ছিন্নমূল ক্রিস্তিনা পেরি রোসসি

জয়া চৌধুরি

২৮ আগস্ট, ২০১৭

প্রায়ই ওরা আসে। বড় বড় শহরের রাস্তা দিয়ে স্থান কালকে স্থগিত করে রেখে ওরা নারী পুরুষ ভেসে বেড়ায়। ওদের পায়ের তলায় শিকড়ের অভাব। এমনকী মাঝে মাঝে ওদের পা-ও থাকে না। ওদের চুল থেকে শিকড় গজায় না, কিংবা মাটির সাথে কোনও কর্ণিক দিয়ে ওদের বেঁধে রাখে না কেউ। সামনের দিকে ভেসে যাওয়া সামুদ্রিক শ্যাওলার মতো ওরা। যদি কখনও পরিধির কোথাও থেকে যায় তারা সেও ক্ষণিক, সামান্য ক’মুহূর্তের জন্য থেমে থাকা সেসব।

তারপর আবার ভাসতে থাকে আর তার ভেতর নিশ্চিত কিছু স্মৃতিকাতরতা থেকেই যায়।

শিকড়ের অভাব তাদের ভিতরে একটা বাতাসের ভাব অর্পণ করে, খুঁতযুক্ত। তারফলে সবদিকে অস্বাচ্ছন্দ্যের বোধ তৈরি হয়। তাদেরকে কেউ উৎসবে নেমন্ত্রন্ন করে না, বাড়িতেও না। কারণ ওরা সন্দেহভাজন। এটা নিশ্চিত যে বাকি মানুষদের মতই কাজকর্ম করে থাকে এরাও, খায়, ঘুমায়, হাঁটে, এমনকি মরেও যায়। কিন্তু হয়ত গভীর মনঃসংযোগ করে যারা এদের দেখে তারা আবিষ্কার করতে পারে তাদের খাবার খাওয়ার ধরন, ঘুমাবার ধরন, হাঁটার ধরন, মরে যাবার ধরনের ভেতর সামান্য, অতি অদৃশ্যপ্রায় তফাত আছে। তারা ম্যাকডোনাল্ডের হ্যামবার্গার খায়, পোকিন্সের চিকেন স্যান্ডউইচ খায়। সে তারা বার্লিন, বার্সিলোন বা মন্টেভিডিও যেখানেই থাকুক না কেন। আর এটা সবচেয়ে বাজে ব্যাপার হলো এখনও অদ্ভুত মেনু থাকে তাদের খাবার টেবিলে। গাসপাচো স্যুপ, পচেরো স্ট্রু কিংবা ইংলিশ ক্রিম সব একসঙ্গে। গোটা দুনিয়ার সবার মতো ওরা রাতে ঘুমায়। কিন্তু কোনও জঘন্য হোটেলের ঘরে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় মুহূর্তের অনিশ্চয়তা ওদের ঘিরে ধরে। ওরা বুঝতে পারে না ওরা কোথায় আছে, দিনের কোন সময় এটা, কিংবা শহরের নামটাই বা কি যেখানে ওরা আছে।

শিকড়ের অভাব ওদের চোখগুলোকে একটা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেয়। একটা মহাজাগতিক স্বনতা, নীলচে জলীয় ভাব, পলায়মান মানুষের চোখ যাদের অতীত শিকড় শক্ত করে প্রোথিত ছিল অথচ আজ সেখানে নিজেকে রক্ষা করার বদলে ভেসে বেড়াচ্ছে কোথায়... যথাযথ কোনও জায়গায় নয়।

কেউ কেউ যদিও জেদি সূক্ষ্ম পরত নিয়ে জন্মায় যা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে দৃঢ় শিকড়ে পরিণত হয়। যে কোনও কারণেই হোক সেটা তারা হারিয়ে ফেলে। হয় সেটা তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেওয়া হয় বা সেটা কেটে বাদ দেওয়া হয়। আর এই জঘন্য কাজটা তাদের প্লেগ রোগীর মতো অচ্ছুৎ করে ফেলে। কিন্তু তাদের জন্য সুদূর কোনও অনুকম্পা জেগে ওঠার বদলে বিদ্বেষ জেগে ওঠে সাধারণত। লোকে সন্দেহ করে ওরা বুঝি অজানা কোনও সন্দেহজনক কাজ করে থাকে। লুট (আদৌ যদি কিছু তেমন থেকে থাকে তা তাদের জন্ম থেকেই থাকা অভাব থেকে বেরোতে চেষ্টা করে) তাদের দোষীতে পরিণত করে।

একবার যদি শিকড় হারিয়ে ফেলে সেই শিকড় আর কখনও শুধরে নেওয়া যায় না। সেই ছিন্নমূলতা বৃথা চলে যায়, বহু সময় কিনারায় থমকে থেমে থাকে, গাছের লাগোয়া...সেই বিরাট অ‌্যাপেন্ডিক্সের দিকে চেয়ে থাকে আড়চোখে যা গাছকে মাটির সঙ্গে বেঁধে রাখে। শিকড় ছোঁয়াচে নয়। অজানা শরীরে সে আটকাতেও চায় না।

অন্য সবাইভাবে একশহর কিংবা দেশে বহুদিন ধরে থেকে যেতে যেতে হয়ত উদাহরণস্বরূপ কখনও শিকড়গুলোকে মরা শিকড় কিংবা প্লাস্টিকের শিকড় বলেও ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু কোনও শহরই এতটা দয়ালু হয় না।

যাইহোক আশাবাদী ছিন্নমূল মানুষেরাও থাকে। যারা বিষয়ের ভালো দিকগুলি নিয়ে নিশ্চিত হতে চায়। তারা দৃঢ়ভাবে বলে যে শিকড়ের অভাব আসলে চলমানতার এক বিশাল মুক্তিবিশেষ। নির্ভরতার অসুবিধাগুলোকে উড়িয়ে দেয় আর উচ্ছেদকে সমর্থন করে। তাদের আলোচনার মধ্য দিয়ে একটা জোরালো হাওয়া বয়ে যায় আর বাতাসের হাঁ-মুখের ভেতরে তারা অদৃশ্য হয়ে যায়।

==============================

লেখক পরিচিতি

ক্রিস্তিনা পেরি রোসসি : ১৯৪১ সালেউরুগুয়ের মন্টে ভিডিও শহরে জন্ম লেখক অনুবাদক ক্রিস্তিনা পেরি রোসসির। ৩৭টি গ্রন্থের প্রণেতা এই মহিলা সাহিত্যিক ১৯৭২সালে সে দেশের মিলিটারি শাসনের সময় স্পেন দেশে পালিয়ে যান। সেখানেই নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন ১৯৭৫সালে। বর্তমানে তিনি বার্সেলোনাতে থাকেন ও কাতালুনিয়া বেতারকেন্দ্রেইে সাংবাদিকতা করেন। ২০০৬সালে কাতালান ভাষার বদলে স্যালোনিশ ভাষা বলার জন্য বেতারকেন্দ্রে চাকরি থেকে বরখাস্ত হন। তারপর বিভিন্ন আন্দোলনের মাধ্যমে সসম্মানে চাকরিতে ফিরে আসেন। ২০০৪সালে লেখা ‘এস্রাতেখিয়াস দেল দেসেও’ বা ‘কামনার স্যাদুয টেজি’ নামে উপন্যাসটি ইংরাজিতে অনুবাদ করেন লেখিকা তাতিয়ানা দে লা তিয়েররা।

Featured Posts

Advertisement