নোনা জলে ডুবেছে চাষ
একরাশ অবহেলার আঁধারে
আজো বিপন্ন মৌসুনী দ্বীপ

রবীন্দ্রনাথ ঘোড়ই

৩ অক্টোবর, ২০১৭

‘মৌসুনী দ্বীপ’ দক্ষিণ ২৪পরগনার একটি বদ্বীপ। মানুষজন মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। বসবাসকারীর সংখ্যা প্রায় ২৭হাজার। হিন্দু-মুসলিম যথাক্রমে ৮০শতাংশ এবং ২০শতাংশ। ঐক্য আছে, অনৈক্য নেই। গরিব মানুষেরা বেশিরভাগ এককাট্টা, অভাব অনটনের নিরিখেই। মৌসুনীর চারটি মৌজা মৌসুনীকে নিয়ে। বাকি তিনটির নাম বাগডাঙা, কুসুমতলা, বালিয়াড়া। ৪টি মৌজাকে ঘিরে রেখেছে চিনাই নদী, বটতলা নদী। মৌসুনীর সীমানা শেষ দক্ষিণে, সেখান থেকেই শুরু বঙ্গোপসাগরের উত্তাল তরঙ্গ।

সবচেয়ে বেশি কষ্ট বালিয়াড়া মৌজার। প্রস্থে এক কিলোমিটার, দৈর্ঘ্যে ৪কিলোমিটার। ২৪ঘণ্টায় দু’বার জোয়ার। দু’বারই নোনা জলের যাতায়াত। নোনা জল বেশি বিপদে ফেলছে বালিয়াড়াকে। বাদ যায়নি কুসুমতলার পশ্চিমাংশ, সল্ট ঘেরি এবং বাগডাঙার কিছুটা অংশ। বালিয়াড়ার ১২শোয়াল এবং ৮শোয়াল-এ ‘আইলা’ বিপর্যয়ের পর থেকে চাষ বন্ধ। ২০০৫-এ নাবার্ড চুক্তিতে নদীবাঁধের কাজ শুরু হয়েছিলো, কাজ এগিয়েছিল বেশ কিছুটা, তারপরেই কাজ বন্ধ হলো। নাবার্ড পিছু হটলো। মানুষ শুনলেন, সেই সময়কার তৃণমূলী পঞ্চায়েতের হর্তাকর্তারা ২০শতাংশ কাটমানি চেয়েছেন। অতএব কাজ বন্ধ। হতাশায় মানুষজন আবার কষ্টের মুখোমুখি। কিছুটা অংশের পুরোনো ভাঙা এবং আধভাঙা বাঁধ দেখা যাচ্ছে। সবে কিছুটা শুরু হয়েছিলো, শেষ হয়নি— বাকিটা প্রতিদিনের ঢেউয়ের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে। মৌসুনীর উত্তর দক্ষিণের ঢালাই বাঁধ। ঢালাই বাঁধ থেকে পুব দিক এবং পশ্চিম দিকে মানুষজনের চলার রাস্তা। বিপর্যয়ের দিনগুলিতে ঢালাই বাঁধে মানুষ বাধ্য হন গবাদি পশুকে বেঁধে রাখতে, জল নেমে গেলে যার যার গোরু তার তার ঘরে রাখা হয়। কিন্তু যে জমিতে মানুষের ঘর ছিলো, পুকুর ছিলো— ধানচাষের জমি ছিলো প্রতিদিনের নোনা জলের ঢেউয়ের আঘাতে সব নষ্ট হয়েছে। পুব-পশ্চিমের বাঁধের ওপরে দেখা যাচ্ছে অস্থায়ী ঘর। অনেক দিন ধরেই তারা এইসব অস্থায়ী ঘরের স্থায়ী বাসিন্দা। জমি নদীগর্ভে। চাষ নেই, ধান কোথায় পাবেন তাঁরা? পুকুর নোনা জলে ভর্তি। নোনা জলে কিছু কিছু মাছ হয়তো হয়, কিন্তু মাছচাষ করতে পারছেন না কোনমতেই। সংসার চলবে কীভাবে? ১৪০০মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, মৌজা বিপন্ন। পুব-পশ্চিমের বাঁধের ওপর অস্থায়ী ঘর করে বালিয়াড়াবাসী আর কতদিন থাকবেন? উত্তর কে দেবেন? কারা দেবেন? জবাব নেই।

মৌসুনীতে বাকি অংশে চাষ হচ্ছে। বোরোচাষ আগে হতো, এখন হচ্ছে না। আমন ধানখেতের মাঝে মাঝে আল করে সেখানে সবজি চাষ করছেন কৃষকরা। খেতে হচ্ছে ধান আর আলে কৃষকরা উচ্ছে, ঝিঙে, বরবটির ব্যাপক চাষ করে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাঁরা রাসায়নিক সার ব্যবহার করছেন। উচ্চফলনশীল চাষে খরচ বেশি করছেন। বছরের পর বছর রাসায়নিক ব্যবহার করে আগের মতো ফলনও পাচ্ছেন না। সমস্যা এদিকেও। জৈব সার ব্যবহারে মান্যতা দি‍‌চ্ছেন কৃষকরা, কিন্তু পাইকারি এবং খুচরো দাম কোথাও ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না।

মৌসুনী দ্বীপে দু’টি উচ্চমাধ্যমিক স্কুল, দু’টি জুনিয়র হাইস্কুল আছে, মাদ্রাসা আছে একটি। শিক্ষিত বেকার যুবকের সংখ্যা প্রায় ৫হাজার। এই দ্বীপেই ৪টি বড়ো বড়ো বাজার আছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে একটি। যাতায়াত এবং নদী পারাপারের অসুবিধার জন্য কোন ডাক্তারই এখানে স্থায়ীভাবে থাকছেন না। মৌসুনীবাসীরা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বাগডাঙা থেকে নদী পেরিয়ে আগে মানুষ দক্ষিণ দুর্গাপুর পারাপার হতেন। ৪টি মৌজার মানুষজন বাগডাঙা থেকেই খেয়া পেরিয়ে দক্ষিণ দুর্গাপুর যেতেন নিজের নিজের কাজে। দক্ষিণ দুর্গাপুরের দিকে নদীতীরে পলি জমে যাওয়ায় ফেরি নৌকার যাতায়াত পারাপার বন্ধ হয়ে যায়। কর্তৃপক্ষের দরকার ছিলো পলি সরিয়ে রাস্তা মেরামত করে আবার ফেরি চালু করা। দীর্ঘদিন তা হয়নি। তাই বেড়েছে মানুষের হয়রানি। এখন বাগডাঙা বাজার থেকে শাসমল ঘাট ও দক্ষিণ দুর্গাপুর, খিরিশতলা খেয়া পার হতে যাত্রীদের আধঘণ্টার বেশি সময় লাগে। কম সময়ে নদী পারাপারের সুবিধা দলমতনির্বিশেষে সবার পক্ষেই ভালো। তা হলো না। পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনায় শাসমলঘাট থেকে দক্ষিণ দুর্গাপুর খেয়াঘাট পর্যন্ত ৬কিমি রাস্তা করার অনুমোদন পায়। ঐ রাস্তা ৬কিমি না করে ৫কিমি করা হয়। ১কিমি রাস্তা না হওয়ার জন্য খেয়া পারাপারের সমস্যা রয়েই গেল। এপার ওপারের লোকজন সবাই বিস্মিত। পঞ্চায়েত এবং ব্লকস্তরে দু’পারের লোকের আবেদন নিবেদন চললো। দু’পারের লোকেরা উদ্যোগী হয়ে পরিশ্রম করে ঐ না করা রাস্তাটা নিজেরাই করে দিলেন। তারপরেও খেয়া পারাপারের অনুমোদন মিললো না। এখনও হয়নি। আবেদন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে মানুষজন আশায় আশায় আছেন— যদি খেয়া পারাপারের অনুমতি মেলে। দু’পারের মানুষের হয়রানি হচ্ছে। বিশেষ করে বাগডাঙার বাজার থেকে ৪টি মৌজার যে কোনও একটি মৌজা থেকে কোনও অসুস্থ লোক, কোনো অন্তঃসত্ত্বা কৃষকরমণীকে তাড়াতাড়ি শহরের বড়ো ডাক্তারখানায়, হাসপাতালে নিয়ে আসার দরকার হয় তাহলে খুবই অসুবিধা হয়। কৃষকরা, মৎস্যজীবীরা সবজি ও মাছ ঠিক সময়ে দক্ষিণ দুর্গাপুর থেকে মূল শহরে নিতে না পারলে ৩মিনিটের জায়গায় আধঘণ্টা দেরি করলে লোকসানের মুখে পড়েন। মৌসুনী দ্বীপের সামগ্রিক উন্নয়ন, পরিবহণ ব্যবস্থা সহজতর করতে এই ফেরি ব্যবস্থা দ্রুত চালু হওয়া দরকার। যত দেরি হবে মৌসুনী দ্বীপবাসীর ততই অসুবিধা হবে। একথা পঞ্চায়েত স্তরে, ব্লক স্তরের কর্মকর্তাদের অজানা নেই, তবু মানুষ কষ্ট পাচ্ছেন, তাঁদের কষ্ট দেওয়া হচ্ছে।

CAPTION : কিছুদিন আগেও এখানে ছিলো বসতবাড়ি, চাষের জমি। সাগরের নোনা জল এখন গিলেছে সবই। প্রতিদিন দু’বার করে নোনা জলের অবাধ যাতায়াত। বাঁধ তৈরিই হোক বা বিপন্ন মানুষের পুনর্বাসন— কোন হেলদোলই নেই রাজ্য সরকারের। স্থানীয় বাসিন্দারা তাই আজো নিরাশ্রয়, অসহায়, সর্বস্বান্ত। দক্ষিণ

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement