চলচ্চিত্রে ফুটবল

৭ অক্টোবর, ২০১৭

এবারে অনূর্ধ্ব ১৭ বিশ্বকাপের আসর বসেছে কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে। শুরু হবে উত্তেজনা, ছন্দপতন ও অনেক নাটকীয় মুহূর্ত। কোন দেশটি হবে বিশ্বের সেরা দল।

চলচ্চিত্রেও এই জনপ্রিয় খেলাটি তার স্থান করে নিয়েছে। বিশ্বের নামীদামি খেলোয়ারদের উপজীব্য করে এগুলি তৈরি। যেমন ‘জায়েন্ট অব ব্রাজিল’, ‘সুপার সকার’। পেলেকে, মারাদোনাকে নিয়ে ছবি হয়েছে। প্রথম ছবিটি ব্রাজিলের জনপ্রিয় ফুটবল তারকাদের নিয়ে। বিশ্বকাপ সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় তাদের দেওয়া অবিস্মরণীয় গোলগুলি সহ খেলায় অংশবিশেষ স্থান পেয়েছে এই ছবি‍‌টিতে। অন্যান্য ছবিগুলিও এই ধারায় তৈরি। এছাড়া বিভিন্ন দেশের নামী দলগুলির খেলার ‍‌ভিডিও ক্যাসেট তৈরি হয়েছে। ‘যা কোচদের দারুণ সাহায্য করে বিপক্ষ দলের বিরুদ্ধে রণকৌশল সাজাতে।’

বাংলা বাঙালির জীবনযাত্রার সঙ্গে জ‍‌ড়িয়ে রয়েছে ফুটবল। বেশ কয়েকটি বাংলা ছবিতে ফুটবল খেলাটি এসেছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে। যেমন ‘স্ট্রাইকার’, ‘মোহনবাগানের মেয়ে, ‘ধন্যি মেয়ে’, ‘ওরা থাকে ওধারে’, ‘সাহেব’, ‘গৃহযুদ্ধ’, ‘এগারো’ ইত্যাদি। এরমধ্যে পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর ‘গৃহযুদ্ধ’ একটি ব্যতিক্রমী ছবি। যেখানে শ্রেণিবিভক্ত সমাজে শোষকশ্রেণি বেকারি ও দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে তরুণ প্রজন্মকে ব্যবহার করে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে ধ্বংস করতে’, তাদের নেতৃবৃন্দকে হত্যা করতে। শীতল এমনই এক তরুণ যুবক যে একটি ছোট ফুটবল টিমের গোলরক্ষক। তার স্বপ্ন একদিন সে এখনকার ‘বড় ক্লাবে’ খেলবে। চাকরি ও টাকার লোভ দেখিয়ে একটি স্টিল কোম্পানির মালিকেরা তাকে ব্যবহার করে ইউনিয়নের নেতাকে হত্যা করার জন্য। কিন্তু মালিকেরা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না। শীতল তার অতীতের কলঙ্কজনক অধ্যায়টি ভুলে নতুনভাবে মনোনিবেশ করে ফুটবল খেলায়। কিন্তু শোষকশ্রেণি তাদের নিজেদের প্রয়োজনে শীতলকে সরিয়ে দেয় পৃথিবী থেকে। ‘গৃহযুদ্ধ’ ছবিটিতে প্রধান চরিত্রের পাশাপাশি শীতলের (সুনীল মুখার্জি) চরিত্রটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে।

এখানে মূলত যে ছবিটির আলোচনা করা হচ্ছে সেখানে ফুটবল খেলাটি নিছক খেলা হিসেবে আসেনি। খেলার পাশাপাশি নির্ভর করছে খেলোয়াড়দের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নটিও। ছবিটির নাম ‘টু হাফটাইম ইন হেল’। সত্য ঘটনার উপর নির্মিত এই ছবিটি হাঙ্গেরির বিশিষ্ট পরিচালক জোলতান ফাবরির ছবি। এখানে বহুবার দেখানো হয়েছে ফিল্ম সোসাইটির সৌজন্যে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউক্রেনে নাৎসিদের একটি বন্দিশিবিরে আটক হাঙ্গেরিয়ানদের উপর নির্দেশ আসে হিটলারের জন্মবার্ষিকীতে তাদের একটি ফুটবল ম্যাচ খেলতে হবে সেখানকার জার্মান রক্ষীদের সঙ্গে। ক্যাম্পে বন্দি ওলোডি নামে একজন বিখ্যাত প্রাক্তন ফুটবলারের উপর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওলোডির কা খেলা। কিন্তু এত অল্প সময়ের মধ্যে খেলোয়াড় নির্বাচন করে তাদের গড়ে তোলা কার্যত অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু নির্দেশ অমান্য করার অর্থই মৃত্যু। সমস্ত যুদ্ধবন্দি খেলাতে অংশ নিতে চায়। কারণ তাহলে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও বন্দিশিবিরের অকথ্য অত্যাচারের থেকে মিলবে রেহাই এবং খাবারের বরাদ্দও এতে বেশি। ওলোডি বন্দিদের মধ্য থেকে খেলোয়াড় বাছাই করে প্রশিক্ষণ শুরু করেন। অনুশীলনের সময় রক্ষীদের পাহারা শিথিল দেখে বন্দিরা পালাবার চেষ্টা করে। কিন্তু ধরা পড়ে যায়। এদিকে খেলার নির্দিষ্ট দিনটি এসে পড়ে। ক্যাম্পের ভেতরের মাঠে উপস্থিত সমস্ত যুদ্ধবন্দিরা। অন্যদিকে নাৎসি অফিসারেরাও হাজির খেলাকে উপভোগ করতে।এ এক অসম লড়াই। একদিকে ফুয়েরারের গৌরবে বলীয়ান নাৎসি রক্ষীদল। অন্যদিকে অর্ধাহার, অত্যাচারে জর্জরিত হাঙ্গেরির যুদ্ধবন্দিদের দল।’ খেলা শুরু হয়। হাঙ্গেরির দল তেমন উৎসাহ ভরে খেলে না। কারণ এই খেলায় জেতার অর্থই হলো অবধারিত মৃত্যু। কিন্তু ওলোডির কাছে এটি নিছক খেলা নয়। তাদের আত্মমর্যাদার প্রশ্ন এবং দেশের সম্মান জড়িত। হাফ টাইমে তিনি তাঁর সহ খেলোয়াড়দের উজ্জীবিত করেন জেতার জন্য।

দ্বিতীয়ার্ধে খেলা এবং নতুন মোড় নেয়। ‘সংঘবদ্ধ আক্রমণের চাপে‍‌ জার্মান দল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এক একটি গোলের উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে উপস্থিত দর্শক বন্দিদের মধ্যে। অবশেষে খেলা শেষের বাঁশি বেজে ওঠে। জয়ের উল্লাসে ফেটে পড়ে খেলোয়াড়েরা। এ যেন এক বিরাট যুদ্ধ জয়। কিন্তু তা স্থায়ী হয় না। উপস্থিত জার্মান কর্নেলের নির্দেশে মেশিনগানের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া প্রাণহীন দেহগুলি লুটিয়ে পড়ে খেলার মাঠে।

এই ছবিটির অনুকরণ করে ১৯৮১ সালে হলিউডে তৈ‍‌রি হয় ‘এসকেপ টু ভিক্টরি’। পরিচালক জন হাস্টন। খেলাটি হয় ‘মার্কিন যুদ্ধবন্দিদের সাথে রক্ষীদের। ছবিটির উল্লেখযোগ্য দিক হলো এতে অভিনয় করেছেন মাইকেল কেইন, সিলভেস্টার স্ট্যালোন, ম্যাক্স ভন সিডো প্রমুখ অভিনেতাদের সাথে পেলে, বরি মুর প্রমুখ বিখ্যাত ফুটবলাররা।

সুইডেনের বিশিষ্ট পরিচালক বো ইউডারবাগ ১৯৭৪ সালে তৈরি করেন ‘স্ট্যাবি’ নামে একটি কমেডি ছবি। এর নায়ক ফিসপেন নামে সাত বছরের একটি ছেলে। ফুটবল খেলায় সে এতটাই পারদর্শী যে সুইডেনের জাতীয় দলে স্থান করে নেয়। এবার শুধু জেতার পালা।

সুইডিশ দলের সে একজন অপরিহার্য খেলোয়াড় হয়ে ওঠে। এরপরে তাকে নিয়ে শুরু হয় নানাভাবে অর্থ উপার্জনের পালা। তার স্কুলের পড়াশুনাও বিঘ্ন হতে থাকে। ফিসপেনের এই খ্যাতি আর ভালো লাগে না। সে ফিরে আসতে চায় স্বাভাবিক জীবনে। শেষবারের মতো মাঠে নামে সুইডেনের দলকে জেতাতে।

এখনও পর্যন্ত ১৯৬১ সালে তৈরি ‘টু হাফটাইম ইন হেল’ ছবিটি নিঃসন্দেহে ফুটবল খেলাভিত্তিক শ্রেষ্ঠ ছবি। যেখানে মৃত্যুও হার মেনেছে সেই সব মরণজয়ী খেলোয়াড়দের কাছে

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement