শ্রমজীবী মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত নোট
বাতিল আর জি এস টি-র ধাক্কায়

নিজস্ব প্রতিনিধি

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

নোট বাতিল আর জি এস টি-র মারাত্মক প্রভাব পড়েছে ভারতের শ্রমিকশ্রেণির ওপরে। একদিকে কর্মচ্যুতির ধাক্কা, অন্যদিকে অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যেই দেশের অর্থনীতি সংক্রান্ত রিপোর্টগুলিতে এই নেতিবাচক দিকগুলি প্রকাশিত হতে শুরু করেছে।

রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার প্রকাশিত রিপোর্ট অনুসারে নোট বাতিলের ফলে লাভ হয়েছে বড় শিল্প কোম্পানিগুলির। তাদের মুনাফা বেড়েছে। আর ছোট শিল্পসংস্থাগুলির ব্যবসা ধাক্কা খেয়েছে। আর বি আই-র রিপোর্ট দেখিয়েছে, গত মার্চ মাসে সমাপ্ত শেষ ত্রৈমাসিক সময়কালে ছোট সংস্থা যাদের লেনদেনের পরিমাণ ২৫কোটি টাকার নিচে তাদের বিক্রির পরিমাণ ৫৭.৬শতাংশ কমে গেছে। অন্যদিকে বড় সংস্থা যাদের লেনদেনের পরিমাণ ১হাজার কোটি টাকার বেশি তাদের বিক্রির পরিমাণ ৯.৫শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ছোট শিল্প সংস্থাগুলিতেই কর্মসংস্থানের পরিমাণ বেশি, তাদের এই অর্থনৈতিক ধাক্কার ফল যে শেষপর্যন্ত কর্মরত শ্রমিক কর্মচারীদের ঘাড়েই এসে পড়েছে সে বিষয়ে প্রায় সকলেই একমত।

প্রথমে নোট বাতিল এবং তারপরে জি এস টি-র ধাক্কায় অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে যে সমস্যা দেখা দিয়েছে তার মাশুল দিতে হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষকে। নোট বাতিলের সঙ্গে ডিজিটাইজেশনের ফলে অসংগঠিত শিল্পক্ষেত্রে বহু কর্মহানি ঘটেছে। জি এস টি-র ফলে সব পণ্যই এখন সরকারের করের আওতায় চলে এসেছে। কোনওটার ওপরে চড়া কর বসেছে, কোনওটার ওপরে কম, আবার কোনওটার ওপরে শূন্য কর বসানো আছে। এখন আর প্রতিবছর বাজেটে সরকারকে পণ্যের ওপরে কর নির্ধারণ করতে হবে না। সংসদের কোনও ক্ষমতাই থাকবে না সেই বাজেটের বিচার বিবেচনা করার। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের একটি বোর্ড তাদের এক্সিকিউটিভদের দিয়ে জি এস টি-র হার নির্ধারণ করে দেবে, কোনও পণ্যকে নতুন করের হারের আওতাতেও নিয়ে আসতে পারবে। সব মিলিয়ে নতুন ব্যবস্থায় সরকারের কর আদায়ের ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু এটাও সত্যি যে যেরকম চড়া হারে কর বসানো হয়েছে তাতে জিনিসপত্রের দাম কমার সম্ভাবনা নেই, বরং জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি যত বেশি হবে ততোই সরকারের কর আদায় বেশি হবে। প্রকৃতপক্ষে সরকার মূল্যবৃদ্ধি কমানোর চেষ্টা না করে কর ব্যবস্থাকে তার সঙ্গে যুক্ত করে আরও বেশি কর আদায়ের সুযোগকে কাজে লাগাতে নেমে পড়েছে।

আগে উৎপাদন শুল্ক নেওয়া হতো পণ্য কারখানায় উৎপাদন হওয়ার পরে তার যে মূল্য তার ওপরে হিসাব কষে। কিন্তু জি এস টি আরোপিত হয় কারখানায় উৎপাদনের পরবর্তী পর্যায়ে নয়, বাজারে জিনিসটির বিক্রয় পর্যায়ে। অর্থাৎ এটি ম্যানুফ্যাকচারিং পর্যায়ে নয়, কনসামপশন পর্যায়ে আদায় করা হয়। এই দুই পর্যায়ের মধ্যে দামের অনেক ফারাক হয়ে যায়। সরকার দ্বিতীয় পর্যায়ে কর আরোপের মাধ্যমে তার আদায়কে অনেকটাই বাড়িয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছে।

তাছাড়া কর আদায়ের ব্যবস্থাটি করা হয়েছে জি এস টি এন নামের প্রাইভেট কোম্পানির মাধ্যমে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের ৪৯শতাংশ শেয়ার আছে এই কোম্পানিতে, ৫১শতাংশ শেয়ার পাঁচটি বেসরকারি কোম্পানির হাতে। বেসরকারি কোম্পানি হওয়ায় কর আদায়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও তারা সি এ জি অডিটের বাইরে, এবং তথ্যের অধিকার আইন তাদের ওপরে প্রযোজ্য নয়। সি পি আই (এম) দাবি করেছে, জি এস টি এন-কে তথ্যের অধিকার আইনের আওতায় এবং সি এ জি অডিটের আওতায় নিয়ে আসা দরকার দেশের স্বার্থে।

জি এস টি-কে যেভাবে কার্যকর করা হয়েছে তাতে আরও একটি গুরুতর আঘাত নেমে আসছে শ্রমজীবী মানুষের ওপরে, বিশেষত অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের ওপরে। অতীতে বিভিন্ন সময়ে শ্রমিক আন্দোলনের চাপে কেন্দ্রীয় সরকার শ্রমিক কল্যাণের জন্য বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প চালু করেছিল যা রূপায়ণ করার জন্য সেস আদায় করা হতো। সেই সেসের টাকায় সুরক্ষা প্রকল্প রূপায়ণ করা হতো। মোদী সরকার এমনিতেই ২০১৬ সাল থেকে একের পর এক সেস প্রত্যাহার করে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলি প্রত্যাহার করে নিচ্ছিল। কিন্তু জি এস টি চালুর সঙ্গে সঙ্গে আলাদা করে শ্রমিক কল্যাণের জন্য সেস আদায়ের কোনও সুযোগ রইলো না। সেস উঠে গেল। এই অবস্থায় নির্মাণশ্রমিক, বিড়িশ্রমিক, পাথর ভাঙাশ্রমিক ইত্যাদি অংশের মানুষের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলির কী হবে তা নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে। জি এস টি-র মাধ্যমে সরকার সেসসহ গোটা আদায়টাই একসঙ্গে করে নিচ্ছে। তাহলে সরকার কেন বাজেটে শ্রমিকদের জন্য পৃথকভাবে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের বরাদ্দ নিশ্চিত করবে না? মোদী সরকারকে এই কাজে শ্রমিক আন্দোলনই একমাত্র বাধ্য করতে পারে।

Featured Posts

Advertisement