এন্ডো‍‌‍‌মেট্রিওসিসের চিকিৎসা
সময়েই করানো দরকার

ডাঃ চন্দ্রিমা দাশগুপ্ত

১ জুন, ২০১৭

বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেক মহিলাই জানতে পারেন তাঁর এন্ডোমেট্রিওসিস আছে। আর তাঁর বন্ধ্যাত্বের জন্য এই সমস্যাই দায়ী। নামটা শুনে খানিকটা অবাকই হয়ে যান। এ আবার কেমন অসুখ! নামটাই তো অজানা। যদিও পরে বুঝতে পারেন নাম না জানলেও এই অসুখের উপসর্গ তিনি প্রতি মাসেই টের পান, পিরিয়সের সময়। তবে আজকের দিনে আর এন্ডোমেট্রিওসিস মা হওয়ার পথে সেভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারছে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি কাজে লাগিয়ে অনেকেই এখন এই সমস্যাকে দমিয়ে রেখে সন্তানের মুখ দেখতে সক্ষম হচ্ছেন। এন্ডোমেট্রিওসিস কী, এর উপসর্গ কী, বন্ধ্যাত্বের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী, এই সমস্যা থাকলে মা হতে গেলে কী করণীয় এই সমস্ত বিষয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন মেডিকা হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ চন্দ্রিমা দাশগুপ্ত।

এন্ডোমেট্রিওসিস বলতে ঠিক কী বোঝায়?

এন্ডোমেট্রিয়াম হলো ইউটেরাস বা জরায়ুর ভিতরের পাতলা লাইনিং। বয়ঃসন্ধি থেকে শুরু করে মেনোপজ হওয়ার পর্যন্ত প্রতিমাসেই পিরিয়ডের সময় জরায়ুর এই লাইনিং খসে গিয়ে ব্লিডিং-এর মতো বেরিয়ে আসে। আবার পিরিয়ডের পর থেকে এই লাইনিং তৈরি হতে শুরু হয়। পরিণত হলে এবং মহিলা সন্তানসম্ভবা না হলে ২৮-৩০ দিন পর ঋতুস্রাব শুরু হয়। কিন্তু কিছুক্ষেত্রে এই এন্ডোমেট্রিয়াম লাইনিং জরায়ুর বাইরের দিকে, ডিম্বাশয়ে, ফ্যালোপিয়ান টিউবে এমনকি মলদ্বারের মতো অন্যান্য অঙ্গেও তৈরি হতে পারে। হরমোনের প্রভাবে প্রতিমাসে পিরিয়ডের সময়ে এই এন্ডোমেট্রিয়ামগুলো থেকেও রক্তস্রাব হয়। এই অংশগুলোর টিস্যু আগলা হয়ে জড়িয়ে যায় বলে পেটে অসহনীয় ব্যথা এবং প্রচুর ব্লিডিং হয়।

এন্ডোমেট্রিওসিসের উপসর্গগুলো কী?

এর প্রধান উপসর্গ হলো ব্যথা। পিরিয়ডের ৭-১০দিন আগে থেকে শুরু হয়ে পিরিয়ড চলাকালীন এমনকি অন্য সময়েও এই ব্যথা থাকে। তলপেট ছাড়াও পিঠ, কোমর এবং আশপাশে খুব ব্যথা হতে পরে। ব্যথা লাগতে পারে শারীরিক মিলনের সময়ে এবং মল-মুত্র ত্যাগের সময়েও। আর বন্ধ্যাত্ব তো আছেই। বেশিরভাগ সময়ে সন্তান না আসার কারণ নির্ণয় করতে গিয়ে ধরা পড়ে এই সমস্যা।

এন্ডোমেট্রিওসিস থেকে বন্ধ্যাত্ব দেখা দেওয়ার কারণ কী?

নানাভাবেই এন্ডোমেট্রিওসিস বন্ধ্যাত্বের সমস্যা ডেকে আনতে পারে। যেমন, ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নিঃসৃত হয়ে ফ্যালোপিয়ান টিউবে যাওয়ার প্রক্রিয়াটাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে, ডিম্বাণুর গুণগত মান খারাপ হতে পারে এমনকি ফ্যালেপিয়ান টিউবের মুখ বন্ধ হয়েও যেতে পারে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণে সমস্যা হয়। আবার এন্ডোমেট্রিওসিসের চিকিৎসায় যেসব পদ্ধতি যেমন, ওরাল কন্ট্রাসেপটিভ পিল, গোনাডোট্রফিন রিলিজিং হরমোন বা সংক্ষেপে জি এন আর এইচ ইঞ্জেকশন কিংবা ইন্ট্রাইউটেরাইন ডিভাইস মিরেনা ইত্যাদি ব্যবহার করা হয় তার ফলেও গর্ভসঞ্চারে সমস্যা হয়। কারণ এসব পদ্ধতিই স্বাভাবিকভাবে ডিম্বাণু নিঃসরণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।

এন্ডোমেট্রিওসিস নির্ণয় কীভাবে করা হয়? চিকিৎসাই বা কী?

ল্যাপারোস্কোপি এবং ট্রান্সভ্যাজাইনাল আল্ট্রাসোনোগ্রাফির মাধ্যমে এন্ডোমেট্রিওসিস নির্ণয় করা হয়। কখনও কখনও আবার ওভারির কর্মক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ওভারিয়ান রিজার্ভ বা সিরাম এ এম এইচ পরীক্ষা করতে হয়। পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে ঠিক করা হয় বন্ধ্যাত্বের জন্য কী ধরনের চিকিৎসা দরকার। রোগীর বয়স ৩৫বছর বা তার বেশি হলে আই ভি এফ পদ্ধতিতেই সন্তান নেওয়ার কথা ভাবনা চিন্তা করতে হয়। প্রথত অবস্থায় এর চিকিৎসা শুরু হলে অনেক জটিলতা এড়ানো যায়। অসুখ যেহেতু প্রথম থেকেই একটু করে জানান দেয়, তাই সন্তান চাইলে প্রথমেই ইনফার্টিলিটি স্পেশালিস্টের পরামর্শ নেওয়া দরকার। কারণ বয়স যত বাড়ে সমস্যাও ততই বাড়তে থাকে।

অসুখ কী পুরোপুরি সারে?

একথা ঠিক, এন্ডোমেট্রিওসিস পুরোপুরি সারে না। ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, সোরিয়াসিস ইত্যাদি অসুখের মতো একে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। রোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে থাকলে সমস্যা থেকে দূরে রাখার জন্য ওরাল কনট্রাসেপটিভ পিল এবং অন্যান্য ওষুধ দেওয়া হয়। তবে ওষুধে কাজ না হলে তখন অপারেশনের প্রয়োজন। কাজেই ভাল থাকার জন্য আর পাঁচটা অসুখের মতো এন্ড্রোমেট্রিওসিসেরও চিকিৎসা করানো দরকার।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement