আবেগ নিয়ে খেলা

শাল্মলি বসু

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

ইদানীং রাজ্যে বাড়ছে পড়ুয়া আত্মহত্যা ঘটনা। দেশের অন্যত্রও শিশু মনে দেখা দিচ্ছে নানা ধরনের সমস্যা। কোমল মতি ছাত্রদের এমন মানসিক বিপর্যয় দেখে অনেকেই বিস্মিত। সামান্য, সামান্য কারণে ছাত্ররা বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ। কখন তা পরিবারের তুচ্ছ ঘটনা, কখনও বা ইন্টারনেটে মারণ খেলার অভ্যাস। আত্মকেন্দ্রিকতায় ভুগতে থাকা শিশু মনে সহজেই জায়গা করে নিচ্ছে ‘ব্লু হোয়েল’-এর মতো ভয়ংকর খেলা। ইঁদুর দৌঁড়ের মধ্যে পড়ে গিয়ে পরীক্ষায় পাশ না করতে পারাতেও নিজেদের জীবন তুচ্ছ বলে মনে করছেন অনেকে। বাড়ির পরিবেশ ঠিক না থাকার জন্য তাঁদের মনে বাসা বাঁধছে নানা ধরনের অন্যায় জেদ।

বাড়ছে নেশার প্রতি আসক্তি। সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে দাঁড়িয়ে ক্রমাগত শিশুমন বিষাক্ত হয়ে পড়ছে। এই নিয়ে এখন অভিভাবকদের সঙ্গে যথেষ্ট চিন্তিত শিক্ষক মহল। চোখের সামনে ছাত্র-ছাত্রীদের স্বভাব, আচার-আচরণ পালটে যাওয়াকে তাঁরা স্বাভাবিক চোখে আর দেখতে পারছেন না। এমনটাই মনে করছেন উত্তর কলকাতার শৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যালয়ের শিক্ষক অভয় ঘোষাল। তাঁর মতে কয়েক বছর ধরেই ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বাড়তি আবেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

মিথ্যা কথা বলা দিয়ে শুরু হওয়া মানসিক অস্থিরতা রাতে না ঘুমানো, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারে শেষ হচ্ছে। পড়াশুনার বাইরের জগতের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ জন্মাচ্ছে। বানিয়ে কথা বলতে দেখা দিচ্ছে। অকারণে তাঁদের মধ্যে একটা ভীতি দেখা যাচ্ছে। ছাত্র বা ছাত্রীর যতই বয়স বৃদ্ধি পাচ্ছে ততই কী একটা অজানা ভয় তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাঁদেরকে। অজানা ভয়ের উৎস কী তার কিন্তু খোঁজ মিলছে না।

সম্প্রতি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে। মণিপুরে বাসিন্দা ওই ছাত্র উত্তর দিল্লির একটি ফ্ল্যাটে আরও দুই বন্ধুর সঙ্গে থাকতেন। একদিন তাঁদের অনুপস্থিতিতে গলায় ফাঁস আত্মহত্যার পথ বেছে নেন উনিশ বছরের হিজাম। দিল্লির আই আই টি-তে একই ঘটনা ঘটেছে। সেখানে পি এইচ ডি পাঠরতা ভোপালের মঞ্জুলা দেভক’কে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। ঠিক কেন একজন উদীয়মান গবেষক আত্মহত্যার পথ বেছে নিল তা পুলিশও জানতে পারেনি।

ব্যক্তিগত কারণের বাইরে গিয়ে একটা অলীক বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়েও অনেককে জীবন শেষ করতে দেখা গেছে। দক্ষিণ কলকাতার একটি বেসরকারি স্কুলের একাদশ শ্রেণির ছাত্র নাকি ‘ভূত’-এর সিনেমা দেখে আত্মহত্যা করেছেন। এবছরে উনিশ বছরের পড়ুয়া শিবানি হঠাৎই বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। মুজফ্‌ফরনগরে দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় শিবানি পরীক্ষা পাশ করতে না পারায় নাকি বিষ খেয়েছেন। কিন্তু পুদুচেরি সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এম বি এ-র প্রথম বর্ষের মেধাবী ছাত্র শশীকুমার বোরা’র ক্যাম্পাসে আত্মহত্যা মানা যায় না।

ব্যক্তিগত কোনও কারণে ইদানীং ‘ব্লু হোয়েল’ ইন্টারনেট গেম অনেকের প্রাণ কেড়েছে। শশীকুমারের মতো অনেকেই ৫০ ধাপের ওই খেলার শেষ পর্যায়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। শুধুমাত্র কৌতূহলের বশেই অনেক ছাত্র অনেকেই সেই মারণ খেলায় মেতেছে। ফলও খারাপ হয়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুরের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র ওই খেলায় মারাত্মক আক্রান্ত হয়েছে।

খেলার উত্তেজনায় এস এম এস করেই বন্ধুদের সেকথা জানাতে বেঁচে গেছে ওই ছাত্র। পরে মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে জানা যায় ওই ছাত্র প্রবল মানসিক অবসাদে ভুগছে। সে নাকি ভালো ছেলে নয়। স্কুলের সঙ্গে বাড়িতে এই গঞ্জনায় নাকি তাঁকে নীল তিমির খেলার দিকে টেনে নিয়ে গেছে। কিন্তু এরই মধ্যে পশ্চিম মেদিনীপুরের আনন্দপুরে দশম শ্রেণির ছাত্র অঙ্কন দে নিজেকে রুখতে পারেনি। আত্মহত্যা করে বসেছেন।

ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে হঠাৎই এই জীবন শেষ করে দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে হতবাক শিক্ষক সমাজ। বেলগাছিয়ার মনোহর অ্যাকাডেমির প্রধান শিক্ষক উৎপল চক্রবর্তী’র মতে সমাজ পরিবর্তন হচ্ছে, ফলে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ছাত্রছাত্রীদের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন হচ্ছে। কালিধন ইনস্টিটিউশনের শিক্ষক বিশ্বরূপ দাশগুপ্তের মতে পরিবেশ পরিস্থিতি অনেক পালটে গেছে। এখন ছোটরা বড় একা। বয়ঃসন্ধিকালীন সময় থেকেই তাঁদের মধ্যে পরিবর্তনটা শুরু হয়ে যায়।

ইদানীং মিডিয়ার প্রভাবে এই সময়ে তাঁদের মধ্যে অনেক বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ফলে ছাত্রদের মধ্যে তর্ক করা, কথা না শোনার প্রবণতা অনেকগুণ বেড়ে গেছে। সেটা কিছুটা অস্বাভাবিক পরিবর্তন। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার যা ধরন তাতে শাসন করা যায় না ছাত্র-ছাত্রীদের। এমনকি কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল সেটা চিহ্নিত করতে দিতেও তাঁরা তা ঠিক মতো নেয় না। এরজন্য অবশ্য অভিভাবকরাও অনেকটা দায়ী। তাঁরা সরাসরি শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে আলোচনা না করে ছাত্র-ছাত্রীদের মূল্যায়নকেই বড় করে দেখেন।

ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে মূল্যবোধের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। সমাজে শিক্ষকদের মর্যাদার অভাব ঘটছে। উলটো দিক থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা কোনও মডেল শিক্ষক বা শিক্ষিকাকেও সামনে পাচ্ছে না। এখন শিক্ষকরা স্কুলে সে অর্থে শিক্ষকতা করতে যান না, যান স্কুলে চাকরি করতে। ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে এই সম্পর্কের অবনতির জন্যই এখন ছাত্রদের সামান্য সতর্ক করতেই শাসাতে আসে খোদ শিক্ষককে। একটা চরম অস্থিরতা তাঁদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে।

ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিক এই অস্থিরতার উন্নতিতে অভিভাবকদের গুরুত্ব অনেকটা বেশি। মানসিক সমস্যার জন্য সময় নষ্ট না কর দ্রুত কাউন্সিলিংয়ের পথে যাওয়াটা খুব দরকার। পণ্যমুখী বাজার এখন প্রতিদিনই ছোটদের মধ্যে চাহিদাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। চাহিদার কোনও শেষ নেই, তা বুঝতে পেরেও অভিভাবকরা ওই চাহিদার রাশ টানার চেষ্টা চালাচ্ছেন না। তার ফলেই অল্প বয়স থেকে তাঁদের মধ্যে অর্থের বাড়তি প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি ছোটদের মধ্যে বাড়ছে মোবাইল ফোন কিংবা কম্পিউটারের চাহিদা।

পড়াশুনায় কম্পিউটার অপরিহার্য ধরে নিয়েই তা হয়ত অনেক অভিভাবক তুলে দিচ্ছেন। কিন্তু ওটা লাগাতার ব্যবহারের সময় নজরটা আর রাখা হচ্ছে না। তার জন্যই ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা নানান গেম সফটওয়্যার লোড করার সূত্রে তাঁদের ছোবল বসাচ্ছে ‘ব্লু হোয়েল’-এর মতো নানান মারণ খেলা। ইন্টারনেটের সোশ‌্যাল সাইট মারফত ছাড়াচ্ছে ওইসব খেলা। এর মধ্যে রয়েছে ‘এ সাইলেন্ট হাউস’, ‘সি অব হোয়েলস’, ‘ওয়েক মি আপ অ্যাট ৪.২০’।

খেলোয়াড়ের আবেগ আর মানসিক অবস্থার সঙ্গে খেলে ওই সব ‘লাইভ গেম’। প্রথমে কিছুই বোঝা যায় না। ধীরে ধীরে মনের ওপর কবজা করে নেয় ওই সব খেলা। ভয়ংকর ওই খেলার সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো — খেলোয়াড়কে খেলার প্রতিটি পদক্ষেপের ছবি তুলে পাঠাতে হয় খেলতে খেলতে চলে আসা নির্দিষ্ট লিঙ্কে। অনলাইন গেম লোড করার সময় ‘অ্যালাউ’ বোতামে চাপ মারফত গেম অ্যাডিমিনিস্ট্রেটর কৌশলে সম্মতি নিয়ে নেয়। এরপর টেনে নেওয়া হয় খেলোয়াড়ের সব গোপন তথ্য। খেলতে খেলতে হঠাৎ কেউ ছেড়ে দিতে চাইলে ‘গোপন তথ্য ফাঁস’, এমনকি ‘খুন করা হুমকি’ পর্যন্ত হুমকি দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্লাকমেলিংয়ের ঘটনাও ঘটেছে।

ভোগবাদী সমাজের মধ্যে পড়ে ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিক বিকৃতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে চাহিদার পূরণ না হলে বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার, আত্মহত্যা পর্যন্ত হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অভিভাবকরা নাজেহাল হয়ে অনেক সময় স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দ্বারস্থ হন। কিন্তু ততক্ষণে অবাধ্যের শিখরে চলে যায় অনেকে। ছাত্র মনের বিরূপ প্রভাব নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত স্টুডেন্টস্‌ হেলথ হোমের কার্যকরী সভাপতি ডাঃ পবিত্র গোস্বামী। তাঁর মতে, বয়ঃসন্ধিতে ছাত্রছাত্রীদের চলতে থাকে নানা ধরনের দ্বন্দ্ব। বেশিরভাগ সময় ছোটদের এই মানসিক দ্বন্দ্বের কথা মা-বাবারা জানতে পারেন না।

এই সময়টায় অভিভাবকদের অনেক বেশি সচেতন হওয়া দরকার। ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিক অবসাদজনিত সমস্যা রুখতে এগিয়ে এসেছে স্টুডেন্টস্‌ হেলথ হোম। অবসাদ দূর করতে কী করণীয় তা একটা রূপরেখা ঠিক করতে ৪ঠা সেপ্টেম্বর, সোমবার মৌলালি যুবকেন্দ্রে একটি কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে। যেখানে উপস্থিত থাকবেন অভিভাবক, স্টুডেন্টস হেলথ হোমের প্রতিনিধিসহ শহরের মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা। সামান্য খরচে জেলাস্তরে ছাত্রছাত্রীদের কাউন্সিলিংয়ের সুযোগ দিতে বদ্ধপরিকর হেলথ হোম। জেলার কিছু স্কুল অবশ্য নিজেদের উদ্যোগে ছাত্র-ছাত্রীদের কাউন্সিলিং শুরু করে দিয়েছে।

Featured Posts

Advertisement