দেশজুড়ে মাশাবাহিত রোগের
দাপট, আক্রান্ত অন্তত ৩লক্ষ

দেবযানী ভট্টাচার্য

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

প্রধানমন্ত্রী মোদী ‘স্বচ্ছ ভারত’ অভিযানের নামের সরকারি কোষাগার থেকে কোটি কোটি টাকা খরচ করছেন। অথচ দেশজুড়ে মশাবাহিত রোগের দাপট ক্রমশ বেড়েই চলেছে। নোংরা পরিবেশ, নিয়মিত জঞ্জাল পরিস্কার না হওয়া পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাবে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকনগুনিয়া-সহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি বছরে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ৩লক্ষাধিক মানুষ ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকনগুনিয়া আক্রান্ত হয়েছেন। এই রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি তামিলনাড়ুতে। দক্ষিণের এই রাজ্যে ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন ১১হাজার বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন জন।

তবে, সোয়াইন ফ্লু ভয়াবহ আকার নিয়েছে রাজস্থান এবং গুজরাটে। মোদীর রাজ্যেই সোয়াই ফ্লু’তে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪৩জন। গত ৩দিনে অন্তত ২০জনের মৃত্যু হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে খবর। সাড়ে ৩হাজারেরও বেশি এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। পাশাপাশি রাজস্থানেও এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। আগস্ট পর্যন্ত ৯৬৫জনের দেহের রক্তে এই রোগের ভাইরাস পাওয়া গেছে। মণ্ডলগড়ের বি জে পি’র বিধায়ক কৃতি কুমারী-সহ ৯১জনের মৃত্যু হয়েছে এই রোগে। তবে, কেরালায় অজানা জ্বরে, গায় ব্যাথা-সহ বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ হয়েছেন অন্তত ২২লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। এই রাজ্যে ৪২১জন মানুষ মারা গেছেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চলতি বছরের বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় মশাবাহিত রোগে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এই রোগ ঠেকানোর প্রশ্নে সরকারি পর্যায়ে পরিকল্পনা এবং উদ্যোগ থাকলে পরিস্থতি ভয়াবহ আকার নিতো না বলে তাঁদের মত। কেরালায় অজানা জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা ২২লক্ষ হলেও প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা শক্তিশালী থাকায় এই রোগে মৃত্যু ঠেকানো অনেকটাই সম্ভব হয়েছে। কিন্তু গুজরাট, রাজস্থান-সহ দেশের অন্যত্র রোগে আক্রান্তের সংখ্যার সঙ্গে রোগীর মৃত্যুর অনুপাত অনেকটাই বেশি। এর পিছনে অন্যতম কারন হল স্বাস্য্র ব্যবস্থার দুর্বলতা। স্বাধীনতার ৭০বছর পেরিয়ে যাবার পরও অধিকাংশ রাজ্যে প্রাথমিক স্বাস্য্স ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সম্ভব হয়নি বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

গোটা দেশে ডেঙ্গু ছাড়াও মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীও। জুলাই মাসে লোকসভায় দেওয়া তথ্যে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা জানিয়েছেন, চলিত বছরে ৬৩২জন ডেঙ্গুতে জ্বরে মারা গেছেন। তবে, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা সংসদে জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোরভাবে তত্ত্বাবধান এবং রোগ নির্ণয় পদ্ধতি সঠিকভাবে পরিচালনা করার ফলে মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। তাঁর দাবি এই রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া থেকে প্রতিরোধ করা গেছে।

তবে, জাতীয় স্তরে সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে কোনও কর্মসূচি নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন নাড্ডা। তিনি বলেন, এখনও পর্যন্ত এই ধরনের কোনও প্রস্তাব স্বাস্থ্যমন্ত্রকের কাছে জমা পড়েনি। মধ্য প্রদেশের ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ এবং সান ফার্মার মধ্যে একটি চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তিমতো স্থির হয়েছে উভয়েই যৌথভাবে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করবে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশে এখন ২৫,৩৫৪টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। এছাড়াও ৫,৫১০ টি কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র কার্যকরী অবস্থায় রয়েছে। এই কেন্দ্রগুলিতে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া-সহ অন্যান্য মশাবাহিত রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

দেশজুড়ে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তদের সংখ্যা উদ্বেগজনক বেড়ে চলেছে। National Vector Bo

e Disease Control Programme (NVBDCP) থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১৪ সালে ১৩৭জন, ২০১৫সালে ২২০জন, ২০১৬সালে ২৪৫জন ডেঙ্গুতে মারা গে‍‌ছেন। একই রকমভাবে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যাও শেষ তিন বছরে বেড়েছে। সরকারি রি‍‌পোর্ট অনুযায়ী ২০১৪ সালে ৪০,৫৭১ জন, ২০১৫ সালে ৯৯,৯১৩ জন এবং ২০১৬সালে ১, ২৯, ১৬৬জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। বিগত বছরগুলিতে মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ভয়াবহভাবে বাড়ছে গোটা দেশে।

প্রতিবছরই দিল্লিতে ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া, সোয়াই ফ্লু, ম্যালেরিয়ার মত রোগ ভয়াবহ আকার নেয়। ইতোমধ্যে সোয়াই ফ্লুতে আক্রান্তের সংখ্যা দু’হাজার ছাড়িয়ে গেছে।জুলাই মাস পর্যন্ত সোয়াই ফ্লু’তে মারা গেছেন ৪০জন বলে সরকারি সূত্রে খবর। ডেঙ্গুতে ৯৫০জন, চিকনগুনিয়ায় ৩৩৯জন ও ম্যালেরিয়ায় ৪৭৩জন আক্রান্ত হয়েছেন।

কেজরিওয়াল বিবৃতিতে জানিয়েছেন ‘‘মশাবাহিত রোগে যাঁরা আক্রান্ত, তাঁদের‍ চিসিৎসার ওষুধপত্র সরবরাহের জন্য কিছু পদ‍‌ক্ষেপ প্রত্যেক বছর নেওয়া হবে, কিন্তু এ বছর মশার বংশবৃদ্ধি প্রতিরোধ করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।’’

দিল্লির স্বাস্থ্যবিভাগের অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর আশিস নায়েকের জানিয়েছেন,‘‘ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধের কাজটি চক্রাকারে সারা বছর ধারাবাহিকভাবে করতে হবে,’’ তিনি ব‍‌লেন, ‘‘ আমি বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি কেন শুধু দিল্লির সিভিক এজেন্সিগুলোকে দোষা‍‌‍রোপ করা হবে। ডেঙ্গু এবং চিকনগুনিয়ায় আক্রান্তদের অধিকাংশই নয়ডা, গাজিয়াবাদ, ফরিদাবাদ, গুরগাঁও থেকে আসে।

মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ডেঙ্গু এবং চিকনগুনিয়া অ্যাডিস ইজিপ্ট মশা থেকে ছড়ায়। যারা পরিষ্কার জলে বংশবৃদ্ধি করে। অ্যানেফি‍‌‍‌‍‌লিস মশা থেকে ম্যালেরিয়া হয়, এরা পরিষ্কার এবং কর্দমাক্ত দু’টো জলেই বংশবৃদ্ধি করে। দিল্লির ৬৯,০৫৭ বাড়ি মশার বংশবৃদ্ধির আঁতুড়ঘর বলে সরকারি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

National Vector Bo

e Disease Control Programme-র রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৬ সালে দেশে ১লক্ষ ৩০হাজার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে এই রোগে মৃত্যু হয়েছে ২৪৫জনের। কিন্তু এই সংখ্যা বাস্তবের থেকে অনেক কম বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডেঙ্গু বিস্তারের কারণ অনিশ্চিত বৃষ্টিপাত যা অ্যাডিস ইজিপ্ট মশার বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করে, যাদের বংশবৃদ্ধির জন্য পরিষ্কার জলের প্রয়োজন। দ্রুত গতিতে শহর কেন্দ্রীক ব্যবস্থা গড়ে ওঠায় মশাদের বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করছে। মশারা একমাত্র পরিষ্কার, স্রোতহীন জলে বংশবৃদ্ধি করে, যা সাধারণত শহরের বাড়িগু‍‌লিতে দেখা যায়।

শুধুমাত্র সংখ্যার দিক দিয়েই নয়, সংক্রমণও অনেক গুরুত্ব হয়ে উ‍‌ঠেছে। ডেঙ্গুর বিভিন্ন ধরনের ভাইরাল দ্বারাই মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন না, একই মরশুমে ক্রমাগত বিভিন্ন ভাইরাল দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন ফলে রোগ আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

আশঙ্কার কথা এবছর ডেঙ্গু সংক্রমণের ভাইরাস এখনও চিহ্নিত করতে পারেননি। তাই এখনও পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না ঠিক কোন ধরনের ভাইরাস এবার রোগ ছড়াচ্ছে। ২০১৬ সালে ডি ই এন ভি-৩ (DENV-3) ভাইরাসের আধিপত্য ছিল। এইমসের চিকিৎসক ডাঃ ললিত ডার বললেন, ‘‘ এবছর আমরা ডেঙ্গুর ভাইরাস হিসাবে স্টেরেইন-৩ হয়তো আমরা চিহ্নিত করতে পারবো।

ভারতের উন্নত যে দেশীয় টীকা আছে তা ব্যক্তিকে প্রাথমিক চিকিৎসা পর্যায়ে চার ধরনের ডেঙ্গু বিরুদ্ধে লড়াই করতে কার্যকর হবে। ডেঙ্গুর প্রতিরোধের একমাত্র ভ্যাকসিন ডেনগাভাসিয়া (Dengvaxia) ভারতের বাইরে পাওয়া যায়। ভারতের বাজারে ডেনগাভাসিয়া বিক্রি অনুমোদন করা হয়নি। বায়োটেকনোলজি বিভাগের প্রধান বললেন, ডেনগাভাসিয়া (Dengvaxia) মানুষকে ডেঙ্গু আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে। ভারতীয় ভ্যাকসিন মানুষদের রক্ষা করবে যাঁদের কাছে ডেঙ্গু দৃষ্টিগোচর নয়, এই ভ্যাকসিন ভ্রমণকারী এবং শিশুদের ক্ষেত্রে কার্যকর হওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে।

ইন্ডিয়ান ভ্যাকসিন এখনও পর্যন্ত ডেঙ্গুর ভাইরাসের সাথে লড়াই করে যাচ্ছে, আমরা সকলেই চেষ্টা করছি মশার বংশবৃদ্ধি প্রতিরোধ করতে এবং যখনই জ্বর আসবে তখন জ্বরের লক্ষণগুলো আমাদের পর্যবেক্ষণ করে দেখতে হবে যে র্যাতসগুলোর (rashes) কোনও জটিল লক্ষণ, অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণ অথবা মাড়ি নাক দিয়ে রক্তপাত হচ্ছে কিনা।

Featured Posts

Advertisement