অটোর ঝাঁকুনি থেকেও
স্লিপ ডিস্ক হতে পারে

১ জুন, ২০১৭

কোমরে ব্যথা বা স্লিপ ডিস্ক হলে নিজে ডাক্তারি করে বিপদ বাড়াবেন না। প্রথম থেকে চিকিৎসা করান। না হলে শয্যাশা‌য়ী হয়ে পড়তে পারেন। স্লিপ ডিস্ক সম্পর্কে সাবধান করলেন কলম্বিয়া এশিয়া হাসপাতালের অর্থপেডিক ও স্পাইন সার্জেন ডাঃ সৈকত সরকার।

সেদিন একটু নিচু হয়ে ফোনটা রিসিভ করতে গিয়েছিলেন মিশ্রবাবু। ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে কোমরে ব্যথা শুরু। প্রথমদিকে তবু সহ্যের মধ্যে ছিল। কিন্তু ক্রমশ ব্যথা বাড়তে থাকে। এমন একটা সামান্য কারণে যে কোমরে এত ব্যথা হতে পারে তা আন্দাজই করতে পারেননি। ব্যথা থেকে মুক্তির জন্য দোকান থেকে পেনকিলার কিনে খেলেন। ঘরে পড়ে থাকা মলমও লাগালেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। অগত্যা চিকিৎসকের কা‍‌ছে যেতেই হলো। ‍‌তিনি সব শুনেই জানালেন এ‍‌ই সমস্যা হচ্ছে স্লিপ ডিস্কের জন্য।

স্লিপ ডিস্ক এমনই এক সমস্যা যা হলে দৈনন্দিন কাজকর্ম, স্বাভাবিক চলাফেরা সবেতেই কষ্ট হয়। শিরদাঁড়ার ব্যথার জন্য মূলত দায়ী এই স্লিপ ডিস্ক। চিকিৎসা পরিভাষায় একে যদিও বলা হয় ডিস্ক হার্নিয়েশন। আমাদের শিরদাঁড়া বা ভার্টিব্রা তৈরি ২৬টি ছোট ছোট হাড়ের টুকরো বা ভার্টিব্রেট দিয়ে। হাড়গুলোর মাঝে থা‍‌‍‌কে নরম জেলি ভরা ডিস্ক। একটা হাড়ের সঙ্গে অন্য হাড়ের ঘষা লে‍গে যাতে হাড়ের ক্ষয় না হয় সেটা প্রতিরোধ করাই এই ডিস্কের কাজ। কিন্তু কখনও কখনও ঝুঁকে বা সামনের দিকে নিচু হয়ে কিছু তুলতে গেলে ডিস্ক সরে যায়। তখন নার্ভ রুটে চাপ প‍‌ড়ে শুরু হয় যন্ত্রণা।

স্লিপ ডিস্কের জন্য প্রথমে অল্পস্বল্প এবং পরের দিকে অসহ্য ব্যথা হতে পারে। ব্যথার বিশেষত্ব হলো কোমর থেকে পায়ের দিকে কিংবা ঘাড় থেকে হাতে ব্যথা নেমে আসে, ঝিনঝিন করে। ব্যথার গতিপ্রকৃতি অর্থাৎ ব্যথা অল্প হবে না বেশি তা নির্ভর করে জেলি কতটা বেরিয়ে গিয়েছে এবং তা নার্ভের গোড়ায় চাপ দিচ্ছে তার ওপর। অনেকেই প্রথমদিকে তেমন ব্যথা থাকে না বলে বিষয়টাতে অতটা গা করেন না ফলে পরবর্তীকালে ব্যথা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। তখন চিকিৎসকের কাছে গেলেও সারতে সময় লাগে।

শরীরের ঘাড়ে ও কোমরের নড়াচড়া বেশি হয় বলে এই দুই জায়গাতেই স্লিপ ডিস্কের সমস্যাও বেশি হয়। ঘাড়ে হলে ব্যথা কাঁধ থেকে হাতে নেমে আসে আর কোমরে হলে ব্যথা বা ঝিনঝিনেভাব পা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। রাতের দিকে এই ব্যথারও প্রকোপ বাড়ে। স্বাভাবিকভাবেই ব্যথার জন্য হাত, পায়ের জোর কমে যায়। কিছু ক্ষেত্রে মল, মূত্র ত্যাগেও সমস্যা হতে পারে।

এই স্লিপ ডিস্কের জন্য অনেকক্ষেত্রে দায়ী সেডেন্টারি লাইফস্টাইল বা দীর্ঘক্ষণ একনাগাড়ে বসে কাজ করার অভ্যাস। কারণ এতে শিরদাঁড়ার আশপাশের পেশি দুর্বল হয়ে একটুতেই জেলির কুশন বেরিয়ে আসে। এছাড়া সামনের দিকে ঝুঁকে ভারী জিনিস তোলা, বাসে, অটোতে বা অন্য কোনও যানবাহনে চলার সময় আচমকা জোরে ঝাঁকুনি লাগলে, বেশি ছোটাছুটি করলে, ভারী এক্সারসাইজ করতে গেলে এমনকি বেশি ওজন হলেও স্লিপ ডিস্ক হতে পারে। স্লিপ ডিস্কের সমস্যা সবচেয়ে বেশি দেখা দেয় ৩০-৫৫ বছরে। আর মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের এই সমস্যা প্রায় দ্বিগুণ বেশি হয়। হঠাৎ করে ভারী এক্সারসাইজ না করে নিয়মিত শরীরচর্চা করলে এই সমস্যা থেকে দূরে থাকা সম্ভব।

বেশিরভাগ সময়েই স্লিপ ডিস্ক নির্ধারণের জন্য তেমন কোনও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসকের চোখ এবং হাতই রোগ নির্ণ‌য়ের পক্ষে যথেষ্ট। তবে কিছু ক্ষেত্রে রোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য এক্স-রে, এম আর আই, সিটি স্ক্যান এবং কিছু রুটিন রক্ত পরীক্ষা করতে হয়। সেই অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু হয়। কিছু মানুষ আছে যারা কোমরের ব্যথাকে মামুলি যন্ত্রণা ভেবে গুরুত্ব দেন না। নিজেরাই ব্যথার ওষুধ কিনে খেয়ে যান। এতে করে অনেকসময় স্থায়ীভাবে নার্ভ খারাপ হয়ে যায়। রোগী তখন শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে। কাজেই কোমরে ব্যথা কখনওই অবহেলা করা উচিত নয়। আর বেশিরভাগ সময়ে সমস্যা দূর করা যায় সাধারণ চিকিৎসায়। কিছু ক্ষেত্রে লাম্বার মাইক্রোডিসেকটোমি সার্জারি করে ব্যথা থেকে মুক্তি মেলে। এই অপারেশনে মাত্র ২-৩ সেন্টিমিটার ফুটো করা হয়। আর অপারেশনের ঘণ্টা চারেক পর থেকেই রোগী হাঁটাচলা করতে পারে আর হাসপা‍‌তালে ভর্তি থাকতে হয় মাত্র একদিন। কাজেই ব্যথা হলে প্রথমেই ডাক্তার দেখান। আর স্লিপ ডিস্ক থেকে দূ‍‌রে থাকতে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন, সোজা হয়ে হাঁটাচলা করুন, ভারী জিনিস ঝুঁকে তুলতে যাবেন না।

Featured Posts

Advertisement