উৎসবের মুখেও বিক্রি নেই
হতাশায় ধূপগুড়ির আখচাষি

সঞ্জিত দে

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

উৎসবের মরশুম শুরু হয়েছে। মাঠে দাঁড়িয়ে আখ গাছ। সে কারণে দুশ্চিন্তায় গিত্তরঞ্জন রায়। কেন দুশ্চিন্তা? প্রশ্ন রাখতেই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বছর বিয়াল্লিশের এই কৃষক বললেন, সারা বছর ধরে যত্ন নিয়ে আখের চাষ করি এই সময়ের জন্য। প্রতি বছর এই সময়ে পাইকাররা গ্রামে আসেন আখখেত দেখে পছন্দ করে দরদাম ঠিক করে টাকা বুঝিয়ে দিয়ে যান। পরে এক সময় তাঁদের সুবিধেমত আখ কেটে নিয়ে যান। কিন্তু এবারে উৎসব শুরু হয়ে গেলো, অথচ কোন পাইকার আসেনি। সে কারণেই দুশ্চিন্তায় আছি।

গিত্তরঞ্জন অন্য কোন চাষাবাদ বেশি করেননা। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া মাত্র বিঘা তিনেক জমি। এর মধ্যে পৌনে এক বিঘা জমিতে আখচাষ করেন। অনান্যবার শ্রাবণ মাসের শেষ দিকেই সব আখ বিক্রি হয়ে যায়। অথচ ভাদ্র মাসের শেষ হলো, কিন্তু এখনো পাইকার আসেনি। মাঝে একজন ছোট ব্যবসায়ী এসে দশ হাজার টাকা দিয়ে সামান্য পরিমাণ আখ নিয়ে গেছে। সেই টাকা হাতে পেয়েছিলাম বলে কদিন সংসার চালাতে পারছি।

উত্তরবঙ্গে কোন চিনিকল নেই, সে কারণে এই জেলাগুলিতে কোনদিন সেভাবে আখচাষের দিকে নজর পড়েনি। তবে এক দশকের বেশি সময় ধরে জলপাইগুড়ি জেলায় আখচাষের জমির পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। কেননা গরমকালে ধূপগুড়ি জলপাইগুড়ি শিলিগুড়ি-সহ অনেক স্থানেই আখের রসের চাহিদা দেখা যাচ্ছে। এছাড়াও শ্রাবণ মাস থেকে বাংলায় উৎসব এবং বিভিন্ন পার্বণ থাকায় বিশেষ ফল হিসেবে আখের কদর বেড়ে যায়। কৃষকরা সে কথা মাথায় রেখে বাজার ধরার চেষ্টা করেন।

আখচাষ নিয়ে কথা বলছিলাম গাদং-২ নম্বর গ্রামপঞ্চায়েতের সাহেব টারি গ্রামের আখচাষি গিত্তরঞ্জন রায়ের সাথে। গত ১২ই আগস্ট জেলার বিভিন্ন স্থানে বন্যা হয়। বন্যায় গ্রামের কৃষকের ক্ষতি কি রকম জানতে গিয়েছিলাম। সঙ্গে ছিলেন সারা ভারত কৃষকসভার থানা সম্পাদক প্রাণগোপাল ভাওয়াল। সাহেবটারি গ্রামে একই জমিতে দুই ভাইয়ের বাড়ি পাশাপাশি। গিত্তরঞ্জন এবং চিত্তরঞ্জন রায়। চিত্তরঞ্জন রায় আখ চাষ করেন না। ধান পাট কিছু শাক সবজি করেন। জানালেন, গাদং-২নম্বর অঞ্চলের সাহেব টারি, সিপাই টারি, পূর্ব শালবাড়ি, ঝারশালবাড়ীর অনেক কৃষক এখন এই চাষের সাথে যুক্ত হয়েছেন। বাইরে থেকে ব্যবসায়ীরাও আসতে শুরু করেছেন। গিত্তরঞ্জন জানান, এই চাষে জমি সারা বছর আটক থাকে। সে জন্য অন্য কোন চাষের সুযোগ থাকেনা। অন্য চাষের থেকে পরিশ্রম কম হয় এবং কম পুঁজি দরকার। এই চাষের জন্য বেলে দোয়াঁশ মাটি হলে ফল ভাল হয়। তবে গাদঙের এই অঞ্চল দোয়াঁশ মাটির। সে কারণে আবার একেবারে ফল খারাপ হয়না। বারোঘরিয়ার খয়েরবাড়ি এলাকা থেকে চারার জন্য আখ কিনে আনতে হয়। প্রতি চারা চার থেকে পাঁচ টাকা দাম। বিঘা প্রতি এক হাজার চারার দরকার।

আশ্বিন মাসে জমি ভাল করে এক চাষ দিয়ে আড়াই থেকে তিন হাট দুরত্ব করে লাইন দিয়ে চারা লাগাতে হবে। অগ্রহায়ণ মাসে গাছের মাথা দেখা দিলেই জৈব সার অথবা ১০/২৬সার দিতে হবে। মাঝে মাঝে জল দিতে হয়। ফাল্গুন চৈত্র মাসে একবার চাপান দিতে হবে। আষাঢ় মাসের মধ্যে গাছ দাড়িয়ে যায় এবং বর্ষার জলে পুষ্ট হয়ে ওঠে। এর পর থেকে ইচ্ছেমত সময়ে কেটে নেওয়া যায়। খরচ বিঘা প্রতি কুড়ি থেকে পঁচিশ হাজার টাকা। জমিতে এসে পাইকার বা ব্যবসায়ীরা ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা দাম দেয় বিঘাপ্রতি। ২০জন শ্রমিক এক দিনে এক বিঘা জমির আখ কাটতে পারেন। গিত্তরঞ্জনের আশঙ্কা, এবারে যদি আখ বিক্রি করতে না পারি তাহলে তিন মেয়ে আর স্ত্রী-কে নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।

Featured Posts

Advertisement