ঘটনাবহু জলছবির গল্পসমগ্র

কিংশুক রায়

১২ জুন, ২০১৭

একদিন যে গল্প পড়ে মনে মনে বড় হয়েছি আজ নতুন করে সেইসব গল্প পড়তে গিয়ে হারানো সুখস্মৃতি অনুভব করতে পারছি। এই পারাটা কখনও মনগড়া নয় বরং মনের গভীরে ডুব দিয়ে অবচেতন মনে যে ছবিগুলি এতদিন এঁকে চলেছি আজ সেই ছবিগুলি জলছবি হয়ে উঠেছে। এই জলছবির রূপকার কথাশিল্পী সমীর রক্ষিত। লেখকের গল্পসমগ্রের তৃতীয় খণ্ডের পঞ্চাশটি গল্পের প্রায় প্রতিটি গল্পে রয়েছে আশ্চর্য সব জলছবি। গল্প অনেকেই লেখেন, শুধুই লেখেন কিন্তু কতজনের গল্প, গল্প হয়ে ওঠে জলছবি ঘাঁটতে ঘাঁটতে এমন প্রশ্নের উদয় হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সমীর রক্ষিত গল্প লেখেন না বরং অক্ষরমালার মধ্য দিয়ে গল্প বলেন। যে গল্প কালের নিয়মে হারিয়ে যাবার নয়। আবার কালের নিয়মেই গল্পের শরীরে নিপুণ হাতে লেখক বপন করেছেন সময়ের দিকচিহ্ন। এই দিকচিহ্ন ধরে আমরা সহজেই পৌঁছে যেতে পারি অতীত থেকে বর্তমান দিনলিপিতে। আমাদের চারপাশের যে সমাজজীবন, যে রাষ্ট্রব্যবস্থা তার গভীরে যে শ্রেণি সম্পর্ক, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিকতার অবমূল্যায়ন চলছে যা ক্রমশ মানবিক মননশীলতাকে হিমঘরে পাঠাবার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত এমন বিষয়ও লেখক অনাদরে দূরে সরিয়ে রাখেননি। আর তাই সমীর রক্ষিতের যেকোন গল্প পাঠককে টেনে নিয়ে যায় গভীর থেকে গভীরতর অনুভবের জগতে।

এমন নয় যে পঞ্চাশটি গল্প পরস্পর পরস্পরের সম্পর্কযুক্ত। হাতের পাঁচটি আঙ্গুল যেমন সমান নয় ঠিক তেমনি প্রতিটি গল্পের লিখনশৈলীতে রয়েছে বৈচিত্র। এক্ষেত্রে লেখকের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার সঙ্গে মিশে আছে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সমাজ ভাবনা। গল্পের বিষয় খুব চেনা মনে হতেই পারে কিন্তু তার মধ্যেই রয়েছে ভিন্নতার স্বাদ। গল্প সমগ্রের প্রথম গল্প ‘র‌্যাগিং’। র‌্যাগিং সম্পর্কে প্রাথমিক একটা ধারণা সকলেরই আছে কিন্তু লেখক যখন এর সঙ্গে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের ফলে যাওয়া অপসংস্কৃতির কথা বলেন তখন র‌্যাগিং নামক সমগ্র জলছবিটা অচিরেই রাজনৈতিক প্রেক্ষিত পেয়ে যায়। দ্বিতীয় গল্প ‘শিশুবর্ষ’ সেখানে আরও সুখ আরও বৈভবের ইদুর দৌড়ে সন্তানকে ক্রেসে রেখে নিজেদের যাপিত জীবনের সাতসতেরো সুখের খোঁজে কল্লোল ও পূর্ণার গল্প আমাদের সমাজে বিরল নয়। সন্তানের প্রতি অভিভাবকদের নৈতিক কর্তব্যের কথা লেখক সুচিন্তিতভাবে মিশিয়ে দেন। কিন্তু জলছবির রঙ পালটায় না। একই থাকে। সেই সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার মতন। ‘সম্পদ’ গল্পে পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে একটা মানবিক দিক উন্মোচন করতে গিয়ে ভোগবাদী সমাজের একটা কদর্য চেহারা সামনে চলে আসে। যেকোন নবজাতকই আমাদের সম্পদ। মানবসম্পদ। এই বিশ্বাস বোধের জলছবি কখনও কি ভেঙে পড়ে? পড়তে পারে? সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে ঋতুর অসময়ে চলে যাওয়ায় মন যতটা বিষণ্ণতা ঢেকে যায় ঠিক সেই সময় লেখক আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন ‘পৃথিবীতে প্রতিমুহূর্তে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ঘটে যাচ্ছে তবু আলো এতটুকু ম্লান হয় না, অজস্র মানুষ একবারও থমকে দাঁড়ায় না, সময় এক পলকের জন্যও থেমে যায় না।’ মণিমালার গল্পটা (আগুনের জিভ) কিন্তু চেনা ছকের বাইরে। উচ্চবিত্ত সমাজের খণ্ডচিত্র। উপরে ওঠার সোপান হিসেবে নয়নের মণিমালাকে ব্যবহার করতে চাওয়াটার থেকে বড় হয়ে ওঠে মণিমালার সবছেড়ে বাইরে এসে দাঁড়ানো। নারীর আত্মসম্মানবোধ আর স্বাধিকারের জলছবি। এক ‘কোজাগরী’ গল্পেইতো কত চরিত্র, কত সব বিচিত্র ঘটনাস্রোত। বেঁচে থাকার জন্য জীবনপন সংগ্রামের অলিগলি দিয়ে কত পূর্ণিমার চাঁদ তিস্তার পারভাঙার শব্দ মেঘনার আর্তনাদ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। কিন্তু ভালো করে বাঁচতে গেলে সমাজটাকে আগে গড়ে পিটে নিতে হয়। অনেক ভাঙাগড়া অনেক ভালোবাসার গল্প কোজাগরী। এভাবেই কথাকার সমীর রক্ষিত গল্পের ছলে মানুষের জীবনসংগ্রাম, ভালোবাসার গল্পের জলছবি তৈরি করেন। যে ছবি চির অমলিন। অনেক আশা নিরাশার জলছবি ‘সন্ত্রাস’। সন্ত্রাস মানেই ক্ষমতাসীনদের রক্তচক্ষু এমন একটা ছবি আমাদের রাজ্য এখন মানুষ প্রতিদিন অনুভব করছেন। কিন্ত এখানে উৎপল আর ব্রতীর গল্পটা সন্ত্রাসের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে ভালোবাসা আর অনুরাগে। ‘যে যুবক জীবনে কোনদিনব মহিলার সামনে...’ গল্প পাঠের আগেই একটা ছবি মনের মধ্যে তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু গল্পের গভীরে প্রবেশ করলে সামনে চলে আসে একটা কম্পিউটারের চেয়ে মানুষের মেমরি অনেক শার্প। যেন এক ঝলকের দৃষ্টি বিনিময়। যেন শাশ্বতকালের। অনন্তকালের। সেই আদিমকাল থেকে আজকের এই মুহূর্ত অবধি পৃথিবীর সব প্রেমিক-প্রেমিকা, স্বামী স্ত্রীর, যুবক-যুবতীর দৃষ্টি বিনিময় হয়ে গেছে, হচ্ছে এই মুহূর্তেও, এটি তারই একটি। এই দৃষ্টি বিনিময় ঘটল কত এয়েভলেংথে? কতটা তাপ, ক্রোধ, ঘৃণা, প্রেম, কামের বিনিময় ঘটল?’ কম্পিউটার তার ডাটাবেস থেকে কি খবর দেবে? এক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গী মন। মনের সঙ্গী জলছবি। সেই জলছবির চরণচিহ্ন ছড়িয়ে আছে সমীর রক্ষিতের গল্প সমগ্রের গল্পগুলির মধ্যে। ‘ভেলিয়াচাঁটির ইস্কুল’ এমন এক চিত্রকল্পের জন্ম দেয় যা চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের স্বাদ নিয়ে আসে। গল্পের নামকরণেও লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করতে হয়। গল্পের নাম যদি হয় ‘যদিদং হৃদয়ং’, ‘হানিমুন’, ‘ ফুটন্ত ফউলের গন্ধ’, ‘বৃদ্ধ ও বাজপাখি’, ‘ভারত, জনসন এবং জিরো আওয়ার’ তখন নড়ে চড়এ বসতে না বসতে কল্পবিজ্ঞান থেকে কুসংস্কারমুক্ত মননের জলছবি ভেসে ওঠে। ‘মানুষের সীমানা’, ‘দেবীমহিমা’, ‘মাটির গন্ধওলা মানুষেরা’, ‘স্বার্থ’, ‘কারফিউ চলছে’ গল্পগুলির মধ্য দিয়ে লেখক বাংলা গল্পের জগতে নতুনধারার গল্পের সূচনা করলেন। গল্পগুলির মধ্যে ছড়িয়ে আছে নানা জীবন, নানা জীবনের রঙ, নানান বৈচিত্রে ভরা চরিত্র। প্রতিনিয়ত দেখা অদেখার মধ্যে তারা রয়েছে আমাদের চারপাশে এই সমাজে।

গল্প সমগ্র। সমীর রক্ষিত। দিয়া পাবলিকেশন। ৪৪/১এ, বেনিয়াটোলা লেন, কলকাতা-৯। দাম ৩০০টাকা।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement