ভবিষ্যতের সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতেন

৭ অক্টোবর, ২০১৭

-------------------------

বিদায় নিলেন বাংলা নাট্যমঞ্চের উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়। গণশক্তির সঙ্গে কথাবার্তা বলেছিলেন সদ্যই। তখনও শরীরের ডান অংশ দুর্বল, হাঁটতে অসুবিধা। কথা বললেই বোঝা যেত অভিনয় জগৎটা তাঁর রক্তে মিশে আছে। প্রতিবেদন : সঞ্জীব বসু।

--------------------------

২০১৬ সালের ১লা জানুয়ারি গিরিশ মঞ্চে ‘ভূতনাথ’ নাটকের শেষ দৃশ্যের একটা সংলাপ দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায় শত চেষ্টা করেও উচ্চারণ করতে পারেননি। শুধু অঙ্গভাষা ও অভিব্যক্তিতে অনুচ্চারিত বক্তব্যটি নিপুণভাবে ব্যক্ত করেছিলেন। দর্শক দ্বিজেনের সেই অভিনয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। আসলে মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনয় করার সময় সেই মুহূর্তে দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায় আক্রান্ত হয়েছিলেন কঠিন স্নায়ু রোগে। মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। শরীরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য অচল হয়ে চোয়ালটাকে আড়ষ্ট করে দিয়েছিল। এই কঠিন যন্ত্রণা সহ্য করে মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে নিজের জীবন বাজি রেখেই নাট্যভাবনাকে অপ্রতিহত রেখেছিলেন। বাংলা অভিনয় শিল্পের এহেন শক্তিমান অভিনেতা বিদায় নিয়েছেন।

দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৪৯ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর শ্যামবাজারের পাল স্ট্রিটে। ছেলেবেলা কেটেছে সেখানেই। প্রথম জীবনে পড়াশুনা করেছেন এ ভি স্কুলে। সেখানে পড়াশুনা করতে করতেই চলে আসেন দমদমের ২১ এফ, বীরপাড়া লেনে। বীরপাড়ার এই বাড়িতেই তখন থিয়েটার ওয়ার্কশপের রিহার্সাল হতো। বাবা ও দাদা ছিলেন থিয়েটার অনুরাগী। বাড়ির এই থিয়েটারের পরিবেশেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ জন্মায় দ্বিজেনের। এই সময় পাড়ার উদ্যোগী ছেলেমেয়েদের নিয়ে বেশ কিছু নাটকে অভিনয় করেছেন। স্কুলে পড়াশুনা শেষ করে সিটি কলেজ থেকে স্নাতক করেন। চাটার্ড অ্যাকাউন্টটেন্ট হিসেবে নিজেকে তৈরি করতে থাকেন। তারপর অমৃতবাজার পত্রিকায় কর্মরত অবস্থায় দ্বিজেনের এক সহকর্মী তাঁকে সুব্রত নন্দীর নির্দেশনায় ‘বাঘবন্দী’ নাটকে অভিনয়ের সুযোগ করে দেন। এর পরেই নতুন উদ্যমে অভিনয় জগতে পথ চলতে শুরু করেন দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়। কিছুদিনের মধ্যেই নীলকণ্ঠ সেনগুপ্তর আহ্বানে যোগ দেন থিয়েটার কমিউনে। ‘কিং কিং’ নাটকে রাজা চরিত্রে, ‘দানসাগর’ নাটকে মেধো চরিত্রে অসামান্য অভিনয় করে দীপ্যমান হয়ে ওঠেন। এরপর দেবাশিস মজুমদার ও দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায় যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা করেন ‘শূদ্রক’ নাট্যদল। এই দলের ‘অমিতাক্ষর’ নাটকে দ্বিজেন অভিনীত তিষাপতি চরিত্রটি খুবই জনপ্রিয় হয়। একাধিক নাট্যদলে অভিনয় করেছেন। যেমন গান্ধার, ক্যালকাটা রেপার্টারি থিয়েটার, পঞ্চম বৈদিক, পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি, থিয়েট্রন, সমবেত প্রয়াস, রঙরূপ ইত্যাদি। সমাবর্তন নাটকে শিবেশ চরিত্র, কুমারসম্ভব নাটকে অনিল সাহানী, ঘোড়া নাটকে ইগনিসাস, নিলাম নিলাম-এ সঞ্জয়, গ্যালিলিওর জীবন-এ বড় আন্দ্রেয়া, বলিদান-এ করুণাময়, ‘সাদাঘোড়া’তে নীরেন রায়, ‘ভম্মা’ নাটকে নামভূমিকায়, ‘গিরগিটি’ নাটকে পুলিশ, ‘গাজিসাহেবের কিস্‌সা’ নাটকে দারোগা, ‘বিকল্প’ নাটকে ডাক্তার এবং ‘চুনি-পান্না’ নাটকে পান্না চরিত্রের অসাধারণ নির্মাণ করেছেন। চুনি-পান্না নাটকটি এতোটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে একটা সময় প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন জেলায় ছুটে বেড়াতে হয়েছে এই নাটকের অভিনয় করার জন্য। সেই রকমই একদিন উত্তরবঙ্গে শো করতে যাওয়ার সময় নাকাশি পাড়ায় ভয়ংকর দুর্ঘটনার কবলে পড়েন দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিপ্লবকেতন চক্রবর্তী। যে জিপ গাড়ি করে তাঁরা যাচ্ছিলেন সেই গাড়িটি বেসামাল হয়ে তিনটে ডিগবাজি খেয়ে রাস্তার ধারে খাদের ডোবায় কলাগাছে আটকে যায়। একটুর জন্য প্রাণরক্ষা হয় সকলের।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছিল প্রগাঢ় বন্ধুত্ব। দুজনে একসঙ্গে অনেক নাটকে অভিনয় করেছেন। যেমন— প্রাণতপস্যা, ন্যায়মূর্তি, কুর্বানী, আহরণ, ছাড়িগঙ্গা ইত্যাদি। নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি অনেক সিনেমা ও সিরিয়ালেও সৌমিত্র-দ্বিজেন জুটি সাফল্যের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। একসময় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নিয়মিত আসতেন দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে। নাট্যচর্চা নিয়ে চলতো দীর্ঘ আড্ডা।

থিয়েটার করতে করতেই সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ আসে। উৎপলেন্দু চক্রবর্তীর ‘ময়নাতদন্ত’ সিনেমায় প্রথম অভিনয় করেন দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়। দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায় খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন ‘আবার যক্ষের ধন’ সিরিয়ালে অনবদ্য অভিনয় করে। ‘মানিকবাবু ভাই...’ দ্বিজেনের এই সংলাপটি অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে। বহু সিনেমা ও সিরিয়ালে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। যেমন চুনী-পান্না, রাজাগজা, দুর্গেশনন্দিনী, বাইসাইকেল কিক, যেখানে ভূতের ভয়, বাদশাহী আংটি, সজারুর কাঁটা, মরুতীর্থে, বেঁচে থাকার গান, ফড়িং ইত্যাদি আরও অনেক কাজ করেছেন।

১৯৮৪ সালে দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘সংস্তব’ নাট্যদল। এই নাট্যদলের প্রযোজনা মুষ্টিযোগ, গুণধরের অসুখ, স্পর্ধাবর্ণ, মনশ্চক্ষু, আইনসিদ্ধ, ধুনিস্তম্ভ, সুন্দর ‍‌ও ভূতনাথ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায় একাধারে সংস্তব নাট্যদলের নির্দেশক, অভিনেতা ও কান্ডারি হিসেবে যে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তা নানাভাবে সম্মানিত ও উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে। দীনবন্ধু পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন তিনি। ১৯৯৭ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক বিভাগের অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। অভিনয় শিক্ষক হিসেবে তাঁর অবদান মনে রাখার মতোই।

অসুস্থতার কারণে পার্থসারথি সেনগুপ্তকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন সংস্তবের নতুন প্রযোজনা নির্মাণ করার জন্য। নতুন নাটক ‘ফাউ’। দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের একমাত্র কন্যা কঙ্কাবতী বন্দ্যোপাধ্যায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর প্রথম বর্ষের ছাত্রী। কন্যার এইটুকু পরিচয়ে সন্তুষ্ট নন দ্বিজেন, তাই অভিনয় প্রশিক্ষণ দিয়ে নিজের ‘সংস্তব’ নাট্যদলের দুটি নাটকে অভিনয় করার সুযোগ দিয়েছেন। দ্বিজেনের অনুপ্রেরণাতেই কঙ্কাবতী তৈরি করেছেন নতুন দল ‘খোয়াবনামা’। ইতিমধ্যে এই নাট্যদল প্রযোজিত দুটি নাটক ‘জতুগৃহ’ ও ‘পাখি’ সাফল্যের সঙ্গে মঞ্চস্থ হয়েছে।

নাটককে জীবন থেকে ছাড়েননি এক মুহূর্তের জন্যও। অসুস্থতার মধ্যেও মাঝে মাঝেই নাটক দেখতে বেরিয়ে পড়তেন।

বামপন্থায় দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন। কথা প্রসঙ্গে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘‘আমি বামপন্থায় বিশ্বাস করি... চিরদিন বিশ্বাস করবো... নিয়মিত গণশক্তি পড়ি। বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাকে খুব যন্ত্রণা দেয়।’’

নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর স্পষ্ট বার্তা ছিল: ‘‘আমি সব সময় ভবিষ্যতের সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি...একসঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে থাকো... থিয়েটারের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করো, সংগঠিত করো। ’’

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement