সরকার আর মালিকের হাতে হাত
মিল চালু, শ্রমিকের মজুরি নেই

চিরন্তন পাড়ুই

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

হাওড়া, ২৪শে সেপ্টেম্বর — দুর্গাদের সংসারে দুর্গতি নেমে এসেছে! বৃদ্ধ মহাদেব ঠায় বসে ঘরের চৌকাঠে। শুকনো মুখে মজুরি ছাড়াই ঘরে ফিরেছে মজদুর ছেলে।

রবিবার সকালে কানোরিয়া জুটমিলের গেট পেরিয়েও কাজ মেলেনি। কাজ না পেয়ে বাড়ি ফিরে আসতে হয়েছে সিজবেড়িয়ার কমল কয়ালকে। ঘরে ফিরেই স্ত্রীকে কমল কয়াল জানালেন, ‘পেমেন্ট স্লিপ পেলেও মজুরি মেলেনি। তাই কেনাকাটা কিছুই হবে না।’ কিন্তু উৎসবের কেনাকাটা, জামাকাপড় বারণ শুনলেও পেটের খিদে বারণ মানবে কেন? কমল কয়ালের স্ত্রী নমিতা কয়াল বললেন, ছেলেটাকে অভাবের জন্য আগেই মামার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি। ভেবেছিলাম পুজোর সময় একটা অন্তত পোশাক কিনে দেব। এখন বয়স্ক মানুষটাকে কী খেতে দেবো? কি করে সংসার চলবে?

কানোরিয়া জুটমিল গেট খোলার পর তৃণমূল সরকার বন্ধ করে দিয়েছে বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের ভাতা। কারখানায় কাজ করেও আগস্ট মাসের ১৫দিনের মজুরি বকেয়া। শুধু কমল কয়াল নয়, এই অভিযোগ বহু শ্রমিকের। কাজ না পাওয়া শ্রমিকদের অভিযোগ, কানোরিয়া জুটমিল গেট খোলার নামে ভণ্ডামি করেছে তৃণমূল সরকার। মিল খুললেও বাঁশি বাজে না। কাজ পায়নি সব শ্রমিক। কারখানা পুরো চললে ৩০৪১জনের কাজ হওয়ার কথা। কারখানার গেট খোলার পর কাজ পেয়েছিলেন ৮২০জন। তৃণমূলের প্রতি আনুগত্য না থাকাতে এখন ২০০ জন শ্রমিক কাজ পাচ্ছেন পালা করে। কাজ না পাওয়া শ্রমিকের জন্য বামফ্রন্ট সরকারের সময় চালু মিল শ্রমিকভাতাও এখন বন্ধ। বকেয়া পি এফ, ই এস আই, লাইন ছুটির টাকা, শ্রমিকদের থেকে মালিকের ধার নেওয়া টাকা।

ফুলেশ্বরের কালসাবা বাজার পেরিয়ে বেলে সিজবেড়িয়াতে বংশ পরম্পরায় শ্রমিক পরিবারের বাস। এখানেই বন্ধ মিল খোলার মডেল দৃষ্টান্ত তৃণমূল সরকারের! মহাদেব কয়াল জানালেন, ‘কানোরিয়া জুট মিলের ফিনিশিং ডিপার্টমেন্টের হেড মিস্ত্রি ছিলাম। অবসর নেওয়ার পর গ্র্যাচুইটির আড়াই লক্ষ টাকা পেলাম না। সব বকেয়া মেটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজ্যের তৃণমূল সরকারের শ্রমমন্ত্রী কানোরিয়া জুটমিলের গেট খুলিয়েছিলেন মালিককে পাশে নিয়ে। কারখানার গেট খুললেও স্থায়ীশ্রমিক নেই। চার হাজার শ্রমিকের কাজ পাওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও কাজ করে মাত্র দুশ শ্রমিক। তাও সবার কাজ মেলে না। বকেয়া টাকাটা পেলেও কিছুটা যন্ত্রণা চাপা যেত। মহাদেবের বড় ছেলে কমল মণ্ডল পেমেন্টের জন্য স্লিপ পেয়েছেন। যাতে লেখা ৩১শে আগস্ট পর্যন্ত ১৫দিনের মজুরি হিসাবে ২৩৬৮টাকা তিনি পাবেন। ব্যাঙ্কে গিয়ে দেখেছেন মজুরির টাকা মালিক দেয়নি। বামফ্রন্ট সরকারের সময় এমন জুলুম ছিল না।

বেলে সিজবেড়িয়া গ্রামেই থাকেন সমর দাস। জানালেন, কানোরিয়া জুটমিলে ২০০ জন শ্রমিককে কাজ করানো হয়। সকলের কাজ জোটে না। পালা করে কাজ দেওয়া হয়। কিন্তু সংসারতো সে কথা শুনবে না। তাই কখনও জোগাড়ে, পিচ রাস্তার লেবারের কাজ কিংবা জনমজুরি করি। সমর দাসের তিন ছেলে মেয়ে। বড় ছেলে পলাশ, মেজো মেয়ে মন্দিরা উলুবেড়িয়া কলেজে বি এ প্রথম বর্ষে পড়ে। ছোট ছেলে মানস অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। সমর দাস বলেন, কারখানা যখন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে বন্ধ করেছিল মালিক বন্ধ মিলের শ্রমিককে সরকার ভাতা দিয়ে পাশে দাঁড়াতো। বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের জন্য ধাপে ধাপে ৫০০, ৭৫০, ১০০০টাকা থেকে বাড়িয়ে বামফ্রন্ট সরকার মাসে ১৫০০টাকা ভাতার ব্যবস্থা করেছিল। রাজ্যের তৃণমূল সরকারের শ্রমমন্ত্রী মালিককে পাশে নিয়ে কারখানার গেট খুলে সব দুর্দশা মেটানোর কথা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু এই পুজোর সময় বোনাস মেলেনি। উলটে শ্রমিকদের মধ্যে যাঁরা সরকারি ভাতা পেতেন তাও বন্ধ করে রাজ্য সরকার। বাধ্য হয়ে সমর দাসের স্ত্রীকে জরির কাজ করতে হয়।

একটা কারখানা খোলা মানে যেখানে হাজার চারেক লোকের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান ও পরোক্ষে কয়েক হাজার মানুষের রুটি-রুজির ভরসা, সেখানে কারখানার গেট খুলে ধাপ্পা দেওয়া হয়েছে এই শিল্প তালুকে। বার্ধক্য বয়সে নিজের প্রাপ্য কবে মিলবে জানেন না বিছানায় শয্যাশায়ী বাসুদেব কয়াল। ‘আমার হকের অবসরের সব টাকাটাই পকেটে পুরবে মালিক। ছেলেরা পাবে না। আমাদের কথা কেউ শুনবে না। সরকারটাইতো মালিকের পক্ষে।’, বলছিলেন বাসুদেব কয়াল। স্বামী হারানো অষ্ট প্রামাণিক বার্ধক্য বয়সেও মাটিতে কাপড় পেতে জরির কাজ করছেন দুটো পয়সার জন্য। অষ্ট প্রামাণিকের স্বামী লক্ষীকান্ত প্রামাণিক কানোরিয়া জুটমিলে কাজ করতেন। বেঁচে নেই। তিনি বললেন, কবে পাবো স্বামীর প্রাপ্য টাকা? কেউ কি বলতে পারবে? হাতে চোট তবুও বৃদ্ধ বয়সে কাজ করতে হচ্ছে।

কালসাবা বাজারে দেখা শেখ দিলসারের সঙ্গে। যেদিন থেকে কানোরিয়া জুট মিল খুলেছে শেখ দিলসার কাজ পেয়েছেন। জানালেন, কানোরিয়া জুটমিলে এখন স্থায়ীশ্রমিক নেই। গ্র্যাচুইটি, পি এফ, মালিকের শ্রমিকদের কাছ থেকে ধার করা টাকা সব বকেয়া ফেরত চাই। টাকা না পাওয়ায় মেয়েটার বিয়ে দিতে পারছি না। ঈদ, পুজোর বোনাসও দেয়নি মালিক। এমন অবস্থা জেনেও সরকার শ্রমিকদের পাশে নেই। তাই কানোরিয়ার শ্রমিক পরিবারের কাছে উৎসবে আনন্দ হারিয়েছে। বেঙ্গল চটকল মজদুর ইউনিয়নের রাজ্যনেতা শামসুল মিদ্দ্যে জানালেন, কানোরিয়া জুটমিলের শ্রমিকদের দুর্দশার কথা, মালিকের শ্রমিকদের প্রতি বঞ্চনার কথা আমরা রাজ্য সরকারকে জানিয়েছি। শ্রমিকদের বকেয়া মেটায়নি মালিক। বেশিরভাগ শ্রমিকই কাজ পাননি। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে চালু হওয়া বন্ধ মিল শ্রমিকের ভাতা বন্ধ করে দিতেই কারখানার গেট খোলার নাম করে বর্তমান তৃণমূল সরকার মালিকের পাশে দাঁড়িয়েছে। মিল পুরো চালু না করলেও, বকেয়া না মেটালেও, বোনাস না দিলেও মালিকের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি তৃণমূল সরকার। রাজ্যে কেমন পরিবর্তন শ্রমিকরা এখন বুঝছেন হাড়ে হাড়ে।

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement