌পেও ভারত ফাইনালে পৌঁছেছিল মূলত সেমিফাইনালে মিতালির অনবদ্য ৯১ অপরাজিত ইনিংসের দৌলতে। সেবার ফাইনালে অস্ট্রেলিয়া আর এবার ফাইনালে ইংল্যান্ড, বেদনার নীল রঙে হারিয়ে যাওয়া অপ্রাপ্তির মাঝে। অপ্রাপ্তি অবশ্য আরও আছে। ২০০৬-তে এশিয়া কাপ জেতার পরই চতুর্দলীয় প্রতিযোগিতায় মিতালির নেতৃত্বাধীন ভারত টেবিলের শেষ স্থানে চলে যায়। অথচ ইংল্যান্ডের থেকেও বেশি ম্যাচ ওই প্রতিযোগিতায় জিতেছিল ভারত। বস্তুতপক্ষে গ্রুপে সবকটি ম্যাচেই হেরেছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু আই সি সি’র অদ্ভুত নিয়মের জাঁতাকলে পড়ে প্লে-অফ ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে ভারত গ্রুপের শেষ স্থানে যায়। ওই সিরিজ মিতালির পক্ষেও ভালো যায়নি। সাতটি ম্যাচে মাত্র একবারই অর্ধশতরানের ইনিংস খেলেছিলেন। ২০০৮’র মে মাসে ভারতকে চতুর্থবার এশিয়া কাপ জেতানোর পরই ইংল্যান্ড সফরে ব্যর্থতা। এশিয়া কাপে মিতালি ৩০০০ রানের মাইলস্টোন পেরিয়েছিলেন এবং ভারত একটাও ম্যাচ হারেনি। ইংল্যান্ড সফরে ভারত আবার একটা ম্যাচেও জিততে পারলো না। দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব খোয়ালেন এবার মিতালি। চার বছর বাদে ইংল্যান্ড সফরে আবার নেতৃত্ব ফিরে পেলেন এবং সিরিজে মোট ২৫১ রান করে একদিনের ম্যাচে ব্যা‍‌টিং ক্রমপর্যায়ের শীর্ষে পৌঁছালেন। ভারত সিরিজ হেরেছিল ৩-২ ম্যাচে।

ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটে একটা পরিবর্তনের হাওয়া এনে দিয়েছে মিতালির এই বিশ্বকাপের দল, বলছেন অনেকে। ইংল্যান্ড থেকে দেশে ফিরে মিতালি বলেছেন ‘দেশে মেয়েদের ক্রিকেটের সুদিন বোধহয় শুরু হলো।’ দেশের মাটিতে অভ্যর্থনা ও সংবর্ধনায় অভিভূত মিতালির মনে হয়েছে, বিশ্বকাপের সাফল্য এখানে মেয়েদের ক্রিকেটকে আরও জনপ্রিয় করবে। তিনি এবং টিমমেটরা সকলেই অভিভূত জানাতে ভোলেননি মিতালি। সেই সঙ্গে এবার মেয়েদের ক্রিকেটে আই পি এল ধাঁচের প্রতি‍‌যোগিতা চালু করার গুরুত্ব জানিয়ে তিনি বলেছেন ‘দু’বছর আগে হলে হয়তো একথা বলতাম না। এখন মেয়েদের পারফরম্যান্সের যেরকম উন্নতি হয়েছে তাতে আই পি এল চালু হলে সব থেকে ভালো হয়। তবে সবকিছু নির্ভর করছে বি সি সি আই-এর উপর। অ‍‌স্ট্রেলিয়া কিংবা ইংল্যান্ডে এই জাতীয় লিগ চালু হবার পর ওদের মেয়েদের ক্রিকেটের মান অনেক বেড়ে গেছে। এখানে চালু হলে আমাদের ভারতীয়দের মানও বেড়ে যাবে।’

২০০৩ সালে মিতালিকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন তাঁর নিজের শহর হায়দরাবাদেরই আর এক নক্ষত্র সানিয়া‍‌ মির্জা। গ্র্যান্ড স্লাম টেনিসে ভারতের অন্যতম মুখ সানিয়া বলেছেন ‘মিতালি দীর্ঘদিন ধরে দেশকে সাফল্য এনে দিয়েছে। ও ক্রিকেটের অতুলনীয় দূত।’ দেশের পণ্য উৎপাদনকারী সংস্থাগুলোর কাছেও মিতালির ব্র্যান্ড ভ্যালু বেড়ে গেছে। প্রায় ২৫টি সংস্থা ইতিমধ্যে তাদের পণ্য বিপণনের দূত হিসেবে যোগাযোগ করেছে। বিশ্বকাপের আগে এই সংখ্যাটা ছিল ৪। মিতালির পাশাপাশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন হরমনপ্রীত কউর, দীপ্তি শর্মা, শিখা পাণ্ডে, পূর্ণিমা রাউতরা। মেয়েদের ক্রিকেটে সত্যিই বোধহয় বিপ্লব শুরু হয়ে গিয়েছে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement