হরিপিসি

রজত বন্দ্যোপাধ্যায়

৩০ জুলাই, ২০১৭

বাঁকুড়া জেলার এক সুপরিচিত মন্দিরে হরিপিসিকে প্রথম দেখি। সন্ধ্যাবেলায় আরতি হচ্ছে আর অকালবিধবা হরিপিসি তালি দেওয়ার ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়ছেন। পুরুতমশাই ঘণ্টা নেড়ে মন্ত্রোচ্চারণ করছেন আর সারিবদ্ধভাবে ভক্তরা দাঁড়িয়ে আছেন একইভাবে। আরতি শেষ হতে ভক্তিগীতির শুরু। চারদিক চুপচাপ। আশেপাশে বসতি কম। পরিবেশটা অন্যরকম লাগছিল। আমি ঈশ্বর মানি না। কিন্তু গ্রামগঞ্জে গেলে মন্দির, মেলা বা কীর্তনের আসরে দর্শক, শ্রোতা হিসাবে চলে যাই। মনে হয় সবটাই ধর্ম নয় — খানিকটা যেন দিনগত বাঁধা যাপন থেকে বেরিয়ে মানুষেরা একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন। উচ্চারণে শুদ্ধতা নেই কিন্তু তাদের মুখাবয়বে যেন প্রশান্তির স্পর্শ। সবশেষে যখন বৃদ্ধ বৃদ্ধারা গাইতেন — প্রভু দিন তো গেল, সন্ধা এলো, পার করো আমারে—তখন মনে হতো মৃত্যুকে সুন্দরভাবে আহ্বান করার এই বিশিষ্টতা যেন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে উচ্চারণের গভীর আন্তরিকথায়। প্রতি সন্ধ্যায় একই দৃশ্য। মাঝে মধ্যে আমার মতো আরও কেউ কেউ হঠাৎ সেখানে হাজির হয়ে যেতেন।

হরিপিসি কিন্তু থাকেন কলকাতার কাছেই। সবাই তাই জানতো। সন্তানাদি নেই, একদম একা। এখন চোখেও কম দেখেন। হাই পাওয়ারের চশমা। মাসের দশবারোদিন টুকটুক করে বাসে ট্রেনে চেপে এইসব মন্দির মেলায় চলে যেতেন। হাত পেতে যা পেতেন কোনরকমে দিন কেটে যায়।

আমার মনে পড়ে গেল ছোটবেলায় বছর নয় দশ বয়সে আমার মামা এইরকম এক মন্দিরে আমাকে দিয়ে আরতি করিয়েছিলেন। আরতির কোনও মন্ত্রই আমি জানতাম না। শুধু কোনটার পর কোনটা হাতে ধরতে হবে সেটা দূর থেকে দেখিয়ে দিচ্ছিলেন। প্রচুর পয়সা পড়ছিল। আরতি শেষ হতে মামা সেগুলি ধীরে ধীরে তুলে নিলেন। আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। তখনই মনে হয়েছিল এটা কেমন হলো? এইভাবে পয়সা তোলা যায়? কেন জানি না তারপর থেকে এইসব ব্যাপারে আর থাকতে ইচ্ছে করতো না। কিন্তু ভোররাত্রিতে যখন ‘ভজ গৌরাঙ্গ...’ গাইতে ভক্তরা পথ পরিক্রমা করতেন আমি কান পেতে শুনতাম। জানলা দিয়ে উঁকি মেরে সেই সংকীর্তন দেখতাম। সুরের প্রভাবে মনটা স্নিগ্ধ হয়ে যেত।

মন্দিরেই আলাপ করলাম হরিপিসির সঙ্গে। সত্যিই তিনি একা। নিরামিশাসি। সন্ধ্যাবেলায় একটু প্রদীপ জ্বালান। শাঁখ বাজাবার ক্ষমতা আর নেই। আমি কিছু সাহায্য করতে গেলে নিলেন না। বললেন, আমি যখন গান গাইতে গাইতে কৌটা বাড়াব—তখন দিয়ো। আমি চুপ করে গেলাম। সেখানেই তাঁর কাছ থেকে ঠিকানা জোগাড় করেছিলাম। বলেছিলেন — কাউকে এটা দিও না বাবা। আমি দিইনি। তাঁর বাড়িতেও যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

একদিন মৌলালির দিকে যাবার পথে হঠাৎ চোখ আটকে গেল। একটা ভিড়। গিয়ে দেখি হরিপিসি। নিথর দেহ। চারপাশে লোকজন জড়ো হচ্ছে। ওনাকে কবর দিতে নিয়ে যাবার জন্যে প্রস্তুতি চলছে। জিজ্ঞেস করলাম — ইনি কে? জানতে পারলাম কলকাতায় থাকলে ভোরের আজানের সময় মসজিদের পাশে চুপচাপ বসে থাকতেন। আজান শেষে প্রণাম জানিয়ে বাটি হাতে বেরিয়ে পড়তেন। আমার মাসির বাড়ি গোকুল বড়াল স্ট্রিটে। সেখানেও পুরানো লোকজন ওঁকে চিনতেন — পুজোর সময় কাপড় জামাও দিতেন।

একটু পরে নিঃশব্দে সবাই হাঁটতে শুরু করলেন। হরিপিসিকে নিয়ে। কবরখানার দিকে। আমি অসহায়ের মতো শেষযাত্রার দিকে তাকিয়ে রইলাম, নির্বাক।

Featured Posts

Advertisement