উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাতেই
খুন কালবুর্গি, গৌরী
প্রতিরোধের লড়াই জারি কর্ণাটকেও

ধীমান সাউ

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

বেঙ্গালুরু : দেশ জুড়ে এখন এক অসম লড়াই — লড়াইটা কলমের সাথে বন্দুকের। মৌলবাদী ফতোয়ার বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে চিন্তার স্বাধীনতাকে। রণক্ষেত্রের একদিকে যেখানে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন গণতন্ত্রপ্রিয় নাগরিক, অন্যদিকে একটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক সংগঠন ও তাদের শাখাপ্রশাখা — যাদের একমাত্র লক্ষ্য যে কোনও মূল্যে ভারতবর্ষের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো ভেঙে হিন্দু রাষ্ট্রে রূপান্তর।

কিন্তু এরই মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে যুক্তিবাদী, প্রগতিশীল মানুষের স্বাধীন কলম, যারা তাঁদের কালির আঁচড়ে টেনে খুলতে চায় স্বঘোষিত ভণ্ড দেশপ্রেমীদের কালো মুখোশ, দিনের আলোতে মেলে ধরতে চায় সত্যের প্রকৃত রূপ, ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে চায় সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসবাদীদের কালো হাত; আর তখনই প্রমাদ গোনে শাসকের দল। এই আপাত নিরীহ কলমগুলো পড়ে শাসকের রোষানলে। পথের কাঁটা যুক্তিবাদী, চিন্তাশীল কলমগুলোকে তারা অর্থবলে কিনে নিতে চায়, অন্যথায় ষড়যন্ত্র চলে তাদের পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে ফেলার। তাই খুন হতে হয় এম এম কালবুর্গি, গৌরী লঙ্কেশকে। মাত্র দুবছরের ব্যবধানে তাঁদের হত্যা করা হয়। কর্ণাটকের দুই প্রান্তে একই কায়দায় গুলি করে সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশ ও চিন্তাবিদ এম এম কালবুর্গিকে খুন করে দুষ্কৃতীরা। দুটি ঘটনার মধ্যে যে যোগসূত্র আছে, তা আগেই অনুমান করেছিলেন তদন্তকারীরা। শেষপর্যন্ত তদন্তকারীদের সেই অনুমানই সত্যি হলো। ফরেনসিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, গৌরী লঙ্কেশ এবং এম এম কালবুর্গি, দুজনকেই ৭.৬৫ এম এম-র একটি দেশি পিস্তল থেকে গুলি করেছিল দুষ্কৃতীরা।

২০১৫সালের আগস্ট মাসে এই কর্ণাটকেরই ধারবাদে নিজের বাড়িতে আততায়ীর হাতে নিহত হন বিশিষ্ট সাহিত্য একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ও শিক্ষাবিদ এম এম কালবুর্গি। কালবুর্গি মূর্তিপুজো ও প্রথাগত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন, সরব ছিলেন ধর্মীয় আগ্রাসন, শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে। লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়ের সদস্য কালবুর্গি প্রচার করতেন কিভাবে ধীরে ধীরে উগ্র হিন্দুত্ববাদ বিষিয়ে তুলেছিল প্রাচীন লিঙ্গায়েত সমাজের স্বাভাবিক ধ্যান ধারণাগুলোকে। তাই তাঁর মৃত্যুর পর বজরং দলের গোরক্ষা সমিতির একজন সক্রিয় কর্মী সোশ্যাল মিডিয়াতে টুইট করেন, "হিন্দুত্ব নিয়ে তামাশা এবং একটি কুকুরের মৃত্যু"। কাজেই কে বা কারা মুক্তচিন্তাশীল স্বাধীন লেখনীকে স্তব্ধ করতে চায় — তা আজ দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।

কিন্তু গত দুবছরে কর্ণাটক পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় এই হত্যার কোনও সুরাহা হয়নি। কালবুর্গির হত্যাকরীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে ৩০শে আগস্ট এস এফ আই, ডি ওয়াই এফ আই, জে এম এস (মহিলা সংগঠন) বেঙ্গালুরুর টাউন হলের সামনে একটি বিক্ষোভ দেখায়। সেখান থেকে কালবুর্গি ও গৌরী লঙ্কেশের হত্যাকারীদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের দাবি জানান বিক্ষোভকারীরা।

এহেন পরিস্থিতিতে, কালবুর্গির অমীমাংসিত মৃত্যু যখন এখনও দেশবাসীর মনে দগদগে ক্ষত, ঠিক তখনই নিজের বাড়ির সামনে আততায়ীর গুলিতে নিহত হলেন সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশ। গত ৫ই আগস্ট রাতে বেঙ্গালুরুতে নিজের বাড়ির সামনে খুন হন তিনি। তাঁর বাড়ির সামনে সি সি টিভির ফুটেজ খতিয়ে দেখা গেছে ওই রাতে ৩জন আততায়ী এসেছিল। খুব কাছ থেকে তারা সাতটা গুলি চালায়। তিনটে ঢুকে যায় গৌরী লঙ্কেশের শরীরে। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি। প্রগতিশীল এবং বামপন্থী চিন্তার গৌরী লঙ্কেশের বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। স্বাভাবিক ভাবেই ধরে নেওয়া হচ্ছে যে দাভোলকর, পানসারে, কালবুর্গিদের যে কারণে খুন হতে হয়েছে, গৌরীর খুন হয়ে যাওয়ার নেপথ্যেও সেই কারণই।

আর এই হত্যাকাণ্ডের পরও একইভাবে সোশ্যাল মিডিয়াতে আবার একইরকম টুইট, "একটা দুশ্চরিত্রা কুকুরের মতো মারা যাবার জন্য সব কুকুরছানা একই সুরে চিৎকার করছে।" এবারেও টুইটকারী সুরাটের এক হিন্দুত্ববাদী কর্মী, এবং উল্লেখ্যভাবে তিনি আবার দেশের প্রধানমন্ত্রী মোদীর টুইটারের ফলোয়ার। গৌরী লঙ্কেশের মৃত্যুতে কর্ণাটকের বি জে পি বিধায়ক ডি এন জিভরাজ দলীয় কর্মীদের সামনে প্রকাশ্যে ঘোষণা করলেন যে, সঙ্ঘ পরিবারের বিরুদ্ধে না লিখলে হয়তো গৌরী বেঁচেই থাকতেন। তবে কিছুদিন আগে প্রাথমিকভাবে ফরেন্সিক ডিপার্টমেন্টের এক রিপোর্টে জানানো হয় যে কালবুর্গি ও গৌরী লঙ্কেশ হত্যাকাণ্ডে একই বন্দুক ব্যবহৃত হয়েছিল। কর্ণাটকের এই দুটি হত্যাকাণ্ডে কি আশ্চর্যরকমভাবে হিন্দুত্ববাদীদের সুস্পষ্ট যোগ।

কালবুর্গি ও গৌরী লঙ্কেশের হত্যাকারীদের চিহ্নিত করা ও তাদের গ্রেপ্তারের প্রশ্নে কর্ণাটকের কংগ্রেস সরকারের ভূমিকায় ইতিমধ্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন মহল। দুটি হত্যাকাণ্ডে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করা হলেও তদন্তের কাজে বিশেষ অগ্রগতি হয়নি। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কালবুর্গির পুত্র শ্রীবিজয়। তিনি ইতিমধ্যে জানিয়েছেন, আগামী ৪মাসের মধ্যে যদি পুলিশ প্রশাসন কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপ না নিলে কালবুর্গির পরিবারের সদস্যরা ও তাঁর অনুরাগীরা সম্মিলিতভাবে বিক্ষোভ আন্দোলনে নামবেন বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শ্রীবিজয়। যদিও কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়া জানিয়েছেন, এই হত্যাকাণ্ডের কিনারা করতে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তাঁর সরকার। এই ঘটনায় তদন্তে নেমে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন সনাতন সংস্থার নেতা রুদ্র পাতিলকে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে চিহ্নিত করে পুলিশ। এই রুদ্র পাতিল ২০০৯সালে গোয়ায় বিস্ফোরণাকণ্ডে জড়িত। কিন্তু কালবুর্গি হত্যার পড় থেকেই সে গা ঢাকা দেয়। পুলিশ এখনও তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়নি। এই ঘটনায় অভিযুক্ত সনাতন সংস্থার আরও একজন সদস্য সমীর গায়কোয়াড়কে ইতিমধ্যে গোবিন্দ পানসারের হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার করেছে মহারাষ্ট্রের সিট। তাকে জিজ্ঞাসবাদ করা হবে বলে কর্ণাটকের সিট সূত্র জানিয়েছে। তবে, তদন্তের গতি অত্যন্ত শ্লথ হওয়ায় কালবুর্গির পরিবার ও তাঁর অনুরাগীরা ইতিমধ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বাড়ছে প্রতিরোধের লড়াই। প্রতিরোধ হচ্ছে গোটা দেশে। এই লড়াইয়ে অন্যতম একটি কেন্দ্র হয়ে উঠেছে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি সেক্টরের রাজধানী বেঙ্গালুরু। গত ১২ই সেপ্টেম্বরের অনন্য নজিরের সাক্ষী থেকে ছিল এই শহর। সেদিনের সকালটা আর দশটা দিনের মতো গতে বাঁধা ছিল না। চেনা পরিচিত ব্যস্ত শহরে মাঝে জেগে উঠেছিল প্রতিবাদের ভাষা। তাতে শামিল হয়েছিলেন শহরে যুবক, যুবতী। শুধু বেঙ্গালুরু কেন, আশেপাশের অঞ্চল থেকে তাঁরা দল বেঁধে এসেছিলেন সেদিন। তাঁরা দেখিয়ে দিয়েছেন প্রতিবাদের ভাষা এখনও ভোলেনি এই শহর। ভোলেনি মিছিলে হাঁটতে, ভোলেনি স্বৈরাচারী শক্তির বিরুদ্ধে একত্রিত গলায় স্লোগান দিতে। শুধুমাত্র আশেপাশের হাতে গোনা কিছু কলেজের ছাত্রছাত্রীরা নয়, কর্ণাটকসহ দক্ষিণভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলি থেকে ছাত্রছাত্রীরা ওই দিন সকালে জড়ো হয়েছিল বেঙ্গালুরু সিটি রেল স্টেশন চত্বরে, তাঁদের হাতে ছিল গৌরী লঙ্কেশের ছবি দেওয়া প্ল্যাকার্ড - আর নিচে লেখা ‘আমি গৌরী’।

সেদিন এই বিপুল সংখ্যক যুবকযুবতীদের সাথে পায়ে পা মিলিয়েছিলেন বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন, মহিলা সংগঠন, দলিত সংগঠন, কৃষক সংগঠন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের মানুষজন। সংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মচারীদের সাথে কাঁধে কাঁধ রেখে প্রতিবাদের সরণি বেয়ে এগিয়ে এসেছিলেন এই শহরের অটোচালকেরা ও রাজ্যের অন্যান্য অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকরা, যাঁরা নিজেদের একদিনের রুজিরুটিকে উপেক্ষা করে এসেছিলেন এই মিছিলে, গৌরীর হত্যার প্রতিবাদে। এছাড়াও এই মিছিলে পা মিলিয়েছিলেন বিভিন্ন বহুজাতিক তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মীরাও। তবে সবথেকে উল্লেখ্যভাবে এগিয়ে এসেছিলেন হাজার হাজার মানুষ —যাঁরা নির্দিষ্ট কোনও সংগঠন থেকে আসেননি। শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বা কারোর থেকে শুনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই মিছিলে শামিল হতে এসেছিলেন। তাঁদের কোনও পারস্পরিক পূর্বপরিচিতি ছিল না ঠিকই, কিন্তু সেদিনের এই মিছিল তাঁদের প্রত্যেককে দিয়েছিল এক অভিন্ন সত্ত্বা, তারা সকলেই গৌরী, তারা সকলেই সমাজে ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে। তাই এই মিছিল সেদিন পরিণত হয়েছিল বাকস্বাধীনতার স্বপক্ষে দাঁড়ানো প্রতিটা মানুষের মিলিত প্রতিবাদ, এতে ছিল না কোনও জাত, ধর্ম, লিঙ্গ বা বর্ণের ভেদাভেদ। "কলমের সামনে বন্দুক কোনও চ্যালেঞ্জ নয়" — লেখা প্ল্যাকার্ডে শত্রুপক্ষের দিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা। পরিচিত শত্রুকে বুঝিয়ে দিয়েছে আততায়ীর বন্দুকের গুলির থেকে নির্ভীক, নিরপেক্ষ কলম হাজার হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী।

স্বতঃস্ফূর্ত, প্রাণবন্ত কিন্তু সংগঠিত এই মিছিল শেষ হয় বেঙ্গালুরুর সেন্ট্রাল কলেজের মাঠে এসে। সেই মাঠে একটি প্রতিবাদসভা অনুষ্ঠিত হয়। দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন গণতন্ত্রপ্রিয় ব্যক্তিত্বের সমাবেশ — সীতারাম ইয়েচুরি, মেধা পাটেকর, তিস্তা শিতলবাদ, অরুন্ধতী রায়, জিগনেশ মেভানি প্রমুখ। উল্লেখযোগ্যভাবে গোঁড়া ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে বিভিন্ন হিন্দু, মুসলমান, খ্রীষ্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী সংগঠনের নেতৃবৃন্দও এই প্রতিবাদসভায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। মঞ্চ থেকে মুক্তকণ্ঠে তাদের প্রত্যেকেই এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা করলেন। গভীর শোকাহত গৌরী লঙ্কেশের মা ইন্দিরা লঙ্কেশ বলেন, "ও (গৌরী) দেহের প্রতিটা অংশ দিয়ে লড়াই করেছে। আমার জন্য, তোমরা সবাই আমার গৌরী।"

সেদিনের এই প্রতিবাদসভায় উপস্থিত ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম বীর যোদ্ধা ও বর্ষীয়ান গান্ধীবাদী নেতা এইচ এস ডোরেস্বামী, "গৌরী লঙ্কেশ পত্রিকা"র একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে তিনি বলেন, "আমার বয়স ৯০ বছর। কিন্তু ‘আমিও গৌরী’ এবং আমি আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তোমাকে (গৌরীকে) সমর্থন করে যাব।" ওই দিন এগিয়ে এসেছিলেন বেঙ্গালুরু উভলিঙ্গ সম্প্রদায়ের মানুষেরা। তাঁরা এই মিছিল ও প্রতিবাদসভার খরচ বাবদ ৩০০০ টাকা দান করেন। তাঁদের কথানুযায়ী, "আমরা ভিক্ষা করে দিন চালাই, তবে আজ আমরা ভিক্ষে করেছি ‘আমি গৌরী’ সমাবেশের জন্য।" এছাড়াও দেশের বহু প্রগতিশীল লেখক, সাংবাদিক, শিল্পী ও চলচ্চিত্র নির্মাতারাও এই মিছিলে ও প্রতিবাদসভায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement