তরোয়াল ও দেওয়ালের মাঝখানে

জয়া চৌধুরি

৩ জুলাই, ২০১৭

তরোয়াল ও দেওয়ালের মাঝখানে যে জায়গাটা পড়ে থাকে তা ভীষণই সামান্য। তরোয়ালের হাত থেকে বাঁচতে আমি যদি দেওয়ালের দিকে ক্রমশ পিছিয়ে যাই পাঁচিলের শীতলতা আমায় জমাট হিম করে দেয়। দেওয়ালের হাত থেকে বাঁচতে যদি আমি উলটো দিকে যাই আমার গলার নলিতে ঠেকে তরোয়ালের ডগা। ওদের ভিতরে কোনও পরিবর্তনই স্থাপন করতে চাওয়া মিথ্যে হয় —একথাই ঘোষণা করছি আমি। দেওয়ালের মতই তরোয়ালই আমার বিনষ্টি, আমার মৃত্যু ঘোষণা করে, যার জন্য কোনটা বেছে নেব ভেবে ইতস্তত করি। তরোয়াল যদি দেওয়াল ও পাঁচিলের চেয়ে কম ধারালো হয়, অন্যটার চেয়ে কম তীব্র যন্ত্রণাদায়ক হয় তখনই সম্ভাবনা আসতে পারে সিদ্ধান্ত নেবার। কিন্তু তরোয়াল অথবা দেওয়াল যে কোন একটাকে কেউ যদি লক্ষ্য করে তাহলে বুঝতে পারবে তাদের ফারাকটা একেবারে বাহ্যিক। তরোয়াল আর দেওয়ালের মধ্যে যে ছোট জায়গাটা থাকে সেখানে বেঁচে থাকবার চেষ্টা করতে করতে আমার মৃত্যুকে মুছে ফেলতে পারা কখনই সম্ভব নয় একথাটা জানি আমি। শুধু যে বাতাস বিকট হয়ে উঠছে তাই নয়, বদ গ্যাসে জায়গাটা ভরে উঠেছে সঠিকভাবে বলতে গেলে হাওয়া বিষিয়ে উঠেছে। তার ওপর তরোয়াল দিয়ে আমার গায়ে ছোট ছোট অংশ চিরে দিয়েছে যা আমি বিনয় দিয়ে ঢেকে রেখেছি। আর দেওয়ালের শীতলতা আমার ফুসফুসকে কফে ভরিয়ে দিয়েছে, যদিও আমি সতর্কভাবেই কেশে থাকি। আপনি যদি আমাকে এখান থেকে উদ্ধার করে বের করে নিয়ে যেতে পারেন (উদ্ধার পাওয়া অসম্ভব) তাহলে তরোয়াল আর পাঁচিল কিন্তু মুখোমুখি পড়ে থাকবে। কিন্তু আমাকে হারিয়ে তাদের ক্ষমতা এতটাই নুয়ে পড়বে যে সম্ভবত দেওয়াল ভেঙে পড়বে আর তরোয়ালে মরচে ধরে যাবে।

কিন্তু কোন অসতর্ক ছিদ্রই তো নেই যা দিয়ে আমি পালাতে পারি। আর তরোয়ালকে যখন হারিয়ে দিতে পারবো দেওয়াল তখন বিশাল আকার নেবে। আর যদি দেওয়াল থেকে নিজেকে আলাদা করতে পারি তাহলে তরোয়াল এগিয়ে আসবে আমার দিকে।

খেলাচ্ছলে তরোয়ালের মনোযোগ সরিয়ে দিতে পেরেছি আমি, কিন্তু সে তো ভারী চালাক। আমার গলা থেকে যখন ওর ডগাটা সরিয়ে নিল তার কারণ হলো সেটা আমার বুকের দিকে তাক করা। এটা সত্যি মাঝে মাঝে ভুলে যাই যে, ওটা বরফের দেওয়াল হয়ে উঠতে চেষ্টা করে। ঠিক সে সময় পাঁচিলটার কাছে ক্লান্ত হয়ে আশ্রয় নিতে যাই, ব্যাপারটা ভালো করি না। একটা শরীরী হিম শীতলতা আমাকে তার প্রকৃতি স্মরণ করিয়ে দেয়।

শেষের মাসগুলি এভাবেই বেঁচে আছি আমি। জানি না কতদিন আমি এভাবে পাঁচিলটাকে কিংবা তরোয়ালটাকে সরিয়ে রাখতে পারব। প্রতিবার আরও সংকুচিত হয়ে যায় জায়গাটা, আর আমার শক্তি ক্লান্ত হতে থাকে। গন্তব্যের প্রতি উদাসীন আমি। ফুসফুসের সংক্রমণে বা কোন ক্ষতস্থান বিষিয়ে মারাও যাই, যদিও তা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন হই না।

কিন্তু নিশ্চিতভাবে ঘোষণা করি তরোয়াল আর দেওয়ালের মধ্যে এমন কোনও জায়গাই থাকে না যেখানে বেঁচে থাকা যায়।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement