বি জে পি সরকারের ছ’মাসে
সবক্ষেত্রেই বেহাল মণিপুর

বিশ্বজিৎ দাস

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

সেনাদের বিশেষ ক্ষমতা আইন, আফস্পার মেয়াদ কি ফের বৃদ্ধি করা হবে, এই নিয়ে জোর আলোচনা মণিপুরে। ২০শে সেপ্টেম্বর এই আইনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রতিবেশী রাজ্য আসামের বি জে পি সরকার ইতোমধ্যে আফস্পার মেয়াদ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তাহলে মণিপুরও কি একই পথ অনুসরণ করবে, এই নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে আলোচনা তুঙ্গে। এই কালা কানুন প্রত্যাহারের দাবিতে টানা ১৬বছর থেকে লড়াই করছেন মণিপুরবাসী। সম্প্রতি বিধানসভা নির্বাচনের আগে ক্ষমতায় এলে মণিপুর থেকে আফস্পা প্রত্যাহার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বি জে পি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থেকে শুরু করে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মোদী নির্বাচনী প্রচারে এসে আফস্পা প্রত্যাহা‍‌রের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসে এই কালা আইন প্রত্যাহার তো দূরের কথা, গত ২১শে মে আফস্পার মেয়াদ আরও ছ’মাস বৃদ্ধি করেছে বি জে ‍‌পি সরকার। এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন মহলে। এই মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইম্ফলে বিক্ষোভও দেখিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন।

এদিকে, বেহাল সড়ক ব্যবস্থায় রাজ্যবাসী চরম ভুক্তভোগী হলেও বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই বি জে পি সরকারের। গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারে বিন্দুমাত্র হাত লাগায়নি সরকার। উল্লেখ্য, রা‍জ্যের রাজধানী ইম্ফল থেকে মাত্র ৩০‍‌ কিলোমিটার দূরে রাস্তাঘাট নেই। রাজধানী‍‌তে আসতে হলে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে তারপর শক্তিমানের মত সেনাবা‍‌হিনীর বাতিল হওয়া লরি আসতে হয় রাজ্যবাসীকে। ই‌ম্ফ‍‌লের বাইরে যেতে হলে এটাই হলো ভরসা। একই সঙ্গে রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবার মানও তালানিতে এসে ঠেকেছে। গড়ে ৯০ কিলোমিটার পরপর একটি উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে। নামে উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র হলেও এখানে কোন ডাক্তার-নার্স নেই। স্থানীয় ধাই ও একজন ওয়‌ার্ড বয় দিয়ে এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো চলছে। জেলা হাসপাতাল‍গুলির অবস্থা একই। একমাত্র ইম্ফল ছাড়া, কোনও জেলা হাসপাতালে এম বি বি এস পাশ করা ডাক্তার নেই। আয়ুর্বেদিক ডাক্তার দিয়ে জেলা হাসপাতাল চলছে। মণিপুরে এই সময়ে এনকেফালাইটিস, ডায়রিয়ার প্রকোপ মারাত্মকভাবে দেখা দেয়। এবছর এই রোগের প্রকোপে এখনও পর্যন্ত ৬৭ জন রোগী মারা গেছেন ‍চিকিৎসার অভা‍‌বে। হাসপাতালে যেতে হলে রোগীকে অন্তত ৩০-৩৫ ‍‌কিলোমিটার পথ বয়ে নিয়ে যেতে হয়। তারপর শক্তিমান ধরে জেলা হাসপাতালে যেতে হয়। অর্থাৎ সকালে রওয়ানা দিলে হাসপাতালে পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। অনেক সময় পথেই রোগীর মৃত্যু ঘটে। রক্তের নমুনা পরীক্ষার জন্য মাঝে-মধ্যে মেডিকেল টিম গ্রামে যায়। যদিও এই টিম‍‌ রোগীর রক্ত ‍নিয়ে শহরে এসে পৌঁছাতে ২-৩দিন লে‍‌‍‌গে যায়। রক্ত নেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রক্ত পরীক্ষা করা জরুরি হলেও মণিপুরে তা হয়ে ও‍‍ঠে না। তবে লোক দেখা‍‌নোর জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের মাঝে মধ্যে গ্রামাঞ্চলে যেতে দেখা যায়।

গোটা রাজ্যে রেল পরিষেবাও এখনো সম্প্রসারণ ক‍‌রেনি বি জে পি সরকার। বিগত ইউ পি এ-১ সরকারের আমলে টুপুশ পর্যন্ত রেল সম্প্রসারণের কাজ হাতে নিলেও বি জে পি আমলে একমিটার অংশের কাজ বৃদ্ধি পায়নি। রাজ্যের অধিকাংশ গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের লাইন পৌঁছায়নি। একমাত্র শহর ছাড়া ও হাতে গোনা কয়েকটি গ্রামীণ এলাকা ছাড়া বিদ্যুতের আলো পৌঁছায়নি রাজ্যের কোথাও। বিগত নির্বাচনে ভোট আদায়ের লক্ষ্যে বি জে পি প্রার্থীরা বেছে বেছে কিছু গ্রামে বিদ্যুতের খুঁটি ফেলে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনও খুঁটি পোঁতা হয়নি। এমনকি যে সকল বিধানসভায় বি জে পি প্রার্থী হে‍‌রেছেন, সেখান থেকে ফেলে রাখা খুঁটি ফেরত নিয়ে এসেছে বি জে পি সরকার।

রাজ্যের রেশন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। সরকারি তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে রাজ্যের দরিদ্র অংশের ৭০ ভাগ পরিবারের হাতে রেশন কার্ড নেই। অথচ বি জে ‍‌পি’র প্রাক্‌ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল ক্ষমতায় এলে ছয়মাসের মধ্যে প্রতিটি বি পি এল পরিবারের হাতে রেশন কার্ড তুলে দেবে। রেশন দোকানে বহুদিন ধরে কেরোসিন, চিনি বন্ধ। শুধু চাল দেওয়া হয়। তাও সরকা‍‌রি নির্ধারিত মাথাপিছু পাঁচ কেজির বদলে ৩ থেকে সাড়ে ৩‍‌কেজি’র বেশি পাওয়া যায় না।

কৃষকের হাতে জমির পাট্টা নেই। বনাঞ্চলে বসবাসকারীদের বনাঞ্চল থেকে উচ্ছেদ করে দিচ্ছে সরকার। বি ‍‌জে পি সরকারের কৃপায় বনাঞ্চল এখন কাঠ চোরাকারবারি আর মাফিয়াদের দখলে। অবাধে বন ধ্বংস করে লুট করছে করছে তারা। সব জেনেশুনেও নিশ্চুপ পুলিশ প্রশাসন।

নির্বাচনের আগে নাগা ছাত্র সংগঠনের ডাকা অনির্দিষ্টকালীন সড়ক অবরোধে মদত দিয়েছিল বি জে পি। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদত পুষ্ট এই আন্দোলনের পিছনেও ছিল। নাগা নেতাদের সঙ্গে রাজনাথ সিং, অমিত শাহদের বহুবার গোপন মিটিংও হয়। টানা তিনমাস সড়ক অবরোধের ফলে মণিপুরে প্রচণ্ড খাদ্য সংকট দেখা দেয়। তখন সড়ক অবরোধের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত। বি জে পি ক্ষমতায় আসতেই অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয় আন্দোলনকারীরা। নাগা পিপ্‌লস পার্টি (এন পি জি) বি জে ‍‌পি জোটে শামিল হয়।

বি জে ‍‌পি’র প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিরুদ্ধে রাজ্যবাসীর ক্ষোভ বাড়ছে। নির্লজ্জভাবে ঘোড়া কেনাবেচার মত বিরোধী দলের বিধায়কদের কিনে ক্ষমতা মণিপুরে ক্ষমতা দখল করেছিল বি জে পি। তৃণমূল কংগ্রেসের একমাত্র বিধায়ক ছড়াও নাগা পিপ্‌ল ফ্রন্ট (এন পি এফ)-এর বিধায়ক এবং কংগ্রেসের ৩ বিধায়ককে মোটা টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে মণিপুরে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসেন বীরেন সিং। উত্তর-পূর্ব ভারতের এই রাজ্যে বি জে ‍‌পি সরকারের ছ’মাস অতিক্রান্ত। কিন্তু রাজ্যবাসীর জীবনমানের সামান্যতম উন্নতি ঘটেনি। বরং প্রতিদিন সমস্যার পাহাড় বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এই সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভও। আফস্পা প্রত্যাহারের দাবি‍‌তে আন্দোলন অব্যাহত আছে এই রাজ্যে। বি জে পি সরকার রাজ্যে হিন্দু-মুসলিম, মণিপুর-নাগাদের মধ্যে বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধেও সি পি আই (এম)-সহ বামপন্থী দলগুলি সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও ধারবাহিক লড়াই চালাচ্ছে। তবে, আন্দোলনের পরিধি ক্রমশ বাড়ছে এই রাজ্যে। বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মানুষের ঐক্য ও সম্প্রতি রক্ষার আন্দোলনে সমাজের ব্যপক অংশকে শামিল করার প্রচেষ্টা জারি রেখেছে বামপন্থী দলগুলি।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement