ফ্যাকাসে স্টোন ইন্ডিয়া, উৎসবের মুখে বেতন
বোনাস, পি এফ সবই বকেয়ার ঝুলিতে

অর্ক রাজপণ্ডিত

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

২০১৬ সালের ২১শে এপ্রিল। সি এন বি সি টিভি এইট্টিনে নিজেই বলেছিলেন জি পি গোয়েঙ্কা। ডানকান গ্রুপের কর্ণধার। স্টোন ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান। ছত্তিশগড়ে ৯হাজার বায়ো টয়লেট বানাবার জন্য ২৮ কোটি টাকার বরাত পেয়েছিল সংস্থা। একটুও খুশি চেপে না রেখে জি পি গোয়েঙ্কা বলেছিলেন, ‘এখনো পর্যন্ত এটিই স্টোন ইন্ডিয়ার সবচেয়ে বড় বরাত’।

রয়াল ক্যালকাটা গলফ ক্লাবের নিয়মিত গলফার জি পি গোয়েঙ্কা একই সঙ্গে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন এই প্রকল্পে কুড়ি থেকে পঁচিশ শতাংশের বেশি হয়ত লাভ হবে না!

তারাতলা থেকে বন্দর যাওয়ার রাস্তায় ব্রিটানিয়া কারখানার পাশেই পঁচাশি বছরের পুরানো কারখানা ‘স্টোন ইন্ডিয়া লিমিটেড’। কর্মীসংখ্যা প্রায় চারশোর কাছাকাছি, উৎসবের আগে ধুঁকছে কারখানা। গত তিন মাস ধরে উৎপাদন বন্ধ। কেনা বন্ধ হয়েছে কাঁচামালও। অথচ ভারতীয় রেলের অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী এই পুরানো সংস্থার কাছে এই মুহূর্তে বরাতের পরিমাণ দুশো কোটি টাকার!

শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন ছাড়াও পি এফ, গ্র্যাচুইটি, সমবায়ের সঞ্চিত অর্থ কয়েক কোটি টাকার বকেয়া। পোর্ট ট্রাস্টের কাছে লিজ নেওয়া জমিতে চলছিল কারখানা, পোর্ট ট্রাস্টকে জমির ভাড়া বাবদ দেওয়ার টাকা গত দুমাস ধরে বন্ধ। জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসের বেতন পাননি শ্রমিকরা। সেপ্টেম্বর শেষ হতে চললেও, বোনাস তো দূর, বেতন দিতেও রাজি নয় কর্তৃপক্ষ। বকেয়া রয়েছে পি এফ খাতে প্রায় আশি লক্ষ টাকা, শ্রমিকদের গ্র্যাচুইটির পাঁচ কোটি টাকা বকেয়া। বিভিন্ন ব্যাঙ্ক থেকে নেওয়া ঋণও শোধ করছেন না মালিক কর্তৃপক্ষ।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ভারতীয় রেলকে ইন্টারলক, ব্রেকিং সিস্টেমের মতো যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে এসেছে সংস্থাটি। এখন বরাত মেলা সত্ত্বেও উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে কারখানাটিকে বন্ধ করার জন্য। তিন মাস বেতন না পেয়ে কার্যত অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন শ্রমিক কর্মচারীরা ও তাঁদের পরিবার। শ্রম কমিশনারকে তিন মাস আগে উৎপাদন বন্ধের সময় চিঠি লেখা হলেও, এখনও পর্যন্ত কোন ত্রিপাক্ষিক বৈঠক ডাকা হয়নি। চিঠি লেখা হয়েছিল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে। সবাই ছিলেন নিরুত্তর।

আশ্বিনের সকাল। মহালয়া হয়ে গেছে দুদিন আগেই। আলিপুরের ‘পশ’ এলাকায় তখন হুলুস্থুলু। ডানকান গ্রুপের মালিক জি পি গোয়েঙ্কার বড় পাঁচিল তোলা বাড়ির সামনে তখন স্লোগানে ফেটে পড়ছেন ‘স্টোন ইন্ডিয়া লিমিটেড’-র শ্রমিকরা।

বেনজির শ্রমিক ঐক্য। ঝান্ডার রঙ ভুলে জি পি গোয়েঙ্কার বাড়ির সামনে অবস্থান বিক্ষোভে শামিল কারখানার তিনটি শ্রমিক ইউনিয়ন। একসাথে।

কার্যত হতবাক হয়ে যায় আলিপুরের অভিজাত পাড়া। সকাল নটায় তারাতলার কারখানার গেট থেকে মিছিল শুরু করেন শ্রমিকরা। সি আই টি ইউ, আই এন টি ইউ সি এবং আই এন টি টি ইউ সি তিনটি শ্রমিক ইউনিয়নের ডাকা মিছিলে শামিল হন কারখানার সব শ্রমিক, এমনকি ম্যানেজমেন্টেরও জনাদশেক আধিকারিক মিছিলে পথ হাঁটেন।

আলিপুরে জি পি গোয়েঙ্কার বাড়ির সামনে পৌঁছে শুরু হয় স্লোগান। ‘অবিলম্বে দিতে হবে বকেয়া বেতন বোনাস’, ‘বকেয়া বেতন না পাওয়া পর্যন্ত মালিকের বাড়ি ছাড়ছি না’, স্লোগান উঠতে থাকে। আলিপুরের অভিজাত এলাকার বাসিন্দাদের এমন স্লোগান শোনার অভিজ্ঞতা নেই। জি পি গোয়েঙ্কার বাড়ি শুধু নয়, আশপাশের সুদৃশ্য বাড়ির বারান্দা থেকেও উঁকিঝুঁকি। যে প্রশাসন গত তিনমাস ধরে শ্রমিকদের ন্যয্য দাবি কানে তোলেনি, তারাও হতবাক হয়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছুটে আসেন আলিপুর থানা ও তারাতলা থানার ওসি। জি পি গোয়েঙ্কার বাড়ির সামনে পুলিশ পাহারা বসানো হলেও, এক ইঞ্চি পিছু হটেননি শ্রমিকরা। একটাই দাবি, মালিককে কথা বলতে হবে। শ্রমিকদের নাছোড়বান্দা মনোভাবে পিছু হটে মালিক কর্তৃপক্ষ। মালিকের বাংলোর লোহার ফটক সরিয়ে বেরিয়ে আসেন ডানকান গ্রুপের আইনজীবীরা। তাঁরা প্রতিশ্রুতি দেন পুলিশের সামনেই, জি পি গোয়েঙ্কা শনিবার ডানকান হাউসে বৈঠক করবেন শ্রমিকদের সঙ্গে, পুজোর আগেই মিটিয়ে দেওয়া হবে সমস্ত বকেয়া বেতন, বোনাস।

গত শনিবার ডালহৌসির ডানকান হাউসে এসেছিলেন জি পি গোয়েঙ্কা। ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করে কথা দিয়ে যান পঞ্চমী আর ষষ্ঠীর সকালের মধ্যেই বকেয়া বোনাস, বেতন দিয়ে দেবেন। নভেম্বর থেকে ফের শুরু হবে উৎপাদন।

চিঠিচাপাটি যা পারেনি। বার বার মুখে বলে যা হয়নি। মালিকের বাড়ি ঘিরে একদিন শ্রমিকরা হট্টোগোল করতেই দাবি আদায়।

এই শারদে আশার আলো স্টোন ইন্ডিয়া-র শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের জয়। আবার, আরও একবার স্টোন ইন্ডিয়ার মজুররা দেখিয়ে দিল প্রবল পরাক্রমশালী মালিকও পিছু হটে ঐক্যবদ্ধ শ্রেণি আন্দোলনের কাছে। হ্যাঁ, এভাবেই পিছু হটানো যায়।

Featured Posts

Advertisement