দুটি প্রযোজনারই মর্মকথা স্বাধীনতা

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭

বিভাব নাট্য আকাদেমি-র ‘মন্ত্রগুপ্তি’-তে স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাস যতটা তুলে ধরা হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি উঠে এসেছে স্বাধীনতার স্বপ্নভঙ্গের বেদনা।

৭০ বছর বয়সের স্বাধীনতা কি দিল, স্বাধীনতার মানে কি, স্বাধীনতার দেশবাসীকে কি কি দেওয়ার ছিল? এইসব প্রশ্নে আলোড়িত স্বাধীনতা সংগ্রামী জীবন সেন। প্রতি বছর ২৬শে জানুয়ারি আর ১৫ই আগস্ট এলেই স্বাধীনতার জয়গান গাওয়া হয়, কিন্তু ক্ষুধা, দারিদ্র, দুর্নীতির অন্ধকারে ডুবে যেতে থাকা এই স্বাধীনতার জন্যই কি রক্ত ঢেলেছিলেন সূর্য সেন, প্রীতিলতা, ক্ষুদিরামরা? এই প্রশ্নকে ‘স্বাধীনতা’র ঢক্কানিনাদে ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়। কিন্তু তবু প্রবল হয়ে প্রশ্ন ওঠে সাধারণ মানুষের মনে। জীবন সেনের প্রশ্নে আত্মসমালোচনার সুরও রয়েছে। সঞ্জয় সেনগুপ্তর এই নাটক বাড়তি মাত্রা পেয়েছে, এই আত্মসমালোচনার সুরে। আর পরিবার আর পরিবেশনের চাপে পড়ে সূর্য সেনের বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এবং বিয়ের রাতেই স্ত্রীকে ছেড়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের কাজে ফিরে যাওয়া এবং স্ত্রী পুষ্পমালার চূড়ান্ত আত্মত্যাগের আখ্যান ‘মন্ত্রগুপ্তি’-কে অন্যরকম নাটকের মর্যাদা দেবে।

পুষ্পমালাকে নাট্যকার সঞ্জয় আলাদা গুরুত্ব দিয়েছেন, আসলে পুষ্পমালাদের ইতিহাস তো ভুলেই থাকে।

কিছু সম্পাদনার সুযোগ অবশ্য রয়েছেই। কাহিনী-সূত্র অনন্ত সিংহ। নির্দেশনা সঞ্জয় সেনগুপ্তর। আর কটি প্রদর্শনীর প্রয়োজন হবে। সঞ্জয় সেনগুপ্ত জীবন সেনের যন্ত্রণা, স্বাধীনতার স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, পেনশন প্রকল্পের অপমান, অনুভবের ভিতর থেকে প্রকাশ করেছেন। অভিনয়ে একটা অন্যরকম নীরবতা মিশে ছিল। রূপা বসু-র (প্রীতিলতা) কাছ থেকে অন্যরকম সব অভিনয় আগামীতে আশাই করা যায়। রমা পাল গুণী অভিনেত্রী। মায়ার যন্ত্রণা এবং অপমানের প্রকাশ ওঁর আন্তরিক অভিনয়ে স্পষ্ট হয়েছে। নান্টু (পাল) সূর্য সেনকে নিয়ে আরও ভাবতেই পারেন। সূর্য সেনের অন্তরের শৌর্য সেভাবে প্রকাশ পেল না। সীমা দে পুষ্পমালাকে বিশ্বাসযোগ্যতা দিতে পেরেছেন। রাজা ব্যানার্জিকে অপূর্বর প্রকাশের স্তরগুলো আরও খুঁজতে হবে। এছাড়া অভিনয়ে ছিলেন তাপস চক্রবর্তী, নির্মল মৃধা। আলোয় এত রঙ কেন? আলো-অন্ধকার আর ধুয়ে যাওয়া সামান্য রঙেই এই মহান কালপর্বের আলো-অন্ধকারকে আবিষ্কার করা যাবে। আলো দেবাশিস চক্রবর্তী ও নান্টু পালের। সুর আর শব্দ প্রয়োজনেই এসেছে। বেশ অন্যরকম ধ্রুপদী বন্দিশের ব্যবহার এই নাট্য চেয়েছিল। নগেন দত্ত, অরুণ চৌধুরির সংগীত। তবু বলবো, কিছু সুর আর শব্দ মুছে দেওয়াই যায়। প্রবীর হাইতের মঞ্চে চারণকবি আর রবীন্দ্রনাথের স্কেচ থাকলে ভালো হতো। গানগুলো আরো যত্ন নিয়ে গাওয়া যায় না? নাটকের সঙ্গে কম্পোজিশন এগিয়েছে।

ফিনিক কাঁচরাপাড়ার ‘ঝাঁসি ব্রিগেড’ স্বাধীনতার পরের স্বাধীনতার লড়াইয়ের আখ্যান।

৭০ বছর বয়সের স্বাধীনতার অনেক কিছুর মতো নারীকে স্বাধীনতা দিতে পারেনি। আমরা মাতৃজ্ঞানে মাতৃপূজা করেছি, কিন্তু জীবন্ত মা ধর্ষিতা হয়েছে, নারীর মর্যাদা ধুলায় লুটিয়েছে। রাষ্ট্র-প্রশাসন নির্বিকার। নারীকেই আপন সুরক্ষার দায়িত্ব নিতে হচ্ছে, ঝাঁসি ব্রিগেড-এর মতো নারী-সুরক্ষা সমিতি গঠন করে। শিবঙ্কর চক্রবর্তীর এই নাটক অবশ্য এই লড়াইকে নারী-ব্রিগেডের মধ্যে আটকে রাখেনি, সমবেত প্রয়াসের কথা বলা হয়েছে।

প্রয়োজনীয় নাটক। নির্বিকার রাষ্ট্র এবং প্রশাসনের নির্বিকারত্বের বিরুদ্ধে হাজার হাজার নারী-ব্রিগেড গড়ে তোলার প্রয়োজন আজ সারা দেশে। আর এই ব্রিগেডের সঙ্গে সেতু তৈরি হোক, সুন্দরের পক্ষে লড়াইতে অগুনতি মানুষ এবং তাদের সংগঠনের, যেখানে রয়েছে নারী-পুরুষ সবাই। যেমন হয়েছিল দিল্লীর নির্ভয়া কাণ্ডকে ঘিরে। ঝাঁসি ব্রিগেডের ধর্ষিতা শামিমাকে ঘিরেও এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া হোক। আসলে এই নাটক পূর্ণাঙ্গের পরিসর দাবি করছে। এই পরিসর না ‍পাওয়ায় কিছুটা সরল হয়ে গেছে নাট্যের পরিণতি।

কাবেরী মুখার্জি নির্দেশক হিসেবে এখন পরিণত। বেশ আত্মবিশ্বাসী, অভিনেত্রী অমিতা সেন, এই আত্মবিশ্বাস কাজে এসেছে মৌমিতাকে বিশ্বাসযোগ্যতা দিতে। হার না মানা মৌমিতাকে পাওয়া গেল। সম্ভাবনাময় একগুচ্ছ তরুণী অন্তর ঢেলে অভিনয় করলেন। এঁরা আগামীদিনে ফিনিকের সম্পদ হয়ে উঠবে—এই বিশ্বাস রাখা যায়। অভিনয়ে ছিলেন ববিতা অধিকারী, দীপ্তি দাস, মৌসুমী অধিকারী, শতাব্দী নন্দী। কনক মুখার্জি, ধর্ষক সুনীলের ভূমিকায় অভিনয় করলেন। একেবারে অন্যরকম চরিত্রে তাঁকে পাওয়া গেল। বেশ ভেঙেছেন নিজেকে। এছাড়া তীর্থ দত্ত ছিলেন অভিনয়ে।

নীল-কৌশিকের মঞ্চে অনেকগুলি মাত্রা কোথায় যেন একটা বন্দিত্বের মতো। বিশ্বাসযোগ্যভাবে মঞ্চটিকে ব্যবহার করেছেন অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। মঞ্চে একটি পেন্ডুলাম রয়েছে। ক্ষমাহীন সময়ের প্রতীক। মনোজ প্রসাদ আলো-অন্ধকারের নানা মাত্রা তৈরি করে আবিষ্কার করেছেন, আলো-অন্ধকারের সংঘাত। রঙ না থাকলেও যেত আসতো না। নগেন দত্ত প্রবল সংঘাতময় শব্দ দিয়ে নাট্যপ্রবাহকে আঘাত করেছেন। নাটক এমনই দাবি করেছিল। তবু শব্দশূন্যতার সীমানা আর একটু বাড়ানো যায় না? কম্পোজিশন দেখে মনেই হলো না, কেউ পরিকল্পনার কথা মনে রেখেছেন। তাই স্বতঃস্ফূর্ত। জীবন আর নাট্যের সেতু তৈরি হয়েছে। এমনই তো হওয়ার কথা।

*রঞ্জন গঙ্গোপাধ্যায়*

Current Affairs

Featured Posts

Advertisement