মনের সৌন্দর্যেও বেনজির সেরেনা

গৌতম চট্টোপাধ্যায়

২০ আগস্ট, ২০১৭

‘অনেকে আমাকে নিম্নশ্রেণির বলে ভাবে, কেউ কেউ আবার আমার শক্তি দেখে ব্যঙ্গার্থে পুরুষ বলে আখ্যা দেয়’ কথাগুলো যখন বলছিলেন ছত্রিশ বছরের কৃষ্ণবর্ণ তরুণী, যন্ত্রণাবিদ্ধ মুখ নয়, শরীর থেকে চুঁইয়ে পড়ছিল যেন শীতল ঔদ্ধত্য। মনের অপরিমেয় শক্তি যা জোগান দেয়। বোধহয় সেই শক্তির জোরেই আগামী সেপ্টেম্বরে প্রথম মাতৃত্বের স্বাদ পেতে চলা তরুণী জানিয়ে দেন, এরপর সাড়ে তিন মাসের মধ্যে কোর্টে ফিরে নেমে পড়তে চান সরাসরি অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে। টেনিস কেরিয়ারে ইতিমধ্যে ২৩টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম প্রতিযোগিতা জেতা হয়ে গিয়েছে। সামনে শুধু কিংবদন্তী মার্গারেট কোর্ট (২৪ গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ী)। কিন্তু সেরেনা উইলিয়ামস নামের ওই তরুণী দৃঢ়কণ্ঠে জানিয়েছেন ‘মা হওয়ার পরে তাড়াতাড়ি কোর্টে ফেরার পরিকল্পনা অনেকের হয়তো অবাস্তব লাগতে পারে কিন্তু আমি নিজের সিদ্ধান্তে অটল’। সম্প্রতি বিশ্ববিখ্যাত ‘ভোগ’ পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেরেনা তাঁর মাতৃত্ব ও আগামী সম্ভাবনার কথা জানানোর পাশাপাশি জোরালো প্রশ্ন তুলেছেন বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে। ‘আমাকে নিম্নশ্রেণির ভাবে কেউ কেউ কারণ আমার গায়ের রঙ কালো। এইরকম একটা সমাজেই আমরা বাস করি। এটাই আমাদের জীবন। সবাই বলেন সমাজে জায়গা পেতে গেলে আফ্রিকান-আমেরিকানদের সব বিষয়ে দ্বিগুণ ভালো হতে হয়। বিশেষ করে মেয়েদের। কোর্টে যখন নামি, মানুষের ভালোবাসা অর্জনের জন্য মারিয়া শারাপোভার থেকে দ্বিগুণ ভালো খেলতে হয় আমাকে। এই লড়াই নিয়েই আমি ভালো আছি’। বলছেন সেরেনা।

১৯৮১’র ২৬শে সেপ্টেম্বর মিশিগানে জন্ম সেরেনার। বাবা রিচার্ড উইলিয়ামস। মা ওরাকেন প্রাইস। এরপরেই পুরো পরিবার উঠে যায় ক্যালিফোর্নিয়ায়। সেখানেই দিদি ভেনাসের সঙ্গে তিন বছর বয়সে টেনিসে হাতেখড়ি সেরেনার। বাবা ও মায়ের কাছেই প্রথম টেনিস শিক্ষা উইলিয়ামস বোনেদের। সেরেনার যখন নয় বছর বয়স, দুই বোনকে রিক ম্যাকির টেনিস আকাদেমিতে প্রশিক্ষণে ভর্তি করানোর জন্য পরিবার চলে আসে ফ্লোরিডাতে। রিক ম্যাকি একবার বলেছিলেন যে রিচার্ড উইলিয়ামস তাঁর মেয়েদের নিজের মতো করে বেড়ে উঠতে দিয়েছিলেন। সেরেনার বয়স যখন ১০, রিচার্ড তাঁর দুই মেয়েকেই জাতীয় জুনিয়র টেনিস প্রতিযোগিতায় পাঠানো বন্ধ করে দিলেন। সেইসময় সেরেনার জেতার রেকর্ড ৪৬-৩। আসলে রিচার্ডের কানে এসেছিল শ্বেতাঙ্গ বাবা মায়েরা প্রতিযোগিতা চলাকালীন তাঁর দুই মেয়ের গায়ের রঙ নিয়ে নানা বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা বলছেন। জীবনে সেই প্রথম সেরেনা বর্ণবিদ্বেষের শিকার। পরে রিক ম্যাকির আকাদেমি থেকে ছাড়িয়ে পুরোপুরি বাড়িতে দুই বোনকে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করলেন রিচার্ড। সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জুনিয়র সার্কিটে যে সেরেনা র‌্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বর জায়গায় ছিল সে এবার বেড়ে উঠতে লাগলো সকলের অলক্ষ্যে। ২০০০ সালে একবার সেরেনাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল জুনিয়র টেনিসে নিয়মিত খেললে কি তার পক্ষে বেশি ভালো হতো? দার্শনিক উত্তর দিয়েছিল সে, ‘প্রত্যেকের পদ্ধতি আলাদা। ভেনাস ও আমি একটা রাস্তা দিয়ে হেঁটেছি এবং এটা আমাদের সাফল্য দিয়েছে।’

কোর্টের মধ্যে আগাগোড়া শক্তিশালী এবং আক্রমণাত্মক টেনিস খেলতে ভালোবাসেন সেরেনা। কোর্টে তাঁর এই দাপিয়ে বেড়ানোর স্টাইল নিয়েও নিন্দার শিকার হয়েছেন সেরিনা। সেই বর্ণবিদ্বেষ ও লিঙ্গ বৈষম্যের কালো ছায়া ধাওয়া করে বেড়িয়েছে তাঁকে, কিন্তু মাটিতে পেড়ে ফেলতে পারেনি। সেরেনা বলেছেন ‘শুধু আমি নয়, যে কোনও ক্ষমতাবান নারীকে হয়ত সমাজ বুঝিয়ে দিতে চায় তোমার শক্তি তোমার জীবনের কালো অধ্যায়। কিন্তু বয়স বাড়ার পাশাপাশি এই ব্যাপারে আমার অনুভূতি নতুন ভাবনার কথা বলে। আমি মনে করি ক্ষমতা নারীকে সৌন্দর্য দেয়। শক্তি নারীকে সুন্দর করে তোলে। তাই কোর্টে যখন নামি, আমার লক্ষ্য থাকে দর্শকরা আমাকে শক্তিশালী হিসেবে দেখুক। ওরা আমাকে একভাবে দেখতে চায়। আমি ওদের মনে ধাক্কা দেওয়ার কাজটা করতে থাকি।’

সেরেনার খেলাটা মূলত বেসলাইন নির্ভর। এর সঙ্গে যোগ হয় একাদিক্রমে শক্তিশালী সার্ভগুলো। ২০১৩-র অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে সেরেনার সার্ভগুলো। ২০১৩-র অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে সেরেনা সার্ভ করেছিলেন ঘণ্টায় ১২৮.৬ মাইল বেগে (২০৭ কিমি)। এর থেকে বেশি জোরে সার্ভ আছে একমাত্র ভেনাস উইলিয়ামস (১২৯ মাইল) ও সাবিনে লিসিকির (১৩১ মাইল)। সেরিনার বিশেষ গুণ, ওইরকম রকেট গতির সার্ভকে একটানা নিখুঁত লক্ষ্যে ফেলে যেতে পারেন এবং অসাধারণ বল প্লেসমেন্ট। ২০১২-র উইম্বলডনে সেরেনা রেকর্ডও করেছিলেন ১০২টি অপ্রতিরোধ্য ‘এস’ সার্ভিস মেরে। ফোরহ্যান্ড ও ব্যাকহ্যান্ডে সমান দুরন্ত সেরেনার তূণে রয়েছে দুর্দান্ত ওভারহেড ভলি। সেরেনা অবশ্য বলেছেন, ক্লে কোর্ট তাঁর সবচেয়ে প্রিয় কারণ এখানে শট খেলার জন্য সামান্য বেশি সময় পান। সাতবার উইম্বলডন জেতার পাশাপাশি তাই তিনবার ফরাসি ওপেনও জিতে নেন তিনি সেখানে ডিফেন্সিভ কোয়ালিটির চূড়ান্ত পরীক্ষা দিতে হয়। একেবারে হাল ছাড়া মুহূর্তে চমকপ্রদ প্রত্যাবর্তনের জন্য বিখ্যাত সেরেনা উইলিয়ামস। তিনটে উদাহরণ দেখে নেওয়া যেতে পারে। ২০০৩ অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ফাইনাল ক্লিম ক্লিস্টার্সের বিরুদ্ধে, ২০০৫ অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ফাইনাল মারিয়া শারাপোভার বিরুদ্ধে, ২০০৯ উইম্বলডন ফাইনাল এলিনা জেপনশিয়েভার বিরুদ্ধে, তিনবারই ম্যাচ পয়েন্ট বাঁচিয়ে ফিরে এসে খেতাব জিতে নিয়েছিলেন। কিংবা ধরুন ৯৯-র সেই ইউ এস ওপেন ফাইনাল। তৃতীয় সেটে ৩-৫ গেমে পিছিয়ে থাকা সেরেনা শুধু সমতা ফেরাননি, জীবনের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম খেতাবও জিতে নিয়েছিলেন। ২০১২-র ইউ এস ওপেন ফাইনালে তৃতীয় সেটে ভিক্টোরিয়া আজারেঙ্কার বিরুদ্ধে একই অবস্থায় পিছিয়ে থাকা সেরেনা ম্যাচ শেষ করে দিয়েছিলেন ৭-৫ গেমে। ২০১৫-র ফরাসি ওপেনের সেমিফাইনাল। অসুস্থ এবং সেট পরিবর্তনের সময় কোর্টের অপর প্রান্তে যেতে দৃশ্যত অসমর্থ সেরিনা তৃতীয় সেটে প্রতিপক্ষ তিমিয়া র‌্যাকসিনস্কাইকে উড়িয়ে দিয়েছিলেন ৬-০ গেমে। ২০১৫-র উইম্বলডনে তৃতীয় রাউন্ডে এক অবিস্মরণীয় জয় আছে সেরিনার। তৃতীয় ও চূড়ান্ত সেটে দুবার তাঁর সার্ভিস ব্রেক করে দিয়েছিলেন ব্রিটেনের এক নম্বর হিয়েদার ওয়াটসন। শেষ হাসি হেসেছিলেন সেই সেরেনা। ৩৭ বার গ্র্যান্ড স্ল্যাম ম্যাচ জিতেছেন এক সেট পিছিয়ে থেকেও। চূড়ান্ত ও কঠিন পরিস্থিতিতে রকেট ‘এস’ সার্ভিস বার করে আনেন তিনি। ২০১৩-র ফরাসি ওপেনের ফাইনালে শেষ গেমে পরপর তিনটে ‘এস’ মেরে খেতাব তুলে নি‍‌য়েছিলেন। তার মধ্যে একটার গতি ছিল ১২৩ মাইল (১৯৮ কিমি)। ২০১৬-র উইম্বলডন ফাইনালে অ্যাঞ্জোলিক ক্রেবেরের বিরুদ্ধে একইভাবে পরপর তিনটে অপ্রতিরোধ্য ‘এস’ সার্ভিস এবং এরপর চতুর্থ পয়েন্টে অলস ভঙ্গিতে ফোরহ্যান্ড ভলি মেরে ম্যাচ শেষ।

‘ আমি আপনার পাশের বাড়ির মেয়েটি হয়ে থাকতে চেয়েছি’ বলেছেন তিনি। একইসঙ্গে জানাতে ভোলেননি তিনি ‘আমি বিশ্বাস করি, লকার রুমে সব মেয়েরা বলবে সেরেনা সত্যিই সুন্দর। কিন্তু মারিয়া শারাপোভা বলবে না কোনও কথা। কারুর সাথে কথা বলে না ও। অথচ লোক ওকেই সুন্দর বলে ভাবে’।

বর্ণবিদ্বেষ যাকে ছুঁয়ে গেছে জীবনের উষালগ্ন থেকে সেই সেরেনা উইলিয়ামস তাই হয়ত কোর্টে শারাপোভার মুখোমুখি হতে চান বারবার দ্বিগুণ ভালো খেলে নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে।

Featured Posts

Advertisement